পশ্চিমবঙ্গে বাম জমানার শেষদিককার কথা। সিঙ্গুর নিয়ে তখন তুলকালাম হচ্ছে। মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল, মানস ভূঁইয়ার কংগ্রেস সকাল-সন্ধ্যা বন্ধ ডেকেছে। সমর্থন দিয়ে চলেছে বুদ্ধিজীবী সমাজ। অধিকাংশই একসময় বাম সমর্থক ছিলেন। বাম সরকার উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলো। উচ্চ আদালত রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জনদুর্ভোগ ইত্যাদির কথা বিবেচনা করে রায় দিলেন দেশের স্বার্থের পরিপন্থী, উন্নয়নের প্রতিবন্ধক এবং জনদুর্ভোগের কারণ বিধায় বন্ধ করা যাবে না। আদালতের এই রায়ের পর সেখানকার শ্রমিক সংগঠনগুলো নানা যুক্তি দিয়ে আদালতকে অনুরোধ করল এই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য। এই রায় দিয়েছিলেন যে বিচারপতি, তিনিই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এক দিনের মধ্যে রায় পর্যালোচনা করে নতুন রায় দিলেন। তাতে বলা হলো বন্ধ সংবিধানে প্রদত্ত মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক এবং সংগঠনের অধিকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। অতএব বন্ধ করা যেতে পারে। তবে বন্ধ না করার অধিকারও সমভাবে যৌক্তিক। কাজেই কেউ যদি বন্ধ না করতে চান, তাহলে তাঁর সেই অধিকারে কোনো অবস্থাতেই বাধা দেওয়া যাবে না।
পশ্চিমবঙ্গে সেই বন্ধ পালিত হয়েছিল, কিছু দোকানপাট খুলেছিল, অফিস-আদালত চলেছিল, ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল বটে; কিন্তু বন্ধ হয়নি। প্রাইভেট গাড়ি চলেছিল রাস্তায়, কেউ ভাঙার জন্য ধেয়ে আসেনি কিংবা আগুন লাগানোর পাঁয়তারা করেনি। এর পরও পশ্চিমবঙ্গে সেদিন বন্ধ হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের সংসদ অধিবেশন বসেছিল, তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস সমেত বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদে গিয়ে বন্ধ সফল হওয়ার দাবি করেছিলেন। বাম জোটেরও কোনো কোনো শরিফ বন্ধকে আংশিক সফল বলে উল্লেখ করেছিল এবং সমস্যাটি পার্লামেন্টে নিষ্পত্তির কথা বলেছিল। সিঙ্গুর ঘটনা বাম সরকারকে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিল এবং একসময় প্রয়াত জ্যোতি বসু পর্যন্ত অবসরকালীন অবস্থায়ও বামফ্রন্টকে উপদেশ দিয়েছিলেন এ ব্যাপারে একটা যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য। হরতাল নয়, সংসদ বর্জন নয়, কোনো জ্বালাও-পোড়াও কিংবা ঘেরাও-ও নয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা থেকেই বামফ্রন্ট সরকারকে পিছু হঠতে হয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক উদাহরণ টানতে হলো এ কারণে যে বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি বিষয়ে বেশ সাদৃশ্য রয়েছে। ওখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এখানকার রাজনৈতিক মহল অনেকখানি অবহিত হলেও ওখানকার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিটি এখানকার এঁরা খুব একটা গায়ে মাখেন না কিংবা সেটা ধারণ করার বা অনুধাবন করার বোধটুকুও বোধ হয় তাঁদের নেই। নইলে এভাবে কেউ হরতাল দেয়!
মাত্র ক'দিনের মধ্যে বিরোধী দল দু-দুবার হরতাল দিল। সর্বশেষটি ছিল ছত্রিশ ঘণ্টার। শোনা যাচ্ছে, এরপর নাকি তিন দিনের হরতাল হবে, তারপর সাত দিনের এবং তারপর নাকি লাগাতার! এ রকম ধরনের হুঁশিয়ারি বাক্য শোনা গেল বিএনপি এবং জামায়াতের ঊর্ধ্বতন নেতাদের কারো কারো মুখ থেকেও।
এ প্রসঙ্গে কিছু খণ্ডচিত্র তুলে ধরা যাক।
সামিরা নামের একটা মেয়ে। তার স্কুলে যাওয়া খুবই প্রয়োজন। কারণ সেদিন তার একটি বিষয়ের শেষ ক্লাস হওয়ার কথা। স্কুল যদি কোনো কারণে বন্ধও হয়, তার ওই দিনের ওই ক্লাসটি করতেই হবে। কারণ এর পরই ক্লাস পরীক্ষার পালা। হরতালের খবর পাওয়ার পর সে বিমর্ষ এবং বিচলিত হয়ে পড়ল। ছোট্ট সামিরা বুঝতেই পারছে না হরতাল কেন হচ্ছে, কারণ যে জন্য হরতাল হচ্ছে সেটাতে তার কিছু যায় আসে না।
মার্কিন দূতাবাসের সামনের ফুটপাতে সকালবেলায় ভিড় জমে দিনমজুরদের। ওদের একদল দিনমজুর বসেছিল গালে হাত দিয়ে। হরতালের কারণে ওদের কোনো কাজ নেই, কোনো কিছু করার নেই। ওদেরই একজনের নাম গফুর। গায়ে বেঢপ মাপের ছেঁড়া শার্ট, হাঁটু পর্যন্ত তোলা লুঙ্গি, কোমরে পেঁচানো গামছা। সে প্রচণ্ড চিন্তিত, কারণ আজ চাল-ডাল না কিনে নিয়ে গেলে বাড়ির সবাইকে উপোস থাকতে হবে। দিনশেষের মজুরিতেই তার বাজার হয়, হরতাল তাই তার কোনো কাজ নেই। গফুর রাজনীতি বোঝে না, বুঝতেও চায় না। তার কথা হলো, পলিটিশিয়ানরা নিজেদের জন্যই সব কিছু করে আর তার ধাক্কা সামলাতে হয় গরিব মানুষদের।
কারওয়ান বাজার এলাকায় উদাস চোখে তাকিয়েছিল ঠেলাগাড়িওয়ালা জমিরদ্দিন। হরতালের জন্য তার ঠেলায় কোনো মাল উঠবে না। আর ঠেলাগাড়ি বসে থাকলে তার ঘরের চুলোয় হাঁড়ি চড়বে না। জমিরদ্দিন কখনো রাস্তায় পুলিশের গাড়ির দিকে তাকায়, কখনো রাস্তায় চলমান মানুষের দিকে। ওর কাছে রাজনীতির এসব অদ্ভুত খেলা মূল্যহীন।
সাতসকালে ছুটতে ছুটতে অফিসে গিয়েছিল গার্মেন্টকর্মী জয়গুন। গিয়ে দেখে কারখানার বিশাল গেটে তালা দেওয়া। ভেতর থেকে দারোয়ান বলে দিল, হরতাল তাই আজ কারখানা বন্ধ। মাথায় বাজ পড়ল জয়গুনের। হায় হায়, আজ তো বেতন পাবে না সে। কী হবে তার! হাত যে একেবারেই শূন্য। সেও বোঝে না হরতালে কী লাভ তার!
এই খণ্ডচিত্রগুলো কাল্পনিক নয়, সম্পূর্ণ বাস্তব। যাঁরা হরতাল দেন তাঁরা এই বাস্তব চিত্রগুলোর দিকে কখনো চোখ তুলে তাকান না। তাঁদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ওই সামিরা, গফুর, জমিরদ্দিন, জয়গুনদের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাঁদের কাছে ব্যবসা-বাণিজ্য, মানুষের অভাব-অভিযোগের কোনো স্থান নেই। ক্ষমতার চেয়ার আড়াল করে দিয়েছে গোটা মানচিত্রকে।
পাকিস্তান আমলে আমরা যখন সক্রিয় রাজনীতি করেছি তখনো তো মাঝেমধ্যে হরতাল হয়েছে। কিন্তু তখন তো তার চিত্র এ রকম ছিল না। আগের রাতে বাসে আগুন দেওয়া, দু-দশটা গাড়ি ভেঙে চুরমার করে দেওয়া-এমনটি তো ঘটেনি তখন। আমরা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে হরতালের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করেছি। কখনো তাতে কাজ হয়েছে, কখনো হয়নি। যখন হরতাল সফল হয়নি তখন আমরা মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছি কেন সফল হলো না, দুর্বলতা কোথায় ছিল? সাংগঠনিক, না নীতিগত? হরতালকে যদি জনসমর্থনের ব্যারোমিটার ধরা হয়, তাহলে এভাবে বিষয়টি যাচাই করতে হবে।
কিন্তু এখন যা হচ্ছে তাতে তো কিছুতেই প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে না। হরতাল আহ্বানকারীরা অহেতুক ভ্রান্তিবিলাসে ভুগবেন এবং এর ফলে নিজেদের সাংগঠনিক ঘাটতি কিংবা নীতিগত দুর্বলতা যাচাই করতে পারবেন না। তার পরিণতিতে হরতালের মতো অস্ত্রটি সম্পূর্ণ ভোঁতা হয়ে যাবে। এখন হচ্ছেও তাই। এখন যে ইস্যুতে হরতাল করা হচ্ছে তা দলীয় ইস্যু, জাতীয় ইস্যু নয়। এর মধ্যে জনগণের সম্পৃক্তি নেই, শিক্ষাঙ্গনের নেই, ক্ষুদ্র-মাঝারি কিংবা বৃহৎ ব্যবসায়ীদেরও সম্পৃক্তি নেই। শ্রমিকেরও নেই, কৃষকেরও নেই। বরং প্রতিটি হরতাল গিয়েছে এদের প্রত্যেকেরই বিরুদ্ধে। তাহলে কেন এভাবে আত্মবিনাশী আচরণ? এর ফলে কী হচ্ছে? মানুষের মনে আবার রাজনীতির প্রতি বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হচ্ছে, এর ফলে নিঃশব্দে ওঁৎ পেতে থাকা সেই শক্তিই লাভবান হচ্ছে, যারা দেশটাকে রাজনীতিশূন্য করতে চায়, অকার্যকর রাষ্ট্র বালাতে চায় বাংলাদেশকে।
আমরা দেখছিলাম, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর অবস্থার দিকে পা রাখতে শুরু করেছিল, বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা ক্রমশ উজ্জ্বলতর হচ্ছিল, দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তারা জড়তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলেন, সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছিল। ঠিক এই সময়টায় একের পর এক অর্থহীন হরতাল দিয়ে বিরোধী দলের কী অর্জন হচ্ছে জানি না; কিন্তু আশঙ্কা করি, এক অপতৎপরতার ছায়া ক্রমশ দীর্ঘতর হচ্ছে। বিএনপির ইস্যু তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর জামায়াতের ইস্যু যুদ্ধাপরাধী এবং অন্য ইসলামী দলগুলোর ইস্যু নারীনীতি আর শিক্ষানীতি। এর মধ্যে মানুষের অবস্থান কোথায়, ব্যবসায়ীদের, শ্রমিকদের, কৃষকদের, চাকরিজীবীদের জায়গা কোথায়? তা ছাড়া আন্দোলনকারী পক্ষগুলোর মধ্যেই ইস্যুগত সমঝোতা নেই। দেখা যাচ্ছে, বিএনপির ঘাড়ে সওয়ার হয়ে অন্যরা নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থাটাকে ঝালাই করে নিচ্ছে।
একটা কথা মনে রাখা বোধহয় প্রয়োজন, আন্দোলন কখনো নকল করে হয় না। অমুক এই এই কারণে এই এই ইস্যুতে আন্দোলন করেছে, অতএব আমরাও করব, এভাবে কোনো আন্দোলন কোনো দেশে কখনো হয়নি। এখন পৃথিবী গণতন্ত্রের পক্ষে। গণতন্ত্রের দুই ক্ষেত্র, একটি হচ্ছে ব্যালট এবং অন্যটি পার্লামেন্ট। ভোটের মাধ্যমেই জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে পার্লামেন্টে পাঠায়। কাজেই যে কোনো বিষয়ের মীমাংসা পার্লামেন্টেই হতে হবে। বাইরে যা-ই করা হোক না, তা দ্বারা মানুষের নির্বাচিত পার্লামেন্টের প্রতি অশ্রদ্ধা পোষণ ছাড়া আর কিছু হয় না। এটা কেবল নিজেকে পরিহাস করা ছাড়া আর কিছু নয়।
হরতাল প্রতিবাদের অস্ত্র বটে; কিন্তু একমাত্র অস্ত্র তো নয়। প্রতিবাদ তো অনেকভাবেই করা যায়। কিন্তু এমন ধরনের প্রতিবাদ তো করা উচিত নয়, যা উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, অর্থনীতির চাকা বন্ধ করে দেবে, মানুষের দুর্ভোগ বাড়াবে। এ ধরনের প্রতিবাদ আসলে জনগণের বিরুদ্ধেই যায়। তবে এ প্রসঙ্গে সরকারেরও দায়িত্ব আছে। বিরোধীপক্ষ যদি কোনো ইস্যু উত্থাপন করে সেটাকে এককথায় তুচ্ছ করে দেওয়া এবং তার পেছনে উদ্দেশ্য আবিষ্কার করার চেষ্টাটাও যুক্তিসংগত নয়। এ ক্ষেত্রে উচিত উদ্যোগী হয়ে তাদের বিষয়গুলো যাচাই করা, আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা। সবাই যদি জিদ করেই জিততে চান, তাহলে হারবে কেবল গণতন্ত্র এবং জনগণ।
[সূত্রঃ কালের কণ্ঠ, ১৭/০৬/১১] |