|
প্রতিদিন নতুন লোক শেয়ারবাজারে ভর্তি হচ্ছে
আবু আহমেদ |
|
গত এক বছরে আমাদের অর্থনীতিতে অন্যত্র বিনিয়োগ ও ব্যবসা না-হলেও শেয়ারবাজারের ব্যবসাটা ভালো জমেছে। তবে এ বাজারকে ব্যবহার করে যে-গতিতে শিল্পপুঁজি সংগ্রহ হওয়ার কথা তা হয়নি, হচ্ছে না। কোম্পানিগুলো বিভিন্ন কৌশলে পুরনো শেয়ারগুলোর কলেবর বৃদ্ধি করে চলেছে। শেয়ারবাজারের আর একটি বড় দিক হলো, জমছে ঋণবিক্রয়। বাণিজ্যিক ও লিজিং কোম্পানিগুলো অন্যত্র ঋণের গ্রাহক না-পেয়ে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছে ঋণ বিক্রির জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। ফলে এ বাজারে অর্থের অভাব নেই। কেউ এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে ওর বিপরীতে অতিসহজেই দুই লাখ টাকা ঋণ পেয়ে আসছে।
একে তো প্রত্যহ নতুন বিনিয়োগকারী নতুন অর্থ নিয়ে শেয়ারবাজারে প্রবেশ করছে, অন্যদিকে ঋণের সহজপ্রাপ্তি এই বাজারকে মূল্যের দিক দিয়ে এমন এক স্তরে ঠেলে দিচ্ছে, যা পর্যবেক্ষণ করলে হিসাব জানে এমন লোকরা ভীত হয়ে পড়ে। এই জ্যামিতিক গতিতে ঊর্ধ্বমুখীর মুখেও রেগুলেটর যতটা চিন্তিত হওয়ার কথা ততটা চিন্তিত হচ্ছে বলে মনে হয় না। অতিসম্প্রতি সবার উৎকণ্ঠার মুখে রেগুলেটর ঋণের প্রবাহকে কমানোর উদ্দেশ্যে মার্জিন রুলকে একটু কড়াকড়ি করেছে। তবে সেই কড়াকড়িও মার্চেন্ট ব্যাংক ও ঋণবিক্রেতারা মানছে কি না, সেটা দেখা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। শেয়ার বাদে বাজারকে বড় করার এক অজ্ঞাত প্রতিযোগিতা আমাদের শেয়ারবাজারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। আমরা সরকারকে শেয়ার বেচার কথাটা বলতে বলতে হয়রান। শেষ বিচারে সরকারই হলো সবচেয়ে বড় রেগুলেটর। কিন্তু সেই রেগুলেটরও যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।
শেয়ারবাজারকে ঘিরে অনেক কেলেঙ্কারি এখনো সংঘটিত হচ্ছে। আইপিওগুলো এসইসির অনুমতির আগেই প্লেসমেন্ট দেওয়া শুরু করে। প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ইতিমধ্যে কয়েকটি কোম্পানি শত শত কোটি টাকা কথিত বড় এবং অতিউৎসাহী বিনিয়োগকারীদের থেকে নিয়ে নিয়েছে। অন্য কেলেঙ্কারি সংঘটিত হচ্ছে মিউচুয়াল ফান্ড ছাড়ার ক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রেও প্লেসমেন্ট চলছে সমান গতিতে। প্লেসমেন্টের ক্রেতাদের উদ্দেশ্য লক-ইন সময় ছয় মাস থেকে এক বছর পার হলে তো তারা ক্রয়মূল্যকে তিনগুণ মূল্যে বেচতে পারবে। বাহ্! এর থেকে ভালো ব্যবসা আর কোথায় আছে! কেনা দশ টাকায়, বেচা ত্রিশ টাকায়। তাও মাত্র ছয় মাস পর।
বিনিয়োগকারীরা যদি মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ থেকে তাদের প্রাপ্যটা ঠিকমতো বুঝত তাহলে এসব ফান্ড কেনার জন্য হইহই-রইরই কাণ্ড ঘটত না। বাংলাদেশই বোধ করি বিশ্বের একমাত্র শেয়ারবাজার, যেখানে মিউচুয়াল ফান্ড কিনে অতটা ক্যাপিটাল গেইনস অর্জন করা যায়। বিরাটসংখ্যক বিনিয়োগকারীর শেয়ারমূল্য কিসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় এ নিয়ে কোনো ধারণা নেই। তারা আর্থিক বিবরণী ঠিকমতো পড়তেও পারে না। যেখানে তারা পড়তে পারে না সেখানে ওইগুলোর ব্যবসা তো তাদের পক্ষে অসম্ভব। আমি নিজে বেশ কয়েকটি ট্রেনিং সেশনে বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকার সুযোগ পাই। সেখানে আমি একনাগাড়ে দুই ঘণ্টা বক্তৃতা এবং হোয়াইট বোর্ড ব্যবহার করে ভ্যালুয়েশনের বিভিন্ন দিক ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছি। সেখানে বক্তৃতা ও লেখাশেষে আমি যখন বিনিয়োগকারীদের জিজ্ঞেস করতাম, কি আপনারা উপকৃত হয়েছেন? তখন সবাই এক বাক্যে বলত, অবশ্যই আমরা উপকৃত হয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, শেয়ারবাজারকে নিয়ে কথিত সচেতনতামূলক প্রোগ্রামগুলোতে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিদের দ্বারা শুধু বক্তৃতা দেওয়ানো হয়। ফলে উপস্থিত লোকরা উজ্জীবিত হয় বটে, তবে শিখতে পারে কতটা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
অঙ্কের ক্লাসের শিক্ষকরা বোর্ড ব্যবহার না-করে শুধু যদি বক্তৃতা দিয়ে অঙ্ক শেখাতে চান তাহলে ছাত্ররা আর শিখবে কী? শেয়ারবাজারের ইস্যুগুলো বিশেষ করে কোন্ শেয়ার কোন্ মূল্যে কিনতে হবে, কোন্ মূল্যে বেচতে হবে, এসব শেখানোর জন্য বোর্ড, সাহিত্য সবকিছুতেই ব্যবহার করতে হবে। তার পরও যে সবার শিক্ষার স্তর সমান হবে সেটা ঠিক নয়। আপন আপন মেধা ও দূরদৃষ্টির ভিন্নতার কারণে তাদের শিক্ষার স্তরও ভিন্ন হতে বাধ্য। আমি কেন বিনিয়োগকারীদের আর্থিক বিষয়গুলোর সহজ লিটারেচার বা বই-সাময়িকী পড়তে বলি সেটা হলো এইজন্য, পড়া ও শোনা ছাড়া কেউ শিখতে পারে না। আমার নিজেরও এ সম্বন্ধে একটা বই আছে, যেটা এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। অনেকে বলেছেন, বইটি তাঁদের উপকারে এসেছে।
আমি আশা করি, এ বইটা অন্য যাঁদের হাতে যাবে তাঁরাও উপকার পাবেন। কিছু না জেনে শেয়ার কিনলে হার অবশ্যম্ভাবী হবে। মনে রাখা উচিত এই যে দুই হাজার ২০০ বিনিয়োগকারী বাজারের সঙ্গে আছেন, তাঁদের মধ্যে বেশ জানেন এমন বিনিয়োগকারীর সংখ্যাও অনেক। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগটা হলো অনেকটা আর্ট। তবে এই আর্টকে রপ্ত করতে হলে অনেক কিছু জানতে হবে, যেগুলোর অনেক কিছু আবার বই-পুস্তকেও নেই। এটাও ঠিক, শেয়ারবাজার কোনো ফর্মুলায় চলে না। যাঁরা এটা বোঝেন বা জানেন, তাঁদের সুবিধা বেশি হয়।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[সূত্র,কালের কন্ঠ, ০৮/০২/২০১০] |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AbuAhmed |
| |
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|