মঙ্গলবার, ২৩ ভাদ্র ১৪১৭; ২৭ রমজান ১৪৩১; ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১০; রাত ১০:১৩ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
নয়া ইতিহাস নির্মাণের স্বপ্ন (১৫/০১/২০১০)
এই প্রজন্মের দায় (১৬/১০/২০০৯)
সরকারের বৈধতার ভীত কি নড়বড়ে? (০১/১০/২০০৯)
বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বিতর্ক-রাষ্ট্রের ন্যায্যতার ক্ষয় ও নাগরিক দায় (১৬/০৭/২০০৯)
প্রভাকরণ যা প্রমাণ করে গেলেন (০১/০৭/২০০৯)
বাংলাদেশের সাহসের সীমানা (২৬/০৩/২০০৯)
ছাত্র আন্দোলনের ফসল চুরির কেরামতি এবং ছাত্র রাজনীতির ভবিষ্যত (৩০/০৯/২০০৮)
আগের লেখা
373


নয়া ইতিহাস নির্মাণের স্বপ্ন

খোমেনী ইহসান

দৈনিক আমার দেশ-এর পাঠক সংগঠন পাঠকমেলার পরিচালকের দায়িত্ব পালনের সূত্রে আমার সাথে দেশের তরুণ-তরুণীদের বড় ধরনের একটা যোগাযোগ ঘটেছে। চলতি বছরের গত ৮ মাসে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অনেকগুলো মতবিনিময় সভা ও নাগরিক সভায় তাদের সাথে আমার কথা হয়েছে। প্রতি দিন মোবাইল ফোনেও তাদের অনেকের সাথে কথা হয়। তারা মূলতঃ প্রায় সবাই স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। দেশের বুড়ো ডান-বাম, আস্তিক-নাস্তিক ও সাহসী-ভীরু বুদ্ধিজীবী, যারা প্রকৃত প্রস্তাবে পাতি বুর্জোয়া শ্রেণীর ক্যানভাসার মাত্র, তাদের প্রপাগান্ডা শুনে শুনে আমার ধারণা হয়েছিল এই তরুণ-তরুণীরা বুঝি ডিজুস জেনারেশন হয়ে গোল্লায় যাচ্ছে। কিন্তু আজ স্বীকার করছি, একটি রাষ্ট্রের জাগরণ ও প্রগতির জন্য যে বুর্জোয়া শ্রেণীর দরকার, এরা মূলতঃ সেই শ্রেণীর নয়া প্রজন্ম। এরা পাতি বুর্জোয়াদের ইতরামি ও মিথ্যার বেসাতিতে বিভ্রান্ত নয়। বিশিষ্টতার জায়গা থেকে এরা সত্যি সত্যি দেশপ্রেমিক ও দেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। দেশের জন্য কিছু করতে এরা বেশ মুখিয়ে আছে।
এদের সাথে দেখাদেখি ও আলাপের সূত্রে আমি বুঝার চেষ্টা করি এ দেশের তরুণরা কী ভাবছে কী করছে। বুঝতে গিয়ে অনেক বার আমি তাদের মুখ থেকে শুনেছি 'বাংলাদেশে নাকি যুগ সন্ধিক্ষণ' চলছে। আমি নিজেও তরুণ, রাজনীতির প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ আছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রনৈতিক ব্যাপার-স্যাপারগুলো আমার মধ্যে প্রচন্ড ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

তরুণ নাগরিকরা যুগ সন্ধিক্ষণ নিয়ে যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা বলে এ নিয়ে আমি প্রায়ই ভাবতে চেষ্টা করি। বিশেষতঃ সংবাদপত্রের পাতায় ছাপানো বিভিন্ন সংবাদ, রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের বক্তব্য ও বুদ্ধিজীবীদের গলাবাজি শুনে শুনে আমি বাংলাদেশের যুগ সন্ধিক্ষণের ব্যাপারে অনুসন্ধিৎসু হয়েছি। এর মধ্যে আমি নিজের জানাশোনা থেকে কিছু বিষয়ের সন্ধান পেয়েছি। এই লেখায় এসব ব্যাপারে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
সত্যিকারের কথা হচ্ছে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে যে জায়গায় এসে পৌঁছেছে, তাতে প্রচন্ড উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এ রাষ্ট্র মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে একটি সংবিধানের ভিত্তিতে যে চারটি অঙ্গের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, যথা- আইন বিভাগ তথা সংসদ, নির্বাহী বিভাগ তথা আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ তথা কোর্ট-কাচারী ও প্রতিরক্ষা বিভাগ তথা সেনা বাহিনী, এসবের প্রত্যেকটিতে মারাত্মক পচন ধরে গেছে। যার দরূণ বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি বাঁচা-মরার এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। চারটি বিভাগ যদি পঁচন থেকে মুক্তি পায় তাতে রাষ্ট্রটি বেঁচে যায়। না হলে রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র থাকবে না।

আলাপের এই পর্যায়ে এসে একটি কথা বলে নেয়া জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান বিপদাপন্ন অবস্থাকে অনেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী আগ্রাসনের কারণ হিসেবে ব্যাখা করার চেষ্টা করেন। অনেকে এই কথা বলেই ক্ষান্ত হন না, আগ বাড়িয়ে এ কথাও বলেন বিগত ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বেসামরিক লেবাসে যে সামরিক ক্যু হয়েছে, তার কারণেই নাকি বাংলাদেশের বর্তমান বেহাল দশা।
এসব কথার পেছনে তারা নানান মার মার কাট কাট ঘটনা, যুক্তি-তর্কের উদাহরণ দিয়ে থাকেন। তাদের কথায় আমার আপত্তি নাই। কিন্তু অভিযোগ আছে।

আমার মতে সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের অভিযান এদেশে যতোই দৃশ্যমান থাকুক না কেন রাষ্ট্রের মুমূর্ষাবস্থার কারণ হিসেবে এ অযুহাত ধোপে টেকে না। আমি রাষ্ট্রকে রোগী মনে করে যে ডাক্তারি করার চেষ্টা করছি তাতে আমার অনুসন্ধান এই যে, রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের আগ্রাসন বিশেষ কোন রোগের উপসর্গমাত্র, রোগ নয়। রোগটি ভিন্ন, যার কারণে রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান অঙ্গে পঁচন ধরেছে আর রাষ্ট্র যন্ত্র দূর্বল থেকে দূর্বলতর হয়ে যাচ্ছে।
এই রোগটি অনৈতিকতা। কেউ মানুন, না মানুন জোর গলায় দাবি করছি বাংলাদেশ রাষ্ট্র আজ ভয়ানকভাবে অনৈতিকতার রোগে ধরাশয়ী হয়ে গেছে। ব্যাপারটি এতোই দুঃখজনক যে এ রোগকে কোন দাওয়াই দিয়ে সারানো যাবে না। অঙ্গে অঙ্গে ধন্বন্তরী বিদ্যা প্রসূত যে মলমই মালিশ করা হোক না পঁচন ঠেকানো যাবে না।
তার চেয়েও বেদনার ব্যাপারে কোন ডাক্তার ঔষধ দেবে, কী ঔষধ দেবে? ডাক্তারই শুধু ভুয়া নয় ঔষধেও ভেজাল। ব্যাপারতো এমন নয় যে অনৈতিকতার রোগ শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রের চারটি অঙ্গকেই ধরাশায়ী করেছে, সাথে সাথে তো রাষ্ট্রের রোগ সারানোর ডাক্তার-কবিরাজ ও ঔষধ-পথ্যও কুপোকাত হয়েছে। সবচেয়ে ভূয়া প্রমাণিত হয়েছে সংবিধান।

কথায় রহস্য না রেখে ভেঙ্গেচুরেই বলি, একটি রাষ্ট্র রোগ বালাইয়ের শিকারে পরিণত না হওয়ার জন্য সংবিধান নামক যে বিধিবিধান থাকে, বাংলাদেশে তা বহু আগেই তেজপাতায় পরিণত হয়েছে। সংবিধান নামে একটি পুস্তক আছে কিন্তু তার মধ্যে না আছে ঝাঝ, না আছে তেজ। তার সাথে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রটিকে দুষ্টচক্রের বদমায়েশি থেকে রক্ষা করতে যে উচ্চ আদালতের নজরদারির কথা তারও তো পতন হয়েছে। তিনি এখন সাক্ষী গোপালেই পরিণত হননি, ভাড় হিসেবেও আত্ম পরিচয় দাঁড় করিয়েছেন।
আরেকটু খোলাসা করে বলি, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী এ দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকই জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারী। স্বয়ং ঈশ্বরও যদি আসমান থেকে নেমে এসে বাংলাদেশের কোন নাগরিককে খুন করেন তবে তাকে বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী আদালত অপরাধ আইনে শাস্তি দিতে নৈতিকভাবে দায়গ্রস্থ। কিন্তু আমরা দেখছি এ রাষ্ট্রে যদি উচ্চ ক্ষমতাধর কোন ব্যক্তি, তিনি যদি হয়ে থাকেন রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী, তার নির্দেশে কোন নাগরিক প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হলেও এদেশে তার বিচার হবে না। আদালত বিচার করার আগে মামলাই বাতিল করে দেয়। এমন ঘটনার সাক্ষী হিসেবে ছোটখাট হাজারো উদাহরণ তুলে ধরা গেলেও তার আর প্রয়োজন হবে না। কারণ ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে একদল মানুষকে দিনের আলোতে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে খুন করা হলেও, আদালতের মাধ্যমে সেই খুনের মামলা বাতিল হয়ে গেছে।

আমরা আইনের ফাঁক-ফোকর নিয়া টানাটানি করে হয়তো তর্ক করতে পারি, রাষ্ট্র ক্ষমতা নাগরিককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে খুন করার মামলা বাতিল করতে পারি। কিন্তু রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতার যে জায়গাটি নাগরিকের প্রাণ সুরক্ষা করা ও দুর্ঘটনাবশত প্রাণ হরণ করা হলে খুনীর বিচার করার কর্তব্য থেকে রচিত সে জায়গাটি এখন কী দিয়ে পূরণ করবো? মুখের বুলি দিয়ে, না ক্ষমতার দেমাগ দিয়ে? পূরণ যদি হয়ও তাহলে সংবিধান কই থাকে পবিত্রতার উচ্চস্থানে না পদদলনের তলানিতে?
ব্যাপারটা ভাবতে সুবিধা হবে যদি আমরা খবর নিয়ে দেখি আসলে সংবিধান আছে কোথায়। এ প্রসঙ্গে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, জাসদের নেতা আসম আব্দুর রবের ও চিন্তাবিদ কবি ফরহাদ মজহারের দুইটা পর্যবেক্ষণ আমি দরকারি হিসেবে এখানে তুলে দিচ্ছি। আব্দুর রব জোর গলায় দাবি করছেন- স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রাম আর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে জনগণের সকল অংশের মাঝে যে লৌহকঠিন সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল তখন তাকে ধরে রাখার জন্য তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্ব একটি 'বিপ্লবী জাতীয় সরকার' গঠন না করে ১৯৭২ সালে প্রবর্তিত সংবিধানে দলভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা চালু করে। এর ফলে শাসনতান্ত্রিকভাবে 'জাতীয় ঐক্য' ভেঙে পড়ে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক গণতান্ত্রিক-আর্থসামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় সমাজের সমকালীন চেতনা ও প্রয়োজনের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হয়। সুদীর্ঘ দুইশ বছরের ঔপনিবেশিক ও স্বৈরতান্ত্রিকমুখি আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার গহ্বরে গড়ে ওঠা ঔপনিবেশিক চেতনা ও ঐতিহ্য ধারণ করেই ব্রিটিশ সংসদীয় পদ্ধতির অনুকরণে ৭২ এর সংবিধান প্রবর্তিত হয়। অতপর একদলীয় শাসন, প্রেসিডেন্সিয়াল শাসন, সামরিক শাসন, সামরিক ফরমানে সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন-সংশোধন, ক্ষমতার স্বার্থে ক্ষমতালিপ্সু জাতীয় চেতানা-জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করে দলীয় শক্তি-গোষ্ঠীকে সংহত করেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয়েছে। নাম পরিবর্তন ছাড়া ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে প্রবর্তিন আইন বা বিধি রহিত না করার ফলে স্বাধীনতার চেতনা উপযোগী শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সমৃদ্ধশালী সমাজ বিনির্মাণে বুদ্ধিবৃত্তিক যে বিকাশ ঘটানোর যে প্রয়োজন ছিল তাও হয়নি। সংবিধানের মূলনীতির অন্যতম নীতি 'গণতন্ত্র'কে রাতারাতি একদলীয় বাকশালে রূপান্তর, বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যা, সাংবিধানিক শাসনের আওতায় বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাষ্ট্রপতি হিসাবে খন্দকার মোশতাকের শপথ গ্রহণ, সংবিধান স্থগিত করাসহ এসবকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করলেই দেখা যায় ১৯৭২ সালের সংবিধানের কাঠামোগত সহজাত সীমাবদ্ধতা ছাড়াও ১. সংসদের অভ্যন্তরীণ স্বনিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যহীনতা, ২. সংবিধানের ধারাবাহিকতা সুরক্ষার জন্য শক্তিহীনতা, ৩. সংবিধানের মূলনীতি বাস্তবায়ন ও প্রয়োগে বাধ্যবাধকতার অভাব, ৪. সংবিধান লঙ্ঘনের প্রতিরোধের প্রশ্নে বিচারবিভাগের শক্তিহীনতার সীমাবদ্ধতা ও ৫. এককেন্দ্রীক সরকার ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে নির্বাহী ব্যবস্থায় স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতায় বারবার ৭২ এর সংবিধান ব্যর্থ, অকার্যকর ও অসহায় প্রমাণিত হয়েছে।

আজ সংবিধান লঙ্ঘন করাটাই যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। আমরা দেখেছি প্রধান বিচারপতি পদ থেকেই 'রাষ্ট্রপতি' হিসেবে শপথ নেয়ার ঘটনা কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই বাধা দেয় না। এসব দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার পথ ধরে ক্যু পাল্টা ক্যু, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, রক্তাক্ত প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের অসাংবিধানিক ধারা, সামরিক শাসন, অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাসহ সংবিধানের বহু কাটাছেঁড়া, বহু সংশোধনী ৭২ সালের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অনেক অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্ম হয়েছে। জাতীয় চেতনা আহত হয়েছে। ৭২-এর সংবিধানের রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি ভারতের সংবিধান থেকে নকল করা হয়েছে। ( ৬ জুন ২০০৯, দৈনিক আমাদের সময়)

কবি ফরহাদ মজহার বলেন- বর্তমান সংবিধান বাংলাদেশের জনগণ প্রণয়ন করে নি। পাকিস্তানের সংসদের জন্য নির্বাচিত সদস্যদের গায়ের জোরে বাংলাদেশের সংবিধান সভা বলে ঘোষণা দিয়ে উকিল-ব্যারিষ্টারদের মুসাবিদা করা এমন এক সংবিধান আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা সাম্প্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক, নারীবিরোধী, একনায়কী শাসনের হাতিয়ার ও আমাদের সকল রাজনৈতিক সমস্যার মূল গোড়া। রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশানে বা গঠনে অর্থাৎ রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় এই দেশের জনগণকে শুরু থেকেই বঞ্চিত করা হয়েছে। কনষ্টিটিউশান মানে রাষ্ট্র 'গঠন' করাও বটে। সেই গঠনের প্রক্রিয়া যেমন আছে তেমনি তার ফলও আছে। এই বঞ্চনার খেসারত ৩৫ বছর ধরে আমরা দিচ্ছি।

শ্রমিক, কৃষক খেটে খাওয়া শ্রেণী নয়, এমনকি সামন্তবাদ ও পেটিবুর্জোয়ার সংকীর্ণ স্বার্থবিরোধী গতিশীল বুর্জোয়া শ্রেণীও নয় বাংলাদেশে পেটিবুর্জোয়া শ্রেণীই একাত্তর সালে বাংলাদেশে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার সমীকরণের সুযোগে ক্ষমতায় এসেছে। পেটিবুর্জোয়া শ্রেণীকে সহজে বোঝার জন্য 'মধ্যবিত্ত' শ্রেণীও বলা হয়। দুনিয়াব্যাপী পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার জোয়ারে বাংলাদেশে সত্তর দশকের এই শ্রেণীটি ক্ষয়িষ্ণু, কিন্তু পুঁজি তার নিজের দরকারে পরিধির দেশগুলোকে এই ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীগুলোকে টিকিয়ে রাখে। সম্ভবত অর্থনৈতিকভাবে এদের দিন শেষ হয়ে এসেছে কারণ নব্য ধনতন্ত্রের কারণে আমরা নতুন যে ডিজুইস জেনারেশান দেখছি তাদের দাপটে ও চমকে এই শ্রেণীর জৌলুস অনেকাংশেই ম্লান। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে যে পাতিবুর্জোয়া শ্রেণী ক্ষমতায় এসেছে সেই শ্রেণীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া অর্থাৎ সংবিধান ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া থেকে জনগণকে সবসময়ই দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক, কৃষক ও খেটে খাওয়া জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের আবেগের মধ্যে রেখে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করবার দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল। তথাকথিত বাহাত্তর সালের সংবিধান গণতান্ত্রিক তো নয়ই বরং ঘোরতর সাম্প্রদায়িক। যার কুফল আমাদের গুনতে হয়েছে আদিবাসী ও পাহাড়িদের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষ ও যুদ্ধে জড়িয়ে।
এই দুই নেতার বক্তব্য থেকে সংবিধান পর্যালোচনা করে তাই আমরা এই শিক্ষাই পাই বাংলাদেশ এমন একটি অকেজো সংবিধানের মাধ্যমে চলছে যা রাষ্ট্রে অনৈতিকতা উৎপাদনেই তৎপর। ভালো কিছু তৈয়ার করার প্রণোদনা সংবিধান থেকে আসে না। (০৬ নভেম্বর ২০০৭, দৈনিক নয়া দিগন্ত)

এরপর আসি সংসদ প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ সংসদ বলে যে সার্বভৌম অঙ্গের কথা বলা হয় তার যে পরাজয় আমরা দেখছি তাকে কোন নসিহত দিয়ে জায়েজ করবো? একদল ব্যক্তি চোখের সামনে দেখলো রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন নিয়া ঝগড়া-ঝাটি করছে আর সে সুযোগে তারা বন্দুক তাক করে ক্ষমতার মসনদ দখল করে ফেললো। চার মাসের জরুরি অবস্থাকে তারা দুই বছর লম্বা করে ফেললো। প্রধানমন্ত্রীর পদ মর্যাদার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দ্বৈত নাগরিক ফখরুদ্দিন আহমদকে গদিতে বসিয়ে দিলো। তারপর তারা সারা বাংলাদেশে তান্ডব শুরু করলো। যার দরুণ দেশের রাজধানীর ফুটপাত থেকে হকাররা ও গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজার থেকে ব্যবসায়ীরা দোকানপাটসহ উচ্ছেদ হয়ে গেলো। জাতীয়ভাবে যেসব ব্যবসায়ী উৎপাদনের সাথে জড়িত তারা গ্রেফতার হলেন, তাদের শিল্প-কারখানায় তালা পড়লো এবং পুঁজি অবৈধভাবে বন্দুকধারীরা লুট করে নিলো। যারা এই কাজ করলো তাদের বিচার করে শাস্তি দেওয়ার দূরে থাকুক তাদের কাছে জবাবদিহিতা চাওয়ারও নূন্যতম নৈতিক বলই দেখাইতে পারলো না সংসদ। সংসদ গত ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে পুনর্বহাল হলেও গত ১১ মাসে নিজের তাকত ও নৈতিক অবস্থানই ব্যাখ্যা করতে পারিনি। বরং আমরা দেখলাম সংসদের সদস্যরা নিজেদের ক্ষমতার বিকার প্রদর্শন করতে উপজেলা পরিষদে ছড়ি ঘুরাইতে ঘুরাইতে উপদেষ্টা নামক প্রভু হিসেবে নাজিল হয়ে গেলেন। তারা কোন ধরণের কারণ ব্যাখ্যা ছাড়াই সংসদে বসে দেশের সমুদ্রবক্ষের তেল-গ্যাস বিদেশে পাচার করার আইন পাশ করে দিলেন।

আমলাতন্ত্রে যা বাসা বেধেছে তাতে এই রাষ্ট্রের নির্লজ্জতাই প্রকট হয়ে ওঠেছে। সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে আমলাদের নামের পেছনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ইত্যাদি দলীয় পরিচয় লিখে দিয়ে কাউকে গদিনশীন কাউকে গদিহীন করার সংস্কৃতি চালু হয়ে গেছে। দলবাজির শিকার হয়ে আমলারা সরকার দলীয় ক্যাডারদের চোটপাটের মুখে ত্রাহি মধুসূদনে পরিণত হয়েছেন। মাঠ পর্যায়ে তারা দলে দলে কর্মস্থল ছাড়ার নিবেদন জানিয়ে দলবাজি ও দলীয় মাস্তানি থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করছেন। এর উপর রয়েছে আমালতন্ত্রের রন্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির পুরনো মহামারি। আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের কর্মকান্ড নির্বাহ করার জন্য গড়ে তোলা হলেও এখন দেখা যাচ্ছে আমলাতন্ত্র সারা দেশবাসীর উপর এক প্রকারের খোদায়ী কায়েম করে বসেছে। আমলারা এমন কর্মকান্ডের জন্ম দিচ্ছে তাতে মনেই হয় না তারা রাষ্ট্রের কর্মচারী। বরং তারা সরকারী দলের চাটুকারী করে এমন কিছু করে বসছে যাতে রাষ্ট্র একদিকে বিদেশীদের সাথে অসম চুক্তি ও এনজিওদের নীতির পকেটে ঢুকে যাচ্ছে।

সামরিক বাহিনীর প্রসঙ্গে কিছু কথা বলে অনুযোগের সমাপ্তি টানবো। সংবিধান মতে 'শৃঙ্খলা-বাহিনী' অর্থ (ক) (ক) স্থল, নৌ বা বিমান-বাহিনী; (খ) (গ) (খ) পুলিশ-বাহিনী; (ঘ) (ঙ) (গ) আইনের দ্বারা সংজ্ঞার অথের্র অন্তর্গত বলিয়া ঘোষিত যে কোন শৃঙ্খলা-বাহিনী। এর মধ্যে স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীকে আমরা সামরিক বাহিনী বলে থাকি। এ বাহিনীর মধ্যে ক্ষমতা চর্চার উদগ্র বাসনা ও দল প্রীতি আজ প্লেগ রোগের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। যার সূত্রপাত মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রথম সরকার থেকেই। ওই সূত্রপাত এমন পাপে পরিণত হয়েছে যার দরুণ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান, সেক্টর কমান্ডার ও উপ সেনা প্রধান খালেদ মোশারফসহ দেশের অনেক কৃতি মানুষকে খুন হতে দেখেছি। এমনও দেখি সামরিক বাহিনীতে পাকিস্তানী আয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানের প্রেতাত্মা স্বরূপ জেনারেল এরশাদ ও জেনারেল মঈনের মতো পাপাত্মারও আবির্ভাব ঘটেছে। তারা দেশে সামরিক ও সুশীল শাসনের মতো অপকর্মের জন্ম দিয়েছেন। তাদের সময়ে সেনা বাহিনী ব্যারাক ছেড়ে দেশ শাসনে জড়িয়ে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়েছিলো। ভূলণ্ঠিত হয়েছে সেনা বাহিনীর পেশাদারিত্ব। ফলে আমাদের তালপট্টি দ্বীপ ভারত দখল করতে পেরেছে, সমুদ্রসীমায় মিয়ানমার ও ভারত আগ্রাসন চালাতে শুরু করেছে। এমনকি পেশাদারিত্বে অবহেলার কারণে বিদেশী চক্রান্তে পিলখানায় ট্রাজেডী ঘটিয়ে ৫৪ জন সেনা কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে দিনের বেলায় খুন করা সম্ভব হয়েছে। এখন সামরিক বাহিনীতে দলবাজি এমন মচ্ছবে পরিণত হয়েছে যে, চৌকষ অফিসারদের বরখাস্ত করা হচ্ছে। সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বোমাবাজির তদন্তাধীন অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাদের আটক করা হচ্ছে। এমনকি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে পুলিশের একটি বিভাগে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আটক হতে হয়েছে। শেষের এই ঘটনাটিই নির্দেশ করে সামরিক বাহিনীর অবস্থান আজ কতো তলানিতে এসে ঠেকেছে।

২.
আমাদের দেশের চাকুরে ও চাটুকার মধ্যবিত্তরা ঔপনিবেশিক জ্ঞানগম্যির জোরে রাষ্ট্র নিয়ে অনেক বাজে বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছেন। তাদের প্রচারণার কারণে আমরা বিশ্বাস করে বসি রাষ্ট্রের মালিকানা সব জনগণের। তাই জনগণের ইচ্ছাতেই বুঝি রাষ্ট্র চলবে। এটি ডাহা মিথ্যা কথা। রাষ্ট্রনৈতিক জায়গা থেকে প্রকৃত সত্য হচ্ছে, রাষ্ট্র মূলতঃ সংখ্যালঘু শাসক শ্রেণীর। আর সংখ্যাগুরু জনগণের পরিণতি শোষিত হওয়ার মধ্যেই অনিবার্য।
যেহেতু আমরা রাষ্ট্রের অসুখ নিয়ে কথা বলতেছি এবং অসুখটিকে এরই মধ্যে অনৈতিকতা বলে চিহ্নিত করেছি, সেহেতু আমাদের মানতেই হচ্ছে অনৈতিকতার অসুখে মর মর অবস্থা রাষ্ট্রের সংখ্যালঘিষ্ঠ শাসক শ্রেণীরই। সংখ্যাগুরু জনগণ কোন ভাবেই অনৈতিকতার রোগে আক্রান্ত নয়।
শাসকশ্রেণীর অসুখকে যদি আমরা বুঝতে যাই তাহলে পুঁজির খাসলতকে কেন্দ্র করে আমাদের কিছু বোঝাপড়া ঠিক করে নিতে হবে।
সাধারণতঃ আধা সামন্তবাদী কিম্বা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে শাসক শ্রেণী জনগণকে লুণ্ঠন ও নিপীড়ন করতো। এ সময় রাজা-রাণী, জমিদার ইত্যাদি শ্রেণীর সামন্তরা জনগণের উৎপাদিত ফসল, অর্থ ও সম্পদ জোর করে লুণ্ঠন করতো। জনগণকে দিতে হতো বাধ্যতামূলক শ্রম। সামন্ত ও ঔপনিবেশিকরা কোন ধরণের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলো না। তারা জনগণের উৎপাদনে সামন্ত কিম্বা ঔপনিবেশিক সম্পর্কের জায়গা থেকে ভাগ বসাতো। তাদের কেউ ভাগ দিতে রাজি না হলে তারা চরম নিপীড়ন চালাতো। এ রাষ্ট্রেও দুটি শ্রেণীই ছিলো-লুটেরা শাসক শ্রেণী ও লুণ্ঠিত-নিপীড়িত শাসিত শ্রেণী।

কিন্তু ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে দুনিয়ার দেশে দেশে সামন্তবাদী শাসনের অবসান ঘটতে থাকে। উদ্ভব হতে থাকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের। এমন ধারার রাষ্ট্রেও শাসক ও শাসিত নামে দুটি শ্রেণী ছিল। শাসক শ্রেণী পুঁজির একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে উৎপাদনের সব উপায়ের মালিক। শাসিত শ্রেণী সব হারিয়ে শ্রম বিক্রি করেই বেঁচে থাকতো। শাসক শ্রেণী শ্রমিকদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য না দিয়ে শ্রম শোষণ চালাতে থাকে। তাই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক শোষণের সম্পর্ক। এই সম্পর্কে পুঁজির আদর্শ নিয়ম হচ্ছে শুধুই শ্রম শোষণ করা, কোন ভাবেই লুণ্ঠন ও নিপীড়ন না করা।
পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে শাসক শ্রেণী শাসিত জনগণকে শোষণ করে বেড়ালেও শিল্প বিকাশের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ও প্রগতি রচনা করে। জনগণকে শোষণের বাইরে লুণ্ঠন, নিপীড়ন থেকে মুক্তি দিয়ে গণতান্ত্রিক সমাজের অধিকার ভোগ করার সুযোগ দেয়। তাই পুঁজিবাদে শোষণ নিয়ে যথার্থ বিতর্ক থাকলেও সামন্তবাদী সমাজ কিম্বা ঔপনিবেশিকতা থেকে মানুষকে মুক্ত করার জায়গায় এক প্রকারে ধন্যবাদার্হ।

তাই আমরা দুনিয়া জুড়েই দেখি কী পুঁজিতান্ত্রিক, কী সমাজতান্ত্রিক, কী ইসলামিক সব ধারার রাষ্ট্রই পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র চালায়।
আমরা বাংলাদেশে অনৈতিকতার রোগ নিয়ে যে আলোচনাটা তুলেছি তার প্রেক্ষিত থেকেই লুণ্ঠন, নিপীড়ন ও শোষণের ব্যাপার-স্যাপারে কোথায় কতটুকু তফাৎ তা বুঝে নেয়ার প্রস্তাব করছি।
বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করলেও বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী আগের সামন্তবাদী চরিত্র থেকে মুক্ত হতে পারেনি। বুর্জোয়া বিকাশের লক্ষ্যে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলেনি। উল্টো স্বাধীনতা লাভের সুযোগে দেশের সব শিল্প কলকারখানা, ব্যাংক-বীমাকে জাতীয় করণের নামে লুট করে নেয়। শ্রমের বিকাশে মনোযোগ না দিয়ে কৃষকের জমি, ব্যবসায়ীর দোকান দখল করাকে সংস্কৃতিতে পরিণত করে। যা শেষ পর্যন্ত নদী-খাল দখলের পর্যায়ে পর্যবসিত হয়। শাসক গোষ্ঠী এই লুণ্ঠনকে সমাজে প্রচন্ড নিপীড়নের জন্ম দিয়েছে। নিজেদের ক্যাডার বাহিনীকে দিয়েই শুধু তারা নিপীড়ন করছে না, সাথে সাথে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বাহিনীকেও তারা ব্যবহার করতে শুরু করেছে। লুণ্ঠনের স্বার্থে নিপীড়ন চালাতে দলীয় ক্যাডার বাহিনী ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করাকে নির্বিঘ্ন রাখতে তারা সংসদ, আইন- আদালতকেও ব্যবহার করছে।

পুঁজি তার চরিত্র অনুসারে বিশ্ব ঐতিহাসিকতায় পুঞ্জিভবন ও কেন্দ্রীভবনের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে আজ সাম্রাজ্যবাদে রূপ নিয়েছে। এ অবস্থায় সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি দেশে দেশে হানাদারির জন্ম দিয়েছে। সেই হানাদারির সাথে লড়াই করে দেশে দেশে জাতীয় পুঁজি নিজের বিকাশ নিশ্চিত করতে চাইছে। এমন জটিল সময়ে আমরা দেখছি বাংলাদেশে সামন্তবাদী লুটেরা নিপীড়ক শাসকগোষ্ঠী সাম্রাজ্যবাদের সাথে গাটছাড়া বেধে এক জোট হয়েছে। তারা দোকানদারির ধর্ম পালন করে সাম্রাজ্যবাদের শক্ত দালালে পরিণত হয়েছে। এই দালালির মাধ্যমে তারা কিছু মাইনে পাচ্ছে।

আমরা বাংলাদেশের তাবৎ শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে এই প্রবণতার বিকার দেখছি। তাই নিশ্চিত করে বলা যায় বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে বুর্জোয়া সমাজের নৈতিকতার ছাপও অবশিষ্ট নেই। বরং এদেশের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, বিচারপতি, উকিল-ব্যরিষ্টার, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, কবি-সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মী প্রভৃতির মধ্যে অনৈতিকতার অসুখ দৃশ্যমান হয়ে ওঠেছে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় শাসকগোষ্ঠীর অনৈতিকতার মূলে রয়েছে তাদের লুটেরা ও নিপীড়ক খাসলত। এ থেকে কোন সমাজ মুক্ত না হলে সে সমাজে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। বরং অসুখের উপসর্গ হিসেবেই তারা এসব বিসর্জন দিতে থাকে।

তাই আমরা অবাক হয়ে দেখি, কিঞ্চিত ব্যতিক্রম বাধে তারা সবাই শেয়ালের মতো হুক্কা-হুয়া করে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের হয়ে বাংলাদেশকে পতিতাপল্লী বিক্রি করে দেয়ার মতো বিক্রি করে দিয়েছে। এই বিক্রি-বাট্টায় রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র নাই। রাষ্ট্র তার প্রধান অঙ্গ সমূহে প্রত্যাশিত নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে মত্ত হয়েছে অভাবিত ব্যভিচারে।
বাংলাদেশে আজ এই ব্যভিচারের শিকার মূলতঃ রাজনৈতিভাবে তিনটি গোষ্ঠী- ১. ইসলামপন্থীরা, ২. বিপ্লবী কমিউনিষ্টরা ও ৩. জাতীয়তাবাদীরা। তাই আমরা দেখি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রচন্ড শক্তিতে প্রচারণা চলছে, ইসলামপন্থীদের রাজপথে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, তাদের জঙ্গিবাদের মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। আর বিপ্লবী কমিউনিষ্টদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। অন্য দিকে কিছু চরিত্রহীন-দুর্নীতিবাজের উছিলায় জাতীয়তাবাদীদের হামলা-মামলা ও দেশ ছাড়া করা হচ্ছে।

আমরা যখন বলি প্রচন্ড সাহস নিয়ে বলি লুটেরা-নিপীড়কদের পরাজিত করে বাংলাদেশে একটি বুর্জোয়া বিপ্লবের সম্ভাবনা রয়েছে, তখন মূলতঃ আমরা প্রস্তাব করি এদেশের ইসলামপন্থী, বিপ্লবী কমিউনিষ্ট ও জাতীয়তাবাদীদের জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে নয়া গণতান্ত্রিক গণ-অভ্যুত্থানের। এই প্রস্তাব যদি সমাজ গ্রহণ করে তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস নতুন করে নির্মিত হবে। এর সম্ভাবনা নিয়ে আজ কোন আলোচনা করছি না।
এতটুকু বলবো এ দেশের তরুণ-তরুণীদের চোখে-মুখে এ ধরণের একটি স্বপ্ন দানা বাঁধতে দেখছি।

লেখকঃ এক্টিভিষ্ট ও সাংবাদিক, ইমেইল, khomenee.ehsan@gmail.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/KhomeneeEhsan
পাঠকের মন্তব্য:
France থেকে Wahid লিখেছেন, ১৪ জানুয়ারী ২০১০; রাত ০৯:৫৫
What can i do ?
6857
টেক্সাস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আশিক লিখেছেন, ১৫ জানুয়ারী ২০১০; রাত ১০:০২
খোমিনী ইহসান সব সময়ই পশ্চিম প্রভাবিত প্রচলিত গতানুগতিক চিন্তার বাইরে নতুন সম্ভাবনার কথা বলেন। আমাদের অধিকাংশ মানুষ ঔপনিবেশিক চিন্তায় এমনিভাবে আচ্ছন্ন হয়ে গেছি যে তথাকথিত দ্বিদলীয় গনতন্ত্র ছাড়া কিছু ভাবতে পারি না। শেষোক্ত প্যারায় লেখক যে বিকল্পের কথা বলেছেন তা সত্যিই চমকপ্রদ। লেখকের বিশ্লেষন যেমনি মৌলিক তেমনি জ্ঞানগর্ভ।
6902
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এহসানুল হক জসীম লিখেছেন, ১৬ জানুয়ারী ২০১০; দুপুর ০১:৪৫
ধন্যবাদ
6919
ঢাকা থেকে মু. নূরনবী লিখেছেন, ১৭ জানুয়ারী ২০১০; সকাল ১০:৫৮
সবই সত্যি কিন্তু বাঙ্গালী বেল কথা!..এদের যে লেজ বাঁকা।
6944
ইতালি থেকে কায়েস লিখেছেন, ১৯ জানুয়ারী ২০১০; সন্ধ্যা ০৬:০১
ধন্যবাদ। ইহসান ভাই। তরুনদেরকে সত্য ও আলোর পথে নিয়ে যেতে আপনার মত লোকের ও লেখকের খুবই প্রয়োজন।
7077
সাপ্তাহিক বুধবার থেকে আহম্মদ ফয়েজ লিখেছেন, ২৯ জানুয়ারী ২০১০; দুপুর ০৩:৫৩
লেখাটা অত্যান্ত সময়োপযোগী এবং বাস্তবতার নিরেখে হয়েছে। লেখককে ধন্যবাদ।
7471
ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে রাতিলা তারান্নুম লিখেছেন, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১০; সন্ধ্যা ০৭:০৯
লেখা ভালো হয়েছে।

আপনার আরো বেশি লেখা পড়তে চাই
9112
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2010. E-mail: editor@sonarbangladesh.com.