|
সরকারের বৈধতার ভীত কি নড়বড়ে?
খোমেনী ইহসান |
|
বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি ও রাষ্ট্রনৈতিক বিকাশ পর্যবেক্ষণ করে মনে হচ্ছে, ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দানা বাধতে শুরু করেছে। নির্বাচনের ফল ওল্টে দেয়াকে ঘিরে বিরোধী দলের অনালোচিত অভিযোগের পক্ষে সরকারী দলের ডাক সাইটের নেতারা বিশ্বাসযোগ্য বক্তব্য রাখতে শুরু করায় সরকারের বৈধতার ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সংসদের প্রায় ৯ দশমাংস আসনধারী সরকার দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে ঝুকিপূর্ণ করে ভারতসহ সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থে একের পর এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় সরকারের ওপর গণ নজরদারিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে নির্বাচিত সরকারের নাম করে রাষ্ট্রঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সরকারী ব্যাকুলতা জনগণের তরফে প্রচন্ড প্রতিরোধের সম্মুখিন হওয়ার ঝুকি বাড়ছে। যা অনিবার্যভাবে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিকে বিনষ্ট করে আবারো অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ার সমূহ শঙ্কাই বাড়ছে।
‘নির্বাচনে জনগণের রায় ওল্টে দিয়ে আওয়ামী লীগের মহাজোটকে বিজয়ী করা হয়েছে’- সারা দেশে আওয়ামী লীগ বিরোধী জনগণের মধ্যে এমন প্রচ্ছন্ন সন্দেহ ছিলো নির্বাচন পরবর্তী রাত থেকেই। রায় কিভাবে ওল্টে দেয়া হয়েছে এ নিয়ে ছিল ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। একই সঙ্গে হাজার কোটি টাকা দামের প্রশ্ন ছিলো কেন রায় ওল্টো দেয়া হয়েছে? কার স্বার্থে দেয়া হয়েছে? সম্প্রতি খোদ মহাজোট সরকারের প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির পদধারী নেতা-নেত্রীদের বক্তব্য ও কর্মকান্ডে অবসান হচ্ছে সব জল্পনা-কল্পনার। একে একে মিলছে হাজার কোটি টাকা দামের নানা প্রশ্নের জবাব। যা দল-মত নির্বিশেষে সব মানুষই বিশ্বাস করতে শুরু করছে। এর ফলে সঙ্কটাপন্ন হয়ে ওঠছে মহাজোট সরকারের বৈধতা। এমতাবস্থায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে। সরকারের নীতি নির্ধারক মহলও পড়েছে মারাত্মক বিপাকে। তারা বিব্রত হয়েও যেন পার পাচ্ছে না। বরং ক্ষমতার মেয়াদ কাল নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার অস্থিরতায় খাবি খাচ্ছে। আর রাজনৈতিক মহল গলদঘর্ম হচ্ছে এ হিসাব মেলাতে- দেশ কি মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে না গণ অভ্যুত্থানের দিকে? তবে পর্যবেক্ষণে একটি বিষয়ই পষ্ট হয়, সামনে এক ‘জটিল অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি’।
রাজনৈতিক অনিশ্চিয়তার ব্যাপারটি ভেতরে ভেতরে বেশ দানা বেধেছে। যা কোন ভাবেই সামাল দেয়া যাচ্ছে না। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংসদে দাড়িয়ে বলতে হয়েছেন দেশে গণতন্ত্র হরণের চক্রান্ত এখনো চলছে। প্রধানমন্ত্রীকে এ কথা বলতে বাধ্য করছে ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অর্জিত ফলাফল। যা সরকারকে ফেলেছে শাখের করাতে। একদিকে সরকারকে ফলাফলের ব্যাপারে বিরাজমান প্রচন্ড সন্দেহের বোঝা কাঁধে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। আরেক দিকে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সঁপে দিয়ে হলেও ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষণের চাপও সহ্য করতে হচ্ছে। সন্দেহযুক্ত ফলাফল নিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে গিয়ে সরকারকে এ দুটি দেশের প্রশ্রয় লাভ নিশ্চিত রাখতে মরিয়া ওঠছে। কিন্তু প্রশ্রয় লাভের বিনিময়ে সরকার প্রমাণ দিতে বাধ্য হচ্ছে তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয় নি।
স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জনমতকে সরকার উপেক্ষা করে যে ভাবে একের পর রাষ্ট্রঘাতী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তাতে জনমনে ব্যাপক অসন্তোষ ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে। যা এক পর্যায়ে প্রচন্ড সরকার বিরোধিতায় পর্যবসিত হবে। এমতাবস্থায় জনগণের মধ্যে দানা বাধতে বিক্ষোভ স্বতস্ফূর্তভাবে দৃশ্যমান হয়ে গেলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠতে পারে। তা মধ্যবর্তী নির্বাচনে না গণ অভ্যুত্থানে মোড় নেবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
ক্ষমতার মেয়াদ ৯ মাস পার হতে না হতেই সরকারের বৈধতা সঙ্কটাপন্ন হওয়ার নানান প্রমাণ প্রকাশ্যে চলে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল। দেশী-বিদেশী প্রায় সব সংস্থা এ ফলাফলের স্বচ্ছতার ব্যাপারে সার্টিফিকেট দিলেও তা যেন ধোপে টিকছে না। বিরোধী দল নির্বাচনী ফলাফলকে বড় মাপের কারচুপি বলে যে অভিযোগ করে আসছে সরকারী দল থেকে তার সমর্থনে শক্তিশালী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন ডাক সাইটের নেতারা। তাদের বক্তব্যের জোর ও ক্ষমতার ৯ মাসে সরকারে কর্মকান্ড কিছুতেই নির্বাচনী ফলাফলের বৈধতা ধরে রাখতে পারছে না। বরং জনগণের সামনে উন্মোচিত হতে চলেছে গোয়েন্দা কাহিনীকেও হার মানিয়ে দেয়া এক নির্বাচনী ক্যু’র শ্বাস রুদ্ধকর ঘটনা।
২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ফখরুদ্দিন-মইন উ’র দুঃসহ জরুরি সরকারের অবসান হওয়ায় ফলাফলের বৈধতার সঙ্কট হাসিনা সরকারের ক্ষমতায় থাকা না থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এ কারণেই জরুরি সরকারের অপনায়কদের সঙ্গে সম্পাদিত সমঝোতায় অটল থাকে। ফখরুদ্দিন, মইন উ, মাসুদ উদ্দিনসহ জরুরি সময়ের বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিরাপদে দেশ ত্যাগের সুযোগ দেয়। সরকারী দল থেকে তাদের বিচারের দাবি জানানো হলেও কোন সাড়া দেয়া হয় নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দলের ডাক সাইটের বেশ কিছু নেতা জরুরি সরকারের খড়গের শিকার হলেও সমঝোতার কারণে সব ভুলে যেতে বাধ্য হয়।
কিন্তু জনমতের বিপরীত নির্বাচনী ফলাফল অর্জনের ঋণ হিসেবে সরকার দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে ঝুকিপূর্ণ করে তোলায় ফলাফলের বৈধতা আবারো বড় ইস্যু হয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে শক্ত যুক্তি হচ্ছে, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারিতেও ড· ফখরুদ্দিন আহমেদ তৎকালীন সেনা প্রধান মইন উ আহমদের মাধ্যমে জরুরি অবস্থা জারি করিয়ে সংবিধান ভঙ্গ করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এ অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধ বলে জাহির করতে তখন বিপুল জন সমর্থনের দোহাই দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় ওই জন সমর্থন ছিলো তৈরি করা। যারা তাদের জন সমর্থন তৈরি করে দিয়েছিলো তাদের ঋণ শোধ করতে গিয়ে জরুরি সরকার একের পর এক দেশ বিরোধী কর্মকান্ডে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়। তখন বিপুল জন সমর্থনের সরকারের পেছন থেকে শুধু জনগণই উধাও হয় নি উল্টো সরকারের বৈধতার ইস্যুটিই বড় হয়ে যায়। যার ফলে রাখ ঢাক না করেই তাকে ‘এঙ্টি পয়েন্ট’ খুজে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হয়। বর্তমান সরকারের কর্মকান্ডও জরুরি সরকারের পরিণতিরই ইঙ্গিত দেয়।
গত ৯ মাসে দেশে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। এ সব ঘটনায় সরকারের অবস্থান ছিল অত্যন্ত সন্দেহজনক। যা খুব সহজেই দেশের জনগণ রাষ্ট্রঘাতী হিসেবে চিহ্নিত করতে পেরেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিডিআর সদর দফতর পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের নারকীয়ভাবে হত্যা করার ঘটনা। এই ঘটনার শুরু থেকে এ যাবত সরকারের যাবতীয় ভূমিকাই জন্ম দিয়েছে বহুমাত্রিক সন্দেহের। বিরোধী দলীয় নেত্রী, বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তারা একাধিকবার অভিযোগ করেছেন, সরকার পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করে কালক্ষেপণ করেছে। যে কারণে ৫৪ জন সেনা কর্মকর্তাকে খুনীদের হাতে বেঘোরে প্রাণ হারাতে হয়। এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও সংসদ সদস্য ব্যরিস্টার ফজলে নুর তাপসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠেছে খুনীদের সটকে পরার সুযোগ করে দেয়ার ব্যাপারে। এরপর এই ঘটনার বিচার করা নিয়েও সরকারকে অবহেলা করতে দেখা গেছে। ঘটনার তদন্ত নিয়ে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন, ঘটনার ব্যাপারে বাণিজ্যমন্ত্রী লে· কর্নেল (অব·) ফারুক খানের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও পরবর্তীতে বিচারের পদ্ধতি নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিডিআর নিয়ে সরকারের অবস্থানই সন্দেহজনক হয়ে যায়। একদিকে বিচারের নাম করে সরকার সীমান্তের ঘাটি খালি করে দলে দলে বিডিআর সদস্যদের ধরে আনে। অপর দিকে সেনা কর্মকর্তাদের খুনের বিচার কোন আইনে হবে এ নিয়ে সরকার সংসদে তরিৎ সিদ্ধান্ত না নিয়ে রাষ্ট্রপতি ও সুপ্রিম কোর্টকে টেনে আনে। যা কাল ক্ষেপণের অযুহাত হিসেবেই বিবেচিত হয়। বিডিআর নিয়ে অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতার সুযোগে ফেনসিডিলসহ ভারতীয় চোরাই পণ্যে সয়লাব হয়ে যায় বাংলাদেশ। অন্যদিকে পোষাক ও নাম পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ডস অব বাংলাদেশ (বিজিবি) করে সরকার বিডিআরকে বিলুপ্তই করে দেয়। যা মূলতঃ বিডিআরের প্রতিপক্ষ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকেই খুশী করে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতকে এশিয়ান হাইওয়ের নামে করিডর প্রদানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণও সরকারের বৈধতার ভীত কাপিয়ে দিচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। তাদের মতে এর আগে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সময় ১৯৭২ সালে ও শেখ হাসিনার সময় ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় গিয়েছিলো। তখনও ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে নানান সুবিধা আদায় করতে চাপ দিয়েছিলো। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা ভারতকে সুবিধা দিতে গিয়ে সার্বভৌমত্বের সীমা লঙ্ঘন করেন নি। কিন্তু এবার সরকারের তরফ থেকে ভারতকে সুবিধা প্রদানের ব্যাকুলতা ব্যাপকভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে ভারতের প্রধান দাবি করিডোর সুবিধা প্রদান। এই সুবিধা প্রদানকে নির্বিঘ্নন রাখতে সরকার এশিয়ান হাইওয়েকে ব্যবহার করছে এবং ভারতের পছন্দসই রুটকে হাইওয়ের জন্য নির্ধারণ করেছে। অভিযোগ ওঠেছে, এই হাইওয়ে মূলত ব্যবহৃত হবে বিচ্ছিন্নতা প্রবণ ভারতীয় সাত বোন রাজ্যমালার স্বাধীনতাকামীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার রসদ পরিবহনে রুট হিসেবে। করিডর প্রদানের ব্যাপারে ভারত অতীতে প্রায় সব সরকারের সময় দাবি জানিয়েই প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলো। এ বার মহাজোট সরকার দেশটিকে বিমুখ করছে না। যাকে অনেকে নির্বাচনী ঋণ শোধ বলে সন্দেহ করেন।
এ দিকে মহাজোট সরকারের সময় সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু হিসেবে মাঠে গড়ায় ভারতের উদ্যোগে সিলেটের অদূরে বরাক নদীর টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণ বন্ধের দাবি। এ জন্য বিএনপি-জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দল, নাগরিক সংগঠন, পরিবেশবাদী সংগঠন, দেশের প্রথিতযশা পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও পানি বিশেষজ্ঞরা জোরেশোরে মাঠে নামে। কিন্তু পানিমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রী ও পানি মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিসহ সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিরা হাঁক-ডাক দিয়েই টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের পক্ষে অবস্থান নেন। বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ ভারত না করার জন্য তাদের আশ্বস্ত করেছে বলে তারা দেশীয় প্রতিবাদকারীদেরকে স্বান্তনা দেয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন। যদিও বঙ্গবন্ধুর সময় ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করায় বাংলাদেশের পদ্মা শুকিয়ে বালুচরে পরিণত হয়ে গেছে। দেশের এক তৃতীয়াংশ এলাকা মরুকরণ ও লবনাক্ততার শিকার হয়েছে। ফারাক্কার অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ব্যাপারে সরকারের ভারতবান্ধব অবস্থানকেও নির্বাচনী ঋণ শোধ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
সরকার ক্ষমতারোহণের বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সাম্রাজ্যবাদীদের বঙ্গোপসাগরের তেল-গ্যাস লুটে নেয়ার সুযোগ দিচ্ছে। এ জন্য সরকারকে দোষী করে এরই মধ্যে তেল-গ্যাস-জাতীয় সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে। সংগঠনটি গত ১৪ সেপ্টেম্বর রমজানের মধ্যেও অর্ধ দিবস হরতাল পালন করেছে।
নির্বাচনী ক্যু
২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে সারা দেশে যেভাবে জনমত প্রতিফলিত হয়েছিলো তাতে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মহাজোট ও বিএনপির চার দলীয় জোটের হাড্ডা-হাড্ডা লড়াই হবে বলেই সবার বিশ্বাস জন্মে ছিলো। কিন্তু নির্বাচনে সব হিসাব ওল্টে দিয়ে প্রায় ৯ দশমাংস আসন পায় মহাজোট। অন্যদিকে মাত্র ৩২ টি আসন নিয়ে হতভম্ব হতে হয় চার দলীয় জোটকে। এই অবিশ্বাস ফলাফলের ব্যাপারে নির্বাচনের পরপর পাতানো ফলাফলের শিকার বিএনপি’র চার দলীয় জোট থেকে অভিযোগ তুলে নির্বাচনের বৈধতার ব্যাপারে আপত্তি জানানোর চেষ্টা করা হয়েছিলো। অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে নির্বাচনের পর পর চার দলীয় জোটের পক্ষ থেকে পুকুর পাড়ে ও ধান ক্ষেতে পরে থাকা ধানের শীষ ও দাড়ি পাল্লায় সিল মারা ব্যালট পেপারের মুড়ি মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিলো। কিন্তু দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষরা এক যোগে ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ স্বচ্ছ নির্বাচন বলে সার্কিফিকেট দেয়ায় ভেস্তে যায় চারদলীয় জোটের নির্বাচন সংক্রান্ত যাবতীয় অভিযোগ। তা ছাড়া মিডিয়ায় প্রদর্শিত সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে কী করে ফলাফল ওল্টে দেয়া সম্ভব হয়েছে এ ব্যাপারেও চার দলীয় জোট তেমন কোন ব্যাখ্যাই দেয় নি। পুরো র্নিবাচনী প্রক্রিয়া সেনা বাহিনীর তদারকিতে হওয়া সত্ত্বেও কে ফলাফল ওল্টে দিয়েছে তাও বলতে পারেনি চারদল।
কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর ট্রাজেডির পর জাতীয় সংসদে দাড়িয়ে মহাজোটের দ্বিতীয় বড় শরিক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ দাবি করে বসেন মহাজোটের বিপুল বিজয়ের জন্য সেনা বাহিনী সহযোগিতা করেছে। তিনি সহযোগিতার ব্যাপারটি পষ্ট করে বলেন নি। অনেকেই মনে করেছিলেন, জরুরি সরকারের সময় সেনা বাহিনীর মাধ্যমে সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের তুলনায় চার দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা বেশি উৎপীড়িত হয়েছিলেন। এ কারণে যে রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছিল হয়তো তার সুবিধা নিয়েই মহাজোট নির্বাচনে অবিশ্বাস্য ফলাফল অর্জন করতে পেরেছে। তবে সেনা বাহিনীর সহযোগিতার ব্যাপারে খোলামেলা ব্যাখ্যা পাওয়া যায় বিএনপির সিনিয়র নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অভিযোগ থেকে। তার অভিযোগ মতে, সেনা বাহিনী বিজি প্রেস থেকে প্লেট তুলে নিয়ে অতিরিক্ত ব্যালট পেপার পেপার ছাপিয়েছিলো। ৪০ হাজার করে নৌকা ও লাঙ্গলে সিল মারা ব্যালট পেপার ভোটের বাে ভরে দেয়া হয়েছিলো। তার এ অভিযোগকে সমর্থন করে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা এমনও অভিযোগ করছেন অতিরিক্ত ব্যালট ঢোকানোর ফলে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিলো প্রাপ্ত ভোটের হার। কোন কোন কেন্দ্রে ১০২ ভাগ থেকে শতভাগ ভোটও গৃহিত হওয়ার রেকর্ড অর্জিত হয়। দেখা গেছে, চার দলীয় জোটের প্রার্থীরা ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে যে হারে ভোট পেয়েছেন তার চেয়ে বেশি ভোট পেয়েও হেরে গেছেন। এটি হয়েছে মূলতঃ অতিরিক্ত ভোট গৃহিত হওয়ায়। ডাক সাইটের রাজনীতিক আওয়ামী লীগের বর্তমান উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল আওয়ামী লীগের বিজয়ের পেছনে ডিজিএফআই-এর সমঝোতার ব্যাপারে বিস্ফোরক মন্তব্য করার পর নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দেয়ার সঙ্গে ডিজিএফআই-এর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ডিজিএফআই শুধু ব্যালটের বিষয়টির সঙ্গেই জড়িত নয়। বরং আওয়ামী লীগের নতুন মুখদের মনোনয়ন লাভের বিষয়টিও এ সংস্থাটির নির্ধারণ করে দেয়া। সংস্থাটির মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ২০০৮ সালের প্রথমার্ধে প্রার্থী নির্ধারণের জন্য প্রত্যেকটি সংসদীয় আসনে জরিপও চালিয়েছিলো। এ বিষয়টিও আলোচনায় আসে অখ্যাত-অজ্ঞাত ব্যক্তিরা মহাজোট সরকারের মন্ত্রী সভায় জায়গা পাওয়ায়। আব্দুল জলিল দু’বার মন্ত্রী সভার নতুন সদস্যদেরকে সরাসরি অভিযুক্ত করেছেন ডিজিএফআই-এর এজেন্ট হিসেবে।
নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দেয়ার ব্যাপারে এ পর্যন্ত যা জানা গেছে তাতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলে থাকতেই সমঝোতা হয়েছিলো জরুরি সরকার মহাজোটকে ক্ষমতায় এনে দেবে। আর মহাজোট সরকার অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জরুরি সরকারের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ব্যক্তিদের নিরাপদ প্রস্থানের সুযোগ করে দেবে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানে আসিফ আলী জারদারি ও পারভেজ মোশারফফের সমঝোতার মতো আন্তর্জাতিক জিম্মাদারও রয়েছে। মহাজোট ও জরুরি সরকারের সমঝোতার সবই ঠিক মতো হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী ফলাফল আগে নির্ধারণ করে দেয়ার কান্ড ও আন্তর্জাতিক জিম্মাদারদের হুকুম পালনে সরকারের বাধ্য বাধকতার ব্যাপারটিই সরকারের নির্বাচনী ম্যান্ডেটের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
লেখকঃ এক্টিভিস্ট ও সাংবাদিক, ইমেইল, khomenee.ehsan@gmail.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/KhomeneeEhsan |
| |
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
|