মিটিংএ চা আসতে দেরী হচ্ছিল। সরকারী অফিসে কনসালট্যান্টদের একঘেয়ে মিটিং। তারা একটানা কথা বলে যায়। পেঁচানো কথা। কয়েক লাইন শোনার পর আর খেই থাকে না। তাছাড়া শোনার আগ্রহও কারো থাকে না তেমন। আমার ঘুম চলে আসছিল।
ঘুম তাড়ানোর জন্য কনফারেন্স টেবিলের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে আনি। সালাম স্যার খাতায় গভীর মনোযোগ দিয়ে আকিবুকি করছেন। শারমিন নিজের হাতের নখ গুলো এতো মনোযোগের সাথে দেখছে যে মনে হবে সে হয়তো নখ নিয়ে গবেষণা করছে।
আমার পাশে একজন বিদেশী বসেছে। সে গভীর মনোযোগ দিয়ে মিটিং এর নোট নিচ্ছে। তার কলমটাতে চোখ আটকে গেলো। লাল রঙের কলম। বেশ মোটাসোটা। ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখি ফাউন্টেন পেন। বললাম,
- বেশ সুন্দর পেন তো, এখন ফাউন্টেন পেন তেমন আর দেখা যায় না।
বিদেশী হেসে জবাব দিলেন,
- আমি পুরোনো দিনের মানুষ, পুরোনো কলমে লিখি।
মিটিং শেষে কলমটা চেয়ে নিয়ে লিখে দেখলাম। কি মসৃণ লেখা। লোকটা বিদেশী না হয়ে বন্ধু-বান্ধব কেউ হলে পেনটা হয়তো নিয়েই নিতাম।
বিদেশীর লাল কলমটা দেখে ফাউন্টেন পেন কেনার জন্য মন আনচান করতে থাকলো। অফিস থেকে ফেরার পথে গেলাম নিউ মার্কেটে। সেখানে পেনের কয়েকটা ভালো দোকান রয়েছে। শেলফে অনেক পেন রয়েছে এরকম একটা দোকানে ঢুকলাম।
তাদের ফাউন্টেন আছে। বিক্রেতা ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, 'নরমালগুলো দেখাবো না একটু দামী দেখবেন?'
শখের কলম, ভাবলাম একটু দামীই দেখি। ভদ্রলোক একটা শেফার্ড কলম বের করলেন। বেশ মোটা, সিলভার কালারের খাপ আর শেওলা রঙের বডি। দেখে খুব পছন্দ হয়ে গেলো। ছোটবেলায়, যখন ক্লাস টেনে পড়ি, তখন বাবা এই রকম একটা কলম কিনে দিয়েছিলেন। সেই কলম দিয়েই এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। সেই পেনটা দিয়ে লিখেছি কয়েক বছর। তারপর তো বলপেনের যুগ চলে আসলো।
কিন্তু দাম শুনে চমকে উঠলাম। পাঁচ হাজার টাকা। করি সরকারী চাকুরী। পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে পেন কিনলে অর্ধেকটা মাস বউ, ছেলেমেয়ে নিয়ে উপোষ করে থাকতে হবে।
প্রথমেই দামী কলম দেখতে চেয়েছি, দোকানীকে কমদামী কলম দেখাতে বলতে পারলাম না এইভয়ে যে সে আমার পকেটের অবস্থা বুঝে ফেলে এমন একটা চাহনীতে তাকাবে যে মনে হবে মাটির সাথে মিশে যাই।
'একটু দেখি' বলে পিছনে আর না তাকিয়ে হনহন করে দোকান থেকে বেরিয়ে গেলাম। অন্য দোকানে খুঁজে আর লাভ হবে না ভেবে চলে এলাম নিউ মার্কেট থেকে।
বাসায় পৌঁছে দেখি রিনা, আমার স্ত্রী, বিছানায় বসে ছেলে-মেয়েকে পড়াচ্ছে। ঘরে ঢোকার আগেই মনে মনে ঠিক করে নিলাম বাসায় ফিরতে দেরী হবার কি কৈফিয়ত দিবো। আমি কলম কিনতে যাবার অভিজ্ঞতার কথা বললাম যতদূর সম্ভব রসিয়ে রসিয়ে। কিন্তু, বলে ফেলে আবার একটু ভয়ও পেয়ে গেলাম। এখনই গরীবের ঘোড়া রোগ জাতীয় কোন টিপ্পনী শুনতে হবে।
তবে রিনা কোন টিপ্পনী কাটলো না। বেশ নরম সুরেই বললো,
- তোমার পাঁচ হাজার টাকা আমি বাচিয়ে দিতে পারি।
- কিভাবে?
- তোমার ছোটবেলার পেনটাই তোমাকে এনে দিচ্ছি।
রিনার কথা শুনে আমি লাফিয়ে উঠলাম। মোটা সবুজ রঙের পেনটা মনে হলো তিন আঙ্গুলের মধ্যে চলে এসেছে।
আমাকে অবাক করে দিয়ে বাচ্চাদের পড়া রেখেই সে পেনটা বের করতে গেলো। কিন্তু বেশ খোঁজাখুঁজির পরও সেটি পাওয়া গেলো না।
তখন আমার ছেলে বললো,
- আম্মু, তুমি বোধহয় পেনটা বাথরুমের ফলস ছাদের উপরে রেখেছো।
কথাটা শুনে আমার মেজাজ গেলো খারাপ হয়ে। রিনার একটা বদ অভ্যাস হচ্ছে, আমার কাজে লাগতে পারে (উল্টোভাবে বলা যায় তার মতে অদরকারী) এ ধরণের সবকিছুই সে বস্তাবন্দী করে স্টোরে ফেলে রাখবে। ছোটবেলা থেকে আমি ডাইরী লেখার হাউশ ছিল। সবগুলো ডাইরী সে বস্তাবন্দী করে ফেলে রেখেছে স্টোরে। বিভূতিভূষণ, টলস্টয়, নাগিব মাহফুজ এবং আরো কয়েকজন প্রিয় লেখকের বাছাই করা কিছু বই যোগাড় করেছিলাম। যখন কিছুই ভালো লাগে না, তখন সেগুলো পড়তাম। একদিন দেখি সেগুলো উধাও। রিনাকে বলতে সে বললো, 'বাইরে থাকলে তেলাপোকা হয়, স্টোরে রেখে দিয়েছি। যখন পড়বে তখন বের করে নিও।'
এ ধরণের কথা শুনলে কার মেজাজ ঠিক থাকে? উচু টুলের উপর উঠে বাথরুমের উপরকার প্রকোষ্টে ঢুকে বস্তার পর বস্তা বের করে নীচে নামিয়ে খুজে খুজে পছন্দের বইটা বের করার পর কি কারো নাগীব মাহফুজের মিরামার পড়ার আগ্রহ অবশিষ্ট থাকবে।
তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে বইতে তেলাপোকা হলেও তা বস্তাবন্দী করে রাখার জিনিস নয়। কিন্তু সে খুব একরোখা আর জেদী টাইপের মেয়ে। যেটা বুঝবে সেটাই চূড়ান্ত। তার সাথে যুক্তি তর্কে যাওয়া মানে এই মাঝ বয়সে ছাড়াছাড়ির ঝুকি।
মেজাজ খারাপ হয়ে গেলেও কিছু বললাম না। ছেলে-মেয়েদের পরীক্ষা সামনে। এর মধ্যে মা রাগ করে নানার কাছে চলে গেলে তাদের পরীক্ষা খারাপের দোষটা আমার ঘাড়েই পড়বে।
আমি কিছু না বলে জামা-কাপড় ছেড়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে টিভি দেখতে বসলাম। ছেলে-মেয়ে পড়ছে, মিউট করে দেখতে হবে। সেও আরেক যন্ত্রণা।
২.
দিন যত যায়, ফাউন্টেন পেনে লেখার জন্য আমার মন ততো উতলা হতে থাকে। বল পেনে লিখতে গেলেই বিরক্তি লাগে। লিখি কমদামী পেনে, কখনো দাগ পড়ে কখনো পড়ে না। কয়েকবার রিনাকে বলেছে, ফলস ছাদ থেকে শেফার্ড পেনটা খুজে বের করে দিতে। কিন্তু কথাটা তুললেই সে খেকিয়ে ওঠে, তোমার তো সখের শেষ নেই। গরীবের যত ঘোড়া রোগ।
গোলমাল এড়াতে বিষয়টা আর তুলিনি। ভয়ে নিজেও পেনটা খোঁজার চেষ্টা করিনি। তবে সুযোগ খুজতে থাকলাম, রিনা কোথাও গেলেই একটা চেষ্টা করবো।
কয়েকদিন পর সুযোগ পাওয়া গেলো। রিনা বাচ্চাদের নিয়ে তার ভায়ের বাসায় গেলো। ভদ্রলোকের বাসায় যেতে আমি পছন্দ করি না। দেখা হলেই তিনি সব পরিচিত সফল মানুষদের গল্প করেন - কে শেয়ার মার্কেটে চার লাখ টাকা খাটিয়ে এখন চল্লিশ লাখ টাকা বানিয়েছে, তার কোন আত্মীয় একটা ভালো পোস্টিং বাগিয়ে তিন বছরে ঢাকায় ফ্লাট কিনেছে - এসব গল্প। ঢাকায় এখন গাড়ী বাড়ছে, বাড়ী বাড়ছে, শেয়ার বাজার বাড়ছে আর আমার বড় কুটুমের গল্পও বাড়ছে। রিনা জানে যে আমার মত অকর্মণ্য লোকেরা এসব সফল মানুষদের কথা শুনতে চায় না, তাই আমাকে সে তার ভায়ের বাসায় নিয়ে যাবার জন্য জোরাজুরি করে না।
খালি বাসা পেয়ে আমি প্রথমে বেডরুমের এটাস্টড বাথাটার উপরে যে স্টোর, তাতে উঠলাম। ছোট দরজার মুখে দুটো ছোট বস্তা, টিপে দেখে মনে হলো লেপ আছে তাতে। সেগুলো সরিয়ে পেলাম
আরেকটা ছোট আকারের বস্তা, বাইরে থেকে মনে হলো তাতে বাচ্চাদের বাদ দেয়া খেলনা, সাথে কিছু বইপত্র থাকতে পারে। বস্তাটি ততো ভারী নয়। সহজেই নীচে নামিয়ে আনা গেলো।
যা ভেবেছিল তাই। ভাঙ্গা-চোরো বাদ দেয়া খেলনা, লেগো, আমার কয়েকটা পছন্দের গানের সিডি। ছেলের কথা সত্যি হলে এর মধ্যেই পেনটা থাকতে পারে।
একেক করে বের করার পর বস্তার একেবারে নীচের দিকে পাওয়া গেলো পুরানো একটা ডায়েরী। ডায়েরীর উপর ধুলোর পুরু প্রলেপ জমে আছে। আমার মারাত্মক রকমের ডাস্ট এলার্জি রয়েছে। একবার ধুলো খেলে হাছি, কাশি, সর্দি, জ্বর মিলে এক মাসের ধাক্কা।
আমি ডাইরীটা হাতে নিয়ে একটা একটা পুরানো ন্যাকড়া খুজতে গেলাম। ধুলো মুছতে গিয়ে কি একটা মেঝেতে পড়লো। ভাজ করা অনেকগুলো রঙিন কাগজ। দেখেই বুঝলাম শিউলীর চিঠি। সর্বনাশ রিনা কি এই চিঠি দেখেছে?
৩.
মেঝেতে বসে আমি চিঠিগুলো পড়া শুরু করলাম। সুন্দর মেয়েলি হাতের লেখা। আমাদের প্রত্যেকদিন দেখা হতো। কিন্তু, তারপরও শিউলী চিঠি লিখতো, আমিও লিখতাম। চিঠির বিষয়গুলো ছিল অদ্ভুত। আমরা দুজনেই প্রকৃতির কথা লিখতাম। যেমন, কাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। সকালে ঝলমলে রোদ। .. তারপর রোদের কথা বৃষ্টির কথা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা দুজনেই একই শহরে থাকতাম।
ইন্টারমিডিয়েটের পর পড়াশোনা করতে দেশের বাইরে চলে গেলেও শিউলীর সাথে বছর খানেক চিঠি-পত্রে যোগাযোগ ছিল। তারপর হঠাৎ তার খোঁজ নেই। চিঠি লিখি, কোন উত্তর পাই না। মাস খানেক পর বাবা লিখলেন, তার বিয়ে হয়ে গেছে, তাকে যেন আর চিঠি না লিখি।
দেশে ফিরে তার সাথে আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করিনি। কখনো খুব অভিমান হয়েছে, কখনো মনে হতো, কি দরকার বেচারার সংসারে অশান্তি করার। তাছাড়া সে হয়তো আমাকে বন্ধু হিসাবে নিয়েছে। চিঠিতে আমরা কখনো তো রোদ-বৃষ্টি, গাছ-পালা, চাঁদের আলো - এসবের বাইরে কেউ কিছু লিখিনি।
শিউলীর খালাতো ভাই মনোয়ার আমাদের ক্লাসমেট। তার কাছে শিউলীর বিষয়ে খোঁজ খবর পাই। মনোয়ারই দেয়, নিজের উদ্যোগে। শিউলী ঢাকাতেই থাকে। তার স্বামী ব্যবসা করে, বেশ ভালো অবস্থা। মনোয়ার আমাকে তার মোবাইল নম্বরও দিয়েছে। অনেকবার মনে হয়েছে, ফোন করি। কিন্তু, আমার মত ভীতু লোকেরা করবো কি করবো না ভাবতে ভাবতেই জীবন কাটিয়ে দেয়।
কিন্ত এই বিশ বছর যা করিনি আজ তা করে ফেললাম। তার মোবাইল নম্বরটি সেভ করে রেখেছিলাম অন্য নামে, যাতে রিনা ফোন চেক করলেও বুঝতে না পারে। আজ শিউলীকে ফোন না করে পারলাম না। ভয়ে ভয়ে ফোন করলাম, ওপাশে কে ধরে কে জানে।
রিং বাজলো। প্রায় সাথে সাথে ওপাশে কল রিসিফ করা হলো। কিন্তু, কোন কথা নেই।
আমিই নীচু গলায় বললাম,
- হ্যালো।
কোন উত্তর নেই। কেটে দিবো কিনা ভাবছি। তখন ওপার থেকে কথা শোনা গেলো,
- বলো।
শিউলীর গলা। ভেজা ভেজা লাগছে। সে কি একটু কেঁদে নিয়েছে কথা বলার আগে?
৪.
শিউলীর সাথে প্রতিদিন আমার দেখা হতে থাকলো। সরকারী চাকুরী করি। ভীতু মানুষ, ধরাধরি করে লোভনীয় পোস্টিং নিতে পারি না। তার সুবিধা হলো, এমন পোস্টিং দেয়া হয়, যেখানে কোন কাজ নেই। অফিসে একবার হাজিরা দিলেই চলে। অফিস ফাঁকি দিতে আমার কোন সমস্যা নেই। আমি উড়ে উড়ে চলতে লাগলাম।
রিনা খুব বুদ্ধিমতি মেয়ে। আমি সারাদিনে কোন মেয়ের সাথে কথা বললে সে নাকি ধরে ফেলতে পারে। আমার মানসিক পরিবর্তন যেন সে বুঝতে না পারে সে জন্য খুব সচেষ্ট থাকি। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সে কিছুই বুঝতে পারলো না বা বুঝলেও কিছু বললো না।
৫.
এর মধ্যে শিউলী হঠাৎ করে তার বাবার কাছে বেড়াতে গেলো কয়েকদিনের জন্য। আমার বাড়ীও একই শহরে। আমাকে বলেছিল যেতে। আমি সাহস পাই নি। ছোট শহর, সহজে সব কিছু জানাজানি হয়ে যায়।
সে চলে যাওয়াতে আমার দিন কাটে না। অফিসে এমনিতেই কাজ থাকে না। আগে বসে বসে ব্লগিং করতাম। এখন তাও ভালো লাগে না।
এর মধ্যে বাবা এলেন বাড়ী থেকে। রিনার সাথে তার শ্বশুরের খুব খাতির। সারাক্ষণ সে শ্বশুরের কাছাকাছি থাকে। তাতে আমার সুবিধাই হয়। আমার সম্পর্কে বাবার ধারণা অন্য সকলের মত। তিনিও আমাকে পেলেই সফল মানুষদের গল্প শোনান। আমি দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি।
আমরা একসাথে বসে টিভি দেখছিলাম। রিনা বাবার সাথে বসে বক বক করছে। আমি যথারীতি এক মনে টিভির দিকে চেয়ে রয়েছি। বাবা বললেন,
- আমার জন্য কি রান্না করছো মা?
রিনা লাফ দিয়ে উঠলো। একদম ভুলে গেছি বাবা। চিংড়ির একটা নতুন মেনু শিখেছি। সেটা করবো। যাই ...
বাবার কথা শুনে আমার মনে কিছুটা সন্দেহ হলো। তিনি কি রিনাকে সরিয়ে দিলেন কিছু বলার জন্য?
সত্যিই তাই। বাবা আমার পাশে সরে এসে নীচু গলায় বললেন,
- শিউলী মাগুরা এসেছে।
আমি চুপ করে থাকলাম। বুঝাতে চাইলাম, শিউলী তার বাবার বাড়িতে যাবে, তাতে আমার কি।
বাবা আবার বললেন,
- সে ঢাকা থেকে যাওয়ার পর প্রত্যেকদিন আমাদের বাসায় গেছে। তোমার মায়ের কাছে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে।
আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না।
বাবা বললেন,
- দ্যাখো, দুটো ফ্যামিলি ধ্বংস করো না।
রিনা কি একটা বললে রান্নাঘর থেকে চলে আসলো।
রান্নাবান্নার ব্যাপারে রিনা সচরাচর যত্নবান না হলেও যাদেরকে সে পছন্দ করে তাদের জন্য মন দিয়ে রান্না করে। তার পছন্দের তালিকায় বাবা বেশ ভালো অবস্থানেই রয়েছেন। তাই সে অনেক পদের রান্না করেছে।
অন্য সময় হলে এরকম লোভনীয় খাবার আমি হাপুস হুপুস করে খেয়ে ফেলতাম। আজ খেতে পারলাম না। খাবার টেবিলে আমার একপাশে পাশে বসে ছেলে, অন্য পাশে মেয়ে। তাদের দিকে তাকিয়ে আমার পায়ের নীচে মাটি সরে গেলো। কয়েকদিন পরেই ছেলে-মেয়ে দুটো দূরে চলে যাবে। রিনা যে জেদী মেয়ে শিউলীর বিষয়টা আরেকটু এগোলে সে ছেলে-মেয়ে নিয়ে সোজা বাপের বাড়ী চলে যাবে আর তাদের সাথে যোগাযোগের সব পথ বন্ধ করে দেবে। রিনার কাছে আমি অপদার্থ, অকর্মণ্য হলেও ছেলে-মেয়ে আমাকে জীবন দিয়ে ভালোবাসে। রিনা আমাকে বেশী বকা-ঝকা করলে মেয়েটাতো কেঁদে ফেলে।
রাতে আমার ঘুম আসলো না। এপাশ-ওপাশ করার উপায় নেই। আমার জন্য রিনার ঘুম ভেঙ্গে গেলে রক্ষে থাকবে না।
৬.
পরদিন অফিসে গেলে বস ডেকে পাঠালেন, জহির সাহেব, আজ কনসালটেন্টদের সাথে মিটিং আছে, আপনি মিনিটস নিবেন।
মিটিং শুরু হলে খাতা বের করে লিখতে গিয়ে দেখি দাগ পড়ে না। অন্য সময় হলে মেজাজটা বিগড়ে যেতো। শেফার্ড ফাইন্টেন পেনটা কেনার পরিকল্পনা করতাম। আজ বরং হাসি পেলো। মনে মনে বললাম, গরীবের আবার ঘোড়া রোগ। তারপর কমদামী বলপেনটা দিয়ে লেখার চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। এক সময় সত্যি সত্যি কালি বের হলো, মিটিং এর মিনিটসটাও নিলাম শেষ পর্যন্ত।
|