|
বাঙালি মুসলমানের বাংলাপ্রীতি
এবিএম মুসা |
|
সপ্তদশ শতাব্দীতে একজন বাঙালি মুসলমান কবি লিখেছিলেন, ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী। সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’ কবি আবদুল হাকিম যখন এই পঙিক্তটি লেখেন তখন ভারতবর্ষে মোগল রাজত্ব, ফার্সি ও উর্দুর ব্যবহার ছিল দাফতরিক, সরকারি ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে। মাদ্রাসা আর মক্তবে আরবি চর্চা, হিন্দুদের টোলে সংস্কৃত। পালি ভাষার প্রচলন ছিল বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে। বাংলা ছিল পতিত, চাষাভুষোদের ভাষা। সেই ভাষা নিয়ে এখন বাঙালি গর্ব করে। প্রাণ দিয়েছে ভাষাকে মর্যাদাপূর্ণ আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে।
বস্তুত সমগ্র বঙ্গ দেশে নয়, চাষাভুষা, জেলে-মাঝিদের মাঝেই কয়েক শতাব্দী বাংলা ভাষা আপন অস্তিত্ব রক্ষা করেছে। এদের বসতি ছিল প্রধানত বাংলার পূর্বাংশে, যা এখন স্বাধীন বাংলাদেশ যা একসময়ে গৌড়-বাংলা বলে পরিচিত ছিল।
প্রাসঙ্গিকভাবে বলতে হয় এই গৌড়-বাংলার নবাব হোসেন শাহ পূর্ব বাংলার বাঙালিদের ভাষাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। এই অঞ্চলে বাংলার ব্যবহার ও প্রচলনের আরেকটি বাহন ছিল পুঁথিসাহিত্য। গ্রাম্য কবিরা মুখে মুখে কবিতা রচনা করতেন। নানা কাহিনী, রূপকথা ও কল্পকথা বাংলা ভাষায় ছন্দোবদ্ধ করে সাধারণ্যেও প্রসারিত করেছিলেন। সেই সব পুঁথিসাহিত্যই পরে সংগ্রহ করেছিলেন আলাওল ও আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ।
এই পুঁথিসাহিত্যের মাধ্যমেই কয়েক শতাব্দী মোগল আমলের ফার্সি আর ব্রিটিশ শাসনামলের ইংরেজির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকিয়ে রেখেছিলেন পূর্ব বাংলার মুসলমান ভাষাপ্রেমী কবি-সাহিত্যিকরা। এই প্রেক্ষাপটেই বলতে হচ্ছে, ভারত বিভক্তির পর পূর্ব বাংলার মুসলিম শিক্ষিত শ্রেণী অতীতের ধারা অনুসরণেই ভাষাপ্রেমে উদ্বেলিত হয়েছিল।
এক বছর আগে যারা উর্দু ভাষায় ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ আওয়াজ তুলেছিল, তারাই এই কারণে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ বলে রেসকোর্স ময়দানে মৃদু গর্জন করেছিল। অতঃপর তারা বিশ্ব ইতিহাস সৃষ্টি করল একটি ভাষাকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। সেই ভাষাটিই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বাংলা।
এ প্রসঙ্গে সমগ্র ভারতের অন্য ভাষাভাষীর ভাষা সম্পর্কীয় চিন্তাভাবনার সঙ্গে বাঙালির তথা পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের ভাবাবেগের পার্থক্যটি আলোচ্য হতে পারে। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারতীয় মুসলমানরা এক ধরনের আত্ম গরিমায় প্রভাবান্বিত হয়ে ইংরেজিকে বর্জন করেছিল। মজার ব্যাপার হল ভারতের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের মুসলমানরা ফার্সি-উর্দু চর্চা বজায় রাখলেও পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে বঙ্গীয় হিন্দু-মুসলমান মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহার অব্যাহত রাখে।
এর প্রথম কারণ হতে পারে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল অথবা ভারতের স্থানীয় অধিবাসীদের একক কোনো মাতৃভাষা ছিল না, অন্যদিকে উত্তর ভারতে ফার্সি-উর্দুতে কাব্যগাথা ও গজল-গানের চর্চা সাধারণভাবে একক চর্চার বাহনরূপে স্বীকৃতি লাভ করে। মোগল আমলে শাহী দরবারে অথবা সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতা লাভে এ দুটি ভাষা প্রকাশ পায়।
পূর্ব-উত্তর ভারতে সংস্কৃত, পালি ও প্রাকৃত ভাষা আপন মহিমায় বিস্তৃতি লাভ করে। ইংরেজ আমলের শুরু হয়েছিল পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলা আসাম-বিহারে। তাই এই অঞ্চলে ইংরেজির প্রচলনে কোনো সংস্কারের বাধা ছিল না। ইংরেজের শাসন পোক্ত করার জন্য ইংরেজি জানা কেরানি-কুল তৈরি হয় এই অঞ্চলে।
এরই মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণকারী অভিজাত সম্প্রদায় মাতৃভাষা বাংলা চর্চায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। বিদ্যাসাগর, রামমোহন, প্যারীচাঁদ ও বঙ্কিমচন্দ্র ইংরেজি বিদ্যার প্রভাবেই শেকসপিয়র, কিটস, কোলরিজদের ভাষারীতির অনুসরণে মাতৃভাষাকে সমৃদ্ধ করায় ব্রতী হন। তাদের কর্মের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলা ভাষায় মোশাররফ হোসেন ইসলামাবাদী আর সিরাজী মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে বাংলাপ্রীতির সূচনা করেন।
ভাষার ব্যবহারের সঙ্গে গবেষণারও যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে তা বাংলা চর্চার সূচনাকালেই পণ্ডিতবর্গ অনুধাবন করেন। এই তথ্যটি প্রথম আবিষ্কার করেন ড. শহীদুল্লাহ চর্যাপদের ব্যুত্পত্তি অনুসরণ করে। অন্যদিকে আদিতে সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, মোহিত লাল মজুমদার, নীহাররঞ্জন দত্ত, পরে আবদুল হাই প্রমুখ শিক্ষাবিদ বাংলা ভাষাকে শৈলী ও পরিশোধিত রূপ দিয়েছেন।
পরবর্তীকালে এই রূপান্তরই বাংলা ভাষা মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে অমূল্য একটি সম্পদরূপে গৃহীত হয়। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, হেমচন্দ্র ও শরত্চন্দ্র থেকে সুনীল, শক্তি, শামসুর রাহমান...যে সাধারণ মানুষের মাঝে বাংলাকে সহজপাঠ্য করে একটি মধুর রূপে রূপান্তরিত করেন। এইভাবে গড়ে ওঠে বাঙালির বাংলাপ্রীতি। তবে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানে প্রীতি বিভক্ত বাংলায় ভারতীয় বাঙালিরা অন্তরে ধারণ করে রাখতে পারেননি।
হিন্দির আধিপত্যে ভারতীয় বাংলাভাষী অঞ্চল থেকে বাংলা হারিয়ে গেছে। অপরদিকে ‘মায়ের ভাষা-প্রাণের ভাষা’ বাংলা আপন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত রয়েছে স্বাধীন দেশে, যা পুরোপুরি বাংলা ভাষা। যদিও আকাশ অপসংস্কৃতির বিস্তারের কারণে বাংলাদেশের বাঙালি নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষার বিকৃতি ঘটেছে, তবুও নিঃসন্দেহে বলা যায় বায়ান্নতে ভাষার জন্য প্রাণ উত্সর্গের মাহাত্ম্য বাংলাদেশে বাংলা ভাষা আপন গরিমায় বিস্তৃতি লাভ করবে।
অবাক করা ব্যাপার নয় কি? আদিতে বাংলা চর্চায় উল্লেখযোগ্য অবদান যারা রাখেনি, সেই বাঙালি মুসলমানরা আজ বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থানে আসীন করেছে। অথচ আদ্যিকালে যারা বাংলাকে বলত বিধর্মীদের ভাষা, আজ তারাই সেই বাংলাকে অন্তরে লালন-পালন করছেন। বাংলা এখন প্রধানত বাঙালি মুসলমানের ভাষা।
[সূত্র : সকালের খবর-০১/০২/২০১২] |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/ABMMusa |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|
বাংলাভাষার চর্চা কী পশ্চিমবঙ্গ থেকে একেবারেই উঠে গেছে? এর প্রমান কী কেউ দিতে পারবেন? না কি এটাও একটা ঢালাও প্রচার যে কাজটিতে আমরা সিদ্ধহস্ত। সারা ভারতে বাণিজ্যিক ভাষা হিসাবে ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দিরও প্রচলন বেড়েছে এবং একারণেই কোলকাতার দোকানপাটে হিন্দি শোনা যায় - এর মানে এই নয় যে ভারতীয় বাঙালিরা বাংলা ভুলে যাচ্ছেন। মনে রাখতে হবে যে উন্নতমানের বাংলা সাহিত্য এখনো পশ্চিমবঙ্গেই লেখা হয়। আমাদের এই অকারণ আত্নতৃপ্তি আমাদেরকে ক্রমশঃ পিছনের দিকেই নিয়ে যাবে।