মঙ্গলবার, ২৩ ভাদ্র ১৪১৭; ২৭ রমজান ১৪৩১; ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১০; রাত ১০:৩৫ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
কল চালাতে শক্তি লাগে : বেঁচে থাকতেও শক্তির প্রয়োজন আত্মপক্ষ (০৮/০২/২০১০)
পরিবেশবাদীদের অসত্য ভাষণ (০৩/০২/২০১০)
মধুসূদনের কাছে আমরা অনেক বেশি ঋণী (০১/০২/২০১০)
মার্কিন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ওবামা (২৭/০১/২০১০)
রাজনীতিতে ধর্ম আর ধর্মের রাজনীতি (২১/০১/২০১০)
কাক ডাকে কা কা (২০/০১/২০১০)
এবারের শীত (১৩/০১/২০১০)
ইয়েমেনে আলকায়েদা (১২/০১/২০১০)
দূতাবাসে নিরাপত্তা (০৬/০১/২০১০)
অন্ধ্র আর তেলেঙ্গানার ঐতিহাসিক সঙ্ঘাত (০৪/০১/২০১০)
রাজনীতিতে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানো (৩০/১২/২০০৯)
জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বরাজনীতি (২৬/১২/২০০৯)
জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বরাজনীতি (০০/০০/০০০০)
সেচ সঙ্কটে বরেন্দ্রভূমি (২৩/১২/২০০৯)
প্রতিবেশী আসাম নিয়ে ভাবনা (১৫/১২/২০০৯)
চট্টগ্রামে সংস্কৃতিচর্চা (২৫/১১/২০০৯)
ভারতে ভাষা সমস্যা প্রবল হচ্ছে (১৯/১১/২০০৯)
এরকম আইন গণতান্ত্রিক দেশে হওয়া উচিত নয় (২৮/১০/২০০৯)
মিয়ানমারের সঙ্গে সংঘাত নয় (২১/১০/২০০৯)
বিশ্বে এখন প্রতি চারজনে একজন মুসলমান (১৪/১০/২০০৯)
আগের লেখা
151


কল চালাতে শক্তি লাগে : বেঁচে থাকতেও শক্তির প্রয়োজন আত্মপক্ষ

এবনে গোলাম সামাদ

মানুষ পাহাড়ি এলাকায় ঝরনার পানিকে কাজে লাগিয়েছে যাঁতা ঘুরাতে। যে যাঁতায় সে পিষেছে ময়দা। এখন সে পাহাড়ি নদীকে একইভাবে কাজে লাগাচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। নদীর পানিপ্রবাহে ঘোরাচ্ছে টারবাইন। এ ক্ষেত্রে কোনো জ্বালানির প্রয়োজন হচ্ছে না। মানুষ বায়ুপ্রবাহকে কাজে লাগাচ্ছে অনেক দিন আগে থেকে। প্রাচীন মিসরের মন্দিরের গায়ে আঁকা থাকতে দেখা যায় পালতোলা নৌকার ছবি। যার বয়স ইতিহাস লেখকদের মতে, ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। বায়ুপ্রবাহ সৃষ্টি হয় সৌরতাপে। কারণ সৌরতাপ বিভিন্ন তাপমাত্রার সৃষ্টি করে। যেখানে তাপমাত্রা বেশি হয় সেখানে বাতাস হালকা হয়ে উঠতে থাকে ঊর্ধ্বমুখে। আর যেখানে তাপমাত্রা কম হয় সেখান থেকে ভারী বাতাস এসে স্খান নিতে চায় যেখান থেকে বাতাস ঊর্ধ্বমুখী হতে চাচ্ছে সেখানে। তাপমাত্রার তারতম্যের জন্যই সৃষ্টি হয় বায়ুপ্রবাহ। এই প্রবহমান বায়ুকে মানুষ কাজে লাগিয়েছে কল চালাতে (Wind Mill)। বায়ুচালিত কল এখন আবার নতুন করে প্রচলিত হতে যাচ্ছে। বায়ুচালিত কলে কোনো জ্বালানি লাগে না। মানুষ এখন সৌরশক্তিকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে বিশেষ রকমের আয়না তৈরি করে। সৌরশক্তিকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে।
সাহারা মরুভূমিতে বৃষ্টি হয় খুব কম। আকাশ থাকে না মেঘলা। একটি হিসাব অনুসারে, সাহারা মরুভূমিতে ২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় যে পরিমাণে সৌরতাপ এসে পড়ে, তার সাহায্যে যদি বিদ্যুৎশক্তি উৎপন্ন করা যায় তবে তার সাহায্যে মেটানো সম্ভব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বিদ্যুৎ চাহিদা। বেলজিয়াম একটা বড় দেশ নয়। বেলজিয়ামের ভৌগোলিক ক্ষেত্রফল ৩০,৫০৭ বর্গকিলোমিটার। সেখানকার একজন পণ্ডিত হিসাব করেছেন, সাহারা মরুভূমিতে তার দেশের এলাকার মতো একটি অংশে যে সৌরতাপ এসে পড়ে, তার শতকরা ০.৩ ভাগ সৌরশক্তিকে যদি তড়িৎ শক্তিতে পরিণত করা যায়, তবে তার সাহায্যে পূরণ করা সম্ভব বর্তমান ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যুৎ চাহিদা। মানুষ এখন চাচ্ছে জ্বালানি সঙ্কট দূর করতে। আর এ কাজে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সৌরশক্তিই হতে পারে সবচেয়ে বড় সহায়।
আমি এসব কথা বলছি একটি বিশেষ কারণে। নয়া দিগন্তে খবর প্রকাশিত হয়েছে (৪ জানুয়ারি) বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানী নাকি এমন একটা যন্ত্র বের করেছেন, যা চলবে বাইরে থেকে কোনো শক্তি সরবরাহ ছাড়াই। যন্ত্রটা চলবে তার আপন ওজনে। কিন্তু এ রকম যন্ত্র তৈরি আদৌ সম্ভব নয়। কারণ জিনিস নিচের দিকে গড়িয়ে আসে তার আপন ওজনে। কিন্তু তার ওজন তাকে ঊর্ধ্বমুখী করতে পারে না। এটা একটা প্রাকৃতিক নিয়ম যার ব্যত্যয় ঘটা সম্ভব নয়। তবে জ্বালানিবিহীন যন্ত্র চালানো যেতে পারে পানি ও বায়ুপ্রবাহের সাহায্যে। নয়া দিগন্তে (১ ফেব্রুয়ারি ২০১০) কোনো একজন সাংবাদিক লিখেছেন, ‘জ্বালানিবিহীন ইঞ্জিন তৈরি : উদ্ভাবককে সহযোগিতা করুন।’ কিন্তু বিজ্ঞানের যেকোনো ছাত্র বলবে, এ রকম সহযোগিতা কোনো বাঞ্ছিত ফল প্রদান করবে না। সেটা বুঝতে হলে জানতে হবে তাপ-গতিবিদ্যার (Thermodynamics) দ্বিতীয় সূত্রকে (2nd Law)। নয়া দিগন্তে খবর পড়ে জানলাম, বাংলাদেশে যিনি চেষ্টা করছেন জ্বালানিবিহীন কল চালাতে, যা নাকি চলবে কেবল নিজের ওজনে, তা বানানোর জন্য ইতোমধ্যেই তিনি ব্যয় করেছেন প্রচুর অর্থ। বিক্রি করেছেন তার স্ত্রীর ২০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার। তার যন্ত্র বানাতে আরো অনেক অর্থের প্রয়োজন। তিনি চাচ্ছেন বাংলাদেশ সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তা। কিন্তু তিনি যত অর্থই ব্যয় করুন না কেন, এ রকম যন্ত্র তৈরি কখনোই সম্ভব হবে না। কারণ এরকম যন্ত্র তৈরি করতে গেলে ভারী বস্তুকে আপনা থেকেই উঠতে হবে ওপর দিকে। সেটা অসম্ভব। তাপ প্রবাহিত হয় উচ্চ তাপমাত্রা থেকে নিু তাপমাত্রার দিকে। পানি প্রবাহিত হয় উঁচু স্খান থেকে নিচু স্খানে । কোন বস্তুকে গড়িয়ে দিলে সে উঁচু স্খান থেকে নিচু স্খানে গড়িয়ে যায়। নিচু স্খান থেকে উঁচু স্খান তাকে তুলতে হলে প্রয়োজন হয় শক্তির। আর সেই শক্তি আসতে হয় বাইরে থেকে। মানুষ ঠিক যন্ত্র নয়। সে নিচু জায়গা থেকে উঁচু জায়গায় উঠতে পারে আপন চেষ্টায়। কিন্তু এর জন্য শক্তির প্রয়োজন পড়ে। মানুষ আহার করে, তা থেকে সে লাভ করে তার কর্মশক্তি। খাদ্যের মধ্যে সঞ্চিত শক্তির ১০ থেকে ২০ শতাংশ মানুষ কাজে লাগাতে পারে। আর এর জন্য তাকে গ্রহণ করতে হয় খাদ্য। মানুষ খাদ্য গ্রহণ করে কর্মশক্তি লাভের জন্য। খাদ্য গ্রহণ করে তার দেহের বৃদ্ধি ও ক্ষয় পূরণের প্রয়োজনে। খাদ্য ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। যে মানুষ যত কঠোর পরিশ্রম করে তার খাদ্যের প্রয়োজন হয় তত বেশি। লেখার কাজে খুব বেশি শক্তির প্রয়োজন হয় না। গড়ে ঘন্টায় ২০ কেজি ক্যালরি পরিমাণ শক্তি এর জন্য যথেষ্ট। পক্ষান্তরে একজন রাজমিস্ত্রি যে কাজ করে তার জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ৩০০ কেজি ক্যালরি পরিমাণ শক্তি। অর্থাৎ যারা খুব খেটে খায় তাদের জন্য খাদ্যের প্রয়োজন বেশি। কিন্তু যারা বুদ্ধির কাজ বেশি করে, তাদের জন্য খাদ্যের প্রয়োজন হলো তুলনামূলকভাবে কম। যে লোক অফিসে বসে কাজ করে সে যা খায় তার অনেকটাই শ্রমে ব্যয় করে না। দেহে জমতে থাকে চর্বি। সে যায় মুটিয়ে। তাই আজ বলা হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষকে অধিক খেতে দেয়ার কথা। কল চালাতে শক্তি লাগে, বেঁচে থাকতেও শক্তির প্রয়োজন হয়। প্রাণীরা তাদের খাদ্যের জন্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে সবুজ গাছপালার ওপর। সবুজ গাছপালা খাদ্যবস্তু উৎপাদন করতে পারে সৌরশক্তির সাহায্যে। সৌরশক্তি হলো আমাদের শক্তির শেষ উৎস।
মানুষ এখন চাচ্ছে সৌরশক্তিকে সরাসরি কাজে লাগাতে। আর সৌরশক্তির সাহায্যে খাদ্যবস্তু উৎপাদন করতে। সৌরশক্তির সাহায্যে খাদ্যবস্তু উৎপাদন করতে পারলে মানুষকে আর খাদ্যের জন্য উদ্ভিদনির্ভর হয়ে থাকতে হবে না। মানুষ ইচ্ছামতো খাদ্যবস্তু উৎপাদন করতে পারবে তার ক্ষুধা সমস্যার সমাধান করতে। এ ক্ষেত্রে সে অনুকরণ করতে চাচ্ছে উদ্ভিদের সালোক সংশ্লেষণ পদ্ধতিকে। মানুষ অনেক রকম কলকব্জা বানিয়েছে। আর ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই সে আরো অনেক রকম কলকব্জা বানাবে, তার আপন প্রয়োজনে। কিন্তু এগুলো তাকে চালাতে হবে শক্তির সাহায্যে। এই শক্তি কয়লা, পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে না-ও আসতে পারে। এর একমাত্র উৎস হতে পারে সৌরশক্তি। অর্থাৎ ভবিষ্যতে যন্ত্র চালাতে কোনো জ্বালানির প্রয়োজন আর থাকবে না। এ রকম মনে করছেন অনেকেই। কিন্তু আমাদের দেশে যেমন অনেকে মনে করছেন এমন যন্ত্র বানানো সম্ভব , যা চলবে কেবল তার আপন ওজনে, তা একটা অলীক কল্পনা মাত্র। সেটা কখনোই হতে পারবে না । বিজ্ঞানের ইতিহাস যারা পড়েছেন তারা জানেন, ১৭৭৫ সালে ফরাসি বিজ্ঞান একাডেমি সে দেশের মানুষকে এ রকম কোনো যন্ত্র উদ্ভাবনের চেষ্টা করতে নিষেধ করে। কারণ তা হবে পণ্ডশ্রম মাত্র। এ রকম যন্ত্র উদ্ভাবন অসম্ভব। সম্ভবত আমরা এ ইতিহাস জানি না। তাই কেউ কেউ চেষ্টা করছি এ ধরনের যন্ত্র উদ্ভাবনের। আর বলছি, দেশের সরকারকে এ কাজে অর্থ জোগাতে। কিন্তু জনগণের অর্থ এভাবে ব্যয়িত হতে দেয়া সম্ভব নয়। উচিতও নয়।
অনেক আজব খবর অনেক দেশের পত্রিকাতেই প্রকাশিত হতে দেখা গেছে। ভারতে নাকি এমন সাধু বাবা আছেন যারা কোনো খাদ্য গ্রহণ না করে কেবল বিশেষ যোগ সাধনার মাধ্যমে বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে পারেন । তারা নাকি তাদের প্রয়োজনীয় শক্তি লাভ করেন তাদের দেহের পরমাণুকে ভেঙে। যেমন শক্তি নির্গত হয় পরমাণুর বোমা বিস্ফোরণের সময়। কিন্তু এটা একটা অসম্ভব ঘটনা। কারণ পরমাণু বোমার মতো কোনো বিস্ফোরণ শরীরের মধ্যে ঘটলে সে ব্যক্তি টিকবে না। পক্ষান্তরে মানুষ কেবল বাঁচতে পারে খাদ্যবস্তুর মধ্যে সঞ্চিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে। অন্য কোনো শক্তিকে সে কাজে লাগাতে পারে না। আমাদের শরীরে শক্তির রূপান্তর ঘটে বিশেষ নিয়মে। যারা সেটা জানে না তারাই কেবল সাধু বাবাদের খাদ্য গ্রহণ না করে বাঁচার কাহিনীকে বিশ্বাস করতে পারে। শক্তি সরবরাহ ছাড়া কল চালানোর ধারণা আর খাদ্যবিহীনভাবে মানুষের বেঁচে থাকার ধারণা হলো একই পর্যায়ে।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত ০৮/০২/২০১০]
http://www.sonarbangladesh.com/articles/IbnGolamSamad
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2010. E-mail: editor@sonarbangladesh.com.