|
আরাকানের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীঃ আত্মপরিচয়ের সন্ধানে
ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ |
|
বর্তমান বিশ্বের আলোচিত ও ভাগ্য বিড়ম্বিত একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা। আরাকান রাজ্যের মুসলিম সংস্কৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে রোহিঙ্গাদের ভূমিকা ছিল প্রধান। রোহিঙ্গাদের উদ্ভব ও বিকাশ আলোচনায় বহুমূখী বিতর্ক ও মতামত রয়েছে। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গারাই আরাকানের প্রথম বসতি স্থাপনকারী আরব মুসলমান হিসেবে প্রচ্ছন্নভাবে দাবী করে খলিলুর রহমান নামে জনৈক লেখক উল্লেখ করেন যে, রহম শব্দ থেকেই রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি হয়েছে। অর্থাৎ অষ্টম শতাব্দীতে আরাকানে চন্দ্রবংশীয় রাজাদের শাসনামলে বৈশালী ছিল তাদের রাজধানী। সে সময় চন্দ্রবংশীয় রাজা মহৎ-ইঙ্গ-চন্দ্রের রাজত্বকালে (৭৮৮-৮১০ খ্রিঃ) কয়েকটি আরব মুসলিম বাণিজ্য বহর রামব্রী দ্বীপের পার্শ্বে বিধ্বস্ত হলে জাহাজের আরোহীরা রহম (দয়া) রহম বলে চিৎকার করে। এ সময় স্থানীয় লোকজন তাদের উদ্ধার করে আরাকানের রাজার কাছে নিয়ে যায়। আরাকানরাজ তাদের বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত আচরণে মুগ্ধ হয়ে আরাকানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের অনুমতি দান করেন। আরবি ভাষায় অনভিজ্ঞ স্থানীয় লোকজন তাদেরকে 'রহম' গোত্রের লোক মনে করে 'রহম' বলে ডাকতো। ক্রমশ শব্দটি বিকৃত হয়ে রহম>রোঁয়াই>রোয়াই> রোয়াইঙ্গা বা রোহিঙ্গা নামে খ্যাত হয়। কিন্তু আরাকান মুসলিম কনফারেন্সের সভাপতি ও সম্পাদক যথাক্রমে জহির উদ্দিন আহমদ ও নাজির আহমদ এ বক্তব্যের সাথে ভিন্নমত পোষণ করেন। তারা মনে করেন যে, রহম রহম বলে চিৎকারকারী জাহাজ ডুবি মুসলমানদের ঘটনা সত্য। তবে তা রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হয়ে থাম্ভইক্যাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়াই যুক্তিযুক্ত। কেননা আরাকানী থাম্ভইক্যা শব্দের অর্থ হলো জাহাজ ডুবি থেকে রক্ষা পাওয়া। অথচ থাম্ভইক্যাগণ নিজেদের রোহিঙ্গা হিসেবে দাবী করেনা। কিংবা অন্যরাও তাদেরকে রোহিঙ্গা নামে ডাকে না। যদি রোহিঙ্গা শব্দটি আরবি রহম থেকেই উদ্ভুত হত তবে থাম্ভইক্যারাই রোহিঙ্গাদের প্রথম দল বলে পরিচিত হত। মূলত লেখক খলিলুর রহমান উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে আরাকানের রোহিঙ্গাদেরকে কুলীন প্রতিপন্ন করার নিমিত্তে তাদেরকে জাহাজ ডুবি থেকে রক্ষা প্রাপ্ত বসতি স্থাপনকারী আরব নাবিকদের বংশধর হিসেবে দাবী করেছেন বলে তারা মন্তব্য করেন। তারা আরো উল্লেখ করেন যে, রোহিঙ্গারা আফগানিস্তানের অন্তর্গত 'ঘোর' প্রদেশের রোহা জেলার অধিবাসীদের বংশধর। মূলত তারা তুর্কী কিংবা আফগানী। কেননা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীসহ বাংলার মুসলমান বিজেতা ও শাসকগণ ইসলাম প্রচার ও প্রসারের নিমিত্তে আফগানিস্তানের রোহার অঞ্চলের কিছু ব্যক্তিকে আরাকানে প্রেরণ করেছিলেন। উক্ত রোহার অঞ্চলের মুসলমানরা আরাকানের নামকরণ করেছিলেন রোহাং। এ রোহা ও রোহাং শব্দ থেকেই রোহিঙ্গা নামকরণ হয়েছে বলে তারা মনে করেন। তারা আরও উল্লেখ করেন যে, আরাকান ও চট্টগ্রামে প্রচলিত আঞ্চলিক ভাষায় সাধু ভাষার শ,ষ,স, মৌখিক উচ্চারণে 'হ' উচ্চারণ শোনা যায় এবং 'হ'কে শ, ষ, স, উচ্চারণ করে থাকে। এ পদ্ধতিতে হয়তো রোহাং>রোসাঙ্গ হয়েছে। রোহার অঞ্চলের মুসলমানরা যেহেতু নিজেদের রোহাইন বলে পরিচয় দেয় সেহেতু আরাকানে এ রোহাইন শব্দ থেকেই রোহিঙ্গা হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
উপর্যুক্ত বিবরণ থেকে রোহিঙ্গাদের উৎপত্তিগত বিষয়ে দুটি মতামত পাওয়া গেল, প্রথমত; রহম শব্দ থেকে রোহিঙ্গা, দ্বিতীয়ত; রোহাইন শব্দ থেকে রোহিঙ্গা। প্রথম যুক্তিকে খণ্ডন করে দ্বিতীয় যুক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন লেখকদ্বয়। তারা মন্তব্য করেন যে, থাম্ভইক্যা অর্থ যেহেতু জাহাজ ডুবি থেকে রক্ষা প্রাপ্ত, অতঃএব থাম্ভইক্যরাই প্রথম বসতি স্থাপনকারী প্রথম আরব বণিক গোষ্ঠী এবং তারাই রহম বলে চিৎকারকৃত ব্যক্তিবর্গ, রোহিঙ্গারা নয়। তাদের বক্তব্যের মধ্যে যুক্তির অবতারণা থাকলেও কোন তথ্যের সন্নিবেশ নেই। তাছাড়া আরাকানে যে মাত্র একবার জাহাজ ডুবেছে তারই বা কি প্রমাণ আছে? এ ধরনের ঘটনা একাধিকবারও ঘটতে পারে। সুতরাং রহম থেকে রোহিঙ্গা কিংবা থাম্ভইক্যা জনগোষ্ঠী জাহাজ ডুবি থেকে রক্ষা প্রাপ্ত মুসলমান দুটি বক্তব্যকেই আপাতত মেনে নেয়া যায়। তবে থাম্ভইক্যাদের বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুশাসন মান্য করা কিংবা আর্থ-সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে তারাই যে জাহাজ ডুবি থেকে রক্ষা প্রাপ্ত আরাকানে বসতি স্থাপনকারী আরব নাবিক ও বণিক তা মেনে নিতে সংশয় মুক্ত হওয়া যায়না। কেননা সকল থাম্ভইক্যরাই জেলে। যদি তারা আরব বণিক ও নাবিকই হবেন তবে তাদের গোত্রের সকল লোক মাছ ধরা কিংবা জেলে হিসেবে পেশা গ্রহণের কারণ থাকতে পারেনা। তাদের মধ্য থেকে অনেকে ব্যবসায়ী ও উচ্চবিত্তশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় মন্তব্য 'রোহার অধিবাসী হেতু রোহাইঙ্গা' কথাটিও সহজে মেনে নেয়া যায় না। কেননা বখতিয়ার খলজী নদীয়া ও গৌড় বিজয় করলেও তা সর্বোচ্চ বরেন্দ্র অঞ্চল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ আরাকান সংলগ্ন অঞ্চল তখনও লক্ষ্মণ সেন এবং পরবর্তীতে অন্যান্য অমুসলিম শাসকদের হাতেই ছিল। সুতরাং শত্রুরাজ্যের উপর দিয়ে রোহার অঞ্চলের মুসলমানগণ আরাকানে ইসলাম প্রচারের জন্য যাবেন তা একটু কঠিনও বটে। তাছাড়া এটাকে যদি যুক্তিযুক্ত বলে মেনে নেয়া হয় তবে লেখকদ্বয়ের কথার মধ্যে দ্বৈততা লক্ষ্য করা যাবে। কেননা তারা বলেছেন যে, খলিলুর রহমান সাহেব রোহিঙ্গাদের কুলীন বানানোর জন্য এমন কথা বলেছেন। যদি তাই হয়ে থাকে তবে আফগানীস্তানের রোহার অঞ্চলের লোক হলে কি রোহিঙ্গাদেরকে কুলীন প্রমাণ করেনা?
দক্ষিণ ও পূর্ববাংলার অপহৃত কৃতদাসদের বংশধরগণই আরাকানের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বলেও মন্তব্য পাওয়া যায়। ষোল শতক থেকে পর্তুগিজরা বাংলায় বাণিজ্য করার অজুহাতে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। বাংলায় খুব বেশী সুবিধা করতে না পেরে সপ্তদশ শতকে আরাকানকে তাদের কেন্দ্রস্থল হিসেবে মনে করে। আরাকানীরাও নৌবিদ্যা শিক্ষার প্রয়োজনে পর্তুগিজদেরকে ঠাঁই দেয়। পর্তুগিজদের সংস্পর্শে ক্রমশ তারা নৌবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে আরাকানী রাজার মৌন সম্মতিতে আরাকানী স্বার্থান্বেষী কিছু ব্যক্তি পর্তুগিজদের সাথে আঁতাত করে দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলার নদী এবং সমুদ্রোপকূলবর্তী অঞ্চলে দস্যুবৃত্তি ও মানুষ অপহরণের ব্যবসা শুরু করে। তারা প্রতি বছর জল পথে এ সব অঞ্চলে ডাকাতি করতে আসত এবং মুসলিম, হিন্দু, নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র যাকেই পেত বন্দী করে নিয়ে যেত। তারা স্বীয় কাঙ্খিত স্থানে পৌঁছার জন্য নৌকা ব্যবহার করত। বন্দীরা যাতে বিদ্রোহ করতে না পারে কিংবা পালিয়ে যেতে না পারে সে জন্য তারা বন্দীদের হাতের তালু ছিদ্র করে তার মধ্যে পাতলা বেত চালিয়ে তাদেরকে নৌকার ডেকের নীচে বেঁধে রাখত। এতে অনেকেই মৃত্যু বরণ করত। তদুপরি যারা বেঁচে থাকত সে সব শক্তপ্রাণ মানুষকে কৃষি কাজসহ অন্যান্য কঠিন কাজ করানের জন্য প্রেরণ করা হত আর কাউকে ইংরেজ, ফরাসী ও ওলন্দাজ বণিকদের নিকট দাক্ষিণাত্যের বন্দরসমূহে দাস হিসেবে বিক্রি করত। এমন কোন অপকর্ম ছিল না যা মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুরা করতে পারতো না। পর্তুগিজরা ও মগরা নামেই শুধু খৃষ্টান এবং বৌদ্ধ ছিল। খুন, জখম, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অপহরণ প্রভৃতি পৈশাচিক ও জঘন্য কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তাদের কেউ সমকক্ষ ছিল না। তারা হাট বাজারের দিন কিংবা ধর্মীয় ও অন্যান্য উৎসব-অনুষ্ঠানের দিনসহ যে কোন দিন তারা গ্রামে হানা দিয়ে ইচ্ছেমত লুণ্ঠন, খুন, ধর্ষণ কিংবা অপহরণ কর্মকাণ্ড পরিচালিত করত। অনেক সময় তারা গ্রামের পর গ্রাম আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিত। উল্লেখ্য, প্রত্যক্ষদর্শী বাংলার সুবেদার ও ঐতিহাসিক মীর্জা নাথান এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, শ্রীপুর অঞ্চলে রাজকীয় শক্তির দূর্বলতার সুযোগে মগেরা শত শত নৌকা নিয়ে ঘুরে অসংখ্য গ্রাম লুণ্ঠন করে এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে গ্রামবাসীকে বন্দী করে নিয়ে যায়। মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের অত্যাচারে বাংলার অনেক অঞ্চল জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। মূলত পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলার হাজার হাজার নারী-পুরুষকে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুরা অপহরণ করে নিয়ে আরাকানে দাস হিসেবে বিক্রি করেছে। এমনকি ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজা থিরি থু ধম্মা ও তৎপুত্র মিনসানিকে বিধবা রানী নাৎসিনমের প্রণয়ী নরপদিগ্যী আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলে নিহত আরাকান রাজের পিতৃব্য ও চট্টগ্রামের আরাকানী শাসনকর্তা মঙ্গতরি নিজেকে স্বাধীন শাসক হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু অবশেষে ক্ষমতার জবরদখলকারী নরপাদিগ্যীর কাছে তিনি পরাজিত হয়ে মোগলদের সাহায্য নিয়ে ঢাকায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। আরাকানের এই গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে বাংলার প্রায় দশ সহস্রাধিক লোক মগ-পর্তুগিজদের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে তাদের জন্মস্থানে ফিরে আসে। সুতরাং এ ধরনের বিশাল অংকের দাসদের বিষয় অনুমান করে কোন কোন গবেষক মনে করেন যে, বাংলা থেকে অপহৃত দাসগণ স্থানীয় মগ রমনী বিয়ে করে আরাকানে বসবাস করে এবং তাদের ঔরসে ও মগ মহিলাদের গর্ভজাত বর্ণসংকর জনগোষ্ঠীই রোহিঙ্গা। কিন্তু এ ধারণা সঠিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। কেননা যদি বাংলার অপহৃত দাসদের পরবর্তী বংশধরগণ রোহিঙ্গা হয় তবে আরাকানে ইসলামের সম্প্রসারণ কি শুধু বাংলার অপহৃত দাসদের দ্বারাই সম্পন্ন হয়েছে? অতএব এটি একটি অমূলক ধারণা। তবে এটা বলা যেতে পারে যে, বাংলার আপতত মুসলিম জনগণের (দাসদের) পরবর্তী বংশধরগণ রোহিঙ্গাদের সাথে মিশে গেছে এ ধরনের বক্তব্যকে কিছুটা হলেও মেনে নেয়া যায়। কেননা মুসলমান দাসদের দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থা দেখে স্থানীয় মুসলিম অধিবাসীরা দয়াপরবশ হওয়াটাই স্বাভাবিক।
স্থানীয় ইতিহাস বিশারদ আবদুল হক চৌধুরী মনে করেন যে, প্রধানত আরাকানে বসতি স্থাপনকারী চট্টগ্রামী পিতার ঔরসে ও আরাকানী মগ মাতার গর্ভে জন্মগ্রহণকারী আরাকানী ও চট্টগ্রামী উপভাষী মুসলমান বর্ণসংকর জনগোষ্ঠীই হল আরাকানের রোহিঙ্গা গোত্র। কালক্রমে আরাকানের রোহিঙ্গা গোত্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় ও পরবর্তীতে নতুন নতুন চট্টগ্রামী বসতি স্থাপনকারীদের আগমনের ফলে তাদের সংখ্যা অধিক হয়। তখন নিজেদের গোত্রের মধ্যে মুখ্যত বিয়ে-শাদী সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে তারা চট্টগ্রামী উপ-ভাষাকে আরাকানের রোহিঙ্গা গোত্রের পারিবারিক ভাষা হিসেবে চালু রাখতে সক্ষম হয়। আরাকানে রোহিঙ্গাদের উদ্ভব সম্পর্কে তিনি তিনটি পর্বের উল্লেখ করেন।
প্রথমত; আরাকানের রাজা নরমিখলা দীর্ঘ ২৪ বছর (১৪০৬-১৪৩০ খ্রিঃ) বাংলার সুলতানদের আশ্রয়ে গৌড়ে অবস্থান করেন। অতঃপর সুলতান জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ শাহ কর্তৃক দু'পর্বে ৫০,০০০ (২০,০০০+৩০,০০০) (পঞ্চাশ হাজার) গোড়ীয় সৈন্য দিয়ে আরাকানের রাজধানী পুনরুদ্ধার করে দিলে নরমিখলা সোলায়মান শাহ নাম দিয়ে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। আরাকানের পুরাতন রাজধানী লঙ্গিয়েত বারবার পরাজয়ের কারণে তার কাছে অকেজো বিবেচিত হয়। সেইসাথে বার্মার সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে থাকার জন্য গৌড়ীয় মুসলিম সেনাপতির পরামর্শে ম্রোহং নামক স্থানে রাজধানী স্থানান্তর করা হয়। নরমিখলা মগদের বিশ্বাস করতে পারেনি হেতু নতুন রাজধানীকে সুরক্ষিত করার জন্য মগ বসতির চারদিকে গৌড়ীয় মুসলমানদের বসতি গড়ে তোলেন। এ সময়ে আগত মুসলিম সৈনিকদের পাশাপাশি পরবর্তীতে তাদের আত্মীয় স্বজন এবং বিভিন্ন পেশার শ্রমিকগণ আরাকানে বসতি স্থাপন করেন। এ শ্রমিক শ্রেণির বেশীরভাগ লোকই ছিল চট্টগ্রামের অধিবাসী। সুতরাং তাদের বংশধরগণই রোহিঙ্গা নামে খ্যাত হয়।
দ্বিতীয়ত; ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় পঁচাশি বছরব্যাপী চট্টগ্রাম একাধিকক্রমে আরাকানের শাসনাধীনে ছিল। এ সময়টা ছিল পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলার পর্তুগিজ ও আরাকানী মগ জলদস্যুদের দাস ব্যবসার কালো যুগ। তখন চট্টগ্রাম ছিল আরাকানীদের শাসনাধীন এবং আরাকান রাজসভায় বড় ঠাকুর, মাগন ঠাকুর, আশরাফ খাঁ, সোলায়মান, নবরাজ মজলিশ, সৈয়দ মুহাম্মদ প্রমুখ বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। আরাকানের বিচারকের আসনেও অধিষ্ঠিত ছিল মুসলমান কাজি। এমনকি সেনা বিভাগেও ছিল মুসলমান সৈনিক। আরাকান রাজসভায় দায়িত্ব পালনকারী এ সকল মুসলমানগণের অধিকাংশই ছিলেন চট্টগ্রামী। সুতরাং এ সময়ে চট্টগ্রাম থেকে মানুষ চুরি করার চেয়ে তারা বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে অপহরণকার্য বেশি চালিয়েছে। পক্ষান্তরে চট্টগ্রাম-আরাকানে চাকরি ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে আরাকান যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। আরাকানে অবস্থানরত গৌড়ীয় দাসগণও এদের সাথে যুক্ত হতে পারে। সুতরাং এ পর্বেও রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
তৃতীয়ত; ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ইঙ্গ-বর্মী যুদ্ধে আরাকান ইংরেজদের অধিভুক্ত হয়। তখন বাংলা-চট্টগ্রাম ও আরাকান একই শাসনভুক্ত হবার কারণে বাংলার অনেক জনগণ অস্থায়ী ও স্থায়ী ভিত্তিতে জীবিকার অন্বেষণে চট্টগ্রামে যায়। এভাবে অনেক কৃষক-শ্রমিক আরাকানে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। রাজা নরমিখলার মৃত্যুর পর ১৪৩৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা মিনখেরী ওরফে আলী শাহ আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলে আরাকান গৌড়ের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়। ফলে তখন গৌড়ের কিছু সৈনিক ফিরে এলেও অধিকাংশ সৈনিক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক আরাকানেই স্থায়ী আবাসন গড়ে তোলে।
রাখাইং শব্দ থেকে রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি হয়েছে বলেও মন্তব্য পাওয়া যায়। তারা মনে করেন রাখাইং শব্দ থেকে রোয়াং হয়েছে এবং এ রোয়াং শব্দটি বিকৃত হয়ে রোয়াইঙ্গা শব্দের গঠন হয়েছে। তাদের মতে রোয়াং তিব্বতী বর্মী শব্দ যার অর্থ বুঝায় আরাকান। এ জন্য অদ্যাবধি চট্টগ্রাম জেলায় রোয়াং বলতে আরাকান এবং রোহিঙ্গা বলতে আরাকানের অধিবাসীকে বুঝায়। যদি এ মতকে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয় তবে রোঁয়াই-চাটি শব্দদ্বয়ের যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যায়। অর্থাৎ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দারা নিজেদের চাটি এবং আরাকান থেকে আগত ও অত্র অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারীদেরকে রোঁয়াই বলে সম্বোধন করে থাকেন। তবে রোহিঙ্গা শব্দটি রাখাইন শব্দ থেকে উৎপত্তি ধরা না হলেও রোঁয়াই বলতে আরাকান অঞ্চল বুঝায় এতে কোন সন্দেহ নেই।
রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি ম্রোহং শব্দ থেকে হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। আরাকানের বিতাড়িত রাজা নরমিখলা ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুলতান জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ শাহের প্রত্যক্ষ সহায়তায় হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করে মুহাম্মদ সোলায়মান শাহ নাম নিয়ে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তিনি রাজধানী লংগিয়েতের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দে রামু বা টেকনাফ থেকে শত মাইলের মধ্যে লেম্ব্রু নদীর তীরে ম্রোহং নামক স্থানে রাজধানী স্থানান্তর করেন। এটাই ছিল আরাকানের শেষ অবধি (১৭৮৫ খ্রিঃ পর্যন্ত) রাজধানী। এ ম্রোহং শব্দটি মুসলমানদের মুখে এবং লেখায় রোহাং উচ্চারিত হয়। এভাবে রোয়াং> রোহাং> রোহিঙ্গা নামকরণ হয়েছে। উল্লেখ্য, সত্যেন্দ্রনাথ ঘোষাল এবং আহমদ শরীফ প্রমুখ মনে করেন যে, রাজধানীকে কেন্দ্র করে লেখকগণ রাজ্যের নাম লিখেছেন। যেমন রোমান সাম্রাজ্য, দিল্লী সাম্রাজ্য প্রভৃতির মত রাজধানী ম্রোহংয়ের নামেই আরাকানকে চিহ্নিত করা হত। তবে ম্রোহং শব্দটি সাধারণ উচ্চারণে রোহাং হয়েছে, আবার পূর্ব বাংলার কথ্য ভাষায় 'স' 'হ' উচ্চারণের রূপান্তরের কারণে রোহাং শব্দটিও রোসাঙ্গ হয়েছে। যেমন ম্রোহং>রোয়াং>রোহাং> রোসাঙ্গ ইত্যাদি। এ কারণেই রোহাঙ্গ রাজ্যকে রোসাঙ্গ রাজ্য বলে লেখকরা অভিহিত করে থাকেন।এক কথায় বলা যায়, আরাকানের শেষ রাজধানী ম্রোহং; এর সাধারণ উচ্চরণ রোহাং। এ রোহাং এর মুসলিম অধিবাসীদেরকে রোহিঙ্গা বলা হয়।
উপরোদ্ধৃত বিবরণে এ বিষয়টি গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপিত হয় যে, প্রথমত; রোহিঙ্গারা আরাকানের মূল ধারার সুন্নী মুসলমান। যদি রহম থেকে রোহিঙ্গা শব্দের উৎপত্তি ধরা হয়, তবে বলা যায় রোহিঙ্গারাই আরাকানে বসতি স্থাপনকারী প্রথম পর্যায়ের আরব মুসলিম নাবিক ও বনিক সম্প্রদায়। আরব বণিক হিসেবে এলেও তাদের বসতি নির্মাণ হয়েছে আজ থেকে প্রায় ১৩শত বছর পূর্বে। জাহাজ ডুবি থেকে রক্ষা প্রাপ্ত রহম রহম বলে চিৎকার করা আরব বণিক গোষ্ঠী থাম্ভুইক্যা হবার সম্ভাবনা খুবই কম। কেননা বর্তমান থাম্ভুইক্যাগণ নিম্ন শ্রেণীর জেলে সম্প্রদায় হিসেবে বসবাস করছে, সেই সাথে ঈমান আকীদাগত দিক থেকে তারা ইসলামের বিধি বিধান থেকে অনেক দুরে অবস্থান করছে। অর্থাৎ ইসলামের সঠিক ধারণা ও চর্চা তাদের মধ্যে পাওয়া যায়না। সুতরাং আরব বণিক ও নাবিক সম্প্রদায়ের সকলেই জেলে পেশা গ্রহণ করবে কিংবা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও আমল থেকে দুরে সবে যাবে তা সহজ সাধ্য বিষয় নয়। তাছাড়া চেহারাগত দিক থেকেও তাদের মধ্যে আরবীয় কোন নিদর্শন পাওয়া যায়না। পক্ষান্তরে রোহিঙ্গাদের ঈমান-আকিদা, জীবন পদ্ধতি এমনকি চেহারাগত দিক থেকেও কিছু কিছু লোককে আরবীয় বলে অদ্যাবধি মনে করা যায়।
দ্বিতীয়ত; মুসলমানগণ প্রচারধর্মী (মিশনারী) জাতি হিসেবে ইসলাম প্রচারের জন্য অনেক দুর দুরান্ত ও শত্রু বেষ্টিত পথও অতিক্রম করতে পারে। এদিক বিবেচনায় বখতিয়ার খলজি কর্তৃক বাংলা বিজয়ের পরে গৌড় থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য আরাকানের দাওয়াতি মিশন নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। এ রকম বিচ্ছিন্নভাবে কিছু তৌহিদবাদী মুসলিম দীন প্রচারে আরাকানে গেলে তারা আরাকানী মুসলমানদের পূর্ব পুরুষ কিংবা সহযাত্রী হবে। কিন্তু সুদুর আফগানিস্তানের রোহার অঞ্চল থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আরাকানে এবং এ রোহার থেকে রোহিঙ্গা নামকরণ হওয়া বিষয়টি সমর্থন যোগ্য নয়।
তৃতীয়ত; রোহিঙ্গারা বাংলা থেকে অপহৃত ও আরাকানে দাসরূপে ব্যবহৃত জনগোষ্ঠীর অধস্তন পুরুষ বিষয়টির সাথেও একমত হওয়া যায় না। যদি এরাই রোহিঙ্গা হয় তবে নরমিখলা কর্তৃক আরাকান রাজ্য পুনরুদ্ধার করার সময় বাংলা থেকে প্রেরিত ত্রিশ হাজারের অধিক মুসলিম সৈন্য এবং সমসাময়িককালে আগত ব্যবসায়ীগণ কোথায় গেল? অথচ আরাকানের সমগ্র জনগোষ্ঠীর ৯০% রোহিঙ্গা।
সুতরাং সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, ম্রোহংয়ের অধিবাসী হবার কারণে আরাকানের মুসলমানগণকে রোহিঙ্গা বলা হয়ে থাকে। অতএব আরব বণিক, নাবিক, ইসলাম প্রচারক, রোহার থেকে আগত ইসলাম প্রচারক, গৌড়ীয় মুসলিম সৈন্য, বাংলায় অপহৃত দাসগণসহ অধিকাংশ মুসলমানই রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, তাহলে সমসাময়িক লেখকদের লেখায় রোহিঙ্গা শব্দটি পাওয়া যায় না কেন? উত্তরে বলা যেতে পারে যে, বাংলার অধিবাসী হবার কারণে যেমন বাঙ্গালী বলা হয় অথচ বাঙালীর হাজার হাজার বছর পূর্বের ইতিহাস ঐতিহ্য তুলে ধরা হলেও বাঙালী শব্দের প্রয়োগ সমসাময়িক লেখকদের লেখায় পাওয়া যায় না। বলা চলে বাঙালী কথাটিও আধুনিককালের প্রয়োগ। অথচ আধুনিককালের প্রয়োগ হলেও যেমন বাঙালীর ইতিহাস হাজার বছরের তেমনি রোহিঙ্গা শব্দটি আধুনিক কালের হলেও রোহিঙ্গাদের ইতিহাসও হাজার বছরের চেয়েও পুরনো। এরা পরিচয়হীনভাবে বেড়ে ওঠা কোন জনগোষ্ঠী নয়। মূলত রোহিঙ্গারাই আরাকানের স্থায়ী ও আদি মুসলমান।
[লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইমেইল, mrakhanda@gmail.com] |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrMahfuzurRahmanAkanda |
| |
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
মাহফুজুর রহমান আখন্দ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগর ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতার নাম মোজাফফর রহমান আখন্দ এবং মাতার নাম মর্জিনা বেগম। নিজ এলাকায় ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে বগুড়ায় অধ্যায়ন করেছেন দীর্ঘসময়। তিনি ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাষ্টক্লাশ ফাষ্ট হয়ে এম. এ করেছেন; অতঃপর ২০০০ সালে এম.ফিল এবং ২০০৫ সালে পিএইচ.ডি ডিগ্রীও অর্জন করেন।
অধ্যাপনা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি ছড়া-কবিতা, গান, প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখেন নিয়মিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা, পদ্মাপাড়ের ছড়া, (যৌথ), পরিলেখ প্রকাশনী, রাজশাহী, ২০০৪; ধনচে ফুলের নাও (ছড়া), পরিলেখ প্রকাশনী, রাজশাহী, ২০০৭; মামদো ভূতের ছাও (ছড়া), শব্দশিল্প প্রকাশনী, চট্টগ্রাম, ২০০৮; গুমর হলো ফাঁস (লিমেরিক), পরিলেখ প্রকাশনী, রাজশাহী, ২০০৭, স্বপ্নফুলে আগুন (ছড়া), পরিলেখ প্রকাশনী, রাজশাহী, ২০১০; তোমার চোখে হরিণমায়া (প্রেমের পঙক্তিমালা), অন্ত্যমিল প্রকাশনী, বগুড়া,২০১০; রোহিঙ্গা সমস্যা : বাংলাদেশের দৃষ্টিভংগী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, গবেষণা বিভাগ, ঢাকা, ২০০৫; প্রভৃতি। এছাড়াও হৃদয় বাঁশির সুর, (গানের বই); সংস্কৃতি ও বিনোদন (প্রবন্ধ), আরাকানের মুসলমানদের ইতিহাস (গবেষণা); দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলমানদের ইতিহাস (গবেষণা) তাঁর প্রকাশিতব্য গ্রন্থ। সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের ছোটকাগজ সমন্বয়, বিজয়ের ছড়া প্রভৃতি।
সেইসাথে তিনি বাংলা একাডেমী ও এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ এর সদস্য; বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ এর জীবন সদস্য; বাংলাদেশ লিমেরিক সোসাইটি’র নির্বাহী সদস্য এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় লেখক ফোরাম এর সভাপতি।
ইতোপূর্বে তিনি বগুড়ার সমন্বয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ঢাকা সাহিত্য শতদল এর পরিচালক এবং বাংলাদেশ সংস্কৃতিকেন্দ্রের সহকারী সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের পিতা।
|
|