বৃহস্পতিবার, ২৫ ভাদ্র ১৪১৭; ০১ শাওয়াল ১৪৩১; ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১০; দুপুর ০২:৩৮ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

সাঁওতালের বিয়ে

ড. সৈয়দ রোকন উদ্দিন

বাংলাদেশের নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস বেশ মজার! বেশ সমৃদ্ধ! বৈচিত্র্যময়! কৌতূহলোদ্দীপক! বিশেষ করে নানা বর্ণের আদিবাসীদের স্বাতন্ত্র্য জীবনধারা এই ছোট্ট ভূখণ্ডকে বানিয়েছে অভাবনীয় গৌরবগাথা এবং মিশ্র সংস্কৃতির লীলাভূমি। এদের নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখির বিস্তর উপাদান রয়েছে তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারায়।

বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের মধ্যে সাঁওতালদের নাম উল্লেখযোগ্য। এদের অধিকাংশই বাস করে দেশের উত্তরাঞ্চলে। ব্রিটিশ আমলে রেলশ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য ভারতের বিহার প্রদেশের ডুমকা থেকে আগত এই সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর এলাকায় বসতি শুরু করে বলে জানা যায়। ফলে বর্তমান ভারতের বিহার প্রদেশের সাঁওতালদের সাথে এদের ঐতিহ্যগত মিল রয়েছে। আবার বৃহত্তর রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের সাঁওতালদের সাথে কোন কোন ক্ষেত্রে ভারতের নদীয়ার সাঁওতালদের প্রভাব রয়েছে।

সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বর্তমানে বাংলাদেশের দিনাজপুর, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁ, রংপুর, পঞ্চগড়, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, জয়পুরহাট, বগুড়া, মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় সাঁওতালদের বসবাস রয়েছে।

সাঁওতালদের সম্পূর্ণ জীবনাচার বৈচিত্র্য ও স্বাতন্ত্র্যে সমৃদ্ধ। তবে এই লেখায় আমরা কেবল ওদের বিয়ের উপাখ্যানের মধেই সীমিত থাকব। সাঁওতালদের সনাতন বিয়ের রীতিনীতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখা যায় ঐতিহ্য অনুযায়ী সাধারণত ছেলের পক্ষ থেকেই বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপিত হয় একজন তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে। এই ব্যক্তিটিই সাধারণভাবে ঘটক হিসেবে বিবেচিত।

যদিও সাঁওতালদের মধ্যে পেশাদার ঘটক তেমন দেখা যায় না; বিয়ে-প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে এমেচার প্রকৃতির ঘটক ও মেয়ের অবিভাবকের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে ছেলের পক্ষ থেকে কন্যা দেখার একটি তারিখ নির্ধারণ হয়। এই তারিখ নির্ধারণকে সাঁওতাল ভাষায় বলা হয় 'নেপেল'। নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী ছেলের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত বর তার দু'একজন বন্ধুবান্ধব ও ভগ্নিপতিসহ নির্দিষ্ট তারিখে মেয়ের বাড়িতে কন্যা দেখার জন্য যায়। উল্লেখ্য যে প্রস্তাবিত কন্যার নিজবাড়িতে এই কন্যা দেখা অনুষ্ঠানটি হয় না। কন্যা দেখানোর আয়োজন করা হয় প্রতিবেশীর বাড়িতে।

এক্ষেত্রে মেয়েকে খুব সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপনের রেওয়াজ নাই। খুব সাদামাটা পোশাকে প্রস্তাবিত কন্যাকে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। এ সময় গ্রামের প্রতিবেশীরা প্রথা অনুযায়ী আমন্ত্রিত হয়। ছেলের দল ও প্রতিবেশীরা নিজ নিজ আসনে বসে থাকে কন্যা আসার অপেক্ষায়। কন্যা তার দু'জন বান্ধবী পরিবেষ্টিত হয়ে উপস্থিত হয় এবং প্রত্যেককে দুই হাত ও মাথা নিচু করে বিনম্র কায়দায় একে একে উপস্থিত সবাইকে প্রণাম করে। এ সময় ঘটক সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ও মেয়েটিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে সাঁওতালী ভাষায় উচ্চারণ করে 'বহু' অর্থাৎ 'ঐ মাঝখানের মেয়েটিকেই তোমরা দেখতে এসেছো'। মেয়ের প্রণাম করা শেষ হলে তারা পাশে রাখা একটি পাটিতে বসে।

তারপর ছেলের পালা। এক্ষেত্রে ঘটক তার পেছনে ছেলেকে নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটে ও মেয়ের মতোই উপস্থিত সকলকে একে একে প্রণাম করে। প্রণাম শেষে ছেলে তার পূর্বের আসনে গিয়ে বসে। এর পরপরই প্রস্তাবিত কন্যা তার বান্ধবীদের নিয়ে ঐ কক্ষ ত্যাগ করে।
তারপর একটি ব্যতিক্রমী আচার লক্ষণীয়। প্রস্তাবিত ছেলের হাতে কিছু তামাকপাতা ও চুন দেয়া হয়। ছেলে তার হাতের তালুতে রেখে ঐ তামাকপাতা ও চুন বুড়ো আংগুল দিয়ে পিষতে থাকে। তারপর তা উপস্থিত প্রত্যেকের কাছে গিয়ে একটু একটু করে ভাগ করে দেয়। ছেলের হাঁটাচলা ও শক্তিসামর্থ নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্যেই সাধারণত এমনটা করা হয়।

এই অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ঘটক দুই পক্ষকেই তাদের মতামত প্রকাশের অনুরোধ জানায়। এ ক্ষেত্রে রেওয়াজ অনুযায়ী দু'পক্ষই সাধারণত তাদের সন্তুষ্টির ইঙ্গিত দেয়। তবে এটা সিদ্ধান্তমূলক প্রতিক্রিয়া নয়। নিতান্তই তাৎক্ষণিক অভিব্যক্তি। অমত থাকলে সাধারণত মুখোমুখী 'না' বলা হয় না। জানিয়ে দেয়া হয় পরে।

বর ও কনে দেখার পালা শেষ হলে ঘটক উভয় পক্ষের সাথে যোগাযোগ করে তাদের সম্মতি নেয়ার চেষ্টা করে। 'হাঁ'-বোধক সম্মতি পেলে পরবর্তী আনুষ্ঠানিক পর্ব হচ্ছে 'গনং টাকা'র অনুষ্ঠান। ঘটকের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে এর দিন ধার্য করা হয়। 'গনং টাকা'র অনুষ্ঠান হলো ছেলের পক্ষ থেকে মেয়েকে নগদ ৭৫ টাকা ও মেয়ের কিছু সাজ পোশাক মেয়ের বাড়িতে গিয়ে প্রাথমিক উপঢৌকন হিসেবে প্রদান করার একটি প্রথাগত সাঁওতালী রীতি।

ছেলের পক্ষ থেকে এই 'গনং টাকা' অনুষ্ঠানের সময় উভয় পক্ষের বাড়িতেই সামাজিকভাবে সাঁওতালী কায়দায় বেশ ধুমধাম হয়ে থাকে। এর মধ্যে পড়ে গনং অনুষ্ঠান সম্বন্ধীয় বিশেষ ধরনের গান বাজনা ও হাড়িয়া খাওয়া। হাড়িয়া হলো এক ধরনের তরল পানীয় যা ভাতকে এক বিশেষ বনজ ঔষধের মাধ্যমে পঁচিয়ে তৈরি করা হয়।

গনং অনুষ্ঠানের দিন প্রথমে ঘটকসহ গ্রামের মাতববররা ছেলের বাড়িতে জড়ো হয় এবং গান বাজনা ও হাড়িয়া খাওয়ায় অংশগ্রহণ করে। হাড়িয়া খেতে খেতে অনেককেই কিছুটা মাতাল হতে দেখা যায় এবং হাড়িয়া খাওয়ার পরপর এ অবস্থায়ই ছেলের বাড়ি থেকে একদল উপঢৌকন নিয়ে কন্যার বাড়িতে রওয়ানা হয়। এই দলে সাধারণত ছেলের প্রতিবেশী ও মাতব্বর কর্তৃক মনোনীত লোকেরা অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে।

একই সময়ে একই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন হয় মেয়ের বাড়িতেও। ছেলের পক্ষের প্রতিনিধি দল এসে এই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। এখানে মেয়ের পক্ষ ছেলের পক্ষকে খাবার ও ঐতিহ্যবাহী 'হাড়িয়া' পরিবেশন করে। ভোজনপর্ব শুরুর আগে মেয়ের পক্ষ প্রথা অনুযায়ী অনুষ্ঠানস্থলে একটি গামছা বিছিয়ে দেয়। ছেলের পক্ষ এই গামছার উপরে 'গনং টাকা' ও মেয়ের সাজ পোশাক (যেমন- কানের দুল, ফিতা, তেল, পাউডার ইত্যাদি) রাখে। মেয়ের পক্ষ গামছার 'গনং টাকা' ও অন্যান্য উপহার উপস্থিত সকলকে দেখায় এবং উচ্চারণ করে 'আমার এত নম্বর (ছোট, মেঝ, বড়) মেয়ের জন্য ছেলের পক্ষের গনং টাকা গ্রহণ করলাম'। এর সঙ্গে সঙ্গেই সাঁওতাল প্রথা মোতাবেক হয় গানবাজনা।

সাধারণত ছেলের পক্ষ মেয়ের পক্ষের বাড়িতে গনং টাকার অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্যে সন্ধ্যার আগে আগে মেয়ের বাড়িতে পৌঁছায় এবং গানবাজনা ও হাড়িয়া খাওয়ার মাধ্যমে ঐ রাতটি উপভোগ করে।

রাত শেষে ছেলের পক্ষ ফিরে যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে এই গনং টাকার অনুষ্ঠানেই বিয়ের তারিখ ধার্য হয়। আবার কখনও কখনও পরেও হয়ে থাকে।

বিয়ের তারিখ চূড়ান্ত হলে সনাতন সাঁওতালপ্রথা অনুযায়ী ছেলের বাড়িতে আরেকটি অনুষ্ঠান হয়। সাওতাল ভাষায় এর নাম 'জামাই সাজা দিয়ালে'। এই অনুষ্ঠানে মেয়েপক্ষ যোগ দেয়। ওদের সাথে থাকে ছেলের জন্য ধুতি, আংটি ও টাকা পয়সা। মেয়ের পক্ষের এই দলে ৬ বা ৭ জোড়া দম্পতি থাকে যারা সাধারণত ছেলের মা-বাবার বিয়াই বা বিয়াইন সম্পর্কের সমতূল্য। এই অনুষ্ঠানটি পূর্বে বেশ ব্যয়বহুল করে করা হতো। বর্তমানে আর্থিক কারণে অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের অনুষ্ঠানকে এড়িয়ে চলা হয়।

ছেলে ও মেয়ের পক্ষ বিয়ের তারিখ নির্ধারণের পর আত্মীয়-স্বজন ও প্রাসঙ্গিক ব্যক্তিবর্গকে বিয়ের নিমন্ত্রণ দেয় একটি অভিনব কায়দায়। তা হলো কাঁঠালপাতা দিয়ে বিশেষ উপায়ে তৈরি পাত্রে রাখা হয় কিছু দূর্বাঘাস, সিঁদুর ও সরিষার তৈল। একটি সুতায় বিশেষ উপায়ে গিঁট দেয়া হয় যা টান দিলে একটি একটি করে গিঁট খুলে যায়। সুতায় এ ধরনের গিঁট কয়টি হবে তা নির্ভর করে ঠিক কতদিন পরে বিয়ের অনুষ্ঠানটি হবে অর্থাৎ প্রতি দিনের জন্য থাকে একটি করে গিঁট । গিঁটযুক্ত এই সূতাটি কাঁঠালপাতার ঐ পাত্রটিতে ঝুলানো থাকে। বিয়ের জন্য ওরা বাংলা তারিখ অনুসরণ করে। সুতার গিঁটযুক্ত ঐ পাত্রটিই বিয়ের দাওয়াতপত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। একে সাঁওতালরা বলে 'গিরা'। যতজনকে নিমন্ত্রণ দেবে ততটি এরূপ 'গিরা' তৈরি করে বণ্টন করে। যাদেরকে 'গিরা' দিয়ে নিমন্ত্রণ দেয়া হয় তারা এই গিরাটি চালের মধ্যে গুঁজে রাখে এবং প্রতিদিন সকালে উঠে টান দিয়ে একটি করে গিঁট খুলে দেয় অর্থাৎ বিয়ের তারিখ একদিন এগিয়ে এলো। এভাবে যে দিন গিরার সমস্ত গিঁট খোলা শেষ হবে সেই দিনই বিয়ের অনুষ্ঠান। কনে এবং বর উভয় পক্ষই এই নিয়মটি অনুসরণ করে থাকে।

সাধারণত বিয়ের দাওয়াত দেয়া ও শূকরের যোগাড় করা ছেলের পক্ষের বিয়ে বিষয়ক একটি বড় প্রস্তুতিমূলক কাজ হিসেবে বিবেচিত। উল্লেখ্য যে, ছেলে বড় হলে বিয়ের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে সাঁওতালরা ছেলের নামে শূকর পালন করে থাকে। বিয়ের তারিখ ঘনিয়ে এলে সনাতন পানীয় 'হাড়িয়া' প্রস্তুত করার ধুম পড়ে। সাঁওতাল সংস্কৃতিতে এটা বেশ গুরুত্ব পায়। সাধারণত বিয়ের চার-পাঁচ দিন পূর্ব থেকেই হাড়িয়া প্রস্তুত শুরু করা হয়। কিছু কিছু সাঁওতাল মহিলা আছে যারা হাড়িয়া প্রস্তুতিতে দক্ষ। এ কাজে সাধারণত ওদেরকেই ব্যবহার করা হয়। প্রস্তুতিমূলক কাজের আওতায় বিয়ের অনুষ্ঠানে বাজনাওয়ালা দল ঠিক করা হয় যাকে ওরা 'ডোম' বলে থাকে।

বিয়ের আগের দিন ছেলে এবং মেয়ে উভয় বাড়িতেই আত্মীয়-স্বজন তথা নিমন্ত্রণপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ জড়ো হয়। ঐ দিন এলাকার সর্দারগণ যাদেরকে ওরা 'মহৎমণ্ডল' বলে থাকে, ছেলে ও মেয়ের বাড়িতে এসে বাঁশের খুঁটি ও ডালপালা দিয়ে বিয়ের জন্য একটি ছাউনী তৈরি করে যার নাম 'মান্ডোয়া'। ঐ দিন এই মান্ডোয়ার মাঝখানের প্রধান খুঁটির চারদিকে সিঁদুর, দূর্বাঘাস, আতপ চাউল ইত্যাদি ছিটিয়ে দিয়ে চারদিক ঘুরে ঘুরে বাজনা বাজায়। একে সাঁওতালরা বলে 'মান্ডোয়া জাগানো'।

এদিকে ছেলের পক্ষের একদল মহিলা এক ধরনের বিশেষ নাচ করে থাকে যার নাম 'দাক বাপলা'। এই নাচন দলের একজনের হাতে থাকে একটি তীর-ধনুক আর এক জনের হাতে একটি বটি এবং আরেক জনের হাতে পানি পানের একটি কাঁশার বদনা। এরা দল বেঁধে ছেলের বাড়ি থেকে নাচতে নাচতে গ্রামের শেষ মাথা পর্যন্ত যায়। সেখানে গিয়ে মাটিতে একটি গর্ত খুঁড়ে পানি ঢালে। এরপর তীর দিয়ে ঐ গর্তে ধনুক ছুঁড়ে। হাতের দা দিয়ে গর্তে কোপায় আর গর্তের চারদিকে নেচে নেচে গান গায়। একে সাঁওতালরা বলে 'গেনো'।

নাচা-গাওয়া শেষে মহিলা নাচনদল একই নিয়মে ছেলের বাড়ির দিকে ফিরে আসে এবং ছেলেকে মেয়ের বাড়িতে যাওয়ার জন্য আয়োজিত বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। এই বিদায় অনুষ্ঠানে ছেলের মা-সহ আরও দুজন মহিলাকে মা সাজতে হয় অর্থাৎ তিন মায়ের একটি দল হয়। এই দলকে 'এংগাত' বলে। এরা ছেলেকে গুড় খাওয়ায়। এই তিন মা পর্যায়ক্রমে কানে কানে বরকে জিজ্ঞেস করে 'ব্যাটা কোথায় যাও'? বর উত্তর দেয়, তোমার জন্য একটি 'কারমি' (কাজের লোক) আনতে যাচ্ছি।

এখানে উল্লেখ্য যে, সাঁওতাল গ্রামে মোড়লের বাড়িতে প্রথাগতভাবে একটি মাটির তৈরি উঁচু ডিবি থাকে। এই ডিবিটি মোড়লের বাড়ির পরিচয় বহন করে। একে 'মানজিহিতান' বলা হয়। সাঁওতালদের যে কোন সামাজিক অনুষ্ঠান এই মানজিহিতান থেকে শুরু এবং শেষ হয়। ফলে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক প্রথা অনুযায়ী বরযাত্রার সময় বরসহ সবাই গিয়ে মোড়লের বাড়ির মানজিহিতানে জড়ো হয়ে প্রণাম করে।

এরপর মানজিহিতান থেকে বরযাত্রীরা কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। বরকে সাজানো হয় হলুদ মাখানো মার্কিন ধুতি পরিয়ে। উল্লেখ্য যে, বরযাত্রার আগের দিন ছেলের বাড়ির পক্ষ থেকে কয়েকজনের একটি অগ্রগামী দলকে কনের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ওরা কনের বাড়িতে গিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানের খাওয়া-দাওয়া ও আনুষ্ঠানিকতার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিজেদের নিয়োজিত করে। তবে এই বরপক্ষীয় অগ্রগামী দল মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করে না। ঐ বাড়ির পাশেই কোন এক গাছের নিচে অবস্থান নেয়। এই দল 'গোয়াদার' বা ব্যবস্থাপনা দল হিসেবে বিবেচিত। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বিয়ের অনুষ্ঠানের যাবতীয় খাওয়া-দাওয়ার খরচ ছেলের পক্ষকে বহন করতে হয়। ফলে গোয়াদার দলের সাথে ছেলের পক্ষ থেকে চাল-ডাল, গোশতসহ যাবতীয় সওদাপাতি দিয়ে দেয়া হয়।

বরযাত্রীরা সরাসরি কনের বাড়িতে না গিয়ে গোয়াদাররা কনের বাড়ির পাশে যে গাছটির নিচে অবস্থান নিয়েছে সেখানেই বরসহ যাত্রীরা অবস্থান নেয় এবং মাটিতেই বসে পড়ে।

এদিকে মেয়ের বাড়িতেও একই নিয়মে মান্ডোয়া তৈরি ও জাগানো হয়। কনেকেও বর পক্ষের আদলেই তিন জন মা কনেকে গুড় খাওয়ায়। লক্ষণীয় যে, বর পক্ষের অগ্রগামী দল হিসেবে গোয়াদার দলের সদস্যরা ছাড়া বর পক্ষের কোন লোক কনে পক্ষের ভিতর বাড়িতে প্রবেশ করতে পারে না। প্রবেশ করলে তাদের সাথে সাথে জরিমানা দিতে হয়। এই জরিমানা টাকা কিংবা হাড়িয়া দিয়ে পরিশোধ করার রেওয়াজ আছে।
বরসহ কনের বাড়ির পাশে অবস্থান নেয়ার পর বরযাত্রীদের মধ্য থেকে পাঁচ, সাত কিংবা নয় জন ব্যক্তি ঠিক করা হয় যারা মেয়ের বাড়িতে প্রবেশ করে। প্রবেশের পূর্বে প্রত্যেকে দুই-তিন বাটি হাড়িয়া পান করে থাকে। হাড়িয়া পানের পর বরকে তার কোন এক ভগ্নীপতির সঙ্গে কনের বাড়ির আঙিনায় দাঁড় করিয়ে অন্যরা ভিতরে প্রবেশ করে এবং কনেকে আনতে যায়। অবশ্য এর পূর্বে প্রথামতো একটি নাচ হয়। তার নাম 'ডান্টা' নাচ। এই নাচে দুদিক থেকে দু পক্ষ অংশ নেয় এবং নাচের প্রতিযোগিতা হয়।
এরই মধ্যে বরের ভগ্নীপতি কনেকে আনার জন্য একটি টুকরী হাতে অন্দর মহলে প্রবেশ করে এবং বর আঙিনার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। বরের ভগ্নীপতি কনেকে টুকরীতে উঠিয়ে নিজের কাঁধে কিংবা হাতে বহন করে বাইরে নিয়ে আসে। টুকরীতে তোলার সময় কনে সাধারণত কান্নাকাটি করে। বিয়েবাড়িতে আগত গ্রামের মেয়েছেলেরা কনেকে নিয়ে আসতে বাঁধা দেয়। এমনকি কনেকে টুকরী থেকে ফেলে দেয়ারও চেষ্টা করে। এ সময় তারা হলুদ ও রঙ ছিটায় এবং মান্ডোয়া চক্কর দেয়।

এরপর বরের আরেক ভগ্নীপতি বরকে কাঁধে নেয় এবং বরকে পূর্বদিকে এবং কনেকে পশ্চিম দিক করে মুখোমুখি করায়। এসময় বরের ভগ্নিপতির কাঁধের টুকরিতে বসা কনের পরনে থাকে হলুদ ছিটানো ধূতি। এসময় নববধূ হিসেবে তার মুখ ঢাকা থাকে। দুই জন দুই ব্যক্তির কাঁধে উপবিষ্ট হয়ে মুখোমুখি হলে বর কনের মুখের কাপড় সরাতে চেষ্টা করে। এ সময় কনে মুখ দেখাতে বাঁধা দেয়। কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর বর কনের মুখের কাপড় সরাতে সক্ষম হয় এবং আঙ্গুল দিয়ে কনের কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেয়। সাঁওতাল প্রথা অনুযায়ী এই সিদুর পরানোর সাথে সাথেই প্রকৃতপক্ষে প্রথাগত বিয়ের কার্য সম্পন্ন হয়ে যায়। এরপর তরবারিতে পানি ঢেলে সেই পানি দিয়ে বরকে গোছল করানো হয়।

এখানে তিন মা বর ও কনেকে মাথায় কপালে ও হাতে পায়ে তেল দিয়ে মাথা আঁচড়িয়ে দেয়। তারপর যারা যারা 'দান' বা উপহার এনেছে তা গ্রহণ করা হয়। সাধারণত কাঁসার থালা বা অন্যান্য ছোটখাট জিনিস দান হিসেবে দেয়ার রেওয়াজ আছে। তিন মাকে দেয়া হয় তিনটি নতুন শাড়ি । দান শেষে প্রাপ্ত জিনিসগুলো উভয় পক্ষ মিলে গুণে দেখে।
এরপর বিদায় অনুষ্ঠান, যাকে সাঁওতালরা 'মাতকুম্ভুটা' বলে থাকে। এ অনুষ্ঠানে গানের মাধ্যমে বর পক্ষকে কনের পক্ষের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের পরিচয় করিয়ে দেয়। সাধারণত এ অনুষ্ঠানটি হয় বাড়ি থেকে একটু দূরে । এখানে কোন মেয়েদের প্রবেশাধিকার নেই। এই অনুষ্ঠানে কিছুকিছু উক্তি করা হয়ে থাকে যা মেয়েদের উপস্থিতির পক্ষে নয় বলে তারা মনে করে।
সকল অনুষ্ঠান শেষে বিদায়ের সময় কন্যার বাবা মেয়েকে বরের বাবার হাতে তুলে দেয়। বরের বাবা সঙ্গে সঙ্গে কনেকে তুলে দেয় বরের ছোটভাই দেবরের হাতে ।

আর দেরি নয়। কনেকে নিয়ে বরপক্ষ নিজবাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। বরের বাড়িতে কনের সাথে কনে পক্ষের অনেককে আবেগে চলে আসতে দেখা যায়। এই চলে আসাকে ওরা বলে 'লুংতি'। গ্রামে প্রবেশ করেই কনেসহ বরযাত্রী বরের গ্রামের একটি উঠানে বসে। এখানে বরের গ্রামের মণ্ডল কর্তৃক নিয়োজিত কিছু লোক আমপাতার উপর পানিভর্তি লোটা দিয়ে বর-কনেকে গ্রহণ করে এবং কুশলাদি জিজ্ঞেস করে থাকে। এদেরকে বলা হয় 'ঝাঁক মাঝি বা ঝোক পাড়ানী'। এরপর বর কনে-সহ নিজবাড়িতে চলে আসে।
এখানেও কনের বাড়ির মতো দান অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠান শেষে পা ধোঁয়ার পালা। এ অনুষ্ঠানে কনে গ্রামের উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনদের পা ধুয়ে দেয় এবং প্রত্যেকের একটি করে পা জড়িয়ে ধরে। টাকা বা দান পেলে পা ছেড়ে দেয়। একপর্যায়ে কনের ভাসুর কনের পায়ে কিছু পানি ছিটিয়ে দেয়। এই পানি ছিটানোর পর কনে আর কোন দিন ভাসুরের হাত থেকে সরাসরি কোন কিছু নিতে পারবে না এমন একটা বাধ্যবাধকতার নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়।

লেখকঃ গবেষক, ইমেইল, rukan57@yahoo.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrSayedRukanUddin
পাঠকের মন্তব্য:
রাজশাহী ইউনিভার্সিটি থেকে ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ লিখেছেন, ১৪ জানুয়ারী ২০১০; রাত ১০:০০
ড. সৈয়দ রোকন উদ্দিন,
শুেভচ্ছা েনবেন। ইতোপূর্বে আপনার অনেকগুলো ছড়া পড়েছি। ভালো লেগেছিল। তবে ছড়ার চেয়ে আপনাকে প্রবন্ধেই বেশি মানায়। এবারের প্রবন্ধটি বেশ ভালো হয়েছে। আরো লিখবেন, এ প্রত্যাশাই রলো।
6858
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 
লেখকের প্রকাশিত মোট গ্রন্থ সংখ্যা ১৭ টি। গ্রন্থ সমুহের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ, রাজনৈতিক প্রবন্ধ, ছড়াবই, শিশুতোশ গল্প, উন্নয়ন-গ্রন্থ, গ্রামিন খেলাধুলা ও সম্পাদনা গ্রন্থ। কর্মক্ষেত্র প্রশিক্ষণ ও গবেষণা। ব্র্যাক ও জার্মান দাতা সংস্থায় নিয়মিত চাকুরিসহ প্রশিক্ষণ ও গবেষণা বিষয়ে কেয়ার, ইউনিসেফ, এসডিসি, সিডা, ডিএফআইডি, ইউএনডিপি, অ্যাকশনএইড, ওয়াল্ড ব্যাংক, আইএলও, জিআরএম ইন্টারন্যাশন্যাল, নেট্জ-জার্মান, ইফাদেব, এলজিইডি, ডিএই সহ বেশ কিছু সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকল্প সমুহে কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে প্রশিক্ষণ ও গবেষণা বিষয়ক সংস্থা প্রমোটিং পারটিসিপেশন এন্ড ট্রেনিং এর (প্রম্পট) নির্বাহী পরিচালক ও উন্নয়ন পরামর্শক ।

তাছাড়া লেখক লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশন্যাল পরিচালিত লায়ন্স ক্লাব অব ঢাকা ক্যাপিটাল এর প্রেসিডেন্ট ও পরে ডিস্ট্রিক্ট চেয়ারপারচন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। উন্নয়ন সংস্থা সোসাইটি ফর আন্ডার প্রিভেলেজ্ড ফ্যামিলির পরিচালনা বোর্ডের সদস্য। প্রশিক্ষণ বিষয়ক সংস্থা বিএসটিডি ও সিলেট বিভাগ উন্নয়ন পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন।

লেখক এডুকেশানএ পিএইচডি করেছেন এবং দাপ্তরিক কাজে বর্হিবিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করেছেন। পৈতৃক নিবাসঃ গ্রাম-হারানপুর, ইউনিয়ন-বাঘাসুরা, উপজেলা-মাধবপুর, জেলা-হবিগঞ্জ।

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2010. E-mail: editor@sonarbangladesh.com.