বৃহস্পতিবার, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৭ মে ২০১২; রাত ১১:১৭ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

প্রবাসে কল্যাণ সমিতিঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা

আব্দুল ওহাব

যেকোন কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানই মহৎ উদ্দেশ্যে গঠিত হয়। কিন্তু লক্ষ্য উদ্দেশ্য স্থির না হলে, সঠিক মূল্যবোধ ও কর্মনীতি না থাকলে এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যোগ্য নেতৃত্ব ও সচেতন কর্মীবাহিনীর অভাব হলে যতই সদিচ্ছা থাকুকনা কেন কিছু মানুষের বদইচ্ছাই এগুলো শেষ পর্যন্ত টেইক ওভার করতে দেখা যায়। ফলে মহৎ উদ্দেশ্য যায় নির্বাসনে হারিয়ে। ঝোপ বুঝে কোপ মারার মতো লোকেরা সুযোগ বুঝে গ্রাস করে নেয় পুরো প্রতিষ্ঠান। আর এভাবে সব স্বপ্ন যায় ধুলায় মিশে।

কেন অসাধুরা হাত বাড়ায়? দুইটা কারণঃ ১) অর্থলোভ ২) পদলোভ। ৫ ডলার মাসিক চাঁদা, অনেকে এটাকে বেশি কিছু মনে করেনা আর অনোচিত ভাবে অনেকের মাসিক চাঁদা বেশিরভাগ সময় প্রার্থীরাই দিয়ে দেয়, তাই সাধারণ মানুষের অনেকে টাকার বিষয়টাকে হাল্কাভাবে দেখে এবং বেশি মাথা ঘামায়না। কিন্তু অসাধুরা ঠিকই বুঝে যে এতো ৫ ডলার না সবমিলে ৫০ হাজার কিংবা তারও বেশি। তাইতো হাজারে হাজারে ডলার নির্বাচনে জেতার জন্য বিলিয়ে দেয়। খরচ বাদ দিয়ে লাভের অংশটা ঠিকমতই ওদের হিসাবে থাকে।

অর্থের পাশাপাশি পদলোভের আরেকটা কারণ হচ্ছে সামাজিক স্টেটাস বাড়ানোর চেষ্টা। সমিতির সভাপতি, সেক্রেটারি কিছু একটা হতে পারলে সমাজে যেন ব্রাহ্মণ বা হাইক্লাসে উঠা যায়। বাড়তি একটা টাইটেল যোগ হবে যেমন অনেকে হজ্জ করেন হাজী বনার জন্য। ছেলে-মেয়ে বিবাহের সময় বলা যাবে অমুক সমিতির অমুক পদের লোক, বিশিষ্ট সম্মানিত ব্যক্তি। লোকমুখে এসব শুনলে তখন কতইনা তৃপ্তি পাওয়া যাবে। ঠিক এরকম পদলোভী অযোগ্যরা আমাদের সমাজ, রাষ্ট্রকে নস্যাত করে দিচ্ছে।

এই সমস্যা ছাড়াও আমাদের আরো কিছু মারাত্মক বাতিক আছে। আশ্চার্যের ব্যাপার হলো আমরা খুব গর্বের সাথে এই বাতিকের লালনও করি। যেমন আমরা জাতিগতভাবে বড়াই করে অন্য জাতির ব্যাপারে বলি “আমরা ওদের চাইতে ভালো, আর যদি আমরা একটু খারাপ হইও তারপরো ওদের চাইতে ভালো। এইরকম ভাবনার ন্যায়সঙ্গত কোন মাপকাঠি থাকার কথা নই, এর মাপকাঠি হচ্ছে অহংকার। এই অহংকার ব্যাক্তিগত লেবেল থেকে শুরু করে জাতিগত হয়ে বিভিন্ন রন্দ্রে রন্দ্রে ছড়িয়ে আছে। এই জাতীয়তাবাদি অহংকার যে আমাদেরকে সমাজে টুকরো টুকরো করে রাখছে সেটা বেশিরভাগ মানুষই অনুধাবন করতে পারছেনা। এই আচরণের কারণে আমরা একই দেশের মানুষ হয়েও জেলায় জেলায় বিভক্ত, থানায় থানায় বিভক্ত, গ্রামে গ্রামে বিভক্ত, এই পার্টি ওই পার্টিতে বিভক্ত। ফলে একটি মহৎ উদ্বেশ্যে একত্র হয়ে এই প্রবাসেও আমরা যোগ্যলোক নির্বাচনে ব্যর্থ হই। সভাপতি পার্থী আমার পাশের গ্রামের ছলিমুদ্দিন; মদ্যপায়ি, জুয়াড়ি এবং চরিত্রহীন হলেও অন্য গ্রামের করিমুদ্দিনের চাইতে ভালো কারন সে আমার পাশের বাড়ীর লোক। অদ্ভুত যুক্তি! আর করিমুদ্দিন নামাজি, সৎ, যোগ্য হলেও ভোট পায়না। এর চাইতে অসুস্থ, অজ্ঞ বা জাহিলি চিন্তা আর কি হতে পারে? কখনো কখনো বলে, “সৎ হলে কি হবে, আজকাল এত ভালো দিয়েও চলেনা, একটু বেয়াদব টাইপের নাহলে মানুষ মানবেনা।” আমাদের চিন্তা যদি হয় এত নিচের, তাহলে আমরা সমাজে শান্তি কিভাবে আশা করতে পারি?

সমিতি করেছি এই গ্রাম ঐ গ্রাম মিল্লা একসাথে। কিন্তু না উন্নতির কথা চিন্তা করলে আমার গ্রামকে অগ্রধিকারে রাখতে হবে, এইটা আরেকটা অসুস্থ চিন্তা। এই চিন্তা উন্নতির পক্ষে অন্তরায়।

আরেকটা চরম ক্ষতির দিক হচ্ছে আমাদের প্রদর্শন ইচ্ছা। আমাদের এই ক্ষতিকারক দিকটা সমস্ত ভালো কাজকে ধুলায় মিশে দেয়। একটা ভাল কাজ করব, কেন করব? করবো কারণ এই কাজটা করলে সবাই সুনাম করবে, নির্বাচনে পার্থী হলে অনেক সাপোর্ট পাওয়া যাবে। এর অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে যারা পদজয়ী হয়ে সমাজে সম্মানী হতে চান তারা। ধর্মীয় দৃষ্টিতে এই ধারণা শিরকের মধ্যেত পড়েই কারণ আল্লাহর সন্তুষ্টি বাদ দিয়ে মনের অসৎ ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করা হয়। তার উপর এই ধারনা ভালো কাজের সাথে ব্যক্তি স্বার্থ জড়িয়ে দেয়। ফলে কাজে সফলতা আসেনা। এভাবে আমাদের ভুল ধারণা এবং অসতর্কতার কারণে শয়তানি প্ররোচনায় আমরা অনেক ভালো কাজের সুফল পাইনা।

আরো কিছু বিশেষ ধরনের রুগি আছে। এরা সমিতির কোন পদ নিবেনা। দেশের কলেজ ইউনিভার্সীটি গুরে এসেছে ইনারা। তাই একটু স্পেশাল, সমিতির পুরো জনশক্তির মধ্যে এলিট ক্লাসের ইনারা উপদেষ্টা বোর্ড, নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন দায়িত্বসহ উল্যেখযোগ্য দায়িত্ব পালন করেন। উনারা হলেন বুদ্ধিদাতা। উনাদের বুদ্ধির মারপেঁচে সমিতির কল্যাণ দিশেহারা! ইনারা প্রার্থী নিয়োগে, নির্বাচনে এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব খাটিয়ে থাকে। প্রার্থীরা এবং কর্মপরিষদের লোক উনাদের কাছে বুদ্ধির জন্য আসলে ইনারা বেজায় খুশী হন। নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও নীতির বড় অভাব এমনকি এই শিক্ষিত শ্রেণীর ভিতরেও।

নির্বাচনে আমি হারব, এটা মানতে পারিনাঃ

জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান, যেখানে দরকার নিঃস্বার্থ পরপকারি মনভাব, কি পেয়েছি বা পাই নাই এই মনভাব থাকলে কেমন করে একটি জনকল্যাণমূলক সংগঠনের দায়িত্ব পালন করা যায়? যারা যেকোন কিছুর বিনিময়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চায় তারা হেরে গেলে মন খারাপ করবেইতো। হাজার হাজার ডলার যে খরছ করল লাভ কি হল? পদও পেলনা আর কিছু লাভের সুযোগও হাতছাড়া হলো! পরাজয়ে কষ্ট আছে আমরা জানি কিন্তু এখানে তা থাকার কথা নই। ইহা একটি জনসেবার কাজ, লাভের কিছু নেই এখানে। জনগণ যদি না চায় বুঝতে হবে আল্লাহ যা ভাল মনে করেছেন তাই হয়েছে। এসব দায়িত্বের প্রকৃত মর্ম বুঝলে কেউ হয়ত এই দায়িত্ব নিতেই চাইতনা। যদি বুঝত এই দায়িত্বের কানাকড়ি হিসাব দিতে হবে আল্লাহর কাছে।

কিন্তু তারপরও দেখা যায় হেরে যাওয়ার বিরুপ প্রতিক্রিয়া। একজন, দুইজনের মনজ্বালা মিটাতে শত শত মানুষের গড়া প্রতিষ্ঠান কেন ক্ষতিগ্রস্ত হবে? একবার নই, দুইবার নই, বার বার সংকটে পড়ে এই সমিতি। হেরে গেলেই কেস। হাজার হাজার ডলার ক্ষতি হয় একটি জনকল্যাণমূলক সংগঠনের। এর দায়ভার কি ঐ হেরে যাওয়া মানুষগুলো নিবে? যাদের উপর রাগবসত কেস করা হল তাদের কি দুই পয়সার ক্ষতি হবে? ক্ষতি হবেত মাসুম সংগঠনটির। যারা এরকম করে তারা হয়তো ভুলে যায় এসবের জন্য তাদের একদিন জবাব দিতে হবে। একবার শেষ নিঃশ্বাসটি দেহ থেকে বিদায় নিক, তখন মনে, জ্ঞানে আর দৈহিকভাবে বুঝতে পারবে জবাবদিহিতা কত প্রকার ও কি কি।

ভোট বিক্রি না বিবেক বিক্রি?

সমিতির কিছু সদস্য আছে ৫ ডলার চাঁদা দিয়ে সদস্য হওয়ার মুরদ রাখেনা কিন্তু নির্বাচনের সময় বিবেক বিক্রি করে ভোটাধিকার কিনে নেয়। তাদের বিক্রি করে দেওয়া ভোট যে সৎপাত্রে যাবেনা এটাতো নিশ্চিত করে বলা যায়। দুঃখের সাথে বলতে হয় এই ভোট কেনাবেচা জ্ঞাতদৃষ্টির সামনেই হয়। কারো কোন মাথাব্যথা হয়না। এই বিবেক বেচা লোকেরা বলে, এতগুলো টাকা দিয়ে সে আমাকে ভোটার করালো, তাকে ভোট কেমনে না দিই! প্রথমত, আমি কেন একজন ব্যাক্তিকে আমার সদস্য ফি দিতে দিব? আর সে যদি জোরবসত দিয়ে থাকে, আমার বিবেক কেন তাকে দিয়ে দিতে হবে? মনে রাখতে হবে, যারা ক্ষমতা কিনে নেই বা নিতে চায় তারা জনকল্যাণ চায়না, পরগাছার মত নিজের কল্যাণ সন্ধান করে। ঐ মাথাবেচাদের আরো একটা প্রশ্ন আছে। সেটা হলো, কার কথা বলবেন, সব প্রার্থীইতো টাকা দিয়ে ভোটার করায়। এর মানে হলো তারাও কোন পথ দেখেনা। সত্যিই খুব আপসোসের ব্যাপার। এমতাবস্থায় সৎ মানুষেরা এসব প্রতিষ্ঠান থেকে দুরেই থাকতে চায়; তাদের সামর্থে কিছু না কুলালে তারাইবা করবে কি?

যে সমিতির সর্বস্তরে এত সমস্যা সে সমিতি কিভাবে জনকল্যাণে আসতে পারে? ব্যাধি আমাদের অনেক মূলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ক্যান্সাররূপ ধারণ করেছে। সর্বস্তরে নিষ্ঠা, মূল্যবোধ ও নীতির ধারুন অভাব।

সমস্যা যেহেতু মুলে তাই মুলেই হাত দিতে হবে। জানি আমাদের বিবেক বহুলাংশে নিস্তেজ, মরিচা পড়ে আছে না ব্যাবহার করতে করতে। আমাদের ঘুমন্ত বিবেক কে একটু খোচা দিয়ে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে হয়তো সে চোখ খুলতে পারে। একবার বিবেকের চোখ খুললে তারপর তাকে জাগ্রত রাখার ব্যবস্থা হতে পারে। কেমন হয় যদি নিম্নের প্রশ্নগুলো আমাদের বিবেককে করা যায়?

১) নিঃস্বার্থ জনকল্যাণ মানে কি?

২) আমি কি নামের জন্য সমিতির কাজ করব নাকি মানবতার খাতিরে এর বিনিময়ে কিছু পূর্ণ হাসিলের চেষ্টা করব? মনে রাখতে হবে সঠিক নিয়তের উপরই কর্মের ফল নির্ভরশীল।

৩) সমিতির একটা পদ হাসিল করে যে সামাজিক মর্যাদা আমি অর্জনের চেষ্টা করি, এই মর্যাদার কোন মূল্য আছে আল্লাহর কাছে? আসল মর্যাদার অধিকারিতো ঐ ব্যক্তি যে অধিক সৎকর্মশীল ও আল্লাহকে বেশী ভয় করে।

৪) এভাবে পদ কিনে সম্মান নেয়া হলে কিছু স্বার্থপর লোক হয়তো সম্মান দেখাবে, কিন্তু সাধারণ মানুষ কি অন্তর থেকে সম্মান দেখাবে? ফলে এর কি প্রকৃত কোন মূল্য আছে?

৫) সমিতির যে অর্থ আত্মসাত করে আমি খেয়েছি বা খাব, এগুলো গরীব মানুষের হক। এর জন্য আল্লাহর কাছে কি জবাব দিব? উল্যেখ আছে যে ব্যক্তি জন মানুষের অর্থ আত্মসাত করবে, তাকে মৃত্যুর পর কন্ঠনালি ধরে কেয়ামত পর্যন্ত টেনে হেচড়ে নেয়া হবে (হাদিস)।

৬) আমি যদি সমিতির বিরুদ্ধে কেস করে সমিতির টাকা নষ্ট করি, এতে কি কোন একক ব্যক্তির ক্ষতি হবে? বা যাদের বিরুদ্ধে আমার রাগ, তাদের কি দুই পয়সার ক্ষতি হবে?

৭) এক সময় এই পৃথিবীতে আমি ছিলাম না, এখন আছি, আবার যেকোন মুহূর্তে চলে যাব। মাঝখানের এই কটা দিনের জন্য অনর্থক এত অর্থ, শ্রম ও সময় নষ্ট করে কি লাভ হবে? দুদিনের জন্য এত পন্ডশ্রম! আর অনন্ত পরকালের জন্য কি করছি আমরা?

যারা পরকাল বা স্রষ্টার কাছে জবাবদিহিতার ভয় করেনা তাদের কাছে হয়তো উপরের প্রশ্নগুলোর কোন গুরুত্ব বহন করবেনা। কিন্তূ আমরা যারা বিশ্বাস করি, মুসলমান বলে দাবি করি, প্রশ্নগুলো আমাদের মাথায় রাখা খুবই প্রয়োজন। ধর্মের কথা বাদ দিলেও প্রতিটি মানবতাবাদি বিবেকের কাছে জনকল্যাণে নিয়োজিত অর্থ আত্মসাত করা বা ঐরকম একটি প্রতিষ্ঠানের কোন ক্ষতি করা অন্যায়ই ঠেকার কথা। তা না হলে মানুষ কি আর মানুষ থাকে?

নির্বাচন পদ্ধতিঃ একটি অন্যতম সমস্যা

উপরের বিষয়টি আমলে নেয়ার পাশাপাশি সমিতির এই অবস্থা থেকে উদ্ধার হয়ে আসার আরেকটি প্রয়োজনীয় করণীয় হচ্ছে নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার। সমিতির অন্যতম সমস্যা হচ্ছে নির্বাচন পদ্ধতি। নির্বাচন কে নিয়ে এবং নির্বাচনকে ঘিরে যত সমস্যা। রায়ের আগ পর্যন্ত দলাদলি, রায়ের পরে কেস-কেলেংকারি। এসবের জন্য সমিতি কল্যাণের পরিবর্তে মারাত্মক সামাজিক অকল্যাণের কেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় সংস্কার না করে সমিতির যথাযত উন্নয়নে সচেষ্ট না হলে এই সমিতি রাখার পরিবর্তে বন্দ করে দেয়ায়ই একটি বড় সামাজিক কল্যাণের কাজ হিসাবে সুবিবেচ্য হবে।

সত্যিকারের কল্যাণ এবং উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা করেন এমন সব মানুষদের আমার নিম্ন সংস্কার প্রস্তাবনাটি ভেবে দেখার জন্য আনুরোধ করা যাইতেছে। প্রয়োজনবোধে কিছু এদিক সেদিক করা যেতে পারে।

১) নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া এবং প্রচার প্রপাগান্ডা বাদ দিয়ে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে। যে দায়িত্ব কিনে নয়, চেয়ে নয়, যে দায়িত্ব জনগণ খুশী মনে অর্পন করে ঐ দায়িত্বেই থাকে প্রকৃত কল্যান। আল্লাহও ঐ দায়িত্বশীলকে সাহায্য করেন (হাদিস)।

আর দায়িত্ব কোন ছেলে খেলা নয়, তার উপর জনগণের দায়িত্ব যাহা একটি বড় আমানত। আল্লাহতো প্রত্যেকের কাছ থেকে এই দায়িত্বের কানাকড়ি হিসাব নিবেন। এই হিসাব দেয়ার ভয় যাদের থাকে তারা কিন্তু কোন দায়িত্ব সহজে গ্রহণ করতে চায়না, চেয়ে নেয়াতো দুরের কথা। এই ব্যাপারে যাদের জ্ঞান নেই, তারা এই ক্ষেত্রে সবার আগে হাত বাড়ায় কারণ এতে ব্যক্তিগত এবং দুনিয়াবি কিছু পয়দাতো আছেই।

আমার কাছে মনে হয় কিছু মানুষের সভাব এমন যে, তারা তাদের ছোট্ট একটি পরিবার সামলাতে পারেনা, কিন্তূ যদি কোন দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতাও অফার করা হয়, তাতেও হাত বাড়াবে, যোগ্যতা আছে কিনা সেদিকটা ভাববেনা। বলাবাহুল্য, আমাদের দেশ-গেরামে তাই হচ্ছে। এসমস্ত ব্যাক্তিরা নির্ঘাত জবাবদিহিতার কোন তোয়াক্কা করেনা। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থই তাদের কাছে বড়। তাই আমার নিম্নের প্রস্তাবগুলো ভেবে দেখার জন্য অনুরোধ করছি।

২) নির্বাচিত হওয়ার জন্য নির্ধারিত কিছু মাপকাঠি থাকতে হবে।

কঃ কেউ প্রার্থী হতে ও ভোট চাইতে পারবেনা

খঃ দুই দফায় ভোট হবে। প্রথম দফায় সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। অনেকটা আমেরিকার প্রাইমারি ইলেকশনের মত। দ্বিতিয় দফায় যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীদয় পদ-অনুযায়ী প্রাপ্য সর্বাধিক ভোটে জয়লাভ করবে। পদ আর প্রার্থী দুটোই অপেন থাকবে।

গঃ নির্দিষ্ট করা যোগ্যতার ভিত্তিতে জনগণ প্রথমে প্রার্থী ও পরে নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন।

ঘঃ প্রথম দফায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি যোগ্য কমিটি দ্বারা বাচাই করা হবে। বাচাই পর্বে সহযোগিতা করার জন্য যোগ্য কমিটি জনমানুষের কাছে আবেদন জানাবে। একটি নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে ঐ সম্ভাব্যপ্রার্থীদের কারো বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তির কোন প্রকার অভিযোগ থাকলে কমিটিকে তারা লিখিতভাবে জানাবে। কমিটি সকল গোপনীয়তা রক্ষা করে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে এসব তথ্য হ্যান্ডল করবে। সৎ ও নিষ্ঠার সাথে যাচাই বাচাই করবে।

ঙঃ কেউ কোন অভিযোগ দেওয়ার আগে সমিতির বাধা নিয়মানুযায়ী সৎ ও নিষ্ঠার সাথে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে একটি অঙ্গীকার নামায় স্বাক্ষর করতে হবে। অভিযোগ মিথ্যা প্রমানিত হলে অভিযোগকারির ভোটাধিকার বা সদস্যপদ বাতিল হতে পারে।

চঃ যাচাই বাচাইয়ের পর সম্ভাব্য প্রার্থীদের লীষ্ট ফাইনাল করা হবে। কমিটি ঐসব প্রার্থীদ্বয়ের সাথে আলাপ আলোচনা করে তাদের মতামতও যাচাই করবে। কেউ যদি প্রার্থী হতে অপারগ দেখায় এবং তা যদি যুক্তিসংগত না হয়, তাহলে কমিটি তাদের বুঝাবেন যে, সমিতির খাতিরে তারা যেন মেনে নেয় এবং দায়িত্ব এলে সবাইকে মনে করতে হবে যে এটি আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে। আল্লাহ অবশ্যই সাহায্য করবেন এবং তার অন্যান্য সহযোগীতো থাকবেনই।

ছঃ বাচাই করা প্রার্থীদের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় সব ভোটারের কাছে নির্বাচনের অন্তত দুই সাপ্তাহ আগে পৌছানো হবে, ফলে সবাই প্রার্থীদের ব্যাপারে অবগত থাকবেন।

জঃ ভোটের দিন ভোট দেওয়ার আগে সব ভোটারের কাছ থেকে ২-৩ বাক্যের একটি মৌখিক অঙ্গিকার নেয়া হবে যে, তারা কোন প্রকার স্বজনপ্রীতি, লোভ বা প্রভাবের স্বীকার না হয়ে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে সৎভাবে ভোট দেবেন। ইহা নির্বাচনী প্রতিনীধি ভোট গ্রহণের সময় করে নেবেন।

ঝঃ বাচাই করা প্রার্থীদের দ্বারা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ব্যালট পেপারে সব পদের নাম উল্লেখ থাকবে। পাশে সব প্রার্থীদের নাম ও ছবি থাকবে। ভোটাররা তাদের বিবেকের বিচারে যাকে যে পদে খুশী ভোট দিতে পারবেন।

ঞঃ বাহিরের স্টেটে যারা থাকেন তাদের ভোট মেইলে পাঠাতে পারবেন। তবে যদি জানা যায় কোন প্রার্থী বা তার কোন লোক বা দল কোনরুপ প্রপাগান্ডা বা দূর্নীতি করেছেন, তাহলে ঐ প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিল বলে গণ্য হবে আর সাফাইকারি ঐসব লোকদের ভোটাধিকার ঐ নির্বাচনের জন্য বাতিল বলে গণ্য হবে। এজন্য বাহিরের স্ট্রেটের ভোট আগে নেয়া হবে।

নির্বাচন কমিটির সদস্য বা নির্বাহী কমিটির প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার জন্য নিম্নবর্তী যোগ্যতাগুলো থাকতে হবেঃ

১- মুসলমান হলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী হতে হবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম পালনে গাফলতি করে, সে যে মানুষের দায়িত্ব পালনে গাফলতি করবেনা, এটা বিশ্বাস করা একটি ভুল ছাড়া আর কিছু নয়।

২- ক্রিমিনাল কোন রেকর্ড় থাকতে পারবেনা। প্রয়োজনে পুলিশ ষ্টেশন থেকে রিপোর্ট নেয়া যেতে পারে।

৩- সামাজিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকার একটা সুনাম থাকতে হবে বা সামাজিকভাবে কর্মঠ হতে হবে।

৪- মদ, জুয়া, ব্যাবিচারে লিপ্ত থাকার কোন প্রতিষ্ঠিত (সামাজিকভাবে জ্ঞাত) অভিযোগ থাকতে পারবেনা।

৫- কোথাও কখনো কারো টাকা আত্মসাত করার ঘটনা থাকতে পারবেনা।

৬- গালাগালি বা কটুকথক, গীবতকারী, চোগলখোর বলে বিবেচিত বা পরিচিত হতে পারবেনা।

৭- শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে বাংলায় শুদ্ধভাবে লিখতে ও পড়তে জানতে হবে। ধর্মীয় মৌলিক জ্ঞানে শিক্ষিত হতে হবে। মিথ্যা, গীবত, চোগলখোরি এবং অসৎভাবে অর্থ উপার্জনের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা সস্বন্ধে অবগত হতে হবে।

৮) পারিবারিকভাবে একজন সফল গার্ডিয়ান হিসাবে সুপরিচিতি থাকতে হবে। কারন যে ব্যাক্তি পরিবারে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়, উনি কোন্‌ যুক্তিতে অনেকগুলো মানুষের একটি সংগঠনের দায়িত্ব নিতে পারেন!

এই ভিত্তির উপর যদি জনমত গঠন করা যায়, তবে শত অন্ধকারের মাঝেও আশার আলো ধীরে ধীরে সব আলোকিত করতে পারে। অন্যথায় আমি অধমের চোখে আর কোন পথের সন্ধান মিলেনা। কোন বিজ্ঞলোক যদি এর চাইতে ভাল কোন পথ দেখাতে পারেন, আমি নির্দিদায় তা গ্রহণ করব।

তা না হলে প্রবাসে এই সমিতিগুলো যেভাবে কর্মকান্ড চালাচ্ছে, তাতে এগুলো বন্দে কেউ উদ্যেগি হলে আমার পূর্ণ সমর্থন থাকবে। কারণ এগুলো কল্যাণের নামে হিংসা, বিদ্বেষ আর ভেদাভেদ ছড়াচ্ছে। আমাদের কমিউনিটিকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করছে। কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের বিশেষ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তাই আসুন, আমরা আরো সচেতন ভূমিকা পালন করি, তা না হলে সমস্যা আরো গাঢ় হবে; অন্ধকার আরো ঘনিয়ে আসবে, তখন হয়তো আমরা আর পথ দেখবনা।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/AbdulWahab
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
রিয়াদ, সৌদি আরব থেকে কামরুল ইসলাম লিখেছেন, ০৩ এপ্রিল ২০১১; রাত ১২:০২
অত্যান্ত চমৎকার লেখা খুবই ভাল লেগছে।
52855
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy