|
যুক্তিহীনতার মহামারীতে আক্রান্ত শিক্ষিত সমাজ
মঈনুল আহসান |
|
বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায়, শোকে অথবা দুঃখে এবং প্রতিবাদের সমাবেশে ইদানীং ব্যপক ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে 'প্রদীপ প্রজ্বলন' আর 'আলোর মিছিল'। প্রদীপ জ্বালানো হচ্ছে অনুষ্ঠান এবং উৎসবের উদ্বোধনেও। একে বলা হচ্ছে 'মঙ্গল প্রদীপ'। প্রজ্বলিত অগ্নি শিখার সামনে দাঁড়িয়ে নেয়া হচ্ছে 'ব্জ্র কঠিন শপথ'। সেই শিখাকে আবার প্রায়সই মহিমান্বিত করা হচ্ছে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমেও। এসবের বেশীর ভাগই হচ্ছে সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এতে অংশ নিচ্ছেন ভিসি, প্রভোষ্ট, অধ্যাপক, সেনানায়কসহ সব বিশিষ্ট জনেরা। তথা সমাজের সর্বোচ্চ শিক্ষিত শ্রেণী।
প্রদীপ, মোমবাতি আর অগ্নিশিখা কেন্দ্রিক এসব আয়োজন আমাদের দেশ ও সমাজে অনেকটা নতুন হলেও বিশ্বব্যাপী এর প্রসার এবং প্রয়োগের ইতিহাস সুদীর্ঘ। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বোধকরি 'অলিম্পিক মশাল'। এই মশাল এতটাই সম্মানিত যে এটা রীতিমত প্রদক্ষিণ করে সারা বিশ্ব। ঘুরে ফেরে দেশে দেশে। প্রতিটি দেশ একে দিয়ে থাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং অভ্যর্থনা। রাষ্ট্র প্রধান, সরকার প্রধান, মন্ত্রী, শাস্ত্রী সবাইকে সব কাজ ফেলে ছুটতে হয় এই একখন্ড আগুনের পেছনে।
অগ্নিশিখার এই অভ্রভেদী মাহাত্মের কারণ বোধকরি আধাঁরের উপরে এর সুস্পষ্ট আধিপত্য। আলোর ধাওয়াতেই তো পালায় আধাঁর। শক্তি হিসেবেও এর গুরুত্ব সর্বস্বীকৃত। তাই আমাদের শৌর্য্য-বীর্য্য তথা 'স্পিরিট'- এর তুল্য হতে পারে যেন একমাত্র এই আগুনই। বোধকরি সেজন্যেই অলিম্পিকসহ সব গেমসে এর সর্বোচ্চ অবস্থান ও মর্যাদা নিশ্চত করা হয়েছে শক্ত আইনের মাধ্যমে।
অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে অলিম্পিক মশালের ক্ষমতা নেই নিজে থেকে জ্বলবার। মানুষ জ্বালালে তবেই জ্বলে। যে প্রদীপ বা মোমের আলোতে আধাঁর হয় দূ্র তার সাধ্য নাই সামান্যতম বাতাসের মুখে টিকে থাকার যদি না মানুষ দয়া করে সেটাকে রক্ষা করে নিজের তালুর আড়ালে। যে জ্যোতি ও শিখার জন্ম এবং স্থায়িত্ব মনুষের হাতের মুঠোয়, মানুষের করুণা নির্ভর, সেটা কিভাবে পেতে পারে মানুষের ভক্তি, সম্মান আর শ্রদ্ধা তা বুঝে আসেনা কিছুতেই। বুদ্ধিতে ধরেনা। বিবেকেও মানে না।
কোন জ্যোতি বা আলোকে যদি জ্ঞান, বিজ্ঞান আর সক্ষমতার প্রতীক ধরতেই হয় তবে তার অনিবার্য দাবীদার হলো 'সূর্য্য'। বাতি বা প্রদীপের মত সূর্য্য দাবী করে না মানুষের কোন করুণা বা সহায়তা। বরং মানুষকেই তার নিত্যদিনের জীবনের স্বার্থে নির্ভর করতে হয় সূর্য্যের উপর। এই সূর্য্যের দাপট এতটাই সর্বব্যাপী যে পৃথিবীর নিভৃততম গুহাকোণও বাধ্য তার আলোকে প্রবেশাধিকার দিতে। এহেন ক্ষমতাধর সূর্য্যও নিয়মিত দিশা হারায় উড়ন্ত মেঘমালার কাছে। রাহুর গ্রাসের কাছে। আসহায় আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় রাতের কালো আধাঁরের কাছে। চাঁদকে সাথে নিয়ে যদিও সে চেষ্টা করে রাতের সাথে লড়তে কিন্তু তাতেও নিয়মিত বাঁধ সাধে পৃথিবী। তাই আধাঁরকে জয় করা তার হয়ে ওঠে না কখনই। এসব তথ্য আজ বৈজ্ঞানিক সত্য। বিশ্বের তাবৎ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী এসব সত্য সম্বন্ধে সর্বজ্ঞ। তারপরও তারা প্রদীপ আর মোমবাতির মত ঠুনকো আলোর ধারার মাঝে দেখতে পায় মানুষের 'মঙ্গল'। নিজ হাতে জ্বালায় আর নিভায় যে শিখা তাকে বলে 'অণির্বাণ', 'চিরন্তন'। কী ভয়ানক মূর্খতা। এহেন আগুনের শিখাতেই যখন পেশ করা হয় 'পুষ্পার্ঘ্য'। তাকে সাক্ষী রেখে যখন নেয়া হয় 'বজ্রকঠিন' শপথ। তখন তাকে কি বলা যায়? বহুমাত্রিক মূর্খতা নাকি জ্ঞানের দুর্ভিক্ষ?
এই যে পুষ্পার্ঘ্য, এটা অগ্নিশিখা ছাড়াও অর্পণ করা হয় শহীদের কবরে এবং স্মৃতির মিনার সমূহে। কিন্তু আমরা কেউ জানি না আমাদের এই অর্ঘ্য বিদেহী আত্মারা দেখে কিনা। গ্রহণ করে কি। কিম্বা এগুলো আদৌ তাদের কোন কাজে আসে কিনা। কোন সুনির্দ্দিষ্ট প্রমাণপঞ্জি ছাড়াই আমরা জীবিতরা এটাকে বানিয়ে নিয়েছি মৃতকে সম্মান জানানোর উপায়। জীবদ্দশায় আমরা অন্যের কাছ থেকে ফুল পেতে ভালবাসি। ফুল পেলে খুশী হই। ফুলের প্রতি সার্বজনীন এই ভাল লাগাই সম্ভবতঃ মৃতকে পুষ্পার্ঘ্য দেয়ার পেছনে প্রধান যুক্তি। কিন্তু ফুল দিয়ে কিচ্ছুক্ষণ পর সেটা ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলতে হলে সেই অর্ঘ্যের মর্যাদা বা মূল্য থাকলো কোথায়? এটা কি সম্মানের নামে মৃতকে অসম্মান করা নয়? অথচ দেহত্যাগী অবিনশ্বর মানবাত্মাকে লাভবান করতে পারে এমন সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর প্রমাণিত পদ্ধতিই রয়ে গেছে আমাদের হাতে। নশ্বর এবং অবিনশ্বর জগতের মাঝে কার্যকর সেতুবন্ধনের অসংখ্য প্রায়োগিক নমুনা রেখে গেছেন চির সত্যবাদী হিসেবে বিশ্ব স্বীকৃত হযরত মহম্মদ (সাঃ)। সেসব ছেড়ে আমাদের অতি প্রিয় সর্বজন সম্মানিত আত্মত্যাগীদের জন্য সাক্ষ্য-প্রমাণহীন মনগড়া পদ্ধতির প্রয়োগ কি যুক্তিগ্রাহ্য?
যুক্তির বলে 'মঙ্গল প্রদীপ' আর 'পুষ্পার্ঘ্য'কে প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে চতুর শিক্ষিতজনেরা এর দায় চাপিয়ে থাকেন আমাদের পূর্ব পুরুষদের উপর। বলা হয় এগুলোই আমাদের ভূখন্ডের সহস্র বছরের পুরোনো আচার। এগুলোই আমাদের মূল সংস্কৃতি এবং কালচার। এসবে পুণঃ প্রত্যাবর্তন এবং এসবের পুণরুজ্জীবনই নাকি চেপে বসা সব অপসংস্কৃতিকে দূ্র করে নিজস্ব সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়ার একমাত্র উপায়। তাহলে কি আমরা আবার পাঠ্য পুস্তকে লিখবো যে 'পৃথিবী স্থির, সূর্য ঘুরছে তার চারদিকে'? জ্বর হলে এখন রোগীর গায়ে পানি ঢালা হয় অথচ কিছুদিন আগেও এসব রোগীকে কাঁথা-কাপড় দিয়ে মুড়ে রাখা হতো। পূর্ব পুরুষদের অনুসরণের দাবীদারদের আবদার অনুযায়ী আমরা কি এখন থেকে জ্বরের রোগীদেরকে আবার কাঁথা-কাপড় দিয়ে মুড়ে রাখা শুরু করবো? শিক্ষা-দীক্ষার বর্তমান বই-পত্র, উপায়-পদ্ধতি ছেড়ে আমরা কি আবার ফিরে যাবো পুঁথি পাঠে? পূর্ব পুরুষদের আচার-কালচার রক্ষাই যদি হয় মানব জন্মের উদ্দেশ্য তা হলে আমাদের তাই করা উচিত নয় কি?
একটা সময় ছিল যখন সমাজের মাতব্বর এবং মোড়লেরা নতুন যে কোন তত্ত্ব-তথ্যের কথা শুনলেই ভয় পেতেন। ক্ষেপে যেতেন। মানুষকে ছলে-বলে-কৌশলে হলেও বিরূপ করে রাখতেন ঐসব নতুনত্বের প্রতি। নতুন সত্যের উদ্ভাবন ও আগমনে সমাজের উপর তাদের একচ্ছত্য আধিপত্য হারানোর ভয়ই ছিল সেই পিছুটানের মূল কারণ। বর্তমান সমাজের কথিত শিক্ষিত অধিপতিরাও কি সেই একই শংকায় আতংকিত? তা না হলে কেন তারা সমাজ ও সভ্যতাকে পেছনে নিতে চাইছেন বৈজ্ঞানিক সত্যসমূহ প্রমাণসহ প্রকাশিত হওয়ার পরও? বিশুদ্ধ জ্ঞানের চর্চায় রত বিশ্ব পন্ডিতরা যখন কোরআনিক সত্যের আদলে মানব সভ্যতাকে ছড়িয়ে দিতে ব্যগ্র পৃথিবীর সীমার বাহিরে তখন তাকে মোমবাতির আলো আর প্রদীপের পেছনে দাঁড় করানোর চেষ্টা অর্বাচিনের মূঢ়তা ছাড়া আর কি হতে পারে।
মানুষের শক্তি, সামর্থ, মর্যাদা, সম্মান যে কত ব্যাপক বিস্তৃত তা উপলব্ধি করার জন্য এইসব 'মূঢ় শিক্ষিত'দের বেশী করে কোরআন পড়া উচিত। কারণ একমাত্র এই কোরআনেই ঐতিহাসিক সব প্রমাণপঞ্জি আর নিদর্শনসহ পরম মমতায় তুলে ধরা হয়েছে মানুষের শক্তি, সামর্থ্য ও সম্মানের সুনির্দিষ্টব্যাপ্তি। এই কোরআন থেকেই আমরা জানতে পারি যে, মানুষের এক আঙ্গুলের ইশারায় দ্বিখন্ডিত হতে পারে চাঁদ (সূরা ক্বামারঃ ১ এবং সহী বুখারী)। উন্মাতাল সাগরও বাধ্য হয় নিজের বুক চিরে মানুষকে চলার পথ করে দিতে [মুসা (আঃ)-এর ঘটনা]। মানুষের পক্ষেই পরম স্রষ্টার সেই সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ সম্ভব যেখানে যেতে পারেন না স্বয়ং জীব্রাইল ফেরেশতাও (সূরা নাজমঃ ১০ এবং মেরাজের ঘটনাবলীঃ সহী বুখারী)। মানুষের এইসব অনন্য গুনাবলীর কারণেই সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ নিজে তাঁর এই বিশেষ সৃষ্টির সাথে প্রভূত্ব নয়, করেছেন বন্ধুত্ব। সেজন্যেই তিনি রসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলেছেন 'হাবিব'। ইব্রাহীম (আঃ)-কে বলেছেন 'খলিল'। আর মানুষকে করেছেন তাঁর 'খলিফা' তথা 'প্রতিনিধি'।
এসব কোন মৌলবাদি, মধ্যযুগীয় বা বিশেষ কোন ধর্মের কথা নয়। এগুলো হচ্ছে চিরসত্য, সরল ও পরিপূর্ণ সেই দর্শনের কথা যা সব জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সমাজ নির্বশেষে সমগ্র মানব গোষ্ঠীর জন্য সর্বাবস্থায় প্রয়োজনীয় এবং প্রযোজ্য। যা আজ পর্যন্ত কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারে নি। ভবিষ্যতেও পারার কোন সম্ভবনা নাই। এই দর্শনে বস্তুতঃ এ কথাটাই স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই মহাবিশ্বে সর্বশক্তিমান আল্লাহর পরই মানুষের স্থান। আল্লাহ আর মানুষের মাঝামাঝি আর কিছু নেই। কোন মাধ্যম নেই। কোন অবলম্বনও নেই। আর সেই মানুষই কিনা প্রদীপ জ্বালায় মঙ্গলের আশায়। অগ্নিপিন্ড মাথায় তুলে দৌড়ায় বিশ্বব্যাপী। ফুল দেয় আগুনের শিখায়। কী ভয়ানক অবিচার। নিজের সাথে কি নিদারুন প্রতারণা।
লেখকঃ লস এঞ্জেলস, ইউএসএ থেকে, ইমেইল, mainul64@gmail.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MainulAhsan |
| |
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|
"নিজ হাতে জ্বালায় আর নিভায় যে শিখা তাকে বলে 'অণির্বাণ', 'চিরন্তন'। কী ভয়ানক মূর্খতা। এহেন আগুনের শিখাতেই যখন পেশ করা হয় 'পুষ্পার্ঘ্য'। তাকে সাক্ষী রেখে যখন নেয়া হয় 'বজ্রকঠিন' শপথ। তখন তাকে কি বলা যায়? বহুমাত্রিক মূর্খতা নাকি জ্ঞানের দুর্ভিক্ষ?"
আমি মনে করি এর উত্তর হচ্ছে: বিশ্বাসের কাছে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরাজয়।
অবশ্য, বিশ্বাস মানব সমাজের একটা সার্বজনীন বিষয়। আমি শুধু অনুরোধ করি: বিশ্বাস যেন হয় যুক্তি ও বিবেকের ভিত্তির উপর।
শুনেছিলাম, শিখা অনির্বানে এক সেনা কর্মকর্তা তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সংগতিপূর্ণ নয় বলে অভিবাদন করতে অস্বীকার পর চাকুরী থেকে অব্যাহতি নিয়েছিলেন।
শুধু আগুন কেন? আমি মনে করি,
জাতীয় পতাকা,
সৃতি সৌধ,
শহীদ মিনার,
কাবা শরীফের কাল পাথর,
এবং এই ধরনের আরো নির্জীব (এবং সজীব) বস্তু ও এই পর্যায়ে পড়ে।