|
আদালতের রায়ের ধন্দ আর সংঘশক্তির জবরদস্তি
সাদেক খান |
|
জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসাবে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের মাত্রা কমছে না, বরং বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেই এমনটি ঘটেছে। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে দৈনিক এক ডলার ২৫ সেন্টের নিচে আয় করে এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৪৯ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০০৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ। উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংক দৈনিক মাথাপিছু আয় এক ডলার ২৫ সেন্টকে নতুন করে দারিদ্র্যসীমা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভাগ থেকে প্রকাশিত 'বৈশ্বিক সামাজিক অবস্থা ২০১০' শীর্ষক প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর (এমডিজি) এক নম্বর লক্ষ্য দারিদ্র্যের হারকে অর্ধেকে নামিয়ে আনা। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশও। প্রতিবেদনটি ঢাকায় উপস্থাপন করার সময় দোসরা ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের অর্থ ও সামাজিক বিভাগের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বলেন, যে উন্নয়ননীতি অনুসরণ করে এত দিন দারিদ্র্যবিমোচনের চেষ্টা করা হয়েছে, তা ত্রুটিপূর্ণ। এগুলো বাতিল করে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে। বিশেষ করে বাজারভিত্তিক দারিদ্র্যবিমোচনের চেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিমাপের পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ। এতে প্রকৃত দারিদ্র্যের চিত্র উঠে আসে না।
প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকার বলেন, 'বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছ' এ কথা আমি বিশ্বাস করি না। জাতিসংঘের দলিলটি হাতে পেলে সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে জবাব দেয়া হবে। উল্লেখ্য, সরকারি হিসাবে ১৯৯১-৯২ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। ১৯৯১-৯২ সালে বাংলাদেশে মোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০০৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিমাপের ক্ষেত্রে খানা জরিপে মৌলিক চাহিদার ব্যয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। জাতিসংঘ বলছে, এ পদ্ধতি অনুসরণ করে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ১৯৯০ থেকে ২০০৫ সময়ে গড়ে প্রতিবছর ১ দশমিক ৬ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমেছে। দৈনিক এক ডলার ২৫ সেন্টের হিসাবে ১৯৯০ সালে ভারতে মোট জনগোষ্ঠীর ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ দারিদ্র্য সীমারেখার নিচে ছিল। ২০০৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ। নেপালে একই সময়ে ৭৭ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ভুটানে ১৯৯০ সালে মোট জনগোষ্ঠীর ৫১ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল, ২০০৫ সালে তা কমে হয়েছে ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ। পাকিস্তানে সম্প্রতি দারিদ্র্যের হার বাড়লেও ১৯৯০ থেকে ২০০৫ সময়ে দারিদ্র্যের হার কমেছে ৩০ শতাংশের বেশি। জাতিসংঘের উন্নয়নবিষয়ক কমিটির সদস্য ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বিশ্বব্যাংকের ১৯৯০ ও ২০০০ সালের বৈশ্বিক উন্নয়ন প্রতিবেদনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল দারিদ্র্য। ২০১০ সালেও এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথা ছিল। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, গত দুই দশকে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার কমানো, মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি এসেছে। কিন্তু স্বাস্থ্য ও শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা যায়নি। যারা দারিদ্র্যের ঝুঁকির মধ্যে আছে, তাদের কথা বাংলাদেশের পরিসংখ্যানে আসে না।
বিশ্বব্যাংকের নীতি অনুসরণ করে দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে তেমন একটা অগ্রগতি আসেনি। তাই তারা কিছুটা অস্বস্তিতে আছেন। কারণ, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সময়সীমা ২০১৫ সাল কাছে চলে এসেছে। কিন্তু বৈশ্বিক দারিদ্র্য তেমন কমেনি। বিশ্ব সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এর একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ, 'নিউইয়ক' শহরে এখন ৬০০টির মতো লঙ্গরখানা খোলা হয়েছে। এ শহরের এক-পঞ্চমাংশ শিশুর পেট ভরে এসব লঙ্গরখানা থেকে। এমনকি ওয়াল স্ট্রিটেও আছে একটি ফুডব্যাংক। এখানকার মানুষ পৃথিবীর সব বড় ব্যাংকগুলোর চেয়ে বেশি আস্থা রাখে ফুডব্যাংকের ওপর।
দারিদ্র্য জরিপপদ্ধতি বা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাথে তুলনামূলকভাবে এ দেশে দারিদ্র্য হ্রাসের হিসাব নিয়ে বিবাদ-বিতর্ক থাকতে পারে। তবে মোটা দাগে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে দুর্গতির সৃষ্টি হয়েছে তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। কী উৎপাদন খাতে কী উন্নয়ন খাতে কোথাও অর্থনীতিতে গতি নেই। একমাত্র রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছাড়া অর্থনীতির আর কোনো সূচকই ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে নেই। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস শেষ হয়েছে এক মাস আগে। এ সময় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সার্বিক সূচকগুলো ছিল ঝুঁকির মধ্যে। এ সময়ের মধ্যে রফতানি আয় কমে গেছে, কমেছে বিনিয়োগ, বেড়েছে দ্রব্যমূল্য, একসাথে অনেকটা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে 'গরিব মানুষের শত্রু' বলে বিবেচিত মূল্যস্ফীতি। আলোচ্য সময়ে রাজস্ব আদায়ও কমে গেছে। অন্য দিকে অর্থমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিনিয়োগ বাড়ার কোনো কারণ নেই। কোন ভরসায় ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ করবেন? বিনিয়োগ বা যেকোনো শিল্প প্রতিষ্ঠার দু'টি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ। এ দুই খাতেই এখন রেশনিং চালু করা হয়েছে। গ্যাসের অভাবে জেনারেটর বন্ধ রেখে বাধ্যতামূলক ছুটি পালন করে তৈরি পোশাক রফতানির চাহিদা পূরণ বা সময়সীমা রক্ষা করতে পারছে না গার্মেন্টস মালিকরা। বাজার হারাচ্ছে। আগামী গ্রীষ্ম মৌসুমের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কল্পনা করে শঙ্কিত ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা আশু সমাধান না করা গেলে আগামীতে পুরো অর্থনীতির চাকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি গত ১২ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
একই সাথে দেশজুড়েই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। আর রাজনৈতিক বিদ্বেষও চরম আকার ধারণ করেছে। গত মাসের শেষে প্রচলিত আইনে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অবসানে পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের নায়ক এবং জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব হত্যা মামলায় খুনি হিসেবে আদালত থেকে দণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে তাদের অনেকে অফিসার হিসেবে জীবন শুরু করেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে সম্মুখ সমরে অংশ নেন। দণ্ডপ্রাপ্ত সাতজনই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাদের মধ্যে আবার একজন জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোচ্চ খেতাব বীরোত্তম ভূষিত। দু'জন বীরপ্রতীক। ২৭ জানুয়ারি রাতে ফাঁসি হয় পাঁচজনের। ছয়জন এখনো পলাতক। একজন মারা গেছেন ২০০১ সালে জুন মাসে জিম্বাবুয়েতে।
পাঁচজন দণ্ডিতের ফাঁসির পর ৩০ জনুয়ারি দুপুরে গণভবনে বাকি পলাতকদের সম্পর্কে আওয়ামী লীগের নতুন কমিটির প্রথম বর্ধিত সভার উদ্বোধনীতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পৃথিবীটা বড় হলেও অনেক ছোট, পালিয়ে থাকবে কোথায়? একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ, জাতীয় চার নেতা হত্যা, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, বিডিআর বিদ্রোহের নামে সেনাকর্মকর্তা হত্যার বিচারও হবে। বিডিআর বিদ্রোহে বিরোধীদলীয় নেতার মদদ ছিল এমন সন্দেহ ব্যক্ত করে দোষারোপের রাজনীতির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের দিন তার বড় সন্তান কিভাবে সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে বেশ কয়েকবার ফোন করে তার মাকে বলেছিল ক্যান্টনমেন্টের বাসায় না থাকার জন্য? এরপর তিনি কী আকাঙ্ক্ষায় কোথায় তিন দিন বসেছিলেন, সে রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে। নির্বাচনে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই কী এই বিডিআর বিদ্রোহ ঘটানো হয়?
ভারতের ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, পলাতক বাকি ছয়জনকে বিভিন্ন দেশে খোঁজা হচ্ছে। 'বাংলা গভর্নমেন্ট পলাতক দণ্ডিতদের ইন্টারপোলের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। আরো অনেক গোয়েন্দা সংস্থাও এতে যোগ দিয়েছে। এ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতের 'র', ইসরাইলের মোসাদ ও বাংলাদেশের এনএসআই। এ তিনটি গোয়েন্দা সংস্থাও ইন্টারপোলের এ অনুসন্ধান কাজে অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
এভাবে ভারতীয় 'র' আর ইসরাইলি মোসাদের সহযোগিতায় '৭৫ সালের ক্যুদেতার সফল নায়কদের খুঁজে বের করার প্রক্রিয়ায় সরকার মনোযোগী হলেও দেশাভ্যন্তরে চলছে সংঘশক্তির জবরদস্তি আর 'প্রতীকী' রাজনৈতিক সহিসংতায় নিরপরাধের নির্যাতন। মরহুম আজিজ পাশা জিম্বাবুয়েতে আগেই মারা গিয়ে ফাঁসির দড়ি এড়াতে পেরেছেন বলে আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির ওই বর্ধিত সভার পর আজিজ পাশার গ্রামের বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করেছে ওই জেলা ও উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। আওয়ামী নেতারা মুখে বলছেন, রায়ে আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আর কাজে তাদের বাধ্য অনুসারীরা আইন ভেঙে আজিজ পাশার পৈতৃক ভিটার বাসিন্দা তার শিক্ষক ভ্রাতা আর ভ্রাতৃবধূর ওপর সংঘশক্তি অমানবিক জবরদস্তি প্রয়োগ করেছে। ঘরবাড়ি আসবাবপত্র পুড়িয়ে দিয়েছে। পুলিশ ছিল নির্বাক দর্শক।
যে পাঁচজনের ফাঁসি হয়েছে তাদের কৌঁসুলিরা বলছেন, সরকার 'অবৈধভাবে' তাড়াহুড়ো করে ফাঁসির রায় কার্যকর করেছে। কারণ বিচারপ্রক্রিয়া তথা রিভিউ শেষ হওয়ার পর ক্ষমার জন্য ২৮ দিন সময় দেয়া সঙ্গত ছিল। আগেই করুণাভিক্ষা-পর্ব শেষ হয়েছে বলে প্রচার সরকারের সাজানো নাটক বা জবরদস্তি আদায়। কারণ দণ্ডিতদের কৌঁসুলি বা আত্মীয়রা এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এ ছাড়া বিরোধী মনোভাবাপন্ন কেউ কেউ আরো বলছেন, আওয়ামীপন্থী সবারই বিচার হচ্ছে, কিন্তু সিরাজ সিকদার হত্যা আর রক্ষীবাহিনীর হাতে নিহত হাজার হাজার মানুষের হত্যার বিচার কে করবে? আদালতে বা থানায় আরো যে শত শত হত্যা মামলা পড়ে রয়েছে, তার তদন্ত করতে হবে? সাধারণ মানুষ কবে সুবিচার পাবে?
অন্য দিকে সারা দেশে অপরাধবৃত্তের অবাধ বিচরণের পাশাপাশি সরকারি দলের মধ্যেই চলছে টেন্ডারবাজি, ভূমিদস্যুতা, স্কুল-কলেজে ভর্তিবাণিজ্য এসবের বখরা নিয়ে হানাহানি, অন্তর্দ্বন্দ্ব। সব মিলিয়ে নিরাপত্তাহীনতার এক দুঃসহ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে দেশবাসী। বিশেষ করে মাঘের শেষে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির হঠাৎ অবনতি ঘটেছে। গত কয়েক দিনে মহানগরীতে খুন, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে। যদিও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির কথা মানতে নারাজ। ডিএমপি কমিশনারের সাথে একমত নয় নগরবাসী। তারা মনে করেন, ঢাকার অপরাধচিত্র উদ্বেগজনক।
ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারির শুরুতেই বোমা বিস্ফোরণে আহত হয়েছে একজন। তিনটি পৃথক ঘটনায় ছিনতাইকারীরা গুলি করে আহত করেছে তিনজনকে এবং নিয়ে গেছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। মিরপুরে ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন এক ভ্যানগাড়ি চালক। তার পেট, পিঠ ও হাতে ছুরিকাঘাত করে সন্ত্রাসীরা। উত্তরায় জেএমবি জঙ্গিদের হাতে খুন হয়েছেন জেএমবি'রই এক সাবেক সদস্য। তাকে উপুর্যপরি ছুরিকাঘাতে হত্যার পর ঘটনাস্থলে দু'টি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যাকারীরা পালিয়ে যায়। বোমার আঘাতে আহত হন স্থানীয় এক পরিবহন কর্মী।
একই দিনে বাংলাবাজার এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছেন এক কাঁচামাল আড়তদার। শ্যামবাজারের আড়তদারের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে একটি ব্যাগে করে সদরঘাট ইসলামী ব্যাংকে যাওয়ার সময় বাংলাবাজার মোড়ে চার ছিনতাইকারী তার ডান পায়ে গুলি করে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। ১টায় জুরাইন রেললাইনের সামনে চার-পাঁচজন ছিনতাইকারী গুলি করে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে আরেক ব্যক্তির ৩ লাখ টাকার একটি ব্যাগ। তিনি শ্যামপুরের ধোলাইখালের হাজী রমিজউদ্দিন প্লাজায় বাংলালিংক কোম্পানির এক কর্মকর্তা। রাজধানীর শ্যামলীর সেবা নার্সিং হোমের সামনে ছিনতাইকারীরা গুলি করে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে আরেকজনের কাছ থেকে। গুলিতে আহত ব্যক্তি ৮/১ শ্যামলী রোডের সৌরভ কেমিক্যাল অ্যান্ড ওয়ার্কশপের কর্মচারী। অফিস কর্মচারীদের বেতনের ওই টাকা নিয়ে শ্যামলী ইসলামী ব্যাংক থেকে ফেরার পথে দু'টি মোটরসাইকেলে কালো পোশাক (র্যাবের মতো) পরা ছিনতাইকারীরা তার পথরোধ করে এবং গুলি করে টাকা ছিনিয়ে নেয়। আগের দিন পুরান ঢাকার ৭১ গোয়ালনগরের মেসার্স রতন স্বর্ণ বিতান থেকে ডাকাতরা দিনদুপুরে নিয়ে গেছে নগদ ১৮ শ' টাকা ও ৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার। গুলি করে আহত করেছে মালিকের ছেলেকে। ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী ১০ জনের একটি ডাকাতদল শপিং ব্যাগে অস্ত্র নিয়ে দোকানে প্রবেশ করে ডাকাতি করে। নগরীতে বেড়েছে বাস ডাকাতিও। দিনের আলোয় কেউ গাড়ির চালক, কেউ হেলপার আবার কেউবা সুপারভাইজার। রাতে দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী কিংবা পেশাদার খুনি। কখনো যাত্রী সেজে আবার কখনো বাসের শ্রমিক সেজেই লুটে নেয় যাত্রীদের সর্বস্ব। করছে খুনও। ২৪ জানুয়ারি এরকম ৫ ডাকাতকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মতিঝিল থেকে গাবতলীগামী ৮ নম্বর বাসে যাত্রীবেশে ডাকাতরা কুপিয়ে আহত করেছে এক শিশুসহ ৫ যাত্রীকে। তবু রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলছেন ডিএমপি কমিশনার। বলছেন, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা।
ভাষা চেতনার এই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ছাত্রের মৃত্যু কলঙ্ক ছাত্র সমাজে ব্যাপক অরাজকতা বিস্তারের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। পয়লা ফেব্রুয়ারি রাতে এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের হল শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীদের সংঘর্ষে আহত হন ইসলামের ইতিহাস তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আবু বকর। ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। আবু বকরের মৃত্যু পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের শেলের আঘাতে হতে পারে বলে এক চিকিৎসক ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার হলের বন্ধুরাও জানিয়েছেন, সংঘর্ষ চলাকালে চতুর্থ তলার রুম থেকে বেরিয়ে আবু বকর করিডোরে দাঁড়িয়েছিল। পঞ্চম তলা থেকে পুলিশের ছোড়া টিয়ার শেল আবু বকরের মাথার পেছনের দিকে আঘাত করে। এরপরই সংজ্ঞাহীন আবু বকরকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়।
সকাল সাড়ে ৯টায় আবু বকরের মৃত্যুর খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তার সহপাঠীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টা থেকে তারা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও ভাঙচুর শুরু করেন। পুলিশ বাধা দিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিক্ষোভ ঠেকাতে তৎপর ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতারাও। তারা মল চত্বরসহ বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ ছাত্রদের মিছিলে বাধা দেয়, ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। ছাত্রদের সাথে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। দুপুর পর্যন্ত পুলিশ ও ছাত্রদের মধ্যে থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে। ছাত্ররা বেশ কয়েকটি গাড়ি ও প্রক্টরের কার্যালয় ভাঙচুর করে।
ইতোমধ্যে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে প্রদত্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি (লিভ টু আপিল) খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। বেসরকারি আপিলের অনুমতি প্রত্যাখ্যান করা হলেও আদালত বলেছেন, হাইকোর্টের রায় পরিমার্জনের পাশাপাশি কিছু পর্যবেক্ষণ দেয়া হবে। প্রধান বিচারপতি মোঃ তোফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত ছয় বিচারপতির বেঞ্চ এ আদেশ দেন। দু'পক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, আদেশের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেয়া সম্ভব হবে।
প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষে নিয়োজিত কৌঁসুলি মাহমুদুল ইসলাম বলেন, 'কিছু পরিমার্জন ও পর্যবেক্ষণ দিয়ে লিভ টু আপিলগুলো খারিজ করায় হাইকোর্টের দেয়া রায়ই বহাল থাকছে। কী পরিমার্জন ও পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে, তা না দেখে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, 'সংবিধানে মার্শাল ল বলে কিছু নেই। সংবিধানবহির্ভূতভাবে মোশতাক, সায়েম ও জিয়া ক্ষমতা দখল করেছেন বলে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে। ঘটনা ঘটে যাওয়ায় কিছু কিছু বিষয় হাইকোর্ট মার্জনা করেছিলেন। হয়তো এসব বিষয় থেকে কিছু বাদ যাবে, আবার কিছু যুক্ত হতে পারে। আশা করি, বাহাত্তরের সংবিধানের মূল চার নীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। জিয়া, মোশতাক ও সায়েমের সামরিক শাসন অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ে আশা করি আপিল বিভাগ দ্বিমত পোষণ করবেন না। হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের কারণে এক-এগারোর সময় সামরিক বাহিনী সরাসরি রাজনীতিতে আসতে পারেনি। আর এ আদেশের ফলে সামরিক শাসন আসার পথ রুদ্ধ হয়ে গেল।
২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর যথাক্রমে খোন্দকার মোশতাক, বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ সংবিধানবহির্ভূত এবং বেআইনি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া সংবিধানের ৬, ৮, ৯, ১০, ১২, ২৫, ৩৮, ৪২ ও ১৪২ অনুচ্ছেদগুলো মূল সংবিধানে যেরূপে ছিল সেরূপে থাকবে বলা হয়।
আপিল আবেদনকারী বিরোধীদলীয় মহাসচিবের আইনজীবী টিএইচ খান বলেন, 'আদালত মডিফিকেশন (পরিমার্জন) শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। তাই হতাশার মধ্যেও আশার আলো দেখছি। কী পরিমার্জন হবে, তা জানি না। তবে লিভ গ্রহণ করে পূর্ণাঙ্গ রায় দেয়া হলে তা হতো শোভনীয়। লিভ মঞ্জুর হলে সরাসরি সরকারের মুখোমুখি যাওয়া হয়। আদালত সরকারের সাথে বিশ্বস্ত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করছে। আমাদের যুক্তির যথার্থতা আদালত বুঝতে পেরেছেন। আশা করি, রায়ে তা প্রতিফলিত হবে। আদালত আমাদের যুক্তিগুলো কিভাবে খণ্ডন করবেন, তা দেখার অপেক্ষায় আছি।
আপিল আবেদনকারী তিন আইনজীবীর কৌঁসুলি মওদুদ আহমদ বলেন, এর সাথে সাংবিধানিক বিষয় জড়িত থাকায় লিভ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ শুনানি করা যেত। আমাদের যুক্তিগুলো সঠিক ছিল, আদালতের আদেশে তা-ই প্রমাণিত হলো। কারণ, আদালত কিছু পরিমার্জন ও পর্যবেক্ষণের কথা বলেছেন। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর বোঝা যাবে, হাইকোর্টের রায় বহাল থাকছে কি না। পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর জনগণ এর মূল্যায়ন করবে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় কেনো লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়নি, এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ বলেন, এক বছর পর অনুলিপি পেয়েছি। আপিল অত দ্রুত শুনানি হয় না। পেপারবুক পেতে এক বছর সময় লাগে।
আদালতের রায়ে 'অতীত এবং সংঘটিত' হিসাবে বাস্তবতার যে স্বীকৃতির ইঙ্গিত আছে, তার সূত্র ধরেই বলতে হয়, বাঘ, বাঘ, বলে চেঁচালে বাঘের আসা বন্ধ হয় না। বাস্তবে দেশের আর্থিক অবস্থার অবনতি জননিরাপত্তার অভাব, আইন প্রয়োগে অক্ষমতা বা উদাসীন্য, শাসনতান্ত্রিক সঙ্কট, রাজনৈতিক হিংসাবিদ্বেষ, রাষ্ট্রযন্ত্রে নাগরিকের অনাস্থা, এসবই কুলক্ষণ, যা ব্যর্থরাষ্ট্রের সূচক। এসব কুলক্ষণের সূত্র ধরেই ঘটে সংবিধানের খেলাফ, রাষ্ট্ররক্ষার নামে প্রতিরক্ষার দায়বদ্ধ সামরিক শাসকদের আবির্ভাব। সংবিধানে বা উচ্চ আদালতে রায়ে অনুশাসন যাই থাকুক না কেন, সুশাসনে সাফল্য এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভিন্নমতসহিষ্ণু শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর প্রত্র্নিয়ার সুনিশ্চয়তা না থাকলে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র দিয়ে গদি রক্ষা হয় না সামরিক শাসন আসার পথও রুদ্ধ হয় না।
লেখকঃ বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[সূত্র, নয়াদিগন্ত, ০৫/০২/২০১০]
|
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/SadekKhan |
| |
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|