হিমালয় কন্যা নেপাল বহুবছর গৃহ যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত। মাওবাদী কমিউনিস্টরা রাজতন্ত্র বিলোপ ও তাদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছে অনেক বছর ধরেই। ২০০৬ সালে সরকারের সাথে এক চুক্তির মাধ্যমে তারা ফিরে আসে প্রকাশ্য রাজনীতিতে। মাওবাদী গেরিলাদের সাথে অনেক শিশু যোদ্ধাও ছিল। চুক্তির পর জাতিসংঘ একসকল শিশুদের পুর্নবাসনের কাজে হাত দেয়। কিন্তু শৈশবে যারা বই-খাতা ছেড়ে হাতে নিয়েছিল মানুষ মারার অস্ত্র, তারা কতটুকু স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে?
নৌ-সেনার পোষাক পরিহিত ডজন ডজন কোমল মুখ। মধ্য দুপুরের তপ্ত রোদ। দক্ষিণ নেপালের ডাডহালি ক্যাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। বাড়ি যাবে বলে বাসের অপেক্ষায় আছে। গৃহযুদ্ধের অবসানের পর তিন বছর জাতিসংঘের পূর্নবাসন কেন্দ্রে থেকেছে এই সকল শিশু। সম্প্রতি তাদের স্বেচ্ছায় নিজগৃহে সাধারণ জীবনযাপন করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। প্রত্যাবর্তন দ্রুত হলেও প্রক্রিয়াটি চলে ধীর গতিতে। গত বছর মে মাসে মাওবাদীরা নির্বাচনে জয় লাভ করে সরকার ঘোষণার পর এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ গৃহ যুদ্ধে নেপালে এ পর্যন্ত ১৬ হাজার মানুষ মৃত্যু বরণ করেছে। ২০০৬ সালে সরকারের সাথে সমঝোতা চুক্তির পর মাওবাদী বিদ্রোহীরা তাদের যুদ্ধ বন্ধ করে। এরপরই চলে আসে প্রকাশ্য রাজনীতিতে।
চলে যেতে খারাপ লাগছে
বৃহস্পতিবারের এক চমৎকার সকাল। ২’শ মাওবাদী শিশু যোদ্ধা ডাডহালি ক্যাম্প ছেড়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। শেষ বারের মত সবাই একত্র হয়েছে দুপুরের খাবার খেতে। ভাত, মুরগির মাংস আর শিম দিয়ে চলছে খাওয়া। সবাই খুব খুশি। একটু পরেই শুরু হবে তাদের বিদায় অনুষ্ঠান। অনেক দিন এক সাথে থেকে তৈরি হয়েছে গভীর বন্ধুত্ব। এ জীবনে হয়তো আর কখনো দেখা নাও হতে পারে। তাই মনটা যেন কেমন কেমন করছে অনেকের। প্রিয় বন্ধুটির সাথে শেষ কথা বলে নিচ্ছে তারা। কর্তৃপক্ষ প্রত্যেকে ১০ হাজার নেপালি রুপি দিয়েছে যাতায়াত এবং অন্যান্য খরচের জন্য। এরপর সবাই তাদের জন্য নির্ধারিত ভাড়া করা বাসে ওঠে বসল।
২০ বছরের তরুণী পুনিতা শাহ। চার বছর আগে স্কুল ছেড়ে যোগ দিয়েছিল মাওবাদীদের সাথে। সে জানালো তার কথা। কৈশরে পা রাখার সময় সে যোগ দেয়া মাওবাদী গ্র“পে। আস্তে আস্তে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু হয়। ভোর ৪ টায় ঘুম থেকে ওঠে নির্ধারিত শারীরিক ব্যায়াম করতে হতো। এরপর শুরু হলো অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ। তারপর এক সময় দস্তুর মত যোদ্ধা বনে যায় নিজেদের অধিকার আদায়ের স্বপ্ন নিয়ে। পুনিতা বলে, পরিবারের কাছে ফিরে আমি একটি ফার্মে কাজ করা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেখানে ফিরে যেতে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। আবার একই সাথে এখানকার বন্ধুদের কথা মনে করে খারাপ লাগছে। তাদের ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। তারপরো বাড়ি ফিরে যেতে চাই। বাড়ি গিয়ে বাবা-মাকে কাজে সাহায্য করবো। একই সাথে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা আছে। নিজেকে এখন বিশেষ দলের যোদ্ধা মনে না করে বরং সাধারণ মানুষ ভাবতেই আমার বেশি ভালো লাগছে।
জাতিসংঘ বলছে এ পর্যন্ত এক হাজার শিশু যোদ্ধাকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। তাদের ওপর কঠোর নজর রাখা হবে। তারা পুনরায় সামরিক কিংবা আধাসামরিক বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে কিনা তা দেখা হবে। ইতোমধ্যে যাদের ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে তাদের অনেকে মাওবাদীদের রাজনৈতিক শাখায় যোগ দেয়ার কথা বলছে। তাদের নিয়ে চিন্তিত জাতিসংঘের কর্মীরা।
আন্দোলন শেষ হয়নি
মাওবাদীরা এসকল শিশুদের বেশির ভাগকেই গ্রাম থেকে জোর করে ধরে নিয়ে যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য করে। অনেকে স্বেচ্ছায়ও যোগ দেয়। তখন এদের বেশির ভাগের বয়স ছিল ১২ থেকে ১৩ বছর। স্বেচ্ছায় মাওবাদীদের সাথে যোগ দেয়া ২২ বছরের যুবক দেব দাস বলছে, তাদের আন্দোলন শেষ হয়ে যায়নি। সে বাড়ি ফিরে গিয়ে একটি ভালো কাজ জোগাড় করবে। তারপর স্থানীয় মাওবাদীদের সাথে যোগ দিয়ে রাজনীতি শুরু করবে। যুদ্ধের সময় সে কমান্ডারদের জন্য খাবার এবং পানি সরবরাহ করতো। তার অনেক বন্ধুকে সে যুদ্ধের সময় মৃত্যু বরণ করতে দেখেছে। দেব বলল, আমি আমার জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলাম। এক হাতে ছিল আমার স্বাধীনতা অন্য হাতে ছিল আমার জীবন। প্রথটির জন্য দ্বিতীয়টি ত্যাগ করতে মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিলাম আমি।
আশা করা হয়েছিল যারা শিবির ত্যাগ করে যাচ্ছে তাদের বেশির ভাগই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। জাতিসংঘ বলছে এদের অনেকেই আবার মাওবাদী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ছে। ২০০৭ সালের আগে যে সকল শিশুকে বাড়ি ফেরার অনুমতি দেয়া হয়েছিল তাদের অনেকেই পুনরায় রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছে। এজন্য অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলোও দায়ি। জাতিসংঘের সাথে চুক্তি অনুযায়ী তারা বলেছিস কোন শিশুকে তাদের দলে ভিড়াবে না। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তারা কথা রাখছে না।
নেপালের জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি রবার্ট পাইপার বললেন, আমরা আশা করি যে সকল শিশুরা ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাচ্ছে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে। তাদের এ ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন করে শান্তির পথ উন্মোচিত হবে বলে আমার বিশ্বাস। এই সকল শিশুরা নিজেদের জীবনকে একটি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসবে। তারা পছন্দমত নিজেদের পেশা বেছে নিবে। এজন্য দরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা। তারা যেন কোন ভাবেই এদের স্বাধীনতায় হাত না দেয়।
উল্লেখ্য ২০০৬ সালের শান্তি চুক্তির পর মাওবাদীদের ২৪ হাজার যোদ্ধাকে ২৮টি ক্যান্টমেন্টে রাখা হয়। কথা ছিল পর্যায়ক্রমে এদের সেনাবাহিনীতে অর্ন্তভূক্ত করা হবে। মাওবাদী নেতা পুষ্প কমল দাহল ( প্রচন্দ) সরকার গঠনের পর এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে সেনাপ্রধানকে নির্দেশ দেন। কিন্তু সেনাপ্রধান তার কথা না শুনায় প্রচন্দ তাকে বহিষ্কার করার সিন্ধান্ত নেয়। এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ও মাওবাদী সরকারের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে প্রচন্দ প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন।