আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীরা যে হারে অবিরাম ধারাবাহিকভাবে অসত্য বলেই যাচ্ছেন, তাতে মিথ্যা কথা আমাদের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। তার ওপর শিনাজুরি তো আছেই। আওয়ামী লীগের কোনো এক নেতা যদি একটি অসত্য বত্ত্নব্য দেন, তাহলে পাতিনেতারা তার সত্যাসত্য যাচাই না করে অবিরাম হিটলারি কায়দায় সে ঢাক পেটাতে থাকে। এবং তাদের কমীদের মনেও ওই অসত্যকে সত্য বলে বদ্ধমূল ধারণার সৃষ্টি হয়। একবার এক ওষুধের দোকানদার আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন টিপাইমুখ বাঁধে বাংলাদেশের কী ক্ষতি এ বিষয়ে আমার জ্ঞান ওয়েবসাইট-নিভর। টিপাইমুখ সম্পকে ভারতীয় পরিকল্পনা যতটুকু প্রকাশিত হয়েছে, ততটুকু আমার জানা আছে। আর বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে তো বলেই দেয়া হয়েছে যে, টিপাইমুখ বাঁধ সম্পকে ভারত বাংলাদেশকে কোনো তথ্যই দেয়নি। আমি ছবি এঁকে সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনায় এ বাঁধের প্রতিত্র্নিয়া কী হতে পারে দোকানিকে তা বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম। আরেক তরুণ ত্র্নেতা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি হঠাৎ ক্ষুব্ধ স্বরে আমাকে বললেন, আপনি টিপাইমুখের কী জানেন, অযথা মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। তারপর নিজের মনে এই বলে গজর গজর করতে থাকলেন যে, আজকাল রাস্তাঘাটে অনেক পানি বিশেষজ্ঞ গজিয়ে গেছে। ভারত তো বলেই দিয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু তারা করবে না। তার পরও এসব লোক মানুষকে বিভ্রান্ত করেই যাচ্ছে।
আমি তো হতভম্ব, ওই তরুণকে কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না। তাকে বললাম, আপনি কি টিপাইমুখ সম্পকে কিছু জানেন? উনাদের সেটাও বোঝাতে পারেন। তিনি বললেন, আমার এত পণ্ডিতির দরকার নেই। আমি বললাম, আপনি কি আমাকে চেনেন? তিনি বললেন, আপনার মতো লোক চেনার আমার দরকার নেই। তারপর গজর গজর করতে করতে বলে গেলেন। ধারণা করা যায় যে, এই তরুণও আওয়ামী পরিবারের সদস্য, অজ্ঞও। জ্ঞানবিমুখ এবং আওয়ামী নেতাদের অবাস্তব প্রচারণার ঘোর শিকার। আওয়ামী নেতাদের এই একটা সুবিধাও বটে। তারা লেখাপড়া, বিদ্যাবুদ্ধির ধার যেমন ধারতে চান না, তেমনি তাদের নালায়েক কমীরাও নেতায় কইছে বলে কোরাস তুলতে থাকে।
সম্প্রতি এমনই এক কাণ্ড করে বসেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, জাতীয় সংসদ ভবনের উত্তর পাশে যেখানে জিয়াউর রহমানের সমাধি ক্ষেত্র, সেখানে প্রকৃতপক্ষে জিয়ার লাশই নেই। এই কথা শুনে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম কী রেখে কী বলবেন দিশামিশা না পেয়ে বলে বসলেন, সেখানে প্রকৃতই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লাশ দাফন করা হয়েছে কি না তার ডিএনএ পরীক্ষা করা হোক। এই দাবি আওয়ামী মহলে নতুনত্বের স্বাদ আনলেও, তিনি যে শেখ হাসিনার মূল বত্ত্নব্যকে অস্বীকার করে বসেছেন সেটি আর মনে রাখতে পারেননি। কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষ্য হলো, সেখানে জিয়াউর রহমানের লাশই দাফন করা হয়েছিল। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর ৪টায় চট্টগ্রাম সাকিট হাউজে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের নিদেশে কিছু বিপথগামী নেতা-কমকতা। জেনারেল মঞ্জুর রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করে অভুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের প্রয়াস পেয়েছিলেন। কিন্তু এই খবর প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথে সারা দেশে লাখ লাখ মানুষ প্রতিবাদ-প্রতিরোধে রাস্তায় নেমে এলে সে অভুত্থান ব্যথ হয়ে যায়।
জিয়াউর রহমানের শাহাদতবরণের পর বিদ্রোহী সেনাকমকতার নিদেশে জিয়ার মরদেহ একটি চাদরে মুড়িয়ে রাঙ্গুনিয়া এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে কোনো জানাজা ছাড়াই জিয়া ও আরো দুইজন নিহত সেনাকমকতাকে মাটিচাপা দেয়া হয়। এই মাটিচাপা দেয়ার দৃশ্য দেখেছিলেন মোহাম্মদ বশির নামের এক কলেজছাত্র। বিদ্রোহ হয়ে গেলে ১ জুন মোহাম্মদ বশির বিষয়টি স্থানীয় থানাকে জানায়। তারপর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ এস এম হান্নান শাহর (এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য) নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধানকারী দল জিয়াউর রহমানের মরদেহ সেখান থেকে তুলে চট্টগ্রাম সিএমএইচে নিয়ে আসে। সেখানে লে. ক. তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বে একদল চিকিৎসক জিয়াউর রহমানের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। সেই ময়দাতদন্ত রিপোটেই উপরোল্লিখিত তথ্যাবলি সন্নিবেশিত আছে।
ওই ময়নাতদন্ত রিপোটে বলা হয়, যদিও বিদ্রোহীদের গুলিতে তার দেহ আংশিক ক্ষতবিক্ষত ছিল, তা সত্ত্বেও তার চেহারা ছিল অপরিবতিত। ফলে তাকে জিয়াউর রহমান বলে শনাত্ত্ন করতে কোনো অসুবিধা হয়নি। তার শরীরে প্রায় ২০টি বুলেট বিদ্ধ হয়েছিল। ওই পোস্টমোটেম রিপোটে বলা হয়, জিয়াউর রহমানের মরদেহ পরিষ্কার করে পুনগঠন করা হয়। শরীরের সব ক্ষত এলাকায় ফমালিন মিশ্রণ দেয়া হয় ইনজেকশনের সাহায্যে। আর সারা দেহে ফরমালিন সলিউশন মাখিয়ে দেয়া হয়। এরপর তার সারা শরীর নরম সুতি পশমি ব্যান্ডেজ দিয়ে পঁ্যাচানো হয়। এরপর নতুন সাদা চাদরে তার শরীর আবৃত করা হয়। তারপর ওই পুরো চাদরের ওপর দেয়া হয় সিজার কাঠের তেল, ইউকেলিপ্টাস কাঠের তেল ও আতর। এরপর চায়ের গুঁড়ো দিয়ে একটি শবাধারে লাশটি সংরক্ষণ করা হয়। কফিনটি জাতীয় পতাকা দিয়ে মুড়ে চট্টগ্রাম সিএমএইচের কমান্ডিং অফিসার বেলা ১টায় ব্রিগেডিয়ার এ কে এম আজিজুল ইসলাম, লে. ক. মাহফুজ ও লে. ক. মাহতাবুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সেনাবাহিনীর একটি পরিবহন বিমানে করে ওই দিনই জিয়াউর রহমানের লাশ ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের দেখার জন্য রাষ্ট্রপতি জিয়ার লাশ প্রথমে তার সেনানিবাসের বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় তার কফিনের উপরিভাগে অভঙ্গুর কাচ লাগানো হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়ার লাশ ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বেশিক্ষণ রাখা সম্ভব ছিল না। কেননা, ততক্ষণে লাখ লাখ শোকাত মানুষ জিয়ার মৃতদেহ একনজর দেখার জন্য ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় জোর করে প্রবেশের চেষ্টা শুরু করেছিল।
১ জুন বিকেলে রাষ্ট্রপতি জিয়ার লাশ সাধারণ মানুষের দেখার জন্য সংসদ ভবনে রাখা হয়। তার পরদিন মানিক মিয়া এভিনিউতে অনুষ্ঠিত হয় মরহুমের জানাজা। এই জানাজায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় জানাজা আর কখনো অনুষ্ঠিত হয়নি।
এসব ঘটনা সামনে থাকা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা যে এখন বলতে শুরু করেছেন, ত্র্নিসেন্ট লেকের ধারে জিয়াউর রহমানকে সমাহিতই করা হয়নি। তার মৃতদেহ বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেয়া হয়েছিল। শূন্য কফিন সমাহিত করা হয়েছিল এর কোনো কিছুই আর ধোপে টেকে না। পোস্টমোটেম রিপোটটি অফিসিয়াল এবং নিশ্চয়ই তা সংরক্ষিত আছে। তার পরও এমন নিষ্ঠুর ও নিুরুচির কথা কেন বলতে হবে সেটি আমাদের বোধগম্য নয়।
আবার শেখ মুজিবকে দেবতা বানানোর অপপ্রয়াসে তার সম্পকে আওয়ামী মহল নানা কথা প্রচার করে থাকে, যা সত্য নয়। বাংলাদেশের যা কিছু আন্দোলন, যা কিছু ঘটনা, তা শেখ মুজিবের হুকুম ছাড়া সঙ্ঘটিত হয়নি এটাই প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আওয়ামী নেতারা সব সময়ই কোশেশ চালিয়ে আসছেন। গত ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীতে বইমেলা উদ্বোধন উপলক্ষে তেমনি এক ভাষণ দিয়েছেন মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা। ওই ভাষণে তিনি বলেছেন, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন আইন পরিষদে ঘোষণা দেন, পূব পাকিস্তানের জনগণ উদুকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে মেনে নেবে। তার এই ঘোষণার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগসহ গোটা ছাত্রসমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের পরিকল্পনা নেয়। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সবদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।
শেখ হাসিনার এই বত্ত্নব্য যে সঠিক নয়, তা জানিয়ে পত্রিকা নিবন্ধ লিখেছেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ, গবেষক ও রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর। তিনি লেখেন শেখ মুজিবের এই ভূমিকা সম্পকে হাসিনার বত্ত্নব্য সম্পূণ মিথ্যা। কিন্তু তার আগে বলা দরকার, পূব পাকিস্তানের বেশির ভাগ অধিবাসীরই এই মনোভাব যে, একমাত্র উদুকেই রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে খাজা নাজিমুদ্দিন এই বত্ত্নব্য দেন ঢাকায় আইন পরিষদে নয়, করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে। নাজিমুদ্দিনের এই বত্ত্নব্যের প্রতিবাদে ঢাকাসহ পূব পাকিস্তানের সবত্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলন চলতে থাকে। এ সময় তমদ্দুন মজলিস, গণ আজাদী লীগ, পূব পাকিস্তানের ছাত্রলীগ ও বিভিন্ন ছাত্রাবাসের যৌথ উদ্যোগে ১০ মাচ ফজলুল হক হলে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কমীদের এক সভায় সবদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, তমদ্দুন মজলিস, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ফজলুল হক মুসলিম হল ইত্যাদি ছাত্রাবাস ও পূব পাকিস্তান ছাত্রলীগ প্রত্যেকটি থেকে দুইজন করে প্রতিনিধি নিয়ে এই সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুল আলম (তাজউদ্দীনের ডায়েরি... ১৯৪৮)। শেখ মুজিব এই সভার ধারেকাছেও ছিলেন না। কারণ, তিনি তখন ছিলেন কলকাতায়। সংগ্রাম পরিষদ গঠনের কয়েক দিন পর কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন... ঢাকায় ছাত্র রাজনীতি না করার ফলে এখানে তার সেরকম অবস্থান সংগঠনের মধ্যে ছিল না। কাজেই তার, প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সবদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল এই বত্ত্নব্য সবৈব মিথ্যা। মিথ্যা যদি না হয় তা হলে এটা সম্পূণভাবেই এবং অজ্ঞতাপ্রসূত বত্ত্নব্য।
এ ছাড়াও শেখ হাসিনার ভাষণে ঐতিহাসিক অনেক তথ্যই ভুল। শেখ হাসিনা তার ভাষণে বলেছেন, এ সময় (১৯৫২) তাকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়, সেখানে তিনি ১৪ ফেব্রুয়ারি অনশন শুরু করলে ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে আবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসার জন্য আনা হয়। সেখান থেকেই বঙ্গবন্ধু ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙার নিদেশ দেন।
এ বত্ত্নব্যও সম্পূণ আজগুবি। বদরুদ্দীন উমর তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, আসলে শেখ মুজিব ও বরিশালের মহিউদ্দীন আহম্মদকে ১৫ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়। এরপর তিনি ও মহিউদ্দীন সেখানে ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, নিজেদের মুত্ত্নির জন্য অনশন শুরু করেন। মহিউদ্দীন আহমদ জেল থেকে ছাড়া পান ২৮ ফেব্রুয়ারি আর শেখ মুজিব ছাড়া পান ২৪ ফেব্রুয়ারি। প্রকৃতপক্ষে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তরের পর শেখ মুজিবকে আর ঢাকায় আনাই হয়নি। আর সেই মুজিবই গোপন বৈঠক করে ১৪৪ ধারা ভাঙার নিদেশ দিলেন? তা ছাড়া ফরিদপুর জেল থেকে ছাড়া পেয়েও তিনি ঢাকা আসেননি। গোপালগঞ্জের নিজ বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই থেকে গিয়েছিলেন। ঢাকায় এসেছিলেন এপ্রিলের শেষে।
কোনো ব্যত্ত্নিবিশেষকে হিরো করার জন্য এসব ঢালাও মিথ্যাচার, ইতিহাস বিকৃতি ও বানোয়াট বত্ত্নব্য সেই ব্যত্ত্নিকে মহীয়ান তো করেই না, বরং তাকে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়। আজ যারা এমন মিথ্যাচারের বেসাতি করছেন, তারা প্রকারান্তরে শেখ মুজিবকেই হেয় করছেন। তাদের মধ্যে এই সত্য উপলব্ধি ঘটলে বরং ভালো হতো।
লেখকঃ সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com
[সুত্র, নয়াদিগন্ত, ০৬/০২/২০১০] |