|
ইসলামে হজ্জ ও ওমরা (পর্ব -৭)
আব্দুদ্দাইয়ান মুহাম্মদ ইউনুছ |
|
হজ্জের সফরে পাথেয় সংগে নেয়া
হজ্জের সফরে পাথেয় সংগে নেয়া বৈধ। কিন্তু জাহেলী যুগে এটাকে দুনিয়াদারীর কাজ মনে করা হতো। তাদের ধারণা মতে একজন ব্যক্তি দুনিয়ার কোন সম্বল সাথে না নিয়ে আল্লাহর ঘরের দিকে রওয়ানা হবে। এটাই ধার্মিকতার লক্ষণ। আল্লাহ তায়ালা তাদের এধারনাকে ভুল আখ্যায়িত করে কুরআনে ইরশাদ করেন; হজ্জ সফরের জন্য পাথেয় নিয়ে যাও আর সবচেয়ে ভালো পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া। কাজেই হে বুদ্ধিমানেরা! আমার নাফরমানী করা থেকে বিরত থাকো’ (বাকারা ১৯৭)। এ আয়াতের তাফসীরে মাওলানা মওদুদী (রহ) বলেন, ’’ এ আয়াতে তাদের ভূল চিন্তার প্রতিবাদ করা হয়েছে। তাদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে, পাথেয় না নিয়ে সফর করার মধ্যে মহাত্ম্য নেই। আসল মহাত্ম্য হচ্ছে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হওয়া, তাঁর বিধি-নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকা এবং জীবনকে পবিত্র, পরিচ্ছন্ন এবং কুলুষমুক্ত করা। যে ব্যক্তি সৎ চারিত্রিক গুণাবলী নিজের মধ্যে সৃষ্টি করে সে অনুযায়ী নিজের চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করেনি এবং আল্লাহর ভয়ে ভীত না হয়ে অসৎ কাজ করতে থাকে, সে যদি পাথেয় সংগে না নিয়ে নিছক বাহ্যিক ফকীরি ও দরবেশী প্রদর্শন করে বেড়ায়, তাহলে তাতে তার কোন লাভ নেই। আল্লাহ ও বান্দা উভয়ের দৃষ্টিতে সে লাঞ্চিত হবে। যে ধর্মীয় কাজটি সম্পন্ন করার জন্য সে সফর করেছে তাকেও লাঞ্চিত করবে। কিন্তু তার মনে যদি আল্লাহর প্রতি ভয় জাগরুক থাকে এবং তার চরিত্র নিষ্কলুষ হয় তাহলে আল্লাহর ওখানে সে মর্যাদার অধিকারী হবে এবং মানুষও তাকে মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখবে। তা খাবারের থলিতে খাবার ভরপুর থাকলেও তার এ মর্যাদার কোন কম-বেশী হবেনা (তাফহীম- বাকারাহ ২১৭ নম্বর টীকা)।
মুফতী শফী (রহ) বাকারার ১৯৭ নম্বর আয়াতের তাফসীরে বলেন, "এ আয়াতে ঐ সমস্ত ব্যক্তির সংশোধনী পেশ করা হয়েছে যারা হজ্জ ও উমরা করার জন্য নিঃস্ব অবস্থায় বের হয়ে পড়ে। অথচ দাবী করে যে আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করছি। পান্তরে পথে ভিক্ষাবৃত্তিতে লিপ্ত হয়। নিজেও কষ্ট করে এবং অন্যকেও পেরেশান করে। তাদের উদ্দেশ্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, হজ্জের উদ্দেশ্যে সফর করার আগে প্রয়োজনীয় পাথেয় সাথে নেয়া উচিত। এটা তাওয়াক্কুলের অন্তরায় নয়। বরং আল্লাহর উপর ভরসা করার প্রকৃত অর্থই হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত আসবাবপত্র নিজ নিজ সামর্থ অনুযায়ী সংগ্রহ ও জমা করে নিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করা। হুযুর (স.) থেকে তাওয়াক্কুলের এই ব্যাখ্যায় বর্ণিত হয়েছে। নিঃস্বতার নাম তাওয়াক্কুল বলা মুর্খতারই নামান্তর (মাআরেফ - বাকারা ১৯৭ নম্বর আয়াতের তাফসীর)।
হজ্জের সফরে উপার্জন করা
হজ্জের সফরে উপার্জনের জন্য কোন কাজ করা বৈধ।
এ প্রসংগে আল্লাহ ইরশাদ করেন, "আর হজ্জের সাথে সাথে তোমরা যদি তোমাদের রবের অনুগ্রহের সন্ধান করতে থাকো তাহলে তাতে কোন দোষ নেই’’। (বাকারাহ ১৯৮)।
মাওলানা মওদুদী এ প্রসংগে বলেন, ’জাহিলী যুগে হজ্জ সফর কালে অর্থ উপার্জনের কোন কাজ করাকে খারাপ মনে করা হতো। কারণ তাদের মতে, অর্থ উপার্জন করা একটি দুনিয়াদারীর কাজ। কাজেই হজ্জের মতো একটি ধর্মীয় কাজের মধ্যে এ দুনিয়াদারীর কাজটি করা তাদের চোখে নিন্দনীয় ছিল। কুরআন এ ধারণার প্রতিবাদ করছে এবং তাদের জানিয়ে দিচ্ছে, একজন আল্লাহ বিশ্বাসী ব্যক্তি যখন আল্লাহর আইনের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন করে নিজের অর্থ উপার্জনের জন্য চেষ্টা চালায় তখন আসলে সে আল্লাহর অনুগ্রহের সন্ধ্যান করে। কাজেই এক্ষেত্রে সে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সফর করতে গিয়ে তার মাঝখানে তাঁর অনুগ্রহের সন্ধানও করে ফেলে, তাহলে তার কোন গোনাহ হবেনা’ (তাফহীম- বাকরাহ ২১৮ নং টীকা)।
মীকাত বা ইহরামের জন্য নির্দিষ্টস্থান ও ইহরাম এর আনুসংগিক মাসায়েল
মীকাত শব্দটি আরবীতে এক বচন। এর বহুবচন হচ্ছে "আল মাওয়াক্কীত’’। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে সীমা, আল মাকান আল মুখতার অর্থাৎ নির্বাচিত স্থান, আল মাকান আল মুআয়্যেন অর্থাৎ নির্দিষ্টস্থান, আল মাকান আল মাহদুদ অর্থাৎ সীমিতস্থান ও আল ওয়াকত আল মুক্কাররার অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়। পরিভাষায় যে স্থান থেকে হজ্জ ও উমরা করার উদ্দেশ্যে ইহরাম করা হয় সে স্থান সমূহকে মীকাত বলা হয়।
আলিমগণী ফীল হাজ্জ ওয়াল উমরা গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে হজ্জের জন্য দুই ধরনের মীকাত রয়েছে।
১. মীকাত আযযামানী অর্থাৎ সময়ের মীকাত।
২. মীকাত আল মাকানী অর্থাৎ স্থানের মীকাত।
সময়ের মীকাত প্রসংগে পরে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ। এখন স্থানের মীকাত সম্পর্কে আলোচনা করবো।
যারা হজ্জ বা উমরার নিয়্যাত করেন তাদেরকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
১.যারা মক্কার বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে হজ্জ বা উমরা করতে যান।
২. যারা মক্কায় অবস্থান করে বা মীকাতের ভিতরে থাকেন
যারা মক্কার বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে হজ্জ বা উমরা করতে যান তাদের ইহরামের জন্য কয়েকটি স্থানের কথা হাদীসে উল্লেখ আছে। এছাড়া অন্যান্য দেশের মানুষ যারা এই স্থান সমূহের যে কোন একটি অতিক্রম করবে তারা সেখান থেকে হজ্জ বা উমরা ইহরাম করবে।
মক্কার বাইরের মানুষের ইহরাম এর জন্য নির্দিষ্টস্থান সমূহ হচ্ছে:
১. যুলহুলায়ফাহ-এটা কাবার উত্তর দিকে মদীনা হতে ৬/৭ মাইল দুরে অবস্থিত। যারা মদীনা শরীফের দিক থেকে আসে এটা তাদের মীকাত।
২. ইয়ালমলম- এটা মক্কা শরীফের দিন দিকে আরব সাগর তীরের অদূরের একটি পাহাড়। মক্কা থেকে ১২০ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত। যারা ইয়ামন থেকে আসেন এটা তাদের মীকাত। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াসহ দিন এশিয়ার যারাই এ পথে মক্কা গমন করবেন তাদেরকে এখান থেকে ইহরাম করতে হবে।
৩. জুহফা-সিরিয়া, লেবানন, জর্দান, ফিলিস্তীন, মিসর ও সে দিক থেকে গমনকারীদের জন্য এটা মীকাত। মক্কা শরীফ থেকে এর দুরত্ব ৪৫ মাইল।
৪. কারনুল মানাযিল-নজদবাসী বা ঐ পথে গমনকারীদের জন্য এটা মীকাত। মক্ক শরীফ থেকে পুর্ব উত্তর দিকে ৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সাধারণত ইরানসহ
৫. যাতুল ইরাক এটাইরাকবাসী বা এ পথে গমনকারীদের মীকাত। মক্কা শরীফ থেকে ৪২ মাইল পূর্ব উত্তর দিকে অবস্থিত।
যারা মক্কায় হেরেম এর মধ্যে অবস্থান করেন বা হেরেমের বাইরে মীকাতের ভিতরে থাকেন হজ্জ ও উমরার জন্য তাদের মীকাত কি এ সম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে কিছুটা ইখতিলাফ আছে।
ইমাম আবু হানিফার মতে মক্কায় বসবাসকারীদের জন্য হজ্জের ক্ষেত্রে মীকাত হলো হারাম শরীফ আর উমরার জন্য মীকাত হলো হেল। তিনি দলিল হিসাবে হযরত আয়েশা (রা) এর হাদীসকে পেশ করেন। রাসুলে কারিম (সা) তাঁকে তানয়ীম নামক স্থান থেকে ইহরাম বাঁধার আদেশ দিয়েছিলেন।
ইমাম শাফেয়ী (রহ) এর মতে যারা মক্কায় হেরেমের ভিতর বা হেরেমের বাইরে মীকাতের ভিতর বসবাস করেন তাঁদের হজ্জ ও উমরা উভয়টির মীকাত হলো হারাম শরীফ। তিনি দলিল হিসাবে একটি হাদীস পেশ করেন যার অর্থ হচ্ছে মক্কার অধিবাসীরা সেখান থেকেই ইহরাম বাঁধবে।
রাসুলে কারিম (স) এর মীকাত বা ইহরাম বাঁধার স্থান
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জের সময় যুল হুলাইফা থেকে ইহরাম বেঁধেছেন। তবে যুল হুলাইফার কোন স্থান থেকে ইহরাম বেঁধেছেন এ সম্পর্কে সাহাবীদের মধ্যে মতভেদ আছে।
হযরত আনাস (রা.) বলেন রাসুলে কারিম (সা.) মসজিদ থেকে বের হয়ে বাহনে আরোহন করে ইহরাম বেঁধেছেন।
ইবনে উমরের মতে একটি গাছের পাশে ইহরাম বেঁধেছেন।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন বায়দা নামক স্থানকে কেন্দ্র করে তোমরা রাসুলে কারিম (স.)কে জড়িয়ে (ইহরাম সম্পর্কে) অসত্য আরোপ করছো। আল্লাহর শপথ! মসজিদের কাছেই একটি গাছের পাশে ইহরামের তাকবীর ধ্বনি করেছিলেন (বুখারী ও মুসলিম)।
কারো কারো মতে রাসুলে কারিম (স.) আল বায়দা নামক স্থান থেকে ইহরাম বেঁধেছেন।
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন নবী (সা.) যখন হজ্জ করতে ইচ্ছা করলেন তখন লোকদের মাঝে ঘোষণা দিলেন। তারা একত্র হলো। তিনি বায়দা নামক স্থানে পৌঁছে ইহরাম বাঁধেন (তিরমিযি)।
জমহুর ওলামার বক্তব্য হচ্ছে যুল হুলাইফার যে স্থানটি নামাজের জন্য নির্দিষ্ট ছিল সেখান থেকে নামাজের পর রাসুলে কারিম (স.) ইহরাম বেঁধেছেন। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত নবী নবী (সা.) নামাযের পর ইহরামের তাকবীর উচ্চারণ করেন (তিরমিযি)।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের আরেকটি হাদীস থেকে রাসুলে কারিম (সা.) এর ইহরাম বাঁধার স্থান সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীসের বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। আবু দাউদ শরীফের কিতাবুল হজ্জ এর বাব ওয়াকতিল ইহরাম অধ্যায়ে হাদীসটি উল্লেখ আছে।
ইবনে আব্বাস বলেন, ’নবী (সা.) হজ্জের নিয়্যাত করে মদীনা থেকে রওয়ানা হন। যুল-হুলাইফার মসজিদে তুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করার পর ইহরাম বাঁধেন। কতিপয় লোক তা শুনেছে এবং আমি তা স্মরণ রেখেছি। তিনি তাঁর বাহনে আরোহন করার পর তা তাঁকে নিয়ে দাঁড়ালে সশব্দে লাব্বাইক পাঠ করেন। কিছুসংখ্যক লোক এটা শুনতে পেয়ে তারা মনে করেন যে, এই মাত্র নবী করিম (স.) ইহরাম বেঁধেছেন। লোকেরা বহু দলে বিভক্ত হয়ে পথ অতিক্রম করছিলো। অতপর তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে বায়দা নামক স্থানে পৌঁছে সশব্দে লাব্বাইক বললে এক দল লোক তা শুনে মনে করলো যে আল্লাহর নবী এখানেই ইহরাম বেঁধেছেন। রাসুলে কারিম (স.) মূলত যেখানে প্রথম নামায আদায় করেছেন সেখানেই ইহরাম বেঁধেছেন এবং সশব্দে লাব্বাইক উচ্চারণ করেছেন। অতপর তাঁর উট তাঁকে নিয়ে রওয়ানা হলে পুনরায় সশব্দে লাব্বাইক বলেন। অতপর তিনি বায়দার উচ্চভূমিতে পৌঁছে পূনরায় সশব্দে লাব্বাইক বলেন’। |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/ADMYounus |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|