|
ত্রিকোণমিতি চর্চ্চার প্রাথমিক বিকাশ এবং একটি মজার ভুল
কে এম রব্বানী |
|
মানব সমাজে গণিত চর্চা কবে শুরু হয়েছিল তার কোন সুনির্দিষ্ট বিবরণ জানা যায় নি, হয়তো জানা সম্ভব হবে না। মানুষ যেদিন ভাবতে শিখেছে সেদিন থেকেই জীবিকার জন্য এবং শিকারের প্রয়োজনে পরিমাণ, দূরত্ব, গতি ইত্যাদি গাণিতিক ধারণা সম্পর্কে ভাবতে হয়েছে। বলা যায়, গণিত চর্চার ইতিহাস মানুষের ইতিহাসের সমান পুরনো। মানুষের সহজাত কৌতুহল আর অনুসন্ধিৎসা থেকে পর্যবেক্ষণের জন্য কিছু যন্ত্রপাতির ব্যবহার হয়েছে সভ্যতার আদিকালে। এগুলো এতটাই সরল গড়নের ছিল যে, এগুলোকে যন্ত্র না বলে বরং হাতিয়ার (Tools, Instruments) বলাই ভাল। এরকম একটি হাতিয়ারের নাম Gonomon (চিত্র ১). এই Gonomon -ই এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে প্রাচীন বৈজ্ঞানিক যন্ত্র। L আকারের এই হাতিয়ারটি ছায়ার দৈর্ঘ্য নির্ণয় করে সূর্যের অবস্থান এবং সম্ভবত সময় নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত হত। সে অন্তত ৫০০০ বছর আগের কথা। ভাবতে অবাক লাগে, এই যন্ত্রটি আজ ব্যবহৃত হচ্ছে, যদি ব্যবহারের ক্ষেত্র পাল্টেছে। বর্তমান কালে সুতার দর্জিসহ আরো কিছু পেশার মানুষ এটা ব্যবহার করেন সমকোণ আঁকার জন্য (L-scale নামে পরিচিত)।

সূর্যের গতি পর্যবেক্ষণের কৌতুহল থেকে ত্রিকোণমিতি শাস্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। ত্রিকোণমিতি নামে না হলেও ত্রিকোণমিতির ‘হাটি হাটি পা পা’ যাত্রা এখান থেকেই শুরু। কার হাত ধরে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল তা জানা যায় নি। এখন পর্যন্ত যার নাম জানা যায় তিনি হলেন আহমিজ (Ahmes)। ধারণা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব অষ্টাদশ শতকে মিশরে তার জন্ম। তিনি ৮৪ টি গাণিতিক সমস্যা প্যাপিরাস গাছের বাকলে লিপিবদ্ধ করেন। সংকলনটি ‘আহমিজ প্যাপিরাস’ নামে পরিচিত। স্কটিশ আইনজীবি হেনরি রিন্ড (১৮৩৩ - ১৮৬৩) মিশর ভ্রমনের সময় ১৮৫৮ সাল এটি স্বল্প মূল্যে সংগ্রহ করেন। তার নাম অনুসারে একে ‘রিন্ড প্যাপিরাস’ বলা হয়।

আহমিজ প্যাপিরাসে কোণ সম্পর্কিত সমস্যা আলোচনা করায় কেউ কেউ এটিকে Proto-Trigonometry বলে অভিহিত করেছেন।
মিশর, ব্যাবিলন (ইরাক), ভারত, গ্রীস, চীনসহ সকল প্রাচীন নগরীতে আলাদাভাবেই গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তন এবং অবস্থান বিষয়ক জ্ঞানচর্চা হত। প্রায় সকল ক্ষেত্রে এই জ্ঞানচর্চার গতি প্রায় সমমূখী এবং সমান্তরাল ছিল।
মিশরীয়রা খ্রিস্টপূর্ব ২৩০০ সালের পূর্বেই একটি বৃত্তকে কেন্দ্র বরাবর দাগ টেনে ৩৬০০ কোণকে ৩৬ টি সমান ভাগে ভাগ করেছিলেন। প্রতি ভাগে ১০০। ২৪ ঘন্টায় সূর্যের আবর্তন ধরলে এক ঘর কৌণিক দূরত্ব পার হতে সময় লাগত ৪০ মিনিট (১০ অতিক্রম করতে সূর্যের ৪ মিনিট সময় লাগে)। অর্থাৎ মিশরীয়দের একটি পিরিয়ড ছিল বর্তমানের ৪০ মিনিট। ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত তারা এভাবে সময়ের হিসাব করতেন। এর পরে তারা ৩৬০০ কোণকে ২৪ ভাগে ভাগ করেন। প্রতি ভাগে ১৫০। তখন একটি পিরিয়ড হয় বর্তমানের ৬০ মিনিট অর্থাৎ ১ ঘন্টা (চিত্র ২)।

অপরদিকে, ব্যাবিলন, ভারত এবং চীনে প্রায় একই সময়কালে বৃত্তকে ৩০০ করে ১২ ভাগে ভাগ করা হত। সেক্ষেত্রে, একটি পিরিয়ড হত ২ ঘন্টায়। এরকম হিসাব থেকে দিন, মাস, ঋতু, বছরের হিসাব করা হত। ভারতে সময় গণনার জন্য ‘প্রহর’ নামক একক ব্যবহার করা হত। এখনো গ্রামের প্রবীন লোকের মুখে প্রহরের হিসাব শোনা যায়, তারা ঘন্টার হিসাবে সাচ্ছন্দ বোধ করেন না। এক দিনে ৮ প্রহর (অষ্ট প্রহর) এবং এক প্রহরে ৩ ঘন্টা। এ থেকে ধারণা করা যায়, ভারতীয়রা বৃত্তকে আট ভাগ করে হিসাব করতেন। সে ক্ষেত্রে, প্রতি ঘরে ৪৫০ অথবা ১৫০ মাপের ৩ ঘরকে একত্র করে হিসাব করতেন। এছাড়া, ফারা আমলে মিশরে পিরামিড নির্মাণ এবং বৈদিক যুগে ভারতে সুনির্দিষ্ট পরিমাপের পূজার বেদী নির্মাণের জন্য পন্ডিতেরা ত্রিকোণমিতির জ্ঞান ব্যবহার করেছেন।
এভাবে প্রতিটি সভ্যতার কেন্দ্রে আলাদাভাবে ত্রিকোণমিতি চর্চা চলতে থাকে আর অনুসন্ধিৎসু মানুষের কৌতুহল সূর্য, চন্দ্র ছেড়ে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে, দৃশ্যমান নক্ষত্রমন্ডলে সঞ্চারিত হতে থাকে। গ্রহ-নক্ষত্রের শুধু আবর্তন কাল নয়, শুধু কৌণিক দূরত্ব নয়, আবর্তনের পথ পরিমাপের চেষ্টা চলেছে। ফলে নির্দিষ্ট ব্যসার্ধের বৃত্তের কেন্দ্রস্থ কোণের পরিবর্তনের সাথে সাথে জ্যা এর পরিবর্তিত মান লিপিবদ্ধ করে সারণী তৈরী করা হত। প্রায় ২০০০ বছর ধরে এরকম ত্রিকোণমিতিক সারণী তৈরির কাজ চলেছে। কোণের সাথে জ্যা’র সম্পর্ক কবে প্রথম সারণীবদ্ধ হয় তা সুনির্দিষ্ট করে জানা যায়নি। তবে, নিশ্চিতভাবে বলা যায় ২০০০ বছর ধরে এরকম সারণী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পন্ডিতের হাতে সংশোধিত ও পরিমার্জিত হয়েছে। এরকম লিপিবদ্ধ সর্বপ্রথম যে ত্রিকোণমিতিক সারণীর কথা জানা যায় সেটি লিপিবদ্ধ করেন হাইপারকাস (Hipparchus of Nicaea-তুরস্ক) (১৮০-১২৫ খ্রি: পূ:) । একারণে তিনি ‘ত্রিকোণমিতির জনক’ আখ্যা পেয়েছেন। তিনি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কোণের জন্য জ্যা এবং বৃত্তচাপের পরিমাপ নির্ণয় করে সারণীবদ্ধ করেন। এর আগে অন্তত ২০০০ বছর কোণের সাপেক্ষে জ্যা-এর সারণী তৈরীর কাজ হলে হাইপারকাস সর্বপ্রথম কোণকে বৃত্তের সাথে সম্পর্কিত করে এর জ্যা (Chord) এবং সংশ্লিষ্ট বৃত্তচাপ (Arc) এর পরিমাপ লিপিবদ্ধ করেন। এখান থেকে ত্রিকোণমিতি চর্চ্চা নতুন মোড় নেয়। ততদিনে বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে পারস্পারিক যোগাযোগ এবং জ্ঞানের সেতুবন্ধন রচিত হয়েছে।
এরপর ত্রিকোনমিতি চর্চায় সবচেয়ে বড় কাজটি করেন ক্লউডিয়াস টলেমি (৯০-১৬৮ খ্রিঃ) (Claudius Ptolemy) । তিনি প্রথাগত পদ্ধতির বদলে নিয়মমাফিক (systematic method) পদ্ধতি ব্যবহার করেন ফলে সূত্র প্রয়োগের পথ উম্মোচিত হয়। তার প্রধান কাজের সংকলন আলমাগেস্ট (Almagest) পরবর্তিতে ‘জ্যোতির্বিজ্ঞানের বাইবেল’ নামে পরিচিতি লাভ করে। টলেমি জ্যা পরিমাপের জন্য সম্পূর্ণ কেন্দ্রস্থ কোণ এবং সমগ্র জ্যা ব্যবহার করে হিসাব করেন। টলেমির পরে ত্রিকোণমিতি চর্চায় যুগান্তকারি পরিবর্তন আনেন ভারতের আর্যভট্ট (৪৭৬-৫৫০ খ্রি:)। তিনিই ত্রিকোণমিতির আধুনিক চর্চার সূচনা করেন। টলেমির যেখানে পূর্ণ জ্যা ব্যবহার করেছেন সেখানে আর্যভট্ট অর্ধ-জ্যা ব্যবহার করেন। কেন্দ্র্রস্থ কোণের সমদ্বিখন্ডক রেখা জ্যা-কে সমদ্বিখন্ডিত করে এই সত্যের উপর ভিত্তি করে তিনি প্রথমে অর্ধ-জ্যা এর দৈর্ঘ্য নির্ণয় করে পূর্ণ জ্যা এর দৈর্ঘ্য নির্ণয় করেন।

পার্শের চিত্রটি (চিত্র: ৩) তীর নিক্ষেপের পূর্ব মূহুর্তের ধনুকের সাথে তুলনীয়। এখানে A কেন্দ্র বিশিষ্ট বৃত্তের উপরস্থ দু’টি বিন্দু B এবং E। BE এর মধ্যবিন্দু C কে কেন্দ্র A এর সাথে সংযোগ করায় A কোণ সমদ্বিখন্ডিত হয়েছে এবং একটি সমকোণী ত্রিভুজ BAC সৃষ্টি হয়েছে। ধনুকের সাথে তুলনা করলে BDE একটি ধনুক এবং এর ছিলা (সংস্কৃত ভাষায় জ্যা, ধনুর্গুণ) BE। আর্যভট্ট জ্যা শব্দটি ধনুকের ‘জ্যা’ হতে নির্বাচন করেছেন। তিনি হিসাবের জন্য সম্পূর্ণ জ্যা এর পরিবর্তে জ্যা-এর অর্ধেক দৈর্ঘ্য BC গ্রহণ করেন এবং কোণ অর্ধেক নেন (কোণ BAC)। তিনি সংস্কৃত ভাষায় লেখা তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সূর্য-সিদ্ধান্ত’-এ ‘জ্যা-অর্ধ’ (jya-Ardha) শব্দটি ব্যবহার করেন এবং সংক্ষেপে লেখেন ‘জিভা’ (jiva)। ফলে ৫ম শতক থেকেই ভারতে জ্যা পরিমাপের নতুন পদ্ধতির সূচনা হয়। বাণিজ্যের জন্য ভারতে আসা একদল আরব বণিক ফিরে যাবার সময় ‘সূর্য-সিদ্ধান্ত’ গ্রন্থের এক প্রস্থ সংগ্রহ করে নিয়ে যান। অষ্টম শতকে গ্রন্থটি আরবীতে অনুবাদের সময় অনুবাদক শব্দটির আরবী অনুবাদ না করে শুধু ج (জ্বিম) এবং ب (বা) বর্ণ দুটি দিয়ে جب (jb) লিখে রাখেন (হয়তো সংস্কৃত শব্দটি বুঝতে না পেরে!)। আরবীতে v উচ্চারণ করার মত বর্ণ না থাকায় আরবী অনুবাদক b ধ্বনি ব্যবহার করেন। গোল বাধে এখানেই। পার্সিয়ান মুসলিম পন্ডিত মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খারিজমী (৭৮০-৮৫০ খ্রি:) ‘এ্যালজেবরার বাইবেল’ নামে খ্যাত তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাব আল জাবর য়াল মোকাবিলা’য় جب ব্যবহার করেন। দ্বাদশ শতকে রবার্ট অভ চেষ্টার (Robert of Chester) ১১৫০ সালের দিকে আল খারিজমী’র ‘কিতাব আল জাবর য়াল মোকাবিলা’ আরবী থেকে লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেন। তিনি جب শব্দটিকে আরবী ভাষার শব্দ বলে ভুল করেন। আরবী শব্দভান্ডারে শব্দটি খুঁজে না পেয়ে তিনি ভাবেন বোধ হয় লেখার কোন ভুল হয়ে থাকবে। তাই এর কাছাকাছি jaib শব্দটি গ্রহণ করেন যার অর্থ বুক ( বক্ষ) রবার্ট আর বিলম্ব করেন নি। তিনি বুক-এর লাতিন অনুবাদ sinus গ্রহণ করেন। পরে sinus এর ইংরেজি অনুবাদ করা হয় sine যেটি সংক্ষিপ্ত করে sin লেখা হয়। পরে ভুলটি উদ্ঘাটিত হয়েছে কিন্তু তত দিনে sin বহু পথ অতিক্রম করে ফেলেছে। সংশোধনের সময় পেরিয়ে গেছে। অবশ্য এই ভুলটি পরবর্তী কালের ত্রিকোণমিতি চর্চায় কোন প্রতিবন্ধক হয়নি। আজ থেকে ৪/৫ হাজার বছর আগে মিশর, ব্যাবিলন, ভারত গণিত চর্চায় নেতৃত্ব দিয়েছে আজ তারাই গণিত চর্চায় সবচেয়ে পিছিয়ে পড়েছে! |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/KMRobbani |
| |
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
নাম : কে এম রব্বানী
জন্ম তারিখ: ০৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৭
গ্রাম- মাকড়াইল
উপজেলা - লোহাগড়া
জেলা - নড়াইল
এমএসসি: ১৯৮৯,
বিষয়: গণিত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ
সরকারি বি এল কলেজ, খুলনা |
|