|
বেলজিয়ামের অসহায় মা
আবু হেনা মুহিব |
|
ভোগ বিলাসের জীবন দর্শনে বেলজিয়ামের বৃদ্ধদের জীবন বড় দুর্বীষহ। করুণ-কাতর। ব্যর্থ বিবশ সে জীবনে শুধু মৃত্যুর অপেক্ষা। শৈশবে শিশুমনে জাগা সব খোরাকের যোগান, যৌবনে সঙ্গীর ব্যাক পকেটে হাত রেখে মনজোসনায় অঙ্গ ভিজিয়ে দিন চললেও বয়স ভাটিতে গড়ালে বেলজিকদের জীবন আর চলতে চায়না। বয়সের ব্যবধান থাকা সঙ্গী ছেড়ে যায় এক সময়। এমনকি প্রিয় কুকুরটিও। গতরী পুঁজি কমে গেলে যেমন সঙ্গী লাপাত্তা, তেমনি যত্ন-আত্নীর একটু অভাব হলেই প্রিয় কুকুরটিও একদিন উধাও। কারণ, মানুষের চেয়ে কুকুরের তুল্য-মূল্য বেলজিয়ামে কম কিছু নয়। ক্ষেত্র বিশেষে বেশিও। অন্তত বুড়ো বেলজিকদের চেয়েতো বটেই।
নাকের পানি চোখের পানিতে একাকার দিন যাপনের গ্লানী নিয়ে শেষ বয়সের বৈচিত্রহীন জীবনে মানসিক ভারসাম্য হারায় বেশির ভাগ বৃদ্ধ। এজন্য মানসিক হাসপাতাল এখানকার সব শহরের বড় স্থাপনা। জীবনাচারে উন্নতর সৌজন্যবোধ স্বল্প একাধিক বৃদ্ধের মুখে দিনের ভর আলোয় গুড নাইট বলে স্বল্পভাষণ শুনেছি। উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বৃদ্ধাশ্রমে কিংবা নিজের বাড়িতে পড়ে অনেকের মধ্যেই জাগে আত্মহত্যার প্রবনতা। ফলে আত্মহত্যা সর্বোচ্চ রেকর্ড এখন বেলজিয়ামের ঘাড়ে।
প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের তত্ত্বে অনুপ্রাণিত বেলজিয়ামের সরকার উৎপাদনহীন ব্যয় এবং সামাজিক শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখতে বুড়োদের স্বাস্থ্য বীমা বন্ধ করে দেয়ার কথা বিবেচনা করছে। বেলজিকদের জীবনে পারিবারিক মিল বন্ধন বলতে গেলে নাই। উদাহরণের জন্য যে টুকু টেনে আনা যায় তার থেকেও বিচ্ছিন্ন এখানকার অসহায় বৃদ্ধরা। বাবা-মা দিবস জাতীয় কোন দিবস উপলক্ষে ছেলে-মেয়েরা দেখতে আসে ফুলের উপহার নিয়ে, বড় জোর শীতের জামা। চকলেট, কেক আর মদ খেয়ে নেচে গেয়ে দিন শেষে বিদায়।
ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের দুনিয়া কিংবা, পার্কের বেঞ্চিতে ধ্যানি, মুনি, তাপসের মত বুড়োদের ঝিমুনির দৃশ্য দেখলে যত কঠিন হৃদয় হোক না কেন মন থেকে আপনাতেই বেরিয়ে আসবে আহা---। আহারে। অন্য দশজন সাধারণ বৃদ্ধের মত ব্রাসেলসস্টপাতের বাসিন্দা মেরি এরকই এক অসহায় মা। ৭৪ বয়সের মেরির একটু মনোযোগ পেতেই আবেগে তার জীবনের অসহায়ত্বের কথা শোনাতে শুরু করলেন। দুই ছেলে থাকা সত্ত্বেও একা থাকেন সোস্যাল হাউজে। খাবার খাদ্য বলতে ফ্রিজে থাকা ফলমুলই ভরসা।
ডুপ্টেন বাড়ির উপরতলায় রাখা ফ্রীজ থেকে নামিয়ে আনার ঝামেলায় সাপ্টার বেশির ভাগ দিনই কাটে আধো-উপোষে। ছেলে মেয়েরা কাছে থাকেনা কেন জানাতে বৃদ্ধ মেরি কথা বলতে চেয়ে কয়েক দফা কান্না থামাতে চাইলেন। পিঠে হাতের পরশ পেয়ে শিকারীর মত হঠাৎ দু’ হাতে আমার হাত টেনে নিলেন মেরি তারপর হাউ মাউ করে কান্না। কাঁদছেন মেরি। একজন মা। এভাবে অনেকক্ষণ। আমি হাতের ঘড়ির কাটার দিকে তাকাইনি। কারণ, এ ঘড়িটা এই মুল্লুক থেকেই কেনা। মেকলিনে যাবার জন্য গাড়ি নিয়ে আমার জন্য বাকি সঙ্গিদের অপেক্ষা সত্ত্বেও আমি ব্যস্ততা দেখাইনি। কারণ, সিনিয়র সিটিজেনের কাছে নিজের ব্যস্ততা দেখানোকে বেয়াদবী বলেই বাংলাদেশের মক্তবে শিখে এসেছি। তাছাড়া মেরি কাঁদুন। অন্তত প্রাণভরে কাঁদুন।
কান্না একটু থামিয়ে মেরি বললেন, ‘আসলে বুড়োরাতো জঞ্জাল। কোন কাজে আসেনা।’ আবারো কাঁদতে শুরু করলেন মেরি। হতাশা বেদনায় হাসপাস করতে করতে মেরি বলে যেতে থাকলেন, ‘আমি জানি আমাকে কেউ মনোযোগ দেবার কোন কারণ নেই।’ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির আওতায় সরকারী ভুর্তকির বাড়িতে মৃত্যুর অপেক্ষায় কাটছে এখন মেরির দিন। আমি মেরির এক ছেলের অনুসন্ধানে তাকে পেয়ে গেলাম।
৫৮ বছরের মারসেল। থাকেন একা। স্ত্রী তার বান্ধবীর সঙ্গে। তিন মেয়ে যার যার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে। একই পরিবারের ৫ জনের ৫ সংসারের সুবিধা কী? মারসেল জানালেন আসলে আমরা কারো জীবনে কেউ হস্তক্ষেপ করিনা। কী ছেলে-মেয়ে কি স্বামী-স্ত্রী। আর মায়ের ব্যাপারে আমি বলবো, বৃদ্ধদের জন্য ব্যয় করাটা সহজ সাধ্য নয়। উষ্মা প্রকাশ করে মারসেল বললেন, কে তার জন্য ব্যয় করবে।
আমার মনে হলো অন্তত এই একটি জায়গায় গরীব বাংলাদেশ ধনী বেলজিয়ামের চেয়ে তফাৎ কত শত যোজন তফাতে এগিয়ে আছে। যেখানে বুড়োরা জঞ্জাল পরিণত হয়না, বেঁচে থাকে যত্ন-আত্মিতে, মৃত্যুবরণ করে, মর্যাদায়-মমতায়।
লেখকঃ সাংবাদিক, ইমেইল, a_muhib@yahoo.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AbuHenaMuhib |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
|