বৃহস্পতিবার, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৭ মে ২০১২; রাত ১১:২৩ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

মে দিবস নয় শ্রমিক দিবস পালন করুন

আবু বকর মুহাম্মদ সালেহ

যারা জনগণকে নানাভাবে সেবা দেন এবং যারা সভ্যতা নির্মাণের কারিগর তারাই শ্রমিক। যেমন যারা কল-কারখানায়, ক্ষেতে খামারে, ঘর গৃহস্থালীতে, রাজমিস্ত্রিীর অধীনে বা ঘরামীর কাজ করেন, যানবাহন চালান তারাই শ্রমিক। এছাড়াও কুলীর কাজ যারা করেন তারাও শ্রমিক। শ্রমিকরা সর্বাপেক্ষা কঠিন শ্রমের কাজ করে থাকেন অথচ সবচেয়ে বেশী অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার তারাই হয়েছেন এবং এখনো হচ্ছেন। পৃথিবী থেকে ভৌগলিক সাম্রাজ্যবাদ উঠে গেলেও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ উঠে যায়নি। বরং আরও পাকাপোক্ত ভাবে জেঁকে বসেছে। অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ বলতে আমরা বুঝাতে চাচ্ছি মানবতার ঘৃণ্য অভিশাপ সমস্ত রকম শোষণ ও বঞ্চনার হাতিয়ার পুঁজিবাদকে।

১৮৭৬ সালের ১ মে তারিখে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিকদের রক্তঝরা আন্দোলন সফল হয়েছিল কেবল কাজের সময় ৮ ঘন্টা করার বিষয়টি। সেদিনকে স্মরণ করতে এখনো পালিত হচ্ছে মে দিবস। তবে আইএলও শ্রমিকদের কাজ, পারিশ্রমিক ও সুযোগ সুবিধা সম্বলিত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে এবং বাংলাদেশ সেই নীতিমালার ৩১টি ধারা মেনে চলার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছে। যদিও সেই সব নীতিমালার কোনটিই প্রকৃতপক্ষে শতভাগ বাস্তবের মুখ দেখেনি। উদাহরণ স্বরূপ আমরা বলতে পারি আইএলও (ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন) নীতিমালা অনুযায়ী যে কোন দেশে নারী ও শিশু শ্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে নারী ও শিশুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জীবিকার জন্য কঠিন শ্রমে নিয়োজিত থাকছে। তাদের কাজের ধরণ হচ্ছে রাজমিস্ত্রির অধীনে কাজ করা, ইট ও পাথর ভাংগা, শিশুরা কাজ করছে বেসরকারী দোকানপাট ও কল-কারখানাগুলোতে। তাদের পারিশ্রমিক উল্লেখ করার মত কিছু নয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা কোন পারিশ্রমিকই পায়না।

শিশুদেরকে বেশী দেখা যায় লেদ মেশিনের কারখানা ও হোটেলগুলিতে। সেখানে তারা এখনও প্রায় ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা একটানা পরিশ্রম করে পারিশ্রমিক পায় যৎসামান্য তবে প্রায়ই তাদের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদীদের প্রতিনিধি জাতিসংঘ হে মার্কেটের ঘটনাকে মে দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর আমরা ঘটা করে মে দিবসই পালন করে থাকি। এটা হচ্ছে শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত দিবস। নামটা হওয়া উচিৎ ছিল শ্রমিক দিবস। সেই ১৮৭৬ সাল থেকে ডান বাম নির্বিশেষে সকলেই এটাকে মে দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। যেসব বামপন্থীরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রাণপাত করে, তারাও সাম্রাজ্যবাদীদের তুলে দেওয়া নাম মে দিবসকে মেনে নিয়েছে। এতদিন আমরা যা করেছি তা কি এখনও করতে হবে? বিষয়টা শ্রমিকদেরকে এবং শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোকে নতুন করে ভাবতে হবে।

শ্রমিক নির্যাতনের সাম্রাজ্যবাদী রূপঃ প্রতি বছর মে দিবস পালন হয়। এদিন সরকারী ছুটি থাকে। শ্রমিকরা আনন্দ মিছিল করে। মিটিং হয়, আলোচনা সভা হয়। কিন্তু শ্রমিক নির্যাতনের স্বরুপটা উন্মোচন হয়না। এখনও শ্রমিকরা ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের যাতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে আমরা সৈয়দপুর রেল কারখানার শ্রমিকদের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে পারি।
বৃটিশদের তৈরী করা কারখানায় বিভিন্ন পর্যায়ের শ্রমিকরা কাজ করে থাকে। এটি পরিচালনা করার জন্য রয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা। এখানে শ্রমিকদেরকে রাখা হয়েছে অচ্ছুৎ হিসেবে। প্রথমেই আমরা বলতে পারি শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের থাকার জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল বিভিন্ন আবাসিক এলাকা। নামগুলো খেয়াল করুন খালাসী মহল্লা, মিস্ত্রীপাড়া, বাবুপাড়া, গার্ডপাড়া, সাহেবপাড়া, উঁচু কলোনী, নীচু কলোনী, অফিসার্স কলোনী ইত্যাদি। নামের মধ্যেই একটি শ্রেণী বৈষম্য রাখা হয়েছে। উক্ত এলাকাগুলিতে বসবাসরত শ্রমিক-কর্মচারীরা ঠিকানা বলার সময়ই নিজেদের সম্পর্কে অবস্থা বুঝে নেয় এবং যাদেরকে ঠিকানা বলা হয় বা জানানো হয় তারাও বুঝতে পারে কারা কোন মর্যাদার মানুষ। শ্রমিকদের পদবীভিত্তিক নামকরণেও রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা। এই পদবীর নামগুলোই মানুষে মানুষে মর্যাদাগত ভেদরেখা স্পষ্ট করে তোলে। আর কোন ধরনের নির্যাতনের প্রয়োজনই হয়না। একজন খালাসী পদের লোক একজন কর্মকর্তার সামনে যেতেও সাহস পায় না। যদি তার প্রয়োজনটা যৌক্তিকও হয়। যদিওবা সামনে যায় তবে যেন তারা রাজার সামনে প্রজার মত মনে হয়।

সর্বাপেক্ষা কঠিন শ্রম, কিন্তু বেতন মজুরী সবচেয়ে কম। বাসস্থানগুলোর আকার আয়তন আর আবাসিক এলাকার নামকরণ সব মিলিয়ে একজন সাধারণ শ্রমিক সামাজিকভাবে থাকে হেয় প্রতিপন্ন অবস্থায় ও ঐ পরিবেশ এবং মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠে তাদের সন্তানরাও। কি জঘন্য ছিল বৃটিশের চাল। সিঙ্গেল বা ডাবল কোয়ার্টারগুলো যেভাবে বানানো হয়েছিল একটু স্মরণ করুন দরোজার সংগে লাগোয়া খাটা পায়খানা আসতে যেতে বারবার কুৎসিৎ দৃশ্য দেখতে হয় যাতে মানসিক লেবেলটা কখনও উন্নত না হতে পারে।
একজন শ্রমিক সর্বাপেক্ষা কঠিন বা বেশী শ্রমের কাজটা করে যে পরিবেশে কোন আরামের ব্যবস্থা এখনও নেই, সে পায় সবচেয়ে কম বেতন আর যাদের কোন কায়িক শ্রম নেই সেই কর্মকর্তাদের রুমে রয়েছে এসি, ফ্যান শীতকালের জন্য হিটারের ব্যবস্থা। সেই সাম্রাজ্যবাদী বৈষম্য।

দেশটা এখন স্বাধীন। একটি স্বাধীন দেশের সকল নাগরিকই সমান হওয়ার কথা। কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মর্যাদাকে আমি অস্বীকার করিনা। কিন্তু তার বৈষম্য আকাশ পাতাল হওয়া কোন রকমেই বাঞ্চনীয় নয় অন্তত সেই দেশে যে দেশে মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকার সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত।

উপরোক্ত বক্তব্যের আলোকে প্রশ্ন উঠতে পারে শ্রমিকের অর্থনৈতিক মুক্তি ও মানুষ হিসেবে মর্যাদা কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে? এ প্রশ্নের উত্তরে আমাদের বক্তব্য হল- বিশ্ব পরিচালিত সেসব দর্শন বা মতবাদ দ্বারা যেসব মতবাদে বা তত্ত্বে মানুষের সঠিক মর্যাদাই সঠিকভাবে সংগায়ীত হয়নি। তাই সেসব পথ বা মতে মানুষের বিশেষ করে শ্রমিকদের মুক্তি সম্্ভব নয়। পক্ষান্তরে আমরা যদি শ্রমিক ও শ্রম সংক্রান্ত ধর্মীয় নীতিমালাগুলি বিশ্লেষণ করি তবে দেখতে পাই তাতে রয়েছে একটি সুন্দর ভারসাম্যপূর্ণ ও সুষম নীতিমালা। এখানে মালিক ও শ্রমিকের উভয়ের স্বার্থ সুন্দরভাবে রক্ষা করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে তোমাদের অধীনস্তরা তোমাদের ভাই, তোমরা যা খাবে, পরবে অধীনস্তরাও যেন তাই খায় ও পরে। এমনি সব নীতিমালা। তাই আমরা বলতে পারি শ্রমিকের মুক্তি একমাত্র ইসলামী শ্রমনীতিতেই সম্্ভব।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/AbuBakrMuhammadSaleh
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
California থেকে Ali Akbar লিখেছেন, ০২ মে ২০১০; দুপুর ০২:০৬
Thank you Abu Bakr Md. Saleh. I do really appreciate your nice writing.May ALLAH Bless you
16083
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ থেকে ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ লিখেছেন, ০২ মে ২০১০; রাত ০৯:৪০
আবু বকর মুহাম্মদ সালেহ, স্বাগত আপনাকে সোনার বাংলাদেশ পরিবারে। লেখাটি ভালো লাগলো। নিয়মিত লিখবেন আশাকরি। ভালো থাকবেন।
16114
Frankfurt/Germany থেকে S. Kohl লিখেছেন, ০৩ মে ২০১০; রাত ০৪:৩০
No isms or Religions can save neutral position, as long as people are not wise enough to carry their purpose.
16131
saidabad dhaka থেকে md. yunus ali লিখেছেন, ০৫ মে ২০১০; রাত ০৯:১৯
thank you for best writing.
16487
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy