বৃহস্পতিবার, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৭ মে ২০১২; রাত ১১:০৮ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
ইউনুস ও বিশ্ব গণ মাধ্যমে বাংলাদেশ (০২/০৪/২০১১)
ইউনুসরা ভালো নেই (২৬/০৩/২০১১)
পৌর নির্বাচন ফলাফল বিশ্লেষণ: বিপর্যয় এবং ওলট পালট (এক) (২২/০১/২০১১)
ডিজিটাল দুঃশাসনের প্রামান্য দলীল: পাবনা নাটোর সিরাজগঞ্জ (১৬/১০/২০১০)
ডিজিটাল দলীয়করণ স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সত্য বচন (২৫/০৯/২০১০)
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারুক হত্যাকান্ড (২৮/০৮/২০১০)
প্রিয় কবি মল্লিক আর নেই (১৪/০৮/২০১০)
আজ একজন ড. জোহার বড়ই প্রয়োজন (০৭/০৮/২০১০)
রাজনৈতিক দলের জঙ্গী সম্পৃক্ততার যুক্তি প্রমাণ (২৪/০৭/২০১০)
কত কথা বলেরে (২৬/০৬/২০১০)
যমুনা টিভি চ্যানেল ওয়ানের পথ ধরে আমার দেশ-এর পর কে? (১৯/০৬/২০১০)
জাতি আওয়ামী যুদ্ধাপরাধীদেরও বিচার চায় (০৫/০৬/২০১০)
আগের লেখা
430


ইউনুস ও বিশ্ব গণ মাধ্যমে বাংলাদেশ

আ ন ম মিঠু

গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে ড. ইউনূসকে অপসারণের পর ঘরে-বাইরে প্রবল চাপের মুখে পড়েছে সরকার। বিদেশী সংবাদ মাধ্যমগুলো সরকারের নেয়া এ ব্যবস্থার তুমুল সমালোচনা করছে। দেশে ও বিদেশে কূটনীতিকদের কাছে ড. ইউনূসকে অপসারণের কারণ ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে সরকারকে।

নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা ‘ক্ষুদ্রঋণের প্রবক্তা বিতাড়িত’ শীর্ষক শিরোনাম দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইউনূসকে জোর করে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে ইউনূস সম্পর্কে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মন্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেছেন, দারিদ্র্য বিমোচনের নামে ইউনূস দরিদ্র মানুষের রক্ত চুষেছেন।

প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সম্পাদক ডিয়ান নেলসন তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতির কারণেই ইউনূসকে অপসারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা বলেছে, বাংলাদেশ সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। তাই একতরফাভাবে ড. ইউনূসকে অপসারণের ঘোষণা দিয়েছে।

দ্য ইনডিপেনডেন্ট বলেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ড. ইউনূসের দীর্ঘদিন থেকে বিরোধ চলে আসছে। এরই ফলশ্রুতিতে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে তাকে জোর করে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

কানাডার গ্লোব অ্যান্ড মেইল পত্রিকা ‘বাংলাদেশ গরিবের ব্যাংকারকে বিতাড়িত করতে চাইছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতির শিকার হয়েছেন ড. ইউনূস।’

গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে অপসারণের বিষয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রায় সব দেশের রাষ্ট্রদূত ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সরকারের অবস্থান সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের জন্ম থেকে শুরু করে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে বলেন, আমি চেয়েছিলাম একটি সম্মানজনক পর্যায়ে সমাধান হোক। কিন্তু তা হয়নি। এদিকে বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি বলেছেন, আমরাও চেয়েছিলাম সম্মানজনকভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তি হোক। এখনও সে সুযোগ রয়েছে। একটি টেকনিক্যাল কারণে অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে তাকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বের করে দেয়া উচিত হয়নি। এটা বাংলাদেশের মানুষের জন্য ভালো নয়। প্রফেসর ইউনূস নোবেল বিজয়ী দেশের একজন সম্মানিত লোক।নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশগ্রহণকারী প্রায় সব দেশের রাষ্ট্রদূত ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের মধ্যে বেশ কয়েকজন অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রফেসর ইউনূসের অপসারণের কারণ জানতে চান। একই সঙ্গে তারা জানতে চান, এতদিন পরে কেন বিষয়টি সামনে এলো। কেউ কেউ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নিয়েও কথা তোলেন। আবার কোন কোন রাষ্ট্রদূত বিষয়টি সম্মানজনকভাবে সমাধানের পথ খুঁজে বের করার পরামর্শ দেন।

বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, তিনি জানান বুধবার গ্রামীণ ব্যাংকের প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে অপসারণের পর অনেকে এর কারণ জানতে আগ্রহী হবে। যে কারণে আমি সব রাষ্ট্রদূত ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের ডেকেছি। আমি তাদের সামনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেছি। যে বক্তব্যের মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংকের সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে আজ অবধি সব ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে। কিছু প্রশ্ন এসেছে। এর মধ্যে বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে তদন্ত কমিটি থাকাকালে কেন এই পদ থেকে তাকে অপসারণ করা হল।

অর্থমন্ত্রী জানান, প্রফেসর ইউনূস যথাযথভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক তার কাছে বারবার জবাব চেয়েছে। কিন্তু তিনি তার কোন জবাব দেননি। এমনকি অডিটের কথা যখন উঠেছে তখন প্রশ্ন উঠেছে কার সঙ্গে কথা বলবেন। ১৯৯৯ সালের পর প্রফেসর ইউনূসের বয়স ৬০ বছর পেরিয়ে যায়। সে সময় তাকে গ্রামীণ ব্যাংকের অধ্যাদেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এমনকি বর্তমানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে, বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে জানতে চেয়েও কোন উত্তর পায়নি। আজ পর্যন্ত তা জানানো হয়নি। বিষয়টি বহু দিনের। এরপরও গত বছরের মার্চ মাস থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিবর্তন নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। সেই আলাপ-আলোচনার ধারাবাহিকতায় প্রফেসর ইউনূসকে সসম্মানে সরে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। নভেম্বরের শেষ দিকে বোর্ডের চেয়ারম্যানকেও এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমিও চেয়েছিলাম সম্মানজনক একটা সমাধান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক তা আর হল না। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বৈধতা নেই। যে কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক অবৈধ হিসেবে তাকে অপসারণের আদেশ দেন। অর্থমন্ত্রী তার নিজের সুর পাল্টে বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে আমার সম্পর্কও ভালো। যে কারণে তাকে আমি প্রস্তাব দেই, যখন তদন্ত শুরু হবে তখন আপনি নিজের থেকে অব্যাহতি চাইবেন। আর ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হবেন পরবর্তী সিনিয়র পরিচালক। তদন্ত শেষে আইনগত বিষয়টি বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য একটি সার্চ কমিটি প্রয়োজন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি বিভিন্ন সময় তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলাপ করে আশা করেছিলাম, তিনি আমার প্রস্তাব গ্রহণ করবেন। কিন্তু তিনি আমার প্রস্তাব গ্রহণ তো করেননি, বরং এখন শুনছি তিনি বৈধতা নিয়ে আদালতে গেছেন। কি কারণে তাকে অপসারণ করা হয়েছে তা ইতিমধ্যে সবাইকে জানানো হয়েছে।

নরওয়ের প্রামাণ্যচিত্রের প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি তদন্ত করার প্রয়োজন ছিল। যে কারণে আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। এমনকি প্রফেসর ইউনূসও তদন্তের জন্য আহ্বান জানান। তদন্তের স্বার্থে তার কাছে আমি উপদেশ চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে তেমন উপদেশ দিতে পারেননি। আমি চেয়েছিলাম গ্রামীণ ব্যাংকের বিষয়টি কিভাবে সুরক্ষা করা যায়। কারণ গ্রামীণ ব্যাংক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করে।
অর্থমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান খুব ভালোভাবে চলছে। সেটার ৩০ বছরের সাফল্য সবাই দেখেছে। কিন্তু কিভাবে প্রফেসর ইউনূস ভাবলেন তিনি না থাকলে প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, প্রফেসর ইউনূসের অপসারণ দেশের ইমেজ মোটেই বাড়েনি। তাই বলে কেউ যেন মনে না করে রাজনৈতিক আক্রোশে তাকে সরানো হয়েছে।

অপর এক প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রফেসর ইউনূসকে অপসারণে বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হবে না। কারণ আইনগত সমস্যার কথা অবহিত করে এ পদ ছেড়ে দিতে বিভিন্নভাবে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এ বিষয়ে সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু অনড় অবস্থানের কারণে এ ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প কিছু ছিল না।

রাজনৈতিক প্রসঙ্গে অপর এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, তিনি কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন। তাই কোন রাজনীতি বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য নেই সরকারের।

বিচলিত যুক্তরাষ্ট্র
গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে মুহাম্মদ ইউনূসকে অপসারণের প্রক্রিয়া নিয়ে সন্তুষ্ট নন যুক্তরাষ্ট্র। তারা বলছে, উদ্ভূত সমস্যার সমাধান অন্যভাবেও করা যেত। ইউনূসকে যে প্রক্রিয়ায় অপসারণ করা হয়েছে তাতে আমাদের সরকার বিচলিত। ড. ইউনূস একজন সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি একজন নোবেল বিজয়ী। সম্মানজনক পদ্ধতিতে এ সমস্যার সমাধান করা যেত। কথাগুলো ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির। তবে তিনি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রভাব পড়বে কিনা এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অন্যদিকে সরব আন্তর্জাতিক মিডিয়া
গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূসের অপসারণের খবরে সরব আন্তর্জাতিক মিডিয়া। বৃহস্পতিবার বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মিডিয়া তার অপসারণের খবর গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- টাইম ম্যাগাজিন, বিবিসি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, আল জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস, ডেইলি মেইল, টেলিগ্রাফ, গার্ডিয়ান, ইনডিপেনডেন্ট ইত্যাদি। তারা মূলত তাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শিরোনাম তৈরি করেছে। যে শিরোনামের মধ্যে রয়েছে- ইউনূসের বাঁচার জন্য রাজনৈতিক যুদ্ধ, ইউনূসের বরখাস্ততা চ্যালেঞ্জ, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ইউনূসকে মুছে ফেলার পরিকল্পনা, ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃত বিতাড়িত ইত্যাদি। [সূত্র : যুগান্তর ০৪.০৩.১১]


বিশিষ্ট কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন কলাম লিখেছেন ইউনূস-ইউনূস-বিরোধিতায় লাভ কার, খেসারত দেবে কে? এই শিরোনামে তার লেখার কিছু অংশ তুলে ধরছি -

রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার জন্যই আইন প্রণীত হলেও রাজনৈতিক সরকার সব সময় আইনের সংকীর্ণ ও যান্ত্রিক ব্যাখ্যা এবং গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময়ই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে আইনের প্রসারিত ও নমনীয় রূপ দাঁড় করিয়ে তারই আওতায় কিছু পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। দলীয় কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করে। কিন্তু সরকারের এই আইনি ঔদার্যের সুযোগ কেবল রাজনৈতিক কর্মীর বিরুদ্ধে করা হয়রানিমূলক মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে, নাকি খুনের আসামি পর্যন্ত প্রসারিত হচ্ছে, তা নিয়ে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হচ্ছে।

ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের বিষয়ে সরকারের মনোভাব যে ভয়ানক কঠোর, তা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অনেকের মন্তব্যে বোঝা যায়, এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সরকারের পক্ষে (তাঁর ভাষায়) যে খোলা চিঠি ছেড়েছেন, তাতে কঠোরতার মাত্রা ভালোই বোঝা যাচ্ছে।

বাজারে একটা কানাঘুষা ছিল যে, সরকারের উচ্চপর্যায়ে অনেকেই ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নোবেল পাওয়া উচিত বলে মনে করেন এবং এ জন্য কিছু লবিও করা হয়েছিল। এর সত্যমিথ্যা জানি না। তবে রায়ের পরে দেশের প্রধান আইনি কর্মকর্তা এ ধরনেরই মনোভাব ব্যক্ত করতে কুণ্ঠিত হননি। তিনি বলেছেন, দেশে শান্তির জন্য কেউ যদি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য হয়ে থাকেন, তিনি শেখ হাসিনা এবং তাঁর সঙ্গে সন্তু লারমা তা পেতে পারেন। তাঁরা দুজনে নোবেল পুরস্কার পেলে সে তো অবশ্যই আনন্দের কথা, এ দুঃখী দেশ আরেকবার আনন্দে ভাসার উপলক্ষ পেত। তবে প্রবীণ আইনজীবীকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, চুক্তির পর থেকে এর বাস্তবায়ন নিয়ে সন্তু লারমা ও পার্বত্যবাসীর হতাশা কেবল দিন দিন বেড়েছে, এ জন্য আওয়ামী লীগ ও মহাজোট সরকারকে দায়ী করে লারমার বক্তব্য দিন দিন জোরালোও হচ্ছে। যে শান্তিচুক্তিকে যথাযথ মর্যাদা আওয়ামী লীগের সরকারই দিল না, চুক্তির অপরপক্ষের নেতা স্বয়ং বারবার এ নিয়ে অভিযোগ জানাচ্ছেন, তখন এটির ভিত্তিতে পুরস্কার, স্বীকৃতির প্রত্যাশা কতটা যুক্তিযুক্ত হবে, তাঁরাই ভালো বুঝবেন।

তবে আবারও বলব, যদি শেখ হাসিনা ও লারমা নোবেল পুরস্কার পেতেন, তাতে আমরা সবাই খুশিই হতাম, কিন্তু তাঁর সঙ্গে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের নোবেল পাওয়ার অন্যায্যতার প্রসঙ্গ টানা কি ন্যায্য? সরকারি মহলে কেউ কি এখন ভাবছেন যে নোবেল কমিটি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ড. ইউনূস ও তাঁর প্রতিষ্ঠানকে সম্মান জানিয়ে ভুল করেছে? তাঁরা আইনের মাধ্যমে এবং প্রচারণার মাধ্যমে এটা প্রমাণ করে ছাড়বেন? অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত অনুযায়ী, তারা যে প্রধানমন্ত্রী ও সন্তু লারমাকে নোবেল না দিয়ে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে দিয়ে ভুল কাজ করেছে, তা প্রমাণের দায় যদি সরকার বা সরকার-অনুগত কেউ নিয়ে থাকেন, তার ফলটা কিছুতেই ভালো হতে পারে না। না সরকার, না গ্রামীণ—কারও জন্যই নয়। আর যেহেতু উভয়ের সঙ্গে জনগণের স্বার্থ জড়িত, তাই এ রকম ভুলের খেসারত—হয়তো সেই সঙ্গে প্রতিদান—দেবে জনগণ।
যদি সত্যিই কেউ এ রকম দায়িত্ব নিয়ে থাকেন, তাঁদের প্রমাণ করতে হবে ড. ইউনূস একজন খলনায়ক, গ্রামীণ ব্যাংক একটি গণবিরোধী প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ এই মহলকে আরও নোংরা খুঁজতে ও ঘাঁটতে হবে। মানুষ ধৈর্যের সঙ্গে রাজনীতির এই নোংরা খেলা দেখে যাবে, নাকি তার মতো করে এর প্রতিকারের কথা ভাববে, সেটা ভবিষ্যতই বলে দেবে। দূর থেকে সাদা চোখে দেখতে পাই, ড. ইউনূসের ওপর আস্থা ও তাঁর অর্জিত ভাবমূর্তি দেশের গণ্ডিতে সীমিত নয়, তা বিশ্বব্যাপী ছড়ানো। সেটা যে কেবল পুঁজিবাদী বিশ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা নয়, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশেও এর বিস্তার রয়েছে। গণতন্ত্রী-সমাজতন্ত্রী দেশ এবং এশিয়া ছাড়িয়ে আমেরিকা-আফ্রিকাতেও তা ছড়িয়েছে। সেদিক থেকে আজকে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্মানিত ও স্বীকৃত প্রতিনিধির নাম কিন্তু ড. ইউনূস।

নোবেল বিজয়ের অনেক আগে থেকেই তাঁর এই ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে এবং লক্ষ করলে দেখা যাবে, তা ধারাবাহিকভাবে উত্তরোত্তর উজ্জ্বল ও বিস্তৃততর হয়েছে। আমরা গর্বের সঙ্গে লক্ষ করেছি, বার্লিন প্রাচীর ভাঙার কুড়ি বছর উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে একমাত্র বক্তা ছিলেন ড. ইউনূস, পেছনে সার ধরে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্টসহ বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রপতিরা। আমরা দেখি, বিশ্বের বড় বড় পুরস্কার ও স্বীকৃতি এই একজন ব্যক্তি জয় করে এনেছেন। সারা বিশ্বের শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রনেতা নেলসন ম্যান্ডেলার ৯০তম জন্মদিনের একমাত্র বক্তা ছিলেন ইউনূস, ভারতীয় পার্লামেন্টের উভয় সভার যৌথ অধিবেশনে ইউনূস দিয়েছিলেন হীরেন মুখার্জি স্মারক বক্তৃতা। এ রকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যাবে।

আমার আশঙ্কা, সরকার দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা একজন মানুষের প্রতি যে আচরণ করছে, তাতে সাধারণের মধ্যে সঞ্চারিত আশা ঘা খাবে। সরকার ড. ইউনূসের সম্মান লাঘবের দায়িত্ব নিতে গিয়ে ২০০৮-এর নির্বাচনের মাধ্যমে সূচিত সম্ভাবনাটুকু বিনষ্ট করবে বলে আশঙ্কা হয়। ড. ইউনূসের সম্মান হরণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুরধার লেখনী ও বক্তব্য চালিয়ে যাচ্ছেন একদিকে দেশের বাম বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর এবং অন্যদিকে বিরূপ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে একাত্তরের পরাজিত মৌলবাদী জঙ্গিশক্তি। আমাদের জানামতে, এরাই হলো আওয়ামী লীগের কট্টর বিরোধী শক্তি। আওয়ামী লীগ কি ইউনূস ও গ্রামীণ-বিরোধিতায় নেমে এবার পরীক্ষিত আওয়ামী-বিরোধীদের সঙ্গেও এক হবে? [সূত্রঃ প্রথম আলো 23.3.11]

অন্যদিকে শফিক রেহমান ড. ইউনূসকে সরানোর আসল কারণ -- নেড়িকুকুরের টেলি সংলাপ
শিরোনামে প্রবন্ধের চম্বুক অংশ নিম্নরূপ-

প্রবন্ধে বলা হয় কোনো সন্দেহ নেই, নরওয়ে সরকার পরিচালিত তদন্তে দেখা গেছে প্রামাণ্যচিত্রের সেই অভিযোগ ভিত্তিহীন। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সতর্কতার সঙ্গে রাজনৈতিক ডামাডোল পিটিয়ে ড. ইউনূসকে হেনস্তা করার প্রেক্ষাপট নির্মাণ করেন।

ইকনমিস্টের রিপোর্টে বলা হয়, চৌদ্দ বছর আগে শেখ হাসিনা যখন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন, তখন ড. ইউনূসের ব্যাপারে তিনি অতটা কঠোর ছিলেন না। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানদের ক্ষুদ্রঋণ শীর্ষ সম্মেলনের কো-চেয়ারম্যান হিসেবে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “আমরা বাংলাদেশে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার গড়া গ্রামীণ ব্যাংকের অসাধারণ কার্যক্রমে গর্বিত।”

ইকনমিস্ট লিখেছে, সুতরাং যে কেউ এটা আশা করতে পারেন, এই শীর্ষ সম্মেলনের ৯ বছর (২০০৬-এ) পর যখন ড. ইউনূস শান্তিতে নোবেল পেলেন, তখন শেখ হাসিনাও তার ওপর সন্তুষ্ট থাকবেন। কিন্তু আসলে তা হয়নি। কারণ শেখ হাসিনা ড. ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তির বহু আগ থেকে মনে করছিলেন তিনিই শান্তিতে এই পদক পাওয়ার যোগ্য। ক্ষুদ্রঋণ চালুর জন্য ড. ইউনূস শান্তিতে নোবেল পেতে পারেন না। বরং তিনি ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে শান্তিচুক্তি করেছিলেন, তার জন্য তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া উচিত ছিল। তবে এ কাজে বিশ্বের নানা প্রান্তে তিনি সিনিয়র আমলাদের লবিইং করতে পাঠিয়েও সফল হননি।

ইকনমিস্টের ভাষায়, কিন্তু নোবেল প্রাপ্তির মাধ্যমে ড. ইউনূস হঠাৎ করেই প্রধানমন্ত্রীর বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়েও বিখ্যাত হয়ে যান। যারা শেখ হাসিনাকে খুব কাছ থেকে জানেন, তাদের মতে, এটা মেনে নেয়া শেখ হাসিনার পক্ষে তেতো ওষুধ গেলার চেয়েও কঠিন হয়ে দাড়ায়।
ওই ম্যাগাজিনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানসিক অসন্তুষ্টি সরাসরি ব্যক্তিগত বিরোধে রূপ নেয়।

ইকনমিস্টের আশঙ্কা, সরকারের প্রসঙ্গ এলেই বাংলাদেশের আদালতগুলো ক্রমান্বয়ে সরকারের মুখপানে চেয়ে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই ড. ইউনূসকে তার পদে ফিরিয়ে দেয়ার রায় দিতে হলে খুবই সাহসী কোনো বিচারপতির প্রয়োজন রয়েছে।
দেখুন, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার ঈর্ষার যে দুটি কারণ দি ইকনমিস্ট দিয়েছে, তা আংশিক বিশ্লেষণ মাত্র। ইকনমিস্ট বলেছে, শেখ হাসিনা ঈর্ষাপরায়ণ কারণ এক. তিনি নিজে নোবেল পুরস্কার চান এবং দুই. নোবেল প্রাপ্তির ফলে প্রধামন্ত্রীর পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়েও বেশি বিখ্যাত হয়ে যান ড. ইউনূস। এ ছাড়া আজকেই অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন শান্তিতে নোবেল পাওয়া উচিত ছিলো সন্তু লারমা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।

ছহি বড় ইউনূস-নামা (পর্ব-১) শিরোনামে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন-

এবার ঢাকায় গিয়ে সহসাই ইউনূস-বিতর্কে জড়িয়ে গিয়েছিলাম। লেখালেখিতে নয়, তদবির-তদারকে। এবার সিদ্ধান্ত নিয়েই গিয়েছিলাম যে মাসখানেক দেশে থাকার সময় কোনো কাগজেই লেখালেখি করব না। কেবল দেখব, শুনব, জানব। কিন্তু 'জন্ম যার বঙ্গে কপাল যায় সঙ্গে!' আমাকে লেখালেখিতে জড়াতে হয়নি, কিন্তু ড. ইউনূসের মামলা সংক্রান্ত একটি ব্যাপারে নিজের অজান্তেই পরোক্ষভাবে জড়াতে হয়েছিল।
এবার ঢাকায় একটু নিরিবিলি থাকব বলে কোনো আত্মীয়ের বাসায় উঠিনি। বনানী গোরস্তানের কাছে ২৭ নম্বর রোডে ইস্টার্ন রেসিডেন্স নামের একটা চমৎকার হোটেলে উঠেছিলাম। হোটেলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর খায়রুল আনাম পল্টু এবং এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ফারুক হোসেন ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। একজন ছিলেন মোহাম্মদপুর ছাত্রলীগের সভাপতি এবং অন্যজন ছিলেন ঢাকা ছাত্রলীগের অর্গানাইজিং সেক্রেটারি। এখন ব্যবসায়ী হলেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত। আমিও প্রাক্তন ছাত্রলীগার। সেই সুবাদেও যত্ন-আত্তিটা তাঁদের কাছ থেকে একটু বেশিই পেয়েছি।

আমি ড. ইউনূসের অনুরাগী অথবা তাঁর সব কর্মকাণ্ডের সমর্থক নই। তাঁকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না এবং তাঁর প্রতি আমার কোনো ব্যক্তিগত বিরাগও নেই। কিন্তু তাঁর মাইক্রো ক্রেডিটের ব্যবসা এবং গ্রামীণফোন সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড দেখে গোড়া থেকেই আমার সন্দেহ হয়েছে এর পেছনে গরিবের স্বার্থ নয়, আত্মস্বার্থ ও আন্তর্জাতিক স্বার্থের (গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের) একটা ব্যাপার-স্যাপার আছে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, 'রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।' এই কাঙালের ধন চুরি করার জন্য গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম নানা কৌশল আবিষ্কার করেছে, সেই কৌশল কার্যকর করার জন্য নানা 'এজেন্ট' তৈরি করেছে। এমনকি এই এজেন্টদের নোবেল পুরস্কারসহ নানা আন্তর্জাতিক পুরস্কার দিয়ে অনুন্নত দেশগুলোর মানুষের কাছে দেবতা হিসেবে খাড়া করার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশে ড. ইউনূস পশ্চিমাদের সৃষ্ট এই ধরনের দেবতা কি না আমি জানি না। কিন্তু গরিব তৃতীয় বিশ্বে এই দেবতা সৃষ্টির সব প্রকরণের সঙ্গে ফতুয়া গায়ে, গরিবের জন্য ক্ষুদ্রঋণ সাহায্য নিয়ে ড. ইউনূসের দেবতার মতো আবির্ভাবের পন্থার মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

ড. ইউনূসকে 'শান্তির জন্য অবদান রাখায়' নোবেল পুরস্কার দেওয়ার পেছনে বিশ্বের একক পরাশক্তির উদ্দেশ্যমূলক কৌশল কাজ করেছে বলে আমার এবং অনেকেরই মনে হয়েছে। এর পেছনে আমেরিকার অত্যন্ত শক্তিশালী ক্লিনটন পরিবারের গোপন ও প্রকাশ্য ক্যাম্পেইনও কাজ করেছে। দেশে অথবা বিদেশে শান্তির জন্য ড. ইউনূসের কণামাত্র অবদান আছে বলে কেউ প্রমাণ করতে পারবেন না। ক্ষুদ্রঋণ দানের ব্যবস্থা দ্বারা তিনি গরিবের ঘরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন বলে কেউ প্রমাণ করতে পারেননি। বরং বহু গরিবের ঘরে অশান্তি, ঋণ পরিশোধে অক্ষমতার জন্য আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়েছে। তবু দেশের দরিদ্রদের খুবই একটা ক্ষুদ্র অংশের স্বাবলম্বিতা অর্জনে গ্রামীণ ব্যাংক কোনো ভূমিকা রাখেনি তা বলব না।
তেমন ভূমিকা ব্রিটিশ আমলে সমবায় আন্দোলন, কুটির শিল্পব্যবস্থা এবং পাকিস্তান আমলে মার্কিন অর্থে পরিচালিত ভিলেজ এইড কর্মসূচিও রেখেছে। তাতে বাংলাদেশের দারিদ্র্য দূর হয়নি। ড. ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প পশ্চিমা তথাকথিত দাতা দেশগুলোর স্বার্থে ও সাহায্যে এবং প্রচারণায় আগেকার সমবায় ও গ্রামোন্নয়ন প্রকল্পগুলোর চাইতে অনেক বেশি পাবলিসিটি ও প্রসারতা পেয়েছে। কিন্তু নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেনি। তবু পশ্চিমারা তাঁকে সেই পুরস্কার দিয়েছে। আর ওয়াশিংটনের কর্তারা তো তাঁকে বছর বছর সম্মানজনক পুরস্কার দিয়ে তাঁর দেবতার মুখোশটি পাকাপোক্ত রাখার ব্যবস্থা করছেন। এর পেছনের উদ্দেশ্য কি গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ও নিউ ইমপেরিয়ালিজমের স্বার্থে তাঁকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যবহারের পর রাজনৈতিক স্বার্থেও ব্যবহার করা?

সন্দেহটা তখন আমার মতো অনেকের মনেই দানা বেঁধেছে। পশ্চিমারা ড. ইউনূসকে দুই হাতে অর্থ সাহায্য ঢেলে তাঁর গ্রামীণ ব্যাংকের ও অন্যান্য ব্যবসায়ের দারুণ প্রসার ঘটিয়ে, তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিয়ে 'আনন্দের এভারেস্টে' তুলে দিয়ে আসলে করতে চাইছে কী? পশ্চিমা প্রচারণায় 'গরিবের ত্রাতা' এবং 'নোবেল লরিয়েট মনীষী' হিসেবে তাঁর ঢক্কা এখন বিশ্বময় নিনাদিত। তাহলে মাইনাস টু থিওরির নামে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শূন্যতা সৃষ্টি করে আফগানিস্তানের কারজাই, পাকিস্তানের জারদারির মতো বাংলাদেশে ড. ইউনূসকে আরেক পলিটিক্যাল রোবট হিসেবে ক্ষমতায় বসানোর ইচ্ছা কি ছিল পশ্চিমাদের? ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে দীর্ঘকালের এঙ্পেরিমেন্ট ব্যর্থ হওয়ার পর এখন কি ড. ইউনূস হবেন পশ্চিমাদের নতুন তুরুপের তাস? প্রশ্নগুলোর সদুত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

বিএনপির ক্রীড়নক রাষ্ট্রপ্রধান ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভেঙে দেওয়ার পর সেনাপ্রধানদের ইচ্ছায় যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, তাতে ড. ইউনূসকেই প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ড. ইউনূস একটি টেম্পোরারি সরকারের টেম্পোরারি প্রধান হতে চাননি। তাঁর দৃষ্টি ছিল গাছের মগডালের দিকে। তাঁরই মনোনয়নে তাঁরই সহপাঠী ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে সেনা-তাঁবেদার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হয়।

ড. ইউনূস তার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা করেছেন। তাঁর হাইকোর্টের মামলা খারিজ হয়ে গেছে। তিনি এখন সুপ্রিম কোর্টে আপিলে যাচ্ছেন। এই বিচারাধীন বিষয়টিকেও বিএনপি রাজনৈতিক ইস্যু বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের সঙ্গে জুটেছে একটি তথাকথিত সুশীল সমাজ এবং তাদের ইংরেজি ও বাংলা দুটি 'নিরপেক্ষ' দৈনিক।

বিএনপি তথাকথিত সুশীল সমাজ ও দুটি নিরপেক্ষ দৈনিক_এই মিলিত অঙ্মি অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে ড. ইউনূসের বিষয়টিকে রাজনৈতিকীকরণের এবং শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারকে ঘায়েল করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা চালাচ্ছে। আমি এই চেষ্টার মধ্যে ২০০১ সালের অক্টোবর-নির্বাচনপূর্ব চক্রান্ত ও চক্রীদের গন্ধ পাচ্ছি। এই অঙ্মি তাদের চক্রান্ত সফল করার জন্য দেশে বিদেশি হস্তক্ষেপও টেনে আনতে চাইছে। যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্যও চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।

দুর্ভাগ্যের ব্যাপার এই যে আওয়ামী লীগ সরকার, এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নিজেদের অবাঞ্ছিত কথাবার্তা দ্বারা চক্রান্তকারীদের ট্রাপে পা দিয়েছেন ও সরকারের জন্য এবং দেশের জন্যও এক বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন। তাঁর বিদেশি প্রভুদের সাহায্য ও সমর্থন আদায় করে হাসিনা সরকারকে একটা নাকে ডলা দিতে। তাতে বিদেশি হস্তক্ষেপে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব নাকে ডলা খাক সেই বিবেচনা তাঁর নেই। [সূত্রঃ কালের কণ্ঠ, ৩১/০৩/১১]

বিশ্বের গণ মাধ্যম এবং বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে যখন বাংলাদেশের এই অবস্থা তখন আমার দেশের সরকার ও তার মন্ত্রী নেতারা জ্বলন্ত উনুনে ঘি ঢালতে কমকী। দিপু মনি বলেছেন সম্পর্কের তেমন কোন প্রভাব ফেলবেনা আর হানিফ মিয়া কি যে বলেন ...... অন্য দিকে আমরা লক্ষ্য করছি সরকার এ অবস্থা থেকে উত্তোরনের জন্য একটি লবিকে মাঠে নামিয়েছেন -- [সূত্রঃ আমাদের সময় ২৭.০৩.১১]

প্রসঙ্গক্রমে হঠাৎ করে বর্তমান সরকারের নেপথ্যে ভূমিকা পালনকারী প্রধানমন্ত্রীর পুত্রধনের ড. ইউনুস প্রসঙ্গে দেশ বাসীর উদ্দ্যেশ্যে ‘খোলা চিঠি’ গভীরতার মাত্রা কে নতুন করে উদ্ভাসিত করেছে। নেপথ্যের চরিত্রের হঠাৎ দৃশ্যমান চরিত্রে অভিনয়ের কী করণ। যা দেশবাসীর মনে শত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

জয়ের খোলা চিঠি নানা প্রশ্নের ডালপালা ছড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার পিছনেও জয়ের অদৃশ্য হাত যে রয়েছে তা দৃশায়িত হলো ড. ইউনুস-এর এই ঘটনার মধ্যদিয়ে।

লেখকঃ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও কলাম লেখক।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/ANMMithu
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলাদেশ থেকে সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্ লিখেছেন, ০২ এপ্রিল ২০১১; রাত ০৮:৩১
এখন পত্রিকায় আর টিভিতে খালি ড. ইউনূস। তাঁর সম্পর্কে এখন অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছে।
এ লোকটার এতো পাওয়ার!
এ লেখাতেও অনেক কিছু জানার আছে। সুন্দর লেখাটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
52829
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে মাহবুব ইসলাম লিখেছেন, ০৩ এপ্রিল ২০১১; দুপুর ০২:৩৭
আবারও আপনােক সাধুবাদ জানাই , আপিন সুনদর একিট বিষয়ে লিখেছেন।
আপিন লিখেছেন-
প্রসঙ্গক্রমে হঠাৎ করে বর্তমান সরকারের নেপথ্যে ভূমিকা পালনকারী প্রধানমন্ত্রীর পুত্রধনের ড. ইউনুস প্রসঙ্গে দেশ বাসীর উদ্দ্যেশ্যে �খোলা চিঠি� গভীরতার মাত্রা কে নতুন করে উদ্ভাসিত করেছে। নেপথ্যের চরিত্রের হঠাৎ দৃশ্যমান চরিত্রে অভিনয়ের কী করণ। যা দেশবাসীর মনে শত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

জয়ের খোলা চিঠি নানা প্রশ্নের ডালপালা ছড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার পিছনেও জয়ের অদৃশ্য হাত যে রয়েছে তা দৃশায়িত হলো ড. ইউনুস-এর এই ঘটনার মধ্যদিয়ে। এজন্য আপনাকে আরও ধন্যবাদ। আপনার এ লেখার মধ্যদিয়ে অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছে।
52911
কানাডা থেকে কামাল ফখরুদ্দীন লিখেছেন, ০৩ এপ্রিল ২০১১; বিকেল ০৪:০৪
আপনােক অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনার আরও লেখা চাই
52920
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy