মঙ্গলবার, ২৩ ভাদ্র ১৪১৭; ২৭ রমজান ১৪৩১; ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১০; রাত ০৯:৪৯ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

কেমন চলছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)

কাজী সায়েমুজ্জামান

দূর্বল হয়ে গেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এর যথেচ্ছ ব্যবহার এবং একে ইস্যু করে বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন বিতর্ক কমিশনকে দুর্বল করে রেখেছে। এটা সত্যি যে দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নির্বিচারে এ কমিশনের ক্ষমতাকে ব্যবহার করা হয়েছিল। তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে হেনস্থা করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় গিয়ে এ পরিস্থিতি নিজেদের মতো করে বদলাতে চেষ্টা করে। কমিশনের ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়ায় সরকারের সঙ্গে কমিশনের কয়েকদফা টানাপোড়েনে শিথিল হয়ে পড়ে কমিশনের কর্মকান্ড। এর ফলে সামাজিকভাবে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরাও পার পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ওদিকে অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচারাধীন মিলিয়ে ১৬ হাজারের মতো মামলার ভার এখন কমিশনের কাঁধে। উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা দুদকের ১ হাজার ২৭৮টি মামলা শেষ করার কোন বিশেষ উদ্যোগও নেই। ওই সময়ে দায়ের করা বিভিন্ন মামলায় অভিযোগ গঠনে দূর্বলতা ও একতরফা রায় দেয়ায় সব আসামিই এখন জামিনে রয়েছেন। দেশে জনতা টাওয়ার মামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ ছাড়া দুর্নীতি মামলার চূড়ান্ত রায়ে আর কেউ সাজা পায়নি।

কমিশনে জনসাধারনের দেয়া অভিযোগের সংখ্যাও কমে গেছে। দু একটি রুই-কাতলা ধরলেও দুদক ছুটছে চুনোপুঁটির সন্ধানে। ওইসব রুই-কাতলার কারবারেও রাজনৈতিক পক্ষপাত দৃশ্যমান। দেখা যাচ্ছে, একপক্ষ ফাইনাল রিপোর্টে পার পেলেও অন্যপক্ষের অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যেই সরকার ৯৯টি দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ পাঠিয়েছে দুদকের কাছে। এ তালিকায়ও যথারীতি সরকারি দল সংশ্লিষ্টরাই শুধু স্থান পেয়েছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না স্বাধীন এ সংস্থাটি।
তবে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, কোনো দুর্নীতিবাজকেই ছাড়া হবে না। আর দুদকের দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বলতে কোনো মামলা নেই। উচ্চ আদালতে গিয়ে মামলাগুলো ঝুলে পড়ার কারণেই কারো শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ কারণেই দুদককে দন্তহীন বাঘ বলে অভিহীত করেছি। এ মুহূর্তে দুদককে শক্তিশালী করতে হলে সুপ্রীম কোর্টে তিন-চারটি স্পেশাল বেঞ্চ করা উচিত। যাতে বেঞ্চগুলো শুধু দুর্নীতির মামলাগুলোর শুনানী শেষ করতে পারে। এ সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছি। এর আগে দন্তহীন কমিশনের থাবার নখগুলো কেটে ফেলে ক্ষমতাহীন করার যে একটি অবস্থা তৈরি করা হয়েছিল তা এ বক্তব্যের মাধ্যমে দূর হবে বলে আশা করছি।

টানাহেঁচড়ায় কমিশনের বিবর্তন
এদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাস প্রায় ৬৬ বছরের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৩ সালে খাদ্য বিভাগের অধীনে এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ নামে একটি সংস্থা তৈরি করা হয়েছিল। রেশনিং সিস্টেমে দুর্নীতি প্রতিরোধ করার জন্য এ সংগঠনটির জন্ম হয়। ১৯৪৭ সালে প্রথম দুর্নীতিবিরোধী আইন তৈরি করে এ সংগঠনটি সিআইডি বিভাগে ন্যস্ত করা হয়।

১৯৫৭ সালে দুর্নীতিবিরোধী আরেকটি আইন করে এ বিভাগকে দুর্নীতি দমন ব্যুরো নামকরণ করা হয়। পাকিস্তান আমলে দুর্নীতিদমন ব্যুরোকে রাজনৈতিক দমন ও নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে এ ব্যুরোকে ব্যবহার করা হয়। এভাবে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত এ ব্যুরোটি পুলিশের একটি শাখা হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৮৩ সালের ১৯ অক্টোবর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের অফিস থেকে একটি নোটিশে পুলিশের ওপর থেকে জনশক্তির নির্ভরতা এড়াতে ব্যুরোর জন্য আলাদা কর্মী কাঠামো গঠন করা হয়। তবে এসময়ও এ সংস্থাটির ওপর আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকে। ফলে সংস্থাটি দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই রাখতে পারেনি। উল্টো, এর বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, ইতোমধ্যে পরপর তিনবার এ দেশকে সারা দুনিয়া শীর্ষ দুর্নীতির দেশ হিসেবে ঘোষণা করলে স্বাধীন একটি দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের জন্য দেশব্যাপী জনমত গড়ে ওঠে। ফলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ২০০৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন তৈরির মাধ্যমে বর্তমান দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করে। বিলুপ্ত করা হয় আগের দুর্নীতি দমন ব্যুরো। কিন্তু এ কমিশন পরবর্তী তিন বছর কোনো কাজই করতে পারেনি।

২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারি মাসে এটি পুনর্গঠন করে। সাবেক সেনাপ্রধান লে জেনারেল অব হাসান মশহুদকে এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। শুরু হয় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। দেশের দুটি প্রধান দলের শীর্ষ নেতৃত্বসহ কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ীকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। এদের বিচারের জন্য স্থাপন করা হয় বিশেষ আদালত। ওই আদালত ২০০৭ সালের এপ্রিল থেকে ২০০৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১১২টি মামলায় ১৪৭ জনকে ১২২৪ বছর ৬ মাস কারাদণ্ড দেন। তবে দুর্নীতি মামলার সেই প্রক্রিয়া না ছিল স্বচ্ছ, না ছিল আইনানুগ। রায় প্রদানের ক্ষেত্রে নিম্নআদালতের বিচারকদের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সশস্ত্র চোখ রাঙানির অধীনে কাজ করতে হয়। নিম্নআদালত পরিণত হয় ক্যাঙ্গারু কোর্টে। স্বভাবতই কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হাইকোর্টের আশ্রয় নিয়ে সবাই সব মামলায় স্থগিতাদেশ নেন। বর্তমানে ২০৩টি মামলা হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। আপিল বিভাগে রয়েছে ১৭৯টি।
২০০৮ সালে নির্বাচিত নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর কমিশনের কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। সরকারের সঙ্গে কমিশনের টানাপোড়েন শুরু হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান হাসান মশহুদ চৌধুরী ও তার তিন সহকর্মীকে কমিটির কছে জবাবদিহি করতে হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়। কমিটির আহ্বানে দুদক চেয়ারম্যান সাড়া দেননি। কমিটি একে সংসদের অবমাননা হিসেবেই উল্লেখ করে। ফলে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ আর দুদকের মধ্যে দূরত্ব আরো বাড়ে। নতুন রাজনৈতিক সরকারের ক্ষমতা নেওয়ার চার মাসের মাথায় ২ এপ্রিল চেয়ারম্যান হাসান মশহুদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে শেষ হয় কমিশনের দ্বিতীয় অধ্যায়।

গত বছরের ৩০ এপ্রিল সরকারি এক গেজেটে দুদকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে গোলাম রহমানের নাম ঘোষণা করা হয়। তিনি ২৪ জুন দুদকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। এর মাধ্যমে শুরু হয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কমিশনের তৃতীয় পর্বের কার্যক্রম। তবে সরকার থেকে অসহযোগিতা আর বিচারে দীর্ঘসূত্রতা দুদকের কার্যক্রমকে প্রায় থামিয়ে দিয়েছে। ফলে কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান দুদককে দন্তহীন বাঘ বলতে বাধ্য হয়েছেন।

দুর্নীতি দমনে সরকারের বিপরীত অবস্থান
গত ৬ জানুয়ারী বর্তমান সরকারের এক বছর পূর্তিতে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দেশকে দুর্নীতি থেকে মুক্তি দিতে চাই। সে কারণে দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ ও সংস্কারসহ বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। এর আগে গত ৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর ঘোষণা দেন। ৯ ডিসেম্বর তিনি আবার বলেন, দুর্নীতিবাজ অর্থ পাচারকারীদের বাংলার মাটিতে ঠাঁই নেই। এভাবে সরকার প্রধানের কথায় দুর্নীতি দমনের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে কমিশন অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। সরকারের কমিশনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আগে ঐক্যমত না হয়েই বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়। যা কমিশন সন্দেহের চোখে দেখে।
২০০৪ সালের ৫নং আইন দিয়ে দুদক পরিচালিত হয়। ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা অধ্যাদেশ জারি করে এর কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা হয়েছিল। বর্তমান সংসদ তা গ্রহণ করেনি। এজন্য ওই বিধিমালা তামাদি হয়ে গেছে। দুদকের চেয়ারম্যান বলেছেন, ২০০৭ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে কমিশনের স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে যে সংসদীয় উপ-কমিটি কাজ করছে তাতে স্বায়ত্তশাসন খর্ব হবে।

তবে গত মার্চ মাসে দুদকের আইন সংশোধনের জন্য সরকার একটি কমিটি তৈরি করে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ৪ মে মন্ত্রিপরিষদ দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর তিনটি ধারায় সংশোধনের অনুমোদন দেয়। এগুলো হচ্ছে- কমিশন আইনের তফসিলে বর্ণিত দণ্ডবিধির ৪০৮ ধারা বিলুপ্ত হবে। এ ধারায় বলা হয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। দুদক আইন ২০০৪-এর ২৬ ধারায় যেখানে সহায়-সম্পত্তির প্রশ্নে কমিশন তদন্ত করবে লেখা রয়েছে সেখানে তদন্ত শব্দের পরিবর্তে অনুসন্ধান শব্দটি বসানোর কথা বলা হয়। কমিশনের দায়ের করা যে কোনো মামলা বা কার্যক্রমের যে কোনো পর্যায়ে আদালতে কেউ প্রতিকার চাইলে কমিশনকে পক্ষভুক্ত করতে হবে। একইসঙ্গে কেউ জামিন বা প্রতিকার চাইলে কমিশনকে সঙ্গত সময় দিয়ে শুনানি করতে হবে। আইনের ২৩(২) ধারার পর ২৩(৩) ধারা সংযোজনের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া কমিশন অনুসন্ধান বা তদন্তের সময় সরকার বা সরকারের অধীন যে কোনো সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের দক্ষ, অভিজ্ঞ ও পারদর্শী কর্মকর্তাদের কমিশনে সংযুক্ত করতে চাইলে উক্ত সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ কমিশনকে সহযোগিতা করবে বলেও সংশোধনীতে নীতিগত অনুমোদনের কথা বলা হয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ আইন সংশোধন করা হলে দুদক আরো দুর্বল হয়ে যাবে। বর্তমান দুদকের আইন অনুযায়ী, সরকারের জনগুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য পেতে পারে দুদক। আইন সংশোধিত হলে, কমিশনের সেই ক্ষমতা আর থাকবে না। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনুমতি ছাড়া এনবিআর কোন করদাতার গোপন তথ্য সরবরাহ করতে পারেনা। একদিকে দুদকের গোপন তথ্য পাওয়ার ক্ষমতা আর অন্যদিকে এনবিআরের অক্ষমতার দুটি আইনই দেশে বিদ্যমান রয়েছে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জোর করেই এনবিআর থেকে গোপন ফাইল এনে সংশ্লিষ্টের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
নতুন আইনে দুদককে সকল কর্মকাণ্ডের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহি করতে হবে। দুদকের আর্থিক ব্যয়ের ব্যাপারেও জবাবদিহিতার আইন করার প্রক্রিয়া চলছে। অথচ কমিশনের বক্তব্য হলো, দুদক একটি স্বাধীন ও স্বশাসিত কমিশন এবং এই কমিশনের কার্যাবলীর বিষয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ইত্যাদি বিষয়ে দুদক আইন ২০০৪-এ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। আইনের ২৫ ধারায় কমিশনের আর্থিক বিষয়ে কমিশনকে স্বাধীনতা দেওয়া আছে এবং এ বিষয়ে সরকারের পূর্বানুমোদন নেওয়ারও কোনো দরকার নেই। সংবিধানের ১২৮ অনুচ্ছেদে আর্থিক বিষয়ে মহাহিসাব নিরীক্ষক যে কোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান তা পারে না।
তবে এ সব পরিবর্তনের পক্ষে রাজনীতিকদের কিছু যুক্তি রয়েছে। মহিউদ্দিন খান আলমগীর বলেছেন, বিএনপি দায়সারাভাবে ওই আইন করেছিল। ওই আইনে দুর্নীতির কোনো সংজ্ঞাও নেই। দুদককে শক্তিশালী করতেই দুদক আইনের সংশোধন দরকার। তবে সমস্যা হচ্ছে ক্ষমতা কেউ কেউ ছাড়তে চায় না। কমিশনও এ কারণে এর বিরোধিতা করছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে কোনো কর্তৃপক্ষকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া যায় না।
এদিকে গত মাসে কেবল দুর্নীতির মামলা শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্টে দুটি বেঞ্চ গঠন হয়। এতে কমিশনও আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। তবে কয়েকদিন পর কোনো বোধগম্য কারণ ছাড়াই দুটো বেঞ্চই শুনানি বন্ধ করে দেয়। এরপর কমিশন চেয়ারম্যান বেঞ্চ গঠনের জন্য এ্যাটর্নী জেনারেলের সঙ্গে দেখা করে স্পেশাল বেঞ্চ গঠনের অনুরোধও জানান। কিন্তু এ্যাটর্ণী জেনারেল তাকে কোন প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন নি।

অভিযোগ কমছে
দুদকের শিথিলতা জনগণের ওপরেও প্রভাব ফেলেছে। দুদকের কার্যক্রমের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাওয়ায় অভিযোগও কমে গেছে। গত বছরের তুলনায় এ হার ছয়ভাগের একভাগ। এ বছরের গত জুলাই থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত দুদক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ১৫৫০টি অভিযোগ পেয়েছে। অথচ ২০০৮ সালে একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৬৭১৩টি। ২০০৮ সালের জুলাই মাসে প্রাপ্ত অভিযোগ ছিল ২৬৬২টি। চলতি বছরের জুলাই মাসে এর সংখ্যা ৫৯৯টি। ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে দায়েরকৃত অভিযোগ সংখ্যা ছিল ২০৪৮টি। চলতি বছরের আগস্টে তা কমে ৫৪৮টিতে দাঁড়িয়েছে। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অভিযোগ ছিল ২০০৩টি। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে এর সংখ্যা ৪০৩টি।

তবে কমিশন জানায়, মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক সচেতন। তারা আগের মতো ঢালাও অভিযোগ করছে না। আগে জমিজমার বিরোধ নিয়েও লোকজন দুদকে অভিযোগ করতো। কিন্তু দুদক ওই বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। এ কারণেই হয়তো অভিযোগ কমে গেছে।
দুদক যেসব অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে তা হলো- দুর্নীতি দমন আইন সংশোধন ২০০৪-এর ২৭ ধারা অনুযায়ী জ্ঞাত আয়ের উৎস-বহির্ভূত সম্পত্তির দখলের অপরাধ, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৪৭ অনুযায়ী অপরাধ, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০০২ অনুযায়ী অপরাধ এবং দণ্ডবিধি (১৮৬০ সালের ৪৫নং আইন)-এর ১৬১ থেকে ১৬৯, ২১৭, ২১৮, ৪০৮, ৪০৯, ও ৪৭৭এ ধারায় অপরাধ। ১৬১ থেকে ১৬৯ ধারায় সরকারী কর্মচারীদের অপরাধের বিষয়ে বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- সরকারি কর্মচারীর বৈধ পারিশ্রমিক ছাড়া অন্য কোনো বখশিশ নেওয়া। অবৈধ উপায়ে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে পারিতোষিক নেওয়া ও এতে সহায়তা করা, অন্যান্য কর্মচারী পরিচালিত মামলা বা ব্যবসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকট থেকে বিনামূল্যে মূল্যবান বস্তু নেওয়া ও এতে সহায়তা করা, ব্যক্তিগত প্রভাব প্রয়োগের জন্য পারিতোষিক নেওয়া, কোনো ব্যক্তির ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে আইন অমান্য করা, বেআইনি ব্যবসা করা, বেআইনি সম্পত্তি কেনা ও নিলামে দর করা। ২১৭ ধারায় রয়েছে- কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি হতে বাঁচাবার বা কোনো সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে সরকারি কর্মচারী আইনের নির্দেশ লংঘন। ৪০৮নং ধারাটি বাতিলের সুপারিশ করেছে মন্ত্রিপরিষদ। ৪০৯ ধারায় রয়েছে সরকারি কর্মচারী বা ব্যাংকার, ব্যবসায়ী অথবা এজেন্টদের অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ। ৪৭৭এ ধারায় রয়েছে- নিয়োগকৃত ব্যক্তির নিয়োগকর্তার হিসাব বিকৃত করা। এছাড়াও দুদক দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় সংজ্ঞায়িত অপরাধ কাজে সহযেগিতা, ১২০বি ধারায় ষড়যন্ত্র ও ৫১১ ধারায় অপরাধে উদ্যত হওয়ার অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

লোকবল সংকট
কমিশন আইনের ৩৮(৩) ধারা অনুযায়ী বিলুপ্ত ব্যুরোর মামলা পরিচালনার ভারও পড়েছে কমিশনের ওপর। বর্তমানে ব্যুরো আমলের ৬৩৬১টি অনুসন্ধানী অভিযোগ, ২৪৩১টি তদন্তাধীন মামলা এবং ২২৭৬টি বিচারাধীন মামলা রয়েছে । আর কমিশন আমলে ১২০১টি অনুসন্ধানী অভিযোগ, ১৪৩৩টি তদান্তাধীন মামলা এবং ৮১৪টি বিচারাধীন মামলা রয়েছে । বর্তমানে দু আমল মিলিয়ে মোট ৭৫৬২টি অনুসন্ধানী অভিযোগ এবং ৩০৬২টি তদন্তাধীন মামলা রয়েছে। এছাড়াও হাইকোর্টে ১০৯৯টি এবং আপিল বিভাগে ১৭৯টি মামলা রয়েছে । সব মিলিয়ে ১৫৭৯৪টি মামলা এ মুহূর্তে কমিশনকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে এত অভিযোগ তদন্ত ও মামলা পরিচলনার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো লোকবলই নেই। কমিশনে তদন্ত ও মামলা পরিচালনার জন্য ৩৩৮টি পদ রয়েছে। এদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ১৯৯ জন। গত বছরের ১৫ অক্টোবর মোট ৬২ জন পরিদর্শক কর্মকর্তাকে সহকারী পরিচালক পদে পদোন্নতি দিয়ে এ সংখ্যা ১৯৯ জন করা হয়েছে। এখন ১৯৯ জনের ওপরই ১৫৭৯৪টি কেস তদন্ত ও মামলা পরিচালনার ভার পড়েছে। এর সুযোগই নিচ্ছে আসামিপক্ষ ।

জানা গেছে, কমিশনের ১২৬৪ পদের মধ্যে ৮৮১টি পদে বর্তমানে লোকবল রয়েছে। বাকি ৩৮৩টি এখনো শূন্য। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর ঝুলে থাকা এতগুলো তদন্ত কাজে গতি আনতে সহকারী পরিচালক পদে ৪০ জন ও উপসহকারী পরিচালক পদে ৩২ জন নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিভিন্ন কারণে এক বছর পার হয়ে গেলেও এ দুটি পদে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে কমিশন জানিয়েছে, দুএক মাসের মধ্যে লিখিত পরীক্ষার তারিখ জানিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে। এ নিয়োগ হলে তদন্ত কার্যক্রম স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে।

চুনোপুঁটি নিয়ে কারবার
কমিশন বর্তমানে দুই একটি রুই-কাতলার কারবার করলেও পুঁটির কারবার নিয়ে ঢিমেতালে কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। কমে গেছে প্রাথমিক তথ্য বিবরণী বা এফআইআর ও চার্জশিটের সংখ্যা। এসব চুনোপুঁটির বেশিরভাগই সরকারি কর্মচারী।
কমিশনের হিসাবে ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এফআইআর করা হয়েছিল ১৭০টি। এর মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় ১৭০টি। অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয় ৮০টি। ২০০৮ সালে একই সময়ে এফআইআর হয় ৯৭৯টি। অভিযোগ দেওয়া হয় ৩৯৭টি। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয় ১৯৭টি। ২০০৯ সালের বছরের জানুয়ারি থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এফআইআর করা হয় ২৫০টি। আর অভিযোগ দেওয়া হয় ৩০৪টি। এছাড়াও ১৮৬টি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। গত দু বছরের চেয়ে চলতি বছরে এফআইআর ও অভিযোগপত্র দেওয়া কমে গেছে।
দুদকের আইনজীবীরা জানান, কালো টাকা সাদা করারও সুযোগ থাকায় এখন অনেক দুর্নীতিবাজকে ছাড় দিতে হচ্ছে। বর্তমান চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ৩১ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট মামলা হয়েছে ১০৩টি। অনুমোদিত অভিযোগপত্রের সংখ্যা ২৬৪টি। অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে ১০৯টি। প্রাথমিক তথ্য বিবরণী এফআইআরে ৩০৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

গত নভেম্বর মাসে মোট মামলা হয়েছে ৩০টি। অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে ২৭টি। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে ১৮টি। প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে মোট অভিযুক্ত ব্যক্তি ৩৩ জন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৫ জন বাদে সবাই সরকারি চাকরিজীবী। কোনো রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ী এ তালিকায় ছিলনা।
এছাড়াও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির অভিযোগে গত ডিসেম্বর মাসে ৩২ জনের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা করেছে (দুদক)। এ ছাড়াও ৮০টি মামলার অভিযোগপত্র অনুমোদন করেছে। এসব মামলায় সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদসহ ১৪৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আলোচিত একজন রাজনৈতিক নেতাও আছেন। একই সময় দুদক ২১টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে ৪২ জনকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।

রুই-কাতলার কারবারে একচোখা নীতি
কমিশনের দুএকটি রুই কাতলার কারবারে একচোখা নীতি ফুটে ওঠেছে। বর্তমান কমিশনের অভিযোগ দায়ের ও চূড়ান্ত অব্যাহতি প্রতিবেদনের দিকে তাকালেই এটা প্রমাণিত হয়। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কোন নেতার বিরুদ্ধে কমিশন মামলা তো দূরের কথা তদন্তই করেনি। বরং সরকারী দলের নেতাদের বিভিন্ন মামলায় অব্যাহতিপত্র দেয়া হয়েছে।
কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, প্রথমে অভিযোগ পাওয়া গেলে সত্যতা অনুসন্ধান করা হয়। সত্যতা পাওয়া গেলে প্রাথমিক তথ্যবিবরণী লিপিবদ্ধ করা হয়। পরে এর বিরুদ্ধে মামলা করা যায় কিনা তার তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগ প্রমাণ করার মতো তথ্যউপাত্ত মিললে অভিযোগপত্র দিয়ে নিয়মিত মামলায় পরিণত করা হয়। এর কোনো অন্যথা হলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। চূড়ান্ত প্রতিবেদনকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর একটি এফআর অ্যাজ এফ বা ফলস। এর অর্থ অভিযোগটি পুরোপুরি মিথ্যা। আরেকটি হলো এফআর অ্যাজ টি। এর অর্থ অভিযোগে হয়তো সত্যতা রয়েছে। তবে আদালতে প্রমাণ করার মতো কোনো তথ্যউপাত্ত নেই। আরেকটি হলো- এফআর এমএফ। অর্থাৎ মিসটেক অব ফলস। ঘটনা অন্য কোনো। বর্তমান কমিশন কয়েকমাসে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে বেশিরভাগ অভিযোগকেই এফআরটি বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে।
গত ৫ জুলাই এফআর অ্যাজ এমএফ হিসেবে বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, বর্তমান স্পিকার অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে একটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বাজেট বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও কিশোরগঞ্জ পৌরসভা আবাসন উপলক্ষে ২ লাখ ৩২ হাজার ৮০০ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ ছিল।
এভাবে ১৭ আগস্ট জেনারেল (অব) মোস্তাফিজুর রহমান বীরবিক্রমসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগেরও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

১৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধ নির্মাণ প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহার করার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক প্রতিমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও রয়েছেন।
ডিসেম্বর মাসে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশররফ হোসেনসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে দায়ের মামলারও এফআরটি বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে ন্যাম ভিলেজ ও ন্যাম ফ্লাটের বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছিল। সরকার যে ৯৯টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করে দুদকের কাছে পাঠায় তার মধ্যে শেখ হাসিনা ও ইঞ্জিনিয়ার মোশররফ হোসেনের বিরুদ্ধে দুটি মামলাও ছিল।
অন্যদিকে বিএনপির নেতাদের মধ্য থেকে ৩ জনের মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। আগস্ট মাসে নোয়াখালী-৪ আসনের সাবেক এমপি মো শাহজাহান, সেপ্টেম্বর মাসে নাজমুল হুদা ও নেত্রকোনার সাবেক এমপি আবু আব্বাসের মামলায় এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

তবে গত ৩ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়ার নামে জিয়া অরফ্যানেজ ট্রাস্টের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযোগপত্র দায়েরের অনুমোদন দেয় কমিশন। জুন মাসে বিএনপির বর্তমান স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অভিযোগপত্র দায়ের করা হয়। জুলাই মাসে হবিগঞ্জ-৩ সাবেক এমপি আবু লেইচ মো মুবিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে সাবেক এমপি ডা দেওয়ান সালাহউদ্দিন, আসাদুল হাবিব দুলু ও বিএনপি নেতা তৈমুর আলম খন্দকারের বিরুদ্ধেও অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ডিসেম্বর মাসে খুলনা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমানের মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তবে কমিশন চেয়ারম্যান একচোখা কার্যক্রমের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, দুদকে কোনো রাজনৈতিক মামলা নেই। এ কারণেই হাইকোর্ট থেকে ছাড়া পাওয়ার পরেও আওয়ামী লীগ এমপি মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও হাবিবুর রহমান মোল্লার বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

আইনজীবী নিয়ে বিপাকে কমিশন
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গত দুই বছরে আইনজীবীদের পেছনে ১০ কোটি টাকা অপব্যয়ের অভিযোগ করেন মহীউদ্দীন খান আলমগীর নেতৃত্বাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কমিটি দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান হাসান মশহুদ চৌধুরী ও তার তিন সহকর্মীকে ১৬ কোটি টাকা অপব্যয় করার জন্য দায়ী করে এই টাকা পিডিআর এক্টের আওতায় তাদের কাছ থেকে আদায় করারও অনুশাসন জারি করে। মহিউদ্দিন খান আলমগীর বুধবারকে জানান, এ অর্থ অবশ্যই আদায় করা হবে। তবে দুদক ৫০০টি মামলা পরিচালনায় গত দেড় বছরে ৫১ জন আইনজীবীর পেছনে পৌনে ৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানায়। নিজেদের আর্থিক স্বাধীনতা অনুযায়ীই তারা আইনজীবীদের পেছনে অর্থ ব্যয় করেছেন বলেও জানানো হয়।
জানা গেছে, ওই আইনজীবীরা এ বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়ার পরও বর্তমানে মামলা পরিচালনার ব্যাপারে আন্তরিক নন। বর্তমানে বিশেষ আদালতের জন্য ৮ জন ও সুপ্রীম কোর্টের জন্য ১৯ জন আইনজীবী রয়েছেন। ২ জন আইনজীবী এদের সমন্বয় করেন। প্রতিমাসে যে পরিমাণ মামলা হচ্ছে তা এদের দিয়ে পরিচালনা সম্ভব নয়। এ কারণে আরও ৪০/৫০ জন আইনজীবী নিয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছেন কমিশন চেয়ারম্যান। পুরনো আইনজীবীরাও এ তালিকায় থাকবেন।

গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুদকের একটি লিগ্যাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল গঠন করা হয়েছিল। ওই কাউন্সিলে ড কামাল হোসেন, টিএইচ খান, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, ড জহির, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, হাবিবুল ইসলাম ভূইয়া ও ওজায়ের ফারুকসহ সিনিয়র আইনজীবীরা সদস্য ছিলেন। তবে এবার আর ড কামাল হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হবে না বলেও তারা নিশ্চিত করেছেন।

শক্তিশালী দুদকের বিকল্প নেই
দুর্নীতি হলো ব্যক্তিস্বার্থ অর্জনের আর ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্যেই গঠিত হয়েছিল কমিশন। এ বছর টিআই ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে এখনও ১৩তম দুর্নীতির তালিকায় রয়েছে এ দেশ। দুর্নীতির সূচক দুই দশমিক চার যা গ্রহণযোগ্য ৫-এর নিচে। তবে এ অবস্থান পরিবর্তনের জন্য সরকারের সদিচ্ছা ও একটি শক্তিশালী দুদকের প্রয়োজন। এর কোনো বিকল্প নেই। দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, ষাটের দশকেও আমাদের অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের চেয়ে ভালো ছিল। বর্তমানে দেশগুলো আমাদের ফেলে অনেক উপরে উঠে গেছে। শুধু দুর্নীতির কারণেই আমরা পেছনে পড়ে রয়েছি।

লেখকঃ সাংবাদিক, ইমেইল, saemsaimum@gmail.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/KaziSaemuzzaman
পাঠকের মন্তব্য:
Shahajlal University, Sylhet থেকে Abdul Hamid লিখেছেন, ১৪ জানুয়ারী ২০১০; বিকেল ০৫:৫৯
Thanks for good effort. Informative and analytical. You should continue....................
6842
ঢাকা থেকে মুসা মিয়া লিখেছেন, ১৪ জানুয়ারী ২০১০; রাত ০৮:৩৪
ভাই, এখানে পড়া অনেক লেখার মধ্যে আপনার লেখাটা আমার সেরা মনে হয়েছে। এরপর দুদক নিয়ে আমার আর কোন প্রশ্ন নেই। অনেক দিন পর একটি সুন্দর প্রতিবেদন পড়লাম যেখানে প্রতিবেদনের সঙ্গে লেখকের নিজের বক্তব্যও প্রকাশ পেয়েছে। এই স্টাইলটা একেবারেই অন্যরকম। নতুন এবং মনকাড়া। সোনার বাংলাদেশে আপনার দীঘর্ায়ু কামনা করি।
6851
রাজশাহী িবশ্ববিদ্যালয় থেকে লায়ন লিখেছেন, ১৪ জানুয়ারী ২০১০; রাত ০৯:৪৬
কাজী সায়েমুজ্জামানকে ধন্যবাদ লেখার জন্য এবং স্বাগতম সোনার বাংলাদেশ এ। তবে ঢাকার মুসা মিয়া যে বড় আঁতেল তাতে কোন সন্দেহ নেই। একটু বেশিই হলোনা?
6855
ঢাকা থেকে আহম্মদ ফয়েজ লিখেছেন, ২৯ জানুয়ারী ২০১০; দুপুর ০৩:৪৩
রিপোর্টটা বেশ হয়েছে। সায়েম ভাইকে অনেক ধন্যবাদ। রিপোর্টটা পড়ে বুঝলাম সায়েম ভাই অনেক পরিশ্রম করে লেখাটা তৈরি করেছেন। সময়োপযোগী এই প্রতিবেদনের জন্য সোনার বাংলাদেশকে ধন্যবাদ।
7470
অামার েদশ, ঢাকা, বাংলােদশ থেকে অািশক মাহাবুব লিখেছেন, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০১০; সন্ধ্যা ০৬:৪৫
ঢাকা িবশ্ববিদ্যালয়ের ডানপিটে প্রেিমক কাজী সায়েমুজ্জামান অনেক ভালই লিখেছেন।
7594
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 
কাজী সায়েমুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতোকত্তোর। জন্ম ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম শহরের দামপাড়ায়। তার পূর্বপুরুষ ছিলেন দক্ষিণাঞ্চলের বাউফলের ঐতিহ্যবাহী জমিদার কাজী পরিবার। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখিতে হাতে খড়ি। তবে ১৯৯৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত হন। তিনি যুগান্তর স্বজন সমাবেশের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম আহবায়ক। ২০০৪ সালে তিনি দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে ইংরেজী দৈনিক নিউ এজ এর বাংলা প্রকাশনা সাপ্তাহিক বুধবারের সিনিয়র প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত। তিনি বাংলা ছাড়াও ইংরেজী, আরবী, উর্দ্দু ও হিন্দী ভাষা জানেন। ছোটবেলা থেকেই কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে পরিচিত। স্কুল জীবনে তার লেখা বেশ কিছু ছড়া ও কার্টুন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়।

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2010. E-mail: editor@sonarbangladesh.com.