মানুষ বেঁচে থাকে একটা স্বপ্নকে ঘিরে। ছোট বেলা থেকেই সে একটা স্বপ্নকে লালন-পালন করে বাঁচিয়ে রাখে, যেটা তাকে সামনের দিকে ধাবিত করে। এগিয়ে নিয়ে যায় স্বপ্ন পূরণের পথে। একে বাস্তব রূপে দেখতে মানুষ মৃত্যু পর্যন্ত লড়াই করে যায়। সেই লড়াইয়ে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে কেউ তার লক্ষ্যে সহজেই পৌঁছে যায়, আর কেউ তীর না পেয়ে অকালেই ঝরে পড়ে। ঝালকাঠির কলেজছাত্র লিমন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন আর দেশের জাতীয় উন্নতিতে স্বাক্ষর রাখার বিশাল লক্ষ্য নিয়ে পড়ালেখা শুরু করেছিল লিমন। বিধাতার এক লীলায় সে আজ পরিণত হতে চলেছে ভয়ানক সন্ত্রাসী হিসেবে। প্রথমে র্যাবের মহাপরিচালক নিজেই বলেছিলেন, লিমন সন্ত্রাসী নয়, সে ঘটনার শিকার। তবে বর্তমানে বলা হচ্ছে সে সন্ত্রাসী ছিল তবে শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিল না। লিমনের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলোর মধ্যে চলছে সমালোচনার ঝড়। অভিযোগ উঠছে কোন পথে যাচ্ছে লিমনের বিচার কার্য।
বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত পত্রিকা থেকে জানা যায়, গত ২৩ মার্চ বিকালে ঝালকাঠির সাতুরিয়া গ্রামের কাঁঠালবাগানে গরু আনতে যায় লিমন। এ সময় র্যাব-৮ এর একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। তারা লিমনকে কাছে পেয়ে আটক এবং পরে পায়ে গুলি করে। প্রথমে তাকে বরিশাল মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাওয়া হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার পরিবার থেকে বারবার থানায় মামলা করতে চাইলেও মামলা নেয়নি থানার কর্মরত অফিসার। ঘটনার অনেক দিন পেরিয়ে গেলে মানবাধিকার কমিশন সহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গুলো এগিয়ে আসলে বিষয়টি আমলে নেয় সরকার। সরকারি ব্যবস্থায় তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। তাকে কয়েকদিন হাসপাতালে চিকিৎসা দিলেও ঘাঁ শুকানো আগেই তাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়ে বের করে দেয়া হয়। তাকে যখন পুলিশী হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয় তখন তিনি বুঝতে পারেন নি তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঝালকাঠির জেলখানায়। সেখানে তাকে নেয়া হয় জবানবন্দি। তারপর থেকেই ঘটনার মোড় নেয় অন্যদিকে।
গত ১১ এপ্রিল র্যাব সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান বলেছিলেন, ‘আমরা তো আর লিমনকে ধরতে যাইনি। তার অপরাধ খুঁজতেও যাইনি। লিমন একটি ছোট ছেলে। আমরা তো বলছি না যে সে খারাপ বা সন্ত্রাসী ছেলে। এ রকম কিছু দেখছিও না।’ তবে গত ১৯ মে বৃহস্পতিবার দুপুরে পাল্টে গেছে ঘটনাটি। র্যাবের গুলিতে লিমনের পঙ্গু হওয়ার ঘটনার তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ১২ জন সাংবাদিককে ডেকে বলেছেন, “লিমনকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়নি। সন্ত্রাসী মোরশেদ জমাদ্দারকে ধরতে গেলে লিমন দৌড়ে পালাতে যায়। তখন র্যাব সদস্যদের গুলি লিমনের পায়ে লাগে। লিমন মোরশেদ জমাদ্দারের সন্ত্রাসী বাহিনীর সঙ্গে জড়িত। এমনকি তার বাবাও জড়িত।”
বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, সাংবাদিকেরা জানতে চান, র্যাবের মহাপরিচালক নিজেই বলেছেন, লিমন সন্ত্রাসী নয়, সে ঘটনার শিকার। এ সম্পর্কে তারিক আহমেদ সিদ্দিক বলেন, এখানে তথ্যের বিকৃতি ঘটেছে। র্যাব মহাপরিচালক বলেছিলেন, লিমন শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিল না। কিন্তু প্রকাশিত সংবাদে ‘শীর্ষ’ শব্দটি বাদ রাখা হয়।
এদিকে ২২ মে রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এডভোকেট সাহারা খাতুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির বিদায়ী সাক্ষাৎ শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ঝালকাঠিতে র্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমন ও তার বাবা সন্ত্রাসী বাহিনীর সঙ্গে জড়িত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটাই সরকারি বক্তব্য। তিনি আরো বলেন, লিমনের মামলার কাগজপত্র দেখে এবং তদন্তকারীদের বক্তব্য শুনে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ওই বক্তব্য দিয়েছেন।
এদিকে লিমনের পঙ্গু হওয়ার ব্যাপারে গত ২০ ও ২১ মে ওয়ার্কার্স পার্টি পলিট ব্যুরোর দু’দিনব্যাপী বৈঠক শেষে ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার এই মন্তব্য লিমনের ঘটনা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তদন্তকেই কেবল প্রভাবিত করবে না, সত্য প্রকাশে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকেও ক্ষুণ্ন করবে। তারা আরো বলেছেন, শুধু র্যাবের কাযক্রম নয় র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দেশের সব সচেতন মানুষ প্রতিবাদ ও ধিক্কার জানিয়ে এসেছে এবং অবিলম্বে এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও এ বিষয়ে দেশবাসীকে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। সভায় আরো বলা হয়েছে, কিশোর লিমনের পায়ে গুলি করার যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা ভয়াবহই নয়, সব ন্যায়নীতির পরিপন্থী। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো র্যাবের মহাপরিচালক যখন লিমনকে পরিস্থিতির শিকার বলে অভিহিত করেছেন, তখন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তার ও তার বাবাকে সন্ত্রাসী শমসের জমাদ্দারের সহযোগী বলে বর্ণনা করেছেন। শুধু তাই নয়, লিমনের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করে তার মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। ফলে কিশোর লিমনের আর ন্যায়বিচার পাওয়ার কোন সুযোগ রইল না। ধারণা করা যায়, এসবই করা হয়েছে ওপরের নির্দেশে।” তারিক আহমেদ সিদ্দিক বলেছেন, বিভিন্ন অপরাধে এ পর্যন্ত র্যাবের এক হাজার ১৪৭ সদস্যের শাস্তি হয়েছে। ৬৭ জন চাকরিচ্যুত হয়েছেন। আর কারাদণ্ড হয়েছে ১৬ জনের। অন্যদিকে অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত হয়েছেন ৩৪ জন।
লিমনের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের সাধারণ জনগনের মাঝেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। লিমন কি তার ন্যায্য বিচার পাবে নাকি তাকে কোন ঘটনার শিকার বলে ছুড়ে ফেলে দেয়া হবে ডাস্টিবিনে। সাধারণ জনগণ মনে করেন এ ঘটনাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়ার জন্য উপর মহল থেকে এ ধরনের টালবাহানা করা হচ্ছে। তার বিচারের রায় কোথায় যাবে তা নিয়ে শঙ্কিত সাধারণ জনগণ।
লেখক: শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়