বৃহস্পতিবার, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৭ মে ২০১২; রাত ১১:০২ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

ডক্টর মাহফুজুর রহমান আখন্দ এর রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষণা

এ কে এম আমিনুল ইসলাম স্বপন

গবেষণা হল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান বা কিছু আবিস্কারের নেশায় অনুসন্ধিৎসু মনের অনুসন্ধান। একটি গবেষণা বদলে দিতে পারে অনেক কিছুই। বয়ে আনতে পারে দেশের জন্য মঙ্গলময় সময় এবং অনিন্দ্য সুন্দর আনন্দময় পরিবেশ। চিহ্নিত করতে পারে দেশের মৌলিক সমস্যা। বলে দিতে পারে আগামীর পথ চলা। আদিম যুগ থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মানুষ গবেষণা করে আজ বিজ্ঞানের এ যুগে এসে পৌঁছেছে। প্রত্যেকটি মৌলিক গবেষণা নতুন নতুন তথ্য দিয়ে আমাদের আগামীর পথচলাকে সমৃদ্ধ করেছে। গবেষণাই সহযোগিতা করেছে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগোতে। তেমনি একটি সমৃদ্ধ মৌলিক গবেষণা ‘রোহিঙ্গা সমস্যা : বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি’। ইসলামিক ফাউণ্ডেশান বাংলাদেশ এর গবেষণা বিভাগ থেকে ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে এ গ্রন্থটি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও উৎসের অনুসন্ধানী গবেষক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ এ গ্রন্থের প্রণেতা।

মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর নাম ‘রোহিঙ্গা’। এই রোহিঙ্গা সম্প্রদায় প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের আরাকান প্রদেশের স্থায়ী অধিবাসী। “রোহিঙ্গা সমস্যা: বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি” গ্রন্থখানিতে গবেষক অত্যন্ত চমৎকার ভাষায় রোহিঙ্গা জাতির আগমন ও উত্থান সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। ইসলাম প্রচারের জন্য মহানবী (সাঃ) এর হিজরতের পূবেই অগ্রবর্তী দল হিসেবে কিছু মুসলমান আবিসিনিয়া গমন করেন। রাসুল (সাঃ) মাতা বিবি আমিনার চাচাত ভাই আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) ভারতের দক্ষিণ উপকূল হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বিভিন্ন নদী বন্দরে দীর্ঘদিন অবস্থান করে ইসলাম প্রচার করেন এবং ৬২৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি চীনের ক্যান্টন শহরে অবতরণ করেন। সেখানে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মসজিদের পাশে তাঁর মাজার আছে। প্রায় তখন থেকেই আরবীয় ধর্মপ্রচারক ও বণিকরা ইসলাম প্রচারের জন্য ব্যবসা বাণিজ্য উপলক্ষে ভারতবর্ষে আগমণ করতেন। অষ্টম ও নবম শতাব্দিতে ব্যবসা করতে বা ইসলাম প্রচার করতে আসা তেমনি একটি দল মিয়ানমারের রাহাম্বী দ্বীপের নিটক বিধ্বস্ত হলে তারা সেখানে আশ্রয় নিয়ে বসতি স্থাপনের অনুমতি পায়। সেই সময় থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত তারা আরাকানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। সামন্ত রাজাদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আরাকানে শান্তি বিনষ্ট হলে বর্মীরাজ তা দখল করেন। এসময় তিনি অসংখ্য লোক হত্যা করেন এবং অনেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

গবেষক মাহফুজুর রহমান আখন্দ তার এ গ্রন্থে আরাকানের মুসলমানদের বসতি স্থাপনের শুরুর ইতিহাস অল্প কথায় অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে এনেছেন। আরাকানিরা মূলত ১৮২৩ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত বৃটিশ শাসনের অধিনে শান্তিপূর্ণ বসবাস করার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৮ সালে বৃটিশ সরকার বার্মাকে স্বাধীনতা দানের পূর্বে তাদের চিরাচরিত রেওয়াজ অনুযায়ী কাশ্মির সমস্যার মত, ডুরাল্ড লাইনের মত এখানেও অত্যন্ত কৌশলে রোহিঙ্গা ও মগদের মধ্যে বিভেদের সূত্রপাত ঘটায়। ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বর্মীসেনা ও মগরা রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন করেছে এবং যার প্রেক্ষিতে তারা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে এ দেশের জন্য একটি সমস্যা তৈরি করেছে তা গবেষক অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন। মূলত ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের দেশহীন বলে চিহ্নিত করেছে। ফলে নিজ দেশেই তারা পরবাসী হয়ে জীবন যাপন করছে। নির্যাতনে বাংলাদেশে ‘পুশইন’ এবং এ দেশের পক্ষ থেকে পুশব্যাক হলো তাদের জীবনগাঁথা। রোহিঙ্গা সমস্যা শুধুমাত্র বাংলাদেশের সমস্যাই নয় এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। বর্তমানে পত্রপত্রিকাগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই রোহিঙ্গা সম্পর্কিত কোন অপ্রীতিকর ঘটনার পাওয়া যায়। দেশের সরকারকে সতর্ক করে অনেক খবর পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হচ্ছে। রোহিঙ্গা সমস্যা দেশের অন্তরালের একটি সমস্যা যা ক্রমশ ঘনীভুত হচ্ছে। এ সমস্যা এতদিন শুধুমাত্র কক্সবাজার জেলার মানুষ অত্যন্ত কাছে থেকে অনুভব করত। কিন্তু মাহফুজুর রহমান আখন্দ তাঁর গবেষণায় ইসলামিক ফাউন্ডেশান প্রকাশিত বইখানি সারা দেশের মানুষের মগজে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। ১লা জুন ২০১০ তারিখের bdnews24.com পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানাযায়, জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত “রোহিঙ্গা সমস্যা: বাংলাদেশের জন্য সমাধানের উপায়” শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এখানে খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক রোহিঙ্গাদের নতুন করে নিবন্ধন করতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন এর উদ্যোগের বিরোধীতা করেন। কারণ শরনার্থীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সীমিত সম্পদের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তিনি আরও মনে করেন নতুন করে নিবন্ধন করা হলে বেশি করে রোহিঙ্গারা প্রবেশ করবে। অথচ ড. আখন্দ আরও ৫ বছর আগেই তার গবেষণায় বিষয়গুলি গ্রন্থখানির ১৮৩-১৮৮ পাতায় “রোহিঙ্গারা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আসায় এদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা হুমকির সম্মুখিন হচ্ছে কি না” বা কোন ধরনের সমস্য হচ্ছে ইত্যাদি বিষয় অত্যন্ত পরিস্কারভাবে তুলে এনেছেন।

২২৫ পৃষ্ঠার বইখানিতে গ্রন্থকার সাতটি অধ্যায়ে সাজিয়েছেন। প্রথম অধ্যায়ে রোহিঙ্গা সম্পর্কিত বেশ কিছু দুর্লভ গ্রন্থের পর্যালোচনা স্থান পেয়েছে।
গ্রন্থখানির দ্বিতীয় অধ্যায়ে আরাকান ও রোহিঙ্গাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে এনেছেন। ভৌগলিক দিক থেকে আরাকান ৭০ ভাগ বনভূমি ও পর্বতময় এলাকা। এখানকার ভৌগলিক অবস্থা, উৎপাদন, উৎপাদিত ফসল ইত্যাদি বিষয় সুন্দরভাবে স্ববিস্তারে তুলে আনা হয়েছে। আরাকানে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস এবং সেই সাথে খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৬৬ থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত রাজবংশ, শাসনকাল ও রাজধানী বিষয়ে একটি সারণিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আরাকানে মুসলমানদের আগমনের ইতিবৃত্তে মুসলমান রাজাদের নামের তালিকা সম্বলিত একটি সারণি সংযোজন করে সমৃদ্ধ করা হয়েছে; যাতে ১৬৪৫ থেকে ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মুসলিম শাসনামলের বিভিন্ন বিষয় কবি দৌলত কাজী, কবি আলওলের বিভিন্ন কবিতার পংক্তিমালা ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এখানে পর্তুগীজদের আগমন, তাদের দস্যুবৃত্তি এবং সেইসাথে মগদের জোগসাজস ও তাদের হাতে সাধারণ মুসলিম-হিন্দুদের নির্যাতন, মোগল যুবরাজ শাহ সুজার স্বপরিবারে হত্যার লোমহর্ষক ইতিহাসও চিত্রিত হয়েছে। এখানে অনুসন্ধানী লেখক একেবারে শেকড়ে যাবার চেষ্টা করেছেন এবং সফলভাবে তা বর্ণনা করেছেন।

গ্রন্থখানির তৃতীয় অধ্যায়ে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত আলোচনা করা হয়েছে; যাতে রোহিঙ্গা সমস্যার স্বরূপ উদঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে জাপানী শাসনামলে বর্মীদের ভূমিকা, বৃটিশ শাসনামলে বার্মা ও রোহিঙ্গাদের অবস্থান তুলে ধরা হয়। মূলত স্বাধীনতা উত্তর আরাকানে নেমে আসে রোহিঙ্গাদের উপর চরম বিপর্যয়। বৃটিশ সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে রোহিঙ্গাদের সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করে মগদের উস্কে দেয়। পরবর্তীতে বিটিএফ গঠন করে আরাকানের মগ ডেপুটি কমিশনার বুদ্ধিজীবি, গ্রাম প্রধান, উলামাসহ হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে তাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে নারকীয় অধ্যায়ের সুচনা করে। পরবর্তীতে বর্মী সরকারের উচ্ছেদ অভিযান ও নির্যাতনের প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের সরকারের কাছে দাবী উপেক্ষিত হলে তারা মোহাম্মদ জাফর হুসাইন কাওয়ালের নেতৃত্ব মুক্তির আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলন ধীরে ধীরে মুজাহিদ আন্দোলনে রূপ নেয়। এভাবে আন্দোলন যত বৃদ্ধি পায় সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন বৃদ্ধি পায়। ১৯৬০ সালে জেনারেল নে উইন সরকারের আমলে রোহিঙ্গাদের বেপরোয়া উচ্ছেদ অভিযান শুরু করলে প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকায় পালিয়ে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। ১৯৬৬ সালের পর বার্মা সামরিক বাহিনী রাতের অন্ধকারে অস্ত্রের মুখে মুসলিম নারীদের শ্লীলতাহানিসহ নানা নির্যাতন চালায়। তাদের দৃষ্টিতে মুসলিম নারীদের শ্লীলতাহানি মোটেই অপরাধ নয়। সরকারের নির্যাতনে ১৯৭৮ সালে প্রায় আড়াইলাখ রোহিঙ্গা তাদের ঘর বাড়ী ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেই সময় নির্মমভাবে ১০ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। বার্মা সরকারের রোহিঙ্গা নির্যাতন বিশ্বের যে কোন নৃশংসতাকে ছড়িয়ে গেছে। ১৯৪২ সাল থেকে বিভিন্ন নির্যাতনের ধারাবাহিক যে পরিসংখ্যান বিভিন্ন বই পত্র, পত্র-পত্রিকা থেকে সংগৃহীত হয়েছে তা প্রশংসার দাবীদার এবং যা লেখকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল।

রোহিঙ্গারা সামরিক বাহিনী ও মগদের অকথ্য নিযাতন সইতে না পেরে বিভিন্ন সময় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করে। ১৯৭০ সালে তারা Rohingya Independence Front গঠন করে এবং পরে তারা ১৯৭৩ সালে Rohingya Liberation Front নামে আরও একটি দল গঠন করে। মুক্তি সংগ্রামের জন্য রোহিঙ্গারা সব রকমের চেষ্টা করলেও নেতৃত্ব, সংগঠনিক দুর্বলতা ও বাস্তবতা বিবর্জিত চিন্তা ও ইসলাম বিদ্বেষী আন্তর্জাতিক মহলের অসহযোগিতা জন্য তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। দেয়ালে পিঠ ঠেকলে মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে শেখে। রোহিঙ্গাদের বেলাতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। এখানে রোহিঙ্গারা নির্যাতন সহ্য করে ঘুরে দাঁড়াতে শিখলেও তারা কেন সফলতার মুখ দেখেনি এবং কি কারণে তাদের অবশেষে নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করতে হয়েছে সে বিষয়গুলি ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ অত্যন্ত পরিস্কার ভাষায় উপস্থাপন করেছেন; যার বাস্তবতা প্রতিটি পাঠকের মর্মস্পর্শ করবে।

গ্রন্থখানির চতুর্থ অধ্যায়ে গ্রন্থকার রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। মিয়ানমার বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশি রাষ্ট্র। সে কারণেই রোহিঙ্গারা বারবার মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের মূখে টিকতে না পেরে জীবন বাঁচানোর জন্য বাংলাদেশের সীমান্তের জেলাগুলোতে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। বৃটিশ শাসিত বাংলা থেকে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গা সমস্যার মোকাবিলা করেছে। ১৯৭৪ সালের বহিস্কৃত রোহিঙ্গাদের ফেরতের জন্য তদানীন্তন সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চরমপত্র প্রদানের প্রেক্ষিতে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ১৯৭৮ সালের আবারো চরম নির্যাতনের মাধ্যমে আড়াই লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করে। সেই সময়ের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বক্তব্য এবং তার প্রেক্ষিতে দু’দেশের মধ্যে আলোচনার সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু তাতে কোন সুষ্ঠু সমাধান না হলেও উভয় দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সাক্ষরিত হয়। এখানে গ্রন্থকার ১৯৭৮ সালের পর রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সরকার ভূমিকা কি ছিল তা সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। বাংলাদেশ সরকাররে প্রতিদিনকার কর্মকান্ড, বক্তব্য সমস্ত জাতীয় ও দেশী বিদেশী পত্র-পত্রিকার উদৃতি দিয়ে উল্লেখ করেছেন। যাতে এ গ্রন্থকারের অক্লান্ত পরিশ্রম করে একেবারে প্রাইমারী সোর্স থেকে তথ্য সংগ্রহ করে মুল ঘটনাবলী উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী সময়ে দ্বিপক্ষিয় ফলপ্রসু আলোচনার মাধ্যমে ১৯৯১ সালে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরের যে তালিকা এবং তাদের প্রদেয় রিলিফের যে তালিকা প্রদান করা হয়েছে তাতে গবেষক পররাষ্ট্র মন্ত্রণায়ের ফাইল নাম্বার উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনাবলীর জন্য সরাসরি জাতীয় পত্রিকাসমুহের মন্ত্রণালয়ের নথির উদ্বৃতি দিয়েছেন। সুতরাং এ গবেষণার প্রায় প্রতিটি পাতায় পাতায় গ্রন্থকার, গবেষক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ছাপ রেখেছেন এবং রোহিঙ্গা সমস্যার একেবারে উৎসমূলের কাছাকাছি গিয়ে সম্পূর্ণ প্রাথমিক তথ্যে গবেষণা কর্মটি সমৃদ্ধ করেছেন।

গ্রন্থটির পঞ্চম অধ্যায়ে গবেষক পত্র-পত্রিকার ভাষায় রোহিঙ্গা সমস্যার বিশদ বিবরণ উল্লেখ করেছেন। পত্রিকার মাধ্যমে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিজেদের উপর নির্যাতনের বর্ণনা তুলে ধরেছেন। রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করে মগদের প্রত্যাবর্তন এবং তাদের খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয় আবার রোহিঙ্গাদের উপর। ড. মাহফুজুর রহমানের গবেষণা উঠে এসেছে প্রবাদের সেই সত্যিকারের মগের মুল্ক। এখানে রোহিঙ্গাদের বাধ্যতামূলক জবরদস্তির মাধ্যমে শ্রম দিতে হয়। একস্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের উপর নিষেধাজ্ঞ আরোপ করা হয়। পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়। রোহিঙ্গাদের বাড়ী ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। জোর পূর্বক চাঁদা আদায় করা হয়। রোহিঙ্গাদের কারণে অকারণে গ্রেফতার করা, অপহরণ করা, বাড়ী ঘর লুণ্ঠন করা, মুসলিম নারীদের নির্যাতন করা, ধর্ষণ করা ইত্যাদি বিষয় বার্মা সরকারের নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়। এসব লোমহর্ষক ঘটনার বাস্তবভিত্তিক বিবরণ উঠে এসেছে এ গ্রন্থখানিতে। এসব ঘটনা এতই বেশি বেদনার যা; পড়লে যে কোন পাঠকই একসুরে বলবেন মগদের এ নির্যাতন পৃথিবীর যে কোন অমানবিক ঘটনাকে হার মানিয়েছে। এবং এ থেকে পরিস্কার হয়ে উঠেছে আরাকানের সরকার মুসলিম নিধনে কতখানি তৎপর।

গ্রন্থাখানির ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে রোহিঙ্গা সমস্যা ও বাংলাদেশের ভূমিকা বিষয়ে গবেষক ড. মাহফুজুর রহমান সচেতন জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করেছেন। এখানে তিনি পত্র-পত্রিকার অসংখ্য উদ্বৃতি, সরকারী বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ, বিভিন্ন ভাষায় প্রণীত বইয়ের উদ্বৃতি দিলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় যাদের অংশীদারিত্ব আছে কিংবা যাঁরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করে থাকেন তাদের মধ্যে শিক্ষাবিদ, কবি-সাহিত্যিক-কলামিষ্ট, পেশাজীবি, রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করেন এমন এনজিও কর্মকর্তা, ওলামা, আমলা ও রাজনীতিবিদ এর মধ্যে ৪০জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তির সাক্ষাতকার গ্রহণের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। এখানে গবেষণায় তিনি একটি নতুনত্বের ছাপ রাখা চেষ্টা করেছেন এবং সফল হয়েছেন। ইতিহাস গবেষণায় বাস্তবভিত্তিক এরূপ প্রাথমিক তথ্য খুবই ব্যতিক্রম ও গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন জনগোষ্ঠীর দৃষ্ঠিভঙ্গি উল্লেখ করার জন্য তিনি এমনভাবে প্রশ্নমালা সাজিয়েছেন যাতে করে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অর্থাৎ বাংলাদেশের দৃষ্ঠিভঙ্গি উঠে আসে। যেমন রোহিঙ্গারা আরাকানের কোন ধরনের নাগরিক? রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আরাকানে শত শত বছর ধরে বসবাস করলেও বিভিন্ন সময় সরকার তাদের উচ্ছেদের জন্য, মুসলিম নিধনের জন্য বিভিন্ন আইন ও নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে এবং দেশ থেকে বিতাড়িত করে। কিন্তু এ প্রশ্নে ৯৫ভাগ সচেতন মানুষ মনে করে রোহিঙ্গারা আরাকানের নাগরিক। এখানে উল্লেখ্য যে, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। কিন্তু আরকানে মুসলমানরা শত শত বছর ধরে বাস করেও তারা উদ্বাস্তু, নিপীড়িত ও নির্যাতিত ও ভাসমান নাগরিক। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে পান থেকে চুন খসলেই মানবাধিকার সংস্থাগুলো সোচ্চার হয়ে ওঠে। অথচ মিয়ানমারের সামরিক জান্তা অকাতরে মুসলিম নিধন করছে অথচ বিশ্ববিবেক ঘুমিয়ে আছে। এ গ্রন্থে গ্রন্থকার এ বিষয়টিই বারবার তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

রোহিঙ্গাদের উপর সামরিক সরকার কর্তৃক যে নির্যাতন চলছে এ বিষয়ে সচেতন জনগোষ্ঠীর ৯৭ ভাগ বিষয়টি সত্য বলে মনে করেন বলে জানিয়েছেন। এখানে গবেষক রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লংঘন, সামরিক শাসনই তাদের সমস্যার কারণ কি না? রোহিঙ্গারা এ দেশে আসায় দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা হুমকির মুখে পড়ছে কি না, এর সমাধানে বাংলাদেশের ভূমিকা কি? ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সচেতন জনগোষ্ঠীর মতামতে উঠে এসেছে। এ সাক্ষাতকার গ্রহণের সময় গবেষক দুর থেকে নয় অত্যন্ত পরিশ্রম করে রোহিঙ্গাদের উদ্বাস্তু পল্লীতে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলে, বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন। এ গবেষণায় ৬০ এর দশক থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় সকল পত্রিকার হাজার খানেক উদ্বৃতি ব্যবহার করেছেন। বাংলাদেশ সরকারের সাথে বিভিন্ন সময়ের চুক্তি, স্মারক ইত্যাদি স্ববিস্তারে তুলে এনেছেন। এছাড়াও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে প্রণীত সকল আইনের উদ্বৃতি ব্যবহার করেছেন; যা সংগ্রহ করা মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। আরাকানের উপর লেখা বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় লেখা অসংখ্য গ্রন্থের উদ্বৃতির ব্যবহারও চাহিদার থেকেও অনেক বেশি। জসিম উদ্দিনের কবিতায় যেমন পল্লী বাংলার রূপ বৈচিত্র ফুটে উঠে, জয়নুলের চিত্র কর্মে যেমন বাংলার দুর্ভিক্ষ ফুটে উঠেছে; চিত্রকরের তুলির টানে টানে যেমন আবহমান বাংলা চিত্রিত হয় তেমনি ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দের গবেষণায় রোহিঙ্গা সমস্যার পরিচ্ছন্ন রূপ পরিস্ফুটিত হয়েছে। মূলত সভ্য পৃথিবীর মানবতার কাছে রোহিঙ্গাদের আহাজারি পৌছে দেয়ার জন্য ড. আখন্দের এ গবেষণা সফল ভূমিকা পালনে সামর্থ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। গ্রন্থ প্রকাশের সময় বানানের ব্যাপারে আরো সর্তকতা অবলম্বন করা জরুরী ছিল। ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ এর গবেষণা বিভাগের মতো দায়িত্বশীল প্রকাশনা সংস্থার পক্ষে বানান বিভ্রাট সত্যিই বেদনাদায়ক। তদুপরি নির্যাতিত মানুষের কথা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেবার মতো মহৎ দায়িত্ব পালনের জন্যে ফাউণ্ডেশন কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাতেই হবে।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/AKMAminulIslamShapom
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
মিরপুর, ঢাকা থেকে ড. শামীম চৌধুরী লিখেছেন, ১৫ জানুয়ারি ২০১১; রাত ১১:৩৬
ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দকে জানি লেখলেখির মাধ্যমেই। তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ পড়েছি অনেক। ‌'রোহিঙ্গা সমস্যা : বাংলাদেশের দৃষ্টিভংগী' গ্রন্থটি পড়েছি। সেখানে মো: মাহফুজুর রহমান লেখা আছে লেখকের নামে। তাই বুঝতে পারিনি যে এ মূল্যবান বইটির লেখকও তিনি। আজকে প্রবন্ধটি পড়ে বিষয়টি জানা গেল। খুব ভালো লাগলো।
জনাব একেএম আমিনুল ইসলামকেও ধন্যবাদ একজন গবেষককে মূল্যায়ন করার জন্যে।
ভালো থাকুন ড. আখন্দ
45871
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড. মো. কামাল উদ্দিন লিখেছেন, ২৮ জানুয়ারি ২০১১; সন্ধ্যা ০৭:১৫
মাহফুজ ভাইয়ের লেখাগুলো খুবই ভালো লাগে। আরও বেশি বেশি কাম্য। একই সাথে তাঁর পিএইচ. ডি গবেষণার বিষয়টি মূল্যায়নের জন্য আমিনুল ইসলামকেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
46995
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড. মো. কামাল উদ্দিন লিখেছেন, ২৮ জানুয়ারি ২০১১; সন্ধ্যা ০৭:৩৬
মাহফুজ ভাইয়ের লেখাগুলো খুবই ভালো লাগে। আরও বেশি বেশি কাম্য। একই সাথে তাঁর পিএইচ. ডি গবেষণার বিষয়টি মূল্যায়নের জন্য আমিনুল ইসলামকেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
46999
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 
লেখকঃ
পিএইচ ডি ফেলো, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রভাষক, পীরগাছা কলেজ, রংপুর।

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy