|
টোনাটুনির গল্প শোন-২
সুমন আখন্দ |
|
টোনাটুনির গল্প প্রথম কিস্তি শোনার পরে আমার এক শিক্ষক বললেন, ‘প্রতিটা History’র একটা Mystery থাকে, তুমি সেদিকে জোর দাও নি কেন?’ এই তত্ত্বকথার কি জবাব দিবো বুঝতে না পেরে আমি বল্লাম, ‘স্যার, আমি সাধারণ মানুষ মনে জোর পাইনি বলে হয়তো লেখাতেও ওই দিকটা আসে নি।’ গুরুর কথার গুঢ়ার্থ ধরতে না পারলেও তাঁর কথার সাথে তাল মিলিয়ে বলি, ‘প্রতিটা Story’র একটা History থাকা উচিত! তা না হলে সেটা জোর পায় না।’ টোনাটুনির রিমিক্সগল্পেও একটা হিস্ট্রি আছে। আজকে আমরা সেই দিকটার প্রতি ইঙ্গিত দিবো।
বছর আটেক আগের কথা। একটা গবেষণা কাজে সিলেট এসেছিলাম, ট্রেনে করে ঢাকায় ফেরার সময় প্লাটফর্মে দেখি জটলা, এসব পাবলিক প্লেসে যা হয়, আমিও প্রথমে ভাবলাম কোন মহৌষধক ক্যানভাসার। পরে যখন দেখলাম অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা জড়ো হয়েছে- তখন আগ্রহী হয়ে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম জটলার বৃত্তে আমাদের চেনামুখ টোনা এবং টুনি। প্রথম দিকে কী হয়েছিলো জানি না, নাটকের মাঝামাঝি থেকে দেখলাম- ইশটেসনের যত কুলি-টোকাই আছে সবাইকে জড়ো করে শপথ করানো হচ্ছে, ‘সবাই আমরা ইশকুলে যাবো! বাবা-মায়ের অবাধ্য হবো না। মন দিয়ে লেখাপড়া করবো! মানুষের মতো মানুষ হবো! কখনো মিথ্যা বলবো না, চুরি করবো না! ইত্যাদি ইত্যাদি।’ টোনার শপথ পড়ানোর পরে টুনি একটা চকচকে দুই টাকার বান্ডিল বের করে বাচ্চাদের সবাইকে একটি একটি করে বিলি করলো। প্লাটফর্মে উপস্থিত অন্যান্য যাত্রীরা মন্ত্রমুগ্ধ। সবাই করতালি দিয়ে অভিনন্দিত করলো টোনাটুনিকে। ড্রামাটার্জিক্যাল তত্ত্ব মতে, এটা হচ্ছে ফ্রন্ট স্টেজ! ব্যাক স্টেজে কী হয়েছে একটু ভাবলে দেখা যাবে, জাস্ট আই ওয়াশ! দুইশো টাকার বিনিময়ে প্রায় পাঁচশো লোকের বাহ্বা কুড়ানো। নিশ্চিত করে বলতে পারি, এরচেয়ে ভালো ব্যবসা বিল গেটসও করতে পারে নি এবং তাঁর ছেলেও পারবে না কোনদিন! চোখ বুজে বলতে পারি ফলোআপ খবর হচ্ছে, এই ছেলেমেয়েরা পরের ট্রেন আসলেই সব হুমড়ি খেয়ে পড়বে মালামাল টানার জন্য, কেউ খালি বোতল কুঁড়াবে, কেউ ভিক্ষা করবে, সুযোগ পেলে চুরি করবে। আর বাবা-মা থাকলে তো অবাধ্য হওয়ার প্রশ্ন আসে! এসব শিশুদের বেশির ভাগই বাবা-মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা বঞ্চিত, তাই এদেরকে কাছে টানা সহজ। আরেকটা সহজ ঘটনার কথা বলি। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে সবাইকে খুব সহজে কাছে টানা যায় এবং আমরা দেখেছি ‘কইয়ের তেলে কই ভেজে’ কিভাবে দেশের এ প্রান্ত হতে ও প্রান্তে ফায়দা লুটেছে টোনাটুনি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে টোনাটুনির রঙিন মুখ। রঙিন মুখ বল্লাম কারণ সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার মতো সহজ মুখ এরা নয়। এদের রঙচঙা পোজের ঠেলায় যে প্রতিরোধটুকু পত্রিকার পাতায় আসেনি তা হলো, অনেক মুক্তিযোদ্ধারাই এই কথা বলে প্রতিবাদ করেছে যে- যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় নি তাদের আয়োজনে আমরা শিশু-কিশোরদের গল্প শোনাবো না! আর তিনি কোন সাহসে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে গল্প বলেন। নিজে যুদ্ধ করলে বুঝতেন এটাতো গল্প নয়, মৃত্যুর মতো সত্যঘটনা। তবু টোনাটুনি বসে থাকে নি, ‘গণিত অলিম্পিয়াড’ ‘চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা’ ইত্যাদির নাম করে নতুন নতুন প্রজেক্ট তারা হাতে নিয়েছে এবং কেউ কিছু বুঝার আগেই মধুটুকু নিয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো, টোনাটুনি কী মৌপোকা না মৌমাছি? এর উত্তর অনেকটাই পেয়ে গেছি বাকিটা জবাব সময় দিয়ে দিবে। তবে এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়, এই মধু হলো- রাজশ্রী হওয়ার বাসনা। গুনী নচিকেতার গানটা আরেকবার শুনে নেই, ‘রাজশ্রী তোমার জন্য দুর্ঘটনা অস্ট্রেলিয়ায়....দুর্ভিক্ষ সোমালিয়ায়... তোমার কথায় নদী আপন বেগে পাগলপারা, টাটা এবং বিড়লা সাহেব হতে চান সর্বহারা..।’
বাইরের মতো ক্যাম্পাসের ভেতরেও টোনাটুনি বেশ সুপ্রতিভ, প্রতিভা বিচ্ছুরিত করে তারা গড়ে তুলেছে ‘ম্যাডকাউ স্কোয়াডে’র মতো একটি স্কোয়াড, যারা এদের উচ্ছিস্ট পেলে ধন্য হয় এবং সুখস্মৃতির জাবর কেটে সুখে নিদ্রা যায়। এই স্কোয়াডে যেমন কিছু সুবিধাবাদী তরুন শিক্ষক আছেন, আছেন কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থীরাও। এরা অনেকেই স্বঘোষিত উঠতি লেখক, কলামিস্ট, মুক্তচিন্তক, নারীবাদী, বুদ্ধিজীবি, এবং উঠতি সাংবাদিক। যদি মায়ের (টুনি) এক লোকমা আশির্বাদ এবং বাবার (টোনা) এক চুমুক দোয়া পাওয়া যায়! তাহলে পালে লাগবে হাওয়া, হালে পড়বে পানি। আর আমাদের চোখে ইতিহাসের ছানি। মহারানী ভিক্টোরিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ছন্দটা বলার লোভ সামলাতে পারছি না; যুগসন্ধির এই কবি পূনর্জন্মে যদি ম্যাডকাউ স্কোয়াডের সম্মানিত সদস্য হতেন তাহলে টুনিকে উদ্দেশ্য করেই লিখতেনঃ ‘তুমি মা কল্পতরু/ আমরা সব পোষা গরু/ আমরা ভূষি পেলে খুশি হই মা/ ঘুষি খেলে বাঁচবো না!’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা না হয় একটা অবস্থান করে নিয়েছেন, কিন্তু শিক্ষার্থী যারা পতঙ্গের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে- আগুন কি তাদের ক্ষমা করবে? অন্তত দুইজন ছাত্রকে জানি, যারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ছয়/সাত বছর পরেও অনার্স ডিগ্রিটা নিয়ে যেতে পারে নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা করতো বলে এদেরকে অনটাইম টিসু পেপারের মতো ব্যবহার করেছে টোনাটুনি, এরপর ছুঁড়ে ফেলেছে।
আমার সেই শিক্ষকের কথায় ফিরে আসি। ‘টোনা, একজন আদর্শ মানুষ’ নামে একটি বই দেখে আমায় তিনি বলেছিলেন, ‘মীরজাফরও দেশপ্রেমিক, পতিতারাও সতী বটে!’ গুরুর কথার মানে বুঝতে পেরে আমারও মনে হলো মিলেছে ভালোই খাপের খাপ! বাতাসে গুলি চালালে টুনির বুকে ব্যথা লাগে কিন্তু মানুষের বুকে লাগলে আনন্দে হাততালি দেয়। স্যার, History’র Mystery’টা মনে হয় বুঝতে পারছি!
সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সিলেট
E-post:sumonakhand@yahoo.com, monjur-anp@sust.edu |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/SumonAkhanda |
| |
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|
আমার মনে হয়, যে যাই বলুক তিনি চালিয়ে যাবেন। এবং কোন কিছু প্রশ্নাতীত নয়, সেটাও ভাববে কেউ কেউ হয়তো।