|
প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীতে- বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ এম.এন হাবীব উল্লাহ্ স্মরণে
এ. এম জিয়া হাবীব আহ্সান |
|
গত ২৮ এপ্রিল ২০১১ইং শুক্রবার (বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই অধ্যক্ষ এম.এন. হাবিব উল্লাহ্ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সাউথ পয়েন্ট স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ এম. এন হাবীব উল্লাহকে আমি একজন বড় ভাই হিসেবেই পেয়েছিলাম। তাঁর মৃত্যু সংবাদ আমাকে কিছুক্ষণের জন্য স্থম্ভিত করে রেখেছিল। পরে মনকে স্থির করে তার রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করলাম। হাবীব ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদটি তাঁর প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিঃ এর পরিচালক বন্ধুবর এডভোকেট মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিনের মাধ্যমে সংগঠনের সকল কর্মকর্তা ও সদস্যদের জানিয়ে দিলাম। ঐ মুহূর্তে সোসাইটির মতিঝিলস্থ অডিটরিয়ামে সোসাইটির ৩৪তম বার্ষিক সাধারণ সভা চলছিল। সভায় সাথে সাথে মরহুমের (বুক সোসাইটির সাবেক পরিচালক) স্মরণে শোক প্রকাশ ও রুহের মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। ঐ দিন শুক্রবার এগারোটায় হযরত খাজা গরীবুল্লাহ শাহ্ (রহঃ) এর মাজার প্রাঙ্গনে এবং কক্সবাজার শহরের গোল দিঘীর পাড়স্থ গোরস্থানে আসরের নামাযের পর দ্বিতীয় জানাযা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এম.এন হাবীব উল্লাহর সাথে আমার দেড় যুগ ধরে পরিচয়। আমার অপর শ্রদ্ধাভাজন পিতৃতুল্য মুরুব্বী মরহুম ইঞ্জিনিয়ার মুনাওয়ার আহমদ এর মাধ্যমে প্রথম তাঁর সাথে আমার পরিচয়ের সূত্রপাত। পরিচয়ের পর থেকে তিনি সর্বদা আমাকে একজন ছোট ভাই হিসেবে স্নেহ করতেন এবং তাঁর থেকে বিভিন্ন সময় মূল্যবান পরামর্শ ও চলার পথে দিক নির্দেশনা পেয়ে এসেছি। তিনি প্রায়ই আমাকে জ্ঞানীগুনী ও সৎ মানুষদের সংস্পর্শে থাকতে পরামর্শ দিতেন।
বাংলাদেশের বৃহত্তম ও প্রাচীনতম প্রকাশনা সমবায় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিঃ এর পরিচালক (লিগ্যাল) থাকা কালে তিনি উক্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (প্রশাসন) ছিলেন। সে সময় সাবেক সচিব আলহাজ্ব এ.জেড এম শামসুল আলম, ড. মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান, ইঞ্জিনিয়ার মুনাওয়ার আহমদ, অধ্যক্ষ এম.এন হাবীব উল্লাহ, এডভোকেট শফিক আহমদ, আলহাজ্ব নুরুল্লাহ, বেনাউল ইসলাম, প্রফেসর ফজলুর রহমান সহ বহু জ্ঞানী গুণীজনের সাথে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পাই। সোসাইটির মিটিং গুলোতে হাবীব ভাই আমাকে পাশে বসাতেন এবং ফাঁকে ফাঁকে বুদ্ধিবৃত্তিক রঙ্গরস করতেন। তিনি আমাকে বলতেন ‘‘তুমিও আইনজীবীর ছেলে আমিও আইনজীবীর ছেলে, এদিক দিয়ে তোমার সাথে আমার মিল আছে’’। আমি বলতাম, ‘‘হাবীব ভাই আপনার সাথে আমার নামেরও মিল আছে’’। এই সদালাপি নিরহংকারী, সহজ-সরল জ্ঞানী মানুষটি হঠাৎ এইভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন তা কখনো ভাবতে পারিনি। মৃত্যুর বছর খানেক আগে তাঁর সাথে তাঁর ছোট ছেলে রায়হানের বিয়েতে আমার সরাসরি শেষবার দেখা হয়েছিল। এরপর টেলিফোনে যোগাযোগ থাকলেও তাঁকে আর সামনা সামনি দেখিনি। তাঁর জানাযায় অংশ নিতে না পেরে মনটা খুব বিষন্নতায় ভুগছিল। কেননা তখন আমি চট্টগ্রামের বাইরে ছিলাম। ইনশাআল্লাহ্ এবার কক্সবাজার গেলে তাঁর কবর জেয়ারতের জন্য মনস্থির করে রেখেছি। ‘‘রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস’’ গ্রন্থের লেখক হিসেবে এম.এন হাবীব উল্লাহকে সারাদেশে অনেকেই চিনেন। ঐ পুস্তকে তিনি আরাকান তথা রোহিঙ্গা জাতির এবং আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্যের ইতিহাস তুলে ধরেন।
তিনি আমাদের রোহিঙ্গা স্মরণার্থী ইস্যুকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও রাষ্ট্র সমূহের দৃষ্টিতে আনার চেষ্টা করেন তার লেখনীর মাধ্যমে। বাংলাদেশী লেখকদের মধ্যে তিনিই রোহিঙ্গাদের নিয়ে সর্বাধিক প্রবন্ধ রচনা করেন। তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী লেখক ও গবেষক। ১৯৪৭ সালে ৩রা ফেব্রুয়ারী কক্সবাজারের পোকখালী গ্রামে তাঁর জন্ম। মরহুমের পিতা মরহুম আলহাজ্ব আব্দুল জলীল, এডভোকেট এবং মাতা নুরবাহার বেগমের চারপুত্র ও চারকন্যার মধ্যে তিনি দ্বিতীয় সন্তান। লেখা-লেখি তাঁর নেশা ছিল। সময়ের তাগিদে, বিবেক এবং প্রয়োজনের খাতিরে, দেশের জন্য মানবতার জন্য তিনি লিখতেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন অধ্যাপক। গণিত শাস্ত্রে এম.এস.সি প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর সরকারী কলেজে অধ্যাপনায় নিযুক্ত হন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস একাডেমীতে উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং লন্ডনের রয়েল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক এডমিনিষ্ট্রেশন হতে ম্যানেজম্যান্ট অব ট্রেনিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে কক্সবাজার কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ২০০৪ সালে সরকারী সিটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সাউথ পয়েন্ট স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এই সময়ে চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র জামালখান এস. এস খালেদ রোডে অবস্থিত ন্যাশনাল কারিকুলাম ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-সিভিএনএস প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার ব্যাপারে অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. ফাতেমা নার্গিস এবং প্রফেসর অধ্যক্ষ এম. এন হাবীব উল্লাহ আমাদের কে সুপরামর্শ এবং গাইডলাইন দিয়ে আসছিলেন। কর্মজীবনে মরহুম এম. এন হাবীব উল্লাহ ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর উপ-পরিচালক, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ-চট্টগ্রাম এর বিভাগীয় প্রধান, বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং সরকারী হাতিয়া দ্বীপ কলেজের অধ্যক্ষ সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সততা ও দতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তিনি বৃদ্ধ মা, দুই ছেলে, এক কন্যাসহ অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখে যান। তাঁর মৃত্যুর মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ০৭/১২/১১ইং তারিখে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মিসেস হোসনে আরা বেগমও ইন্তেকাল করেন। (ইন্নানিল্লাহি ............. রাউজেউন)। সম্প্রতি মরহুমের বড় ছেলে ইমরান হাসান বিন হাবিব তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে আমাকে তার মরহুম পিতার রেখে যাওয়া অর্থ বিত্ত উত্তোলনে সাকসেশনে মামলা দায়েরের দায়িত্বভার অর্পণ করেন। এ মামলা চালাতে গিয়ে দেখেছি প্রিয় হাবিব ভাই জীবনে সততা ও ন্যায় নিষ্ঠার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একজন মানুষ। তাঁর ব্যাংক হিসাবে চাকুরীলব্ধ পেনশন ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধার বাইরে কোন টাকা পয়সা রেখে যাননি। এতে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরো বেড়ে যায়। আমি মহৎ প্রাণ এই প্রিয় মানুষটির রুহের মাগফেরাত কামনা করছি তাঁর সৎ কর্মের বিনিময়ে আল্লাহু রাব্বুল আলামীন যেন তাকে জান্নাতে নাসিব করুন;- আমিন।
লেখকঃ বিশিষ্ট আইনজীবী, প্রবন্ধকার, সু-শাসন ও মানবাধিকারকর্মী |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AMZiaHabibAhsan |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|