|
ঘুমা, বেঞ্চের উপর ভাল করে শুয়ে ঘুমা
মোহাম্মাদ আল-আমিন |
|
মকবুল বিএসসি, তবে তিনি গনিত বাদেই বিএসসি পাশ করেছিলেন তাই তার কট্টর সমালোচক ছিলেন আমজাদ স্যার। প্রায়ই তাদের মাঝে ঝগড়া বাধত এই ডিগ্রী নিয়ে। ক্লাসে ঢুকেই আমজাদ স্যার এক বিষম ঝাড়বেন বিএসসি ডিগ্রী নিয়ে। “আরে ও সব আমরাও করতে পারতাম, গনিত ছাড়া বিএসসি! গেল গেল দেশটা গেল, আরো কত কি দেখব, ক দিন পর শুনব পরীক্ষা না দিয়েই বিএসসি পাশ”। ছোট বেলায় আমরা বুঝিনি তবে এখন ওসব মনে হলেই হাসি ধরে রাখতে পারিনা।
গ্রীষ্মের এক বিকেলে মকবুল বিএসসির অঙ্ক ক্লাস। সবার পিছনে বসেছে সুমন, ক্লাসে বরাবরই অমনযোগী, সময় পেলেই ঝিমুবে, ছন্দ ছাড়া কবিতা লিখবে, পিছন থেকে একটা চিরকুট লিখে ছেড়ে দিবে “মন খুলে মন্ত্যব্য কর” শিরোনামে, সাথে অশ্লীল একটা বাক্যাংশ তো থাকবেই। এই ভয়ে কেউ তার সাথে সহজে লাগত না। গরমের দিনে বিকেলের ক্লাসে এমনিতেই শরীরটা মেজমেজ করে, তারপর মকবুল স্যার এর ক্লাস। যার জীবনেও ঘুম ধরেনা সেও কিছুটা ঘুমিয়ে নেয় এই ক্লাসে। অংক ক্লাস চলাকালিন সময়ে আমজাদ স্যার বারান্দা দিয়ে যাচ্ছেন ওমনি তার নজরে পড়ল –মনের সুখে ঘুমুচ্ছে পিছনের বেঞ্চের এক ছাত্র। সুড়ুত করে ক্লাসে ঢুকেই বিএসসি স্যার কে লক্ষ্য করে তিনি বললেন “ক্লাসের ছাত্ররা ঘুমাচ্ছে আর আপনি কাদের অংক শিখান? নাকি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই এরা আপনার অংক শিখে?” বলেই বের হয়ে গেলেন। এই উক্তিটি মকবুল স্যারের মোটেও ভাল লাগেনি হয়ত। তিনি ভাবলেন আমার ক্লাসে এসে টিকা-টিপ্পনি! একদম সহ্য করা যায় না। রেগেমেগে বললেন “কে, কে ঘুমায়?” একথা শুনেই ভাবলাম আজ হয়েছে সুমনের রক্ষা নেই, তার পরেও শান্ত ছেলার মত সুমন দাঁড়িয়ে বলল “স্যার আমি”। “আশ্চয্য কথা, আমার ক্লাসে আমার ছাত্র ঘুমাবে-না অংক করবে সেটা আমার দেখার বিষয়, অন্য লোকের এত মাতামাতি কেন? এই সুমন, তুই ঘুমা, বেঞ্চের উপর ভাল করে শুয়ে ঘুমা। শুধু আজকে নয় তুই প্রতিদিন ঘুমাবি, ঘুম না আসলেও ঘুমাবি, দেখি কোন বাপের বেটার সাধ্য আছে কি করে। বিএসসি পাশ করে এই গেরামের ইস্কুলে চাকরি করতে আসেছি, কারো বাবার দোহায় দিয়ে আমরা চাকরি করিনা”। শেষ, সেদিনের মত অংক ক্লাস ওখানেই শেষ। ওসময় বুঝতে পারিনি মকবুল স্যারের এরকম অদ্ভুত আচরণের কথা, কেনো তিনি সুমন কে ক্লাসে ঘুমুতে বললেন। আশ্চয্যই হয়েছিলাম তখন। আজ হাসি পায় যখন বুঝি ব্যাপারটা অন্য জায়গায়। আমজাদ স্যারের সাথে শত্রুতাই সুমনের জন্য পজিটিভ হয়েছিল। দুই স্যারের মাঝে দ্বন্দ্বের কারণে আমরা অনেক সুবিধা পেতাম এভাবে।
যা হোক, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কদিন আগে ভারত সফর সেরে আসলেন। এসেই তিনি বললেন শতভাগ সফল পক্ষান্তরে বিরোধীদল সংবাদ সম্মেলনে জানান দিলেন শতভাগ ব্যর্থ। আমরা আমজনতা কিছুই বুঝলাম না, কি কারণে শতভাগ সফল আর কি কারণে শতভাগ ব্যর্থ। মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হেড়ে গলা ছেড়ে দিয়ে বললেন “কি এমন অন্যায় করেছি ভারতের সাথে চুক্তি করে? জনগণ আমাদের ভোট দিয়ে সরকার বানিয়েছে এ রকম দু-চারটে চুক্তি আমরা করতেই পারি প্রতিবেশীদের সাথে”। হ্যাঁ হক কথা, ১০০% খাঁটি গরুর দুধের মত খাঁটি কথা। আপনি তা পারেন, ১০০ বার পারেন। তবে জনগণ কিন্তু উল্টাটাও পারে সেটাও আপনার মনে রাখতে হবে। যে কোন কাজের মূল্যায়ন উনিশ-বিশ হতে পারে তবে ১৮০ ডিগ্রী ঘুরিয়ে শতভাগ সফল থেকে শতভাগ ব্যর্থ হয় কিভাবে তা আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে ধরেনা। সরকার ও বিরোধীদলের দ্বন্দ্বের কারণে তৃতীয় একটি পক্ষ যে লাভবান হচ্ছে বা হবে সেটুকু বুঝতে বুদ্ধিজীবি হওয়ার দরকার নেই। তবে এতটুকু বুঝি ভারতের সাথে এ পর্যন্ত যতগুলি চুক্তি হয়েছে তাতে বাংলাদেশের জনগণ কোন সুবিধা আদায় করতে পারেনি। এমনকি বঙ্গবন্ধু কতৃক সম্পাদিত চুক্তিকেও ভারত সম্মান জানায়নি। যে কারণেই আজ ফারাক্কার বদৌলতে পদ্মা নদী থেকে মরুভূমিতে রুপান্তরিত হয়েছে, তিনবিঘা করিডোর আজও আমাদের হয়নি, সীমান্ত এলাকায় ঠুনকো অজুহাতে বিএসএফ গুলি করে সাধারণ বাংলাদেশীদেরকে হত্যা করছে অহরহ।
হ্যাঁ, বিএনপির সাথে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে হয়ত শেখ হাসিনা মকবুল বিএসসি-র মত বলতেই পারেন একটা চুক্তি না একশতটা করব, এদেশের মধ্যদিয়ে ট্রানজিট দিব, করিডোর দিব, ভারতের পুলিশ এনে সচিবালয় পাহারা দিব, বিডিআর এর নাম মুছে বিএসএফ বানাব, দিতে দিতে শেষ করে দিব তাতে খালেদার কি?
না, খালেদার কিছুই হবেনা। তার পরিবারের লোকজন হয় ঢাকার আট্টালিকায় থাকবে না হয় লন্ডনে থাকবে। হাসিনা পরিবারের তো কথাই নেই। ৩০ বছর পর হাসিনার নাতি পুতিরা বাংলাদেশে এসে বলবে Hi hello, how are you, your country (Bangladesh) is so dirty!! কিন্তু আমরা তো আর এদেশ ছেড়ে পালাতে পারবনা। আমাদেরকে চলতে হবে পদ্মা মরুভূমির উপর দিয়েই। টিপাইমুখ বাঁধের কারণে সুরমা কুশিয়ারাতে পানি না থাকলে কি করার, বালির উপর দিয়েই হাঁটতে হবে আমাদের। তবুও আমার দেশ, সোনার দেশ বাংলাদেশ। তোমাদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে যদি এদেশ ইরাক অথবা আফগান হয়ে যায় তোমাদের কিছুই হবেনা, মরবে শুধু সাধারণ জনগণ। কষ্ট হবে তাদেরই যারা এই চুক্তির কিছুই বুঝলনা, শুধু ক্ষমতার লোভে নয় যারা এ দেশকে ভালবাসে নিজের জীবনের চাইতেও বেশী।
মোহাম্মাদ আল-আমিন
পিএইচডি গবেষক
জেজু, দক্ষিণ কোরিয়া |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MohammadAlAmin |
| |
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
পেশা নয়, নেশা থেকেই লেখা-লেখি। প্রবাহমান সময়ে যে ঘটনাই মন ছুঁয়ে যায় তাই লিখে ফেলেন গল্পাকারে খুব সহজ ভাষায়। লেখক হিসেবে জন্ম অথবা পরিচিতি না থাকলেও কিছু কিছু মানুষ লিখে যান শুধু বিবেকের তাড়নায় এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তাদেরই একজন মোহাম্মাদ আল-আমিন। তিনি বগুড়া জেলার ঐতিহাসিক মহাস্থান গড়ের অদুরে বড় সরলপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেছেন ১৯৭৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ, এর এনিমেল হাজবেন্ড্রী ফেকাল্টি থেকে ২০০১ সালে বিএসসি(এ এইচ) প্রথম শ্রেনীতে ৬ষ্ঠ এবং এনিমেল ব্রিডিং এন্ড জেনেটিক্স বিভাগ থেকে ২০০৪ সালে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। অতঃপর পেশাগত জীবনে অনুপ্রবেশ। গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রাণি-সম্পদ অধিদপ্তরাধীন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকুরি করেছেন ২০০৪-২০০৯ পর্যন্ত। বর্তমানে পিএইচডি গবেষক হিসেবে দক্ষিন কোরিয়ার জেজু ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির Applied Cell Biology laboratory তে, Cancer cell, Apoptosis এবং EAE বিষয়ে গবেষনা করছেন। এপর্যন্ত তার গবেষনালব্ধ ১৩ টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন দেশী ও আন্তজাতিক জার্নালে। গবেষনার পাশা-পাশি গান গাওয়া, ভ্রমন এবং লেখা-লেখি করাই তার সখ।
ই-মেইলঃ mohammad.alamin@gmail.com |
|