এই লেখার মূল আলোচ্য বিষয় হল ইলমূল ফারাইজ তথা ইসলামের উত্তরাধিকার আইনের ইতিহাস। যা আমাদের সমাজের আজকের প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে মেয়েদের অধিকার প্রায় দেয়াই হয় না। অথচ ইসলাম দিয়েছে তার পূর্ণ অধিকার। তাই ইসলাম আসার পূর্বে উত্তরাধিকার আইন কি ছিল? ইসলাম আসার পর উত্তরাধিকার আইন সমাজে কি রুপ প্রভাব পড়েছে? তা নিচের প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে তুলে ধরা হল- ইলমূল ফারাইজ কি? আছবিয়্যাত বা আছাবা প্রথা কি? মাওলাল মাওয়ালাত বা মাওলা কি? তাবান্নী কাহাকে বলে? কালালা কাহাকে বলে? উত্তরাধিকার আইন প্রবর্তনে আল্লাহর কৌশল কি? উত্তরাধিকার আইণ কখন পূর্ণতা পেল?
১. ইলমূল ফারাইজের সংজ্ঞা:
ইল্ম অর্থ জ্ঞান, জানা, খবর, বিষয় শাস্ত্র ইত্যাদি। আর ফারাইজ শব্দটি আরবী ফরীজাতুন শব্দের বহুবচন। যার অর্থ হল: কেটে পৃথক করা, নির্ধারণ করা, বন্টন করা প্রভৃতি। তাই এক কথায়, যে শাস্ত্র মানুষের মৃত্যু পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয়াদি, তার উত্তরাধিরা বিষয়ক বিষয়াদী তার রেখে যাওয়া যাবতীয় সম্পদ ও অধিকার সমূহের সুষ্ঠ ব্যবহার অংক করে ভাগ বাটোয়ারা সম্পর্কিত বিষয়াদি আলোচিত হয়, তার নাম হল ইল্মুল ফারাইজ।
২. আছবিয়্যাত বা আছাবা প্রথার সংজ্ঞা:
ইসলাম আসার পূর্বে তখনকার আরব সমাজে গোষ্ঠি প্রথা ও শুধু মাত্র পুরুষ কেন্দ্রিক উত্তরাধিকারের যে ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল সেই প্রথাই আছাবিয়্যাত বা আছাবা প্রথা।
৩. মাওলাল মাওয়ালাত বা মাওলার সংজ্ঞা:
প্রাক-ইসলামী যুগে গোত্রহীন দূর্বল লোকেরা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে সমাজের প্রভাবশালী শৌর্য বীর্যবান লোকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতেন, চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর দু’পক্ষের জীবদ্দশায় পরস্পরের মিত্র, সাহায্যকারী, বন্ধু হিসাবে পরিচয় লাভ করত এবং কোন একজনের মৃত্যু হলে অপরজন তার উত্তরাধিকারী হতেন। এই রকম বন্ধুকে মাওলাল মাওয়ালাত বা শুধু মাওলা বলা হত।
৪. তাবান্নীর সংজ্ঞা:
পুত্রহীন লোকেরা অন্যের পুত্রকে তার অনুমতিক্রমে নিজের পুত্র হিসেবে গ্রহন করত। কেউ কেউ আবার কিশোর বয়সের কৃতদাসকে খরীদ করে নিত এবং তাদেরকে নিজের পুত্র হিসাবে সংসার ভূক্ত করত, এ ব্যবস্থাকে তাবান্নী বলা হয়।
৫. কালালার সংজ্ঞা:
কালালা অতি আলোচিত ও অতি বিতর্কিত একটি বিষয়। কেউ কেউ কালালা শব্দটি আরবী ইকলীল শব্দ থেকে উদ্ভুত বলে মনে করেন। নিম্নে তার কয়েকটি সংজ্ঞা দেওয়া হল-
ক) কালালা হল এমন ব্যক্তি যার শাখার দিকেও কোন উত্তরাধিকারী নেই এবং মূলের দিকেও কোন উত্তরাধিকারী নেই।
খ) কালালা হল পিতৃহীন নি:সন্তান লোক।
গ) হযরত কাতাদা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কালালা হল এমন ব্যক্তি যার অধ:স্তন বা উর্ধ্বতন কেউ নেই।
ঘ) হযরত উমর রা. বলেন, কালালা হল এমন লোক যার কোন সন্তান নেই (ইবনু জারীর)।
ঙ) রাসূল (সা:) বলেন, সূরা নিসার ১৭৬ নং আয়াত হল আল্লাহ কর্তৃক কালালার ব্যাখ্যা।
৬. উত্তরাধিকার আইন প্রবর্তনে আল্লাহর কৌশল:
আল্লাহর নিয়ম হল সমাজের অধিকাংশ লোক যদি কোন অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে যায় আর আল্লাহ তা পরিবর্তন করতে চান তাহলে তিনি তা তাৎক্ষণিক পরিবর্তন করেন না। এর জন্য আল্লাহ যে ধারা অবলম্বন করেন তা হল-
ক) প্রথমে উহার কুফল বর্ণনা করে অভ্যাস পরিত্যাগের জন্য জনমত গঠনের প্রয়াস চালান।
খ) তারপর যখন জনগণ উহা গ্রহণ করে নেয় ও এর স্বপক্ষে জনমত সৃষ্টি হয়, তখন সুবিধাজনক সময়ে তা পরিত্যাগের নির্দেশ দিয়ে আয়াত নাজিল করেন।
ক) সূরা বাকারা আয়াত -১৮০: “অভ্যাস পরিত্যাগের জন্য প্রথম নাজিলকৃত আয়াত এটি-“তোমাদের উপর লিখে দেয়া হল: তোমাদের কারা মৃত্যুর সময় যখন হাজির হবে তখন তার সম্পদ থাকলে পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনের অনুকুলে ইনসাফ মোতাবেক যেন ওসিয়াত করে, ইহা মুত্তাকীদের উপর বাধ্যতামূলক’’।
খ) সূরা নিসা আয়াত-০৭: “পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনেরা যা কিছু রেখে যাবেন, তাতে পুরুষদের নির্ধারিত অংশ রয়েছে এবং পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনেরা যা কিছু রেখে যাবেন, তাতে নারীদের নির্ধারিত অংশ রয়েছে। তা পরিমানে কম হোক অথবা বেশী’’।
গ) সূরা নিসা আয়াত-১১: “তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশনা হল একজন পুরুষ দু’জন নারীর সমান হিস্সা পাবেন। সুতরাং যদি তারা দু’এর অধিক কন্যা সন্তান হয়, তবে তারা দু’তৃতীয়াংশ পাবে সে যা কিছু ছেড়ে যাবে তা থেকে”।
ঘ) সূরা নিসা আয়াত-৩২ ও ৩৩: “আর তোমাদের কাউকে অপর কারো উপরে আল্লাহর মর্যাদা দেয়ার কারণে তোমরা তা পেতে ইচ্ছা কর না। পুরুষেরা তা পাবে যা তারা অর্জন করবে এবং নারীরা তা পাবে যা তারা অর্জন করবে। আর তোমারা আল্লাহর কাছে তার করুণা ভিক্ষা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেকটি ব্যাপারে জ্ঞান রাখেন। এবং পুরুষ ও নারী প্রত্যেককে আমরা রেখে যাওয়া সম্পদে আর যাদের ব্যাপারে তোমরা শক্ত অঙ্গিকার করেছ সে লোকদের হিস্সা তাদেরকে পরিশোধ কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ প্রত্যেকটি বস্তু প্রত্যক্ষ করেন’’।
ঙ) তার পর দীর্ঘ কয়েক বছর মুসলিম জনমতে অনেক পরিবর্তন এসেছে, জনগণের গভীরে ইসলামের বীজ প্রোথিত হয়েছে। এর পরই এই আয়াত নাজিল হয়---
সূরা নিসা আয়াত-১৭৬: “যদি কোন নি:সন্তান লোক মারা যায় এবং একজন বোন থাকে, তবে সে মৃত ভাইয়ের মোট সম্পদের অর্ধেক পাবে।....’’
চ) নিম্নের এই নাজিলকৃত আয়াতের মাধ্যমে ইসলামী উত্তরাধিকার আইন পূর্ণতা পেল-
সূরা আল মায়িদা আয়াত-৩: “আজ আমি তোমাদের জীবন বিধানের পূর্ণতা দান করলাম আর তোমাদের জন্য ইসলামকে জীবন বিধান হিসাবে সন্তুষ্ট চিত্তে ঘোষণা করলাম’’।
Prepared by: Coordinator (Research, Training & Program), Non Govt. Research Institute, Uttara, Dhaka;
Very good.Please write and post your second part also.
61086
২
ঢাকা থেকে সূচী লিখেছেন,
০১ জুলাই ২০১১; রাত ০৮:২৭
চমৎকার লিখেছেন আলামিন ভাই। এটা পড়ে আমাদের সমাজে সম্পত্তি নিয়ে নানান কুসংস্কার দূর হবে বলে আমার ধারন। এই ধরনের লিখা আরো বেশি করে লিখবেন সেই প্রত্যাশা রইল। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুক।
61310
৩
টাংগাইল থেকে েমাহাম্মাদ ইকবাল েহােসন লিখেছেন,
০৩ জুলাই ২০১১; সন্ধ্যা ০৬:০৭
অেনক ভাল েলেগেছ ।উত্তরাধিকারী আইন যা মুলত কুরআন হাদীছ সম্মত তার জ্ঞান এদেশের জনগনের মধ্যে অনুপস্তিত ।বিশেষত মেয়েরা তাদের যথাযথ অধিকার পায় না । জনসচেতনতার অংশ হিসেবে তার এলেখা ও উত্তরাধিকারী আইন অামাদের সহজভাবে জানার সুযোগ করে দিয়েছে ।তাই আমি কৃতজ্ঞ ।
61485
৪
ঢাকা থেকে শরিফুজ্জামান লিখেছেন,
২২ এপ্রিল ২০১২; বিকেল ০৫:০৫
সুন্দর গুছানো লেখা। উত্তরাধিকার নিয়ে আমরা না জেনেই বিতর্ক করে থাকি। এ জন্যই ইসলামে জ্ঞানার্জনকে ফরয করা হয়েছে। আগে জানুন একইসাথে জানাতে থাকুন। ধন্যবাদ ।
83241
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: