বৃহস্পতিবার, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৭ মে ২০১২; রাত ১১:৩০ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

বিডিআর সদর দফতরে নারকীয় হত্যাকাণ্ড ভয়াল ৩৪ ঘণ্টার পোস্টমর্টেম

আবু সোহায়েল

বিডিআর বিদ্রোহের দুইদিন ২৫ �" ২৬ ফেব্রুয়ারির ঘটনাবলীর চুলচেরা পর্যালোচনা হ�"য়া প্রয়োজন, যাতে জাতীয় জীবনের এই মহাসংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য-ব্যর্থতার দিকটি পরিষ্কারভাবে সামনে আসে, একথা মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সরকার মনে করছেন তারা সংকট মোকাবিলায় যা করা প্রয়োজন সেটা করেছেন। অপরদিকে দেশের অন্যান্য সচেতন মহলের অভিমত হলো যে, বিডিআরদের রক্তাক্ত বিদ্রোহকে যেভাবে হ্যান্ডলিং করা হয়েছে, সেটা ট্রেড ইউনিয়নের কোন ধর্মঘট অথবা কোনো সাধারণ পণবন্দী মুক্ত করার দরকষাকষির মতো। তাদের মতে সেনাবাহিনীর অনেক ঊর্ধ্বতন অফিসার যখন খুন হচ্ছিল, যা প্রকাশ�" হয়ে পড়েছিল, সেই সময় বিদ্রোহ দমনে সময়ক্ষেপণ করা এবং বিদ্রোহীদের দাবি-দা�"য়াকে গুরুত্ব দেয়া সুস্পষ্ট ব্যর্থতা অথবা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাস্তবতা থেকে চোখ ব রাখার সামিল। অভিজ্ঞমহলের বক্তব্য হলো, দুইদিনের ঘটনার বিস্তারিত পর্যালোচনা থেকেই প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসতে পারে।

বিডিআরের যে দরবার হলে রক্তাক্ত ঘটনার সূত্রপাত, সেখানে বিডিআরের বাৎসরিক দরবার অনুষ্� ানের কার্যক্রম শুরু হয় ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায়। দরবার শুরুর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল শাকিল আক্রান্ত হন। এরপর প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য অনুসারে সাড়ে দশটার মধ্যেই সেই সময় হলে উপস্থিত সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে এই বিদ্রোহের খবরটি বাইরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মহলে পৌঁছে যায় আধা ঘণ্টার মধ্যে। কিন্তু মাত্র বেলা একটায় সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্রোহ দমনের উদ্যোগ নেয় বরং বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রথম উদ্যোগ হিসেবে একজন প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সরকারি দলের হুইপ মির্জা আযমকে বিডিআর গেটে পা� ানো হয়। তারা দুই ঘণ্টা পর্যন্ত মাইকিং করে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। বিদ্রোহীদের উদ্দেশে তারা বলেন, “আসুন আমরা এক সঙ্গে বসে এ সমস্যার সমাধান করি।” এসব আবেদন নিবেদনের আরো পরে বিদ্রোহীরা মাইকের মাধ্যমে তাদের দাবি-দা�"য়া তুলে ধরাসহ নানক �" আযমকে বিডিআর হেড কোয়ার্টারে ঢোকার অনুমতি দেয়। তারা ভিতরে ঢুকে বিশ মিনিট পরে বিদ্রোহীদের ১৪ জনকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে যান। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে দুই ঘন্টা ধরে আলোচনা চলে। আলোচনার পর স্যা পৌনে সাতটায় বিদ্রোহী প্রতিনিধি দলকে নিয়ে নানক �" মির্জা আজম বিডিআর সদর দফতরে প্রবেশ করেন। প্রবেশ করার আগে তারা সাংবাদিকদের বলেন, “এটা একটা অনভিপ্রেত ঘটনা। পুরা দেশ �" জাতি উদ্বিগ্ন। ফলপ্রসূ আলোচনা শেষে কাউকে বিচারের মুখোমুখি না করে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন এবং তাদের সুযোগ সুবিধা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন এবং এই আশ্বাসের প্রেক্ষিতে বিডিআর জোয়ানরা অস্ত্র জমা দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাবার আশ্বাস দিয়েছেন।” এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিডিআর গেটে আসেন রাত আটটায়। ফজলে নূর তাপস বলেন, “বিডিআর হেড কোয়ার্টারে অস্ত্র জমা দেয়ার কাজ চলছে। তারা নিরস্ত্র হবার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, আইন �" শৃংখলা বাহিনীর প্রধানরা ভিতরে প্রবেশ করবেন।” কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো তার একথা বলার আগেই পিলখানার ভিতরে গুলীবর্ষণ বেড়ে যায়। মাইকে তারা দাবি জানাতে থাকে “সারাদেশে বিডিআরের ৪৬টি ইউনিট �" ১৩টি সেক্টর থেকে সেনা কর্মকর্তা প্রত্যাহার না হ�"য়া পর্যন্ত তাদের বিদ্রোহ থামবে না এবং অস্ত্র পরিত্যাগ করবে না।” রাত পৌনে দশটা পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী �" তার টিমের সদস্যরা বিডিআর গেটে অবস্থান করতে থাকেন। এরপর আমবালা হোটেলে চারজন বিডিআর বিদ্রোহী সদস্যের সাথে আলোচনা অনুষ্� িত হয়। রাত পৌনে এগারটায় বিদ্রোহী সদস্যরা মিটিং এর সিদ্ধান্ত নিয়ে হেড কোয়ার্টারের ভিতরে চলে যায়। কিন্তু তারা কোনো ইতিবাচক খবর দেয় না। পাঁচজন বিডিআর প্রতিনিধির সাথে আবার আমবালা হোটেলে বৈ� কে বসে। আলোচনার পর প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, হুইপ আজম �" ফজলে নূর তাপস বিডিআর গেটে যান। তাপস জানান, “বিডিআর জোয়ানরা পুলিশের কাছে প্রতিকী হিসেবে অস্ত্র জমা দেবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা সমাধানের পথ খুঁজে পেয়েছি।” কিন্তু এই সময় বিডিআর বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আসতে হবে। রাত ১২টায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসেন এবং বিডিআর সদর দফতরে প্রবেশ করেন। রাত চারটা পর্যন্ত আলোচনা চলে, পণবন্দী মুক্তি শুরু হয় এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেনা পরিবারের ২০ জন বন্দীকে নিয়ে চলে আসেন। বিডিআর সদস্যরা অস্ত্র ত্যাগ করেনি এবং বিদ্রোহী থেকে�" সরে দাঁড়ায়নি; নিহত জীবিত সেনা কর্মকর্তাদের উদ্ধারের�" কোনো সুরাহা হয়নি। এগুলো বিদ্রোহের ১ম দিন ২৫ তারিখের বিদ্রোহের পুরো ঘটনা। এক রাত �" একদিনের ১৫ ঘন্টা আলোচনার নামে বৃথায় নষ্ট করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা ঘোষণার পর বলা হয়, ‘সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।’ তারপর ফজলে নূর তাপস রাত ৮টায় বলেন, ‘হেড কোয়ার্টারের ভিতরে অস্ত্র জমা দেয়ার কাজ চলছে।’ একথা�" ডাহা মিথ্যা। রাত চারটা পর্যন্ত অস্ত্র ত্যাগ বা বন্দীমুক্তির কিছু হয়নি। যে দীর্ঘ ১৫ ঘণ্টা সময় নষ্ট করা হলো কোন প্রকার অগ্রগতি ছাড়াই, সেই সময়ে হত্যাকাণ্ড সবচেয়ে বেশি হয়েছে। সাড়ে নয়টা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত অনেকগুলো অফিসারকে হত্যা করা হয়। মেজর কামরুজ্জামানের বক্তব্য অনুসারে দুপুরের পর অফিসের বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে খুঁজে খুঁজে অফিসারদের বের করে হত্যা করা হয়। তিনি আরো বলেছেন দুপুরের দিকে এ হত্যাযজ্ঞ চলে। এছাড়া�" এদিন দিনগত রাতে নির্যাতনের বীভৎস প্রহর নামে সেনা অফিসারদের বাসভবনে। দুঃখের বিষয় দিনের অনেকটা সময় এবং রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তার টিমের সদস্যরা বিডিআর হেডকোয়ার্টারে ছিলেন। অর্থাৎ তাদের উপস্থিতিতে সেনাকর্মকর্তাদের হত্যা �" তাদের পরিবারের �"পর নির্যাতন অনুষ্� িত হয়। সেনা পরিবারগুলোর কাছে আমাদের এ ব্যর্থতার কি জবাব আছে জানি না।

অন্যদিকে সরকার যদি বিদ্রোহের প্রথম খবর পা�"য়ার পরেই সেনাবাহিনীকে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী দিতেন তাহলে আমরা মনে করি দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে বিদ্রোহ দমন �" সেনা অভিযান সম্পন্ন হতে পারতো। বলা হচ্ছে তাতে প্রচুর লোকের ক্ষতি হতো এবং সেনা কর্মকর্তা �" সেনা পরিবারের�" ক্ষতি হতো। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে বলছেন, সেনাবাহিনীর সর্বাত্মক অভিযানের মুখে বিশৃংখল, দ্বিধাগ্রস্ত এবং অধিকাংশের সমর্থনহীন বিদ্রোহীরা বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হতো। ট্যাংক সাঁজোয়া বিমানসহ সেনাবাহিনীর কাছে যে অস্ত্র আছে সে অস্ত্র নিয়ে বিডিআর সদর দফতরে যা�"য়া এবং কিছু ফায়ারিং-ই বিদ্রোহ দমনে যথেষ্ট ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার বিদ্রোহ দমনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লেঃ জেনারেল শ�"কত�" এ কথাই বলেছেন। তার মতে, বিডিআর জ�"য়ানদের বিদ্রোহ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীকে পিলখানায় ঢুকতে দেয়া হলে তারা বিদ্রোহ দমন করতে পারতো। বিডিআর সদর দফতরে ঢুকতে তাদের পনের মিনিট�" লাগতো না। সেনানিবাস থেকে মুভ করে আসলে বিদ্রোহীরা ভয়ে পালিয়ে যেত। কারণ সবারই মৃত্যুর ভয় আছে।’ ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলব, যদি ত্বরিত সামরিক অপারেশন গ্রহণ করা যেত তাহলে হয়তো অনেক অফিসারের জীবন বেঁচে যেত এবং পরিবারগুলো নিগৃহীত হ�"য়ার হাত থেকে রক্ষা পেত। তিনি বলেন, ত্বরিত গতিতে সেনা অপারেশন চালালে ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে বিদ্রোহ প্রশমন সম্ভব হতো। সেনা অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোনোভাবেই আধঘণ্টার বেশি সময় লাগতো না বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।’

তার মতে, “সেনাবাহিনী �"পর থেকে হেলিকপ্টার অভিযান এবং চারদিক থেকে ঢুকে পিলখানাকে চারভাগে বিভক্ত করে ফেললে বড় ধরনের প্রাণহানি ছাড়াই বিডিআর জ�"য়ানরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হতো।”

তাছাড়া সেনাবাহিনী যখন অপারেশনের জন্য প্রস্তুত ছিল, তখন বুঝতে হবে সেনাবাহিনী ভালমন্দ বিচার করে সেনা কর্মকর্তা �" তাদের পরিবারের নিরাপত্তা এবং কতটা রক্তপাত এড়ানো যায় সেটা ভেবেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। নীতির�" দাবী ছিল, সেনাবাহিনীকে বিদ্রোহ দমনে সুযোগ দেয়া। বিদ্রোহকে না ছড়াতে দিয়ে কনটেন করা এবং তাৎক্ষণিকভাবে দমন করার মধ্যেই কল্যাণ বেশি। বিডিআর বিদ্রোহের ক্ষেত্রে�" এটাই সত্য ছিল। ১ম দিনে বিদ্রোহ দমন হলে এই বিদ্রোহ গোটা দেশে ছড়াতে পারতো না। দ্বিতীয়ত, প্রথম সুযোগে বিদ্রোহ দমন হলে পরবর্তীকালে নিহত এবং তাদের পরিবারের অনেক সেনা কর্মকর্তার জীবন বাঁচতো এবং তাদের পরিবার হত্যা নির্যাতন �" সম্ভ্রমহানি হতে রক্ষা পেত এবং আজ অবশিষ্ট ৭১ জনের লাশ তালাশ করে ফিরতে হতো না। তারা গণকবর খোঁড়া এবং লাশ পোড়ানোর সুযোগ পেত না। তাছাড়া খুনিরা পালাবার সুযোগ�" পেত না।

দ্বিতীয় দিনের স্যায় বিদ্রোহীরা যে অস্ত্র সমর্পণ করে সেটা ছিল সেনাবাহিনীর তরফ থেকে বিডিআর সদর দফতরের সামনে ট্যাংক �" সাঁজোয়া বাহিনী মোতায়েনের ফল। সেনাবাহিনীর ট্যাংক এবং কামানের গোলা থেকে বাঁচার জন্যই তারা প্রধানমন্ত্রীর ভাষণকে মূল্যবান আশ্রয় এবং সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে এবং তারা পালিয়ে যায়। পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রথমদিনের প্রথম সুযোগে যদি সেনাবাহিনীর ট্যাংক সাঁজোয়া কামান বাহিনীকে পিলখানায় আনা হতো তাহলে বিদ্রোহীরা অস্ত্রসমর্পণ করতো তাহলে দ্বিতীয় দিনের মতো প্রথম দিনই অস্ত্র ত্যাগ করতো।

বিদ্রোহের দ্বিতীয় দিন ২৬ ফেব্রুয়ারি�" ছিল আর�" সময়ক্ষেপণেরই একটি দৃষ্টান্ত। এদিন�" ছিল নিষ্ফল বক্তব্য �" বৈ� কের মিছিল। ২৬ তারিখ ৭টা ১৫ মিনিটে মতিয়া চৌধুরী তার কয়েকজন সহযোগীসহ বিডিআর প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনায় বসে। এরপর নানক, কামরুল ইসলাম �" আইজিপি নূর মোহাম্মদ বিডিআর গেটে যান। বিস্ময়ের ব্যাপার রাতে অস্ত্রসমর্পণের মহড়া চললে�" একে মিথ্যা প্রমাণিত করে বিদ্রোহী প্রতিনিধিরা তাদের জানায়, বিডিআর সদর দফতর এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে এবং অস্ত্রসমর্পণের পর তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না এ ব্যাপারে চুক্তিতে আসতে হবে। ১২টার দিকে তাপস বলে, ২টার মধ্যে বিডিআর অস্ত্র ত্যাগ করবে।’ কিন্তু দেখা গেল সাড়ে ১২টার পর বিডিআর সদর দফতরে আবার গোলাগুলি শুরু হলো। একটার দিকে উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়। ২টার দিকে মহাজোটের প্রতিনিধিরা সেখানে যান। তাদের মধ্য থেকে তিনজন সাদা পতাকা নিয়ে বিডিআর সদর দফতরে যান। বৈ� কের পর তারা পৌনে তিনটার দিকে প্রধানমন্ত্রী ভবনে আসেন। দলনেতা জলিল বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কথা তাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে এসেছি। তাদেরকে অস্ত্রসমর্পণের কথা বলেছি।’ এরপর প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ভবনে�" বেশ কয়েকটি মিটিং অনুষ্� িত হয়। সকাল সাড়ে ৮টায় মন্ত্রিপরিষদ �" দলীয় নেতাদের নিয়ে�" তিনি বৈ� ক করেন। এ বৈ� কে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। জেনারেল মইন এবং নৌবাহিনীর প্রধান প্রধানমন্ত্রীর ভবনে যান সকাল ১১টার পর পরই। ফিরে যান দুপুর একটার দিকে। প্রায় পাঁচটার দিকে সেনাপ্রধান, নৌ �" বিমান বাহিনীর প্রধান প্রধানমন্ত্রী ভবনে যান এবং সাড়ে ছয়টার দিকে তারা ফিরে আসেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর ৩টা ৩৫ মিনিটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মির্জা আজম �" নানক পিলখানার উদ্দেশ্যে গমন করেন। এই সময় সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান ট্যাংক কামান বহর পিলখানার উদ্দেশে অগ্রসর হচ্ছিল। খুনি বিদ্রোহীরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিল, যে সেনা অভিযান তারা দূরে রাখতে চাচ্ছিল সেটা আসন্ন। এই পরিস্থিতিতে তারা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা ঘোষণা সম্বলিত আত্মসমর্পণের আহ্বানকে আত্মরক্ষার একটা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে এবং তারা অস্ত্র ত্যাগে একমত হয়ে যায়।

এদিকে এ সময় আরো একটা মজার ঘটনা ঘটে। সেটা হলো, ফজলে নূর তাপসের নির্দেশে বিডিআর সদর দফতরের চারদিক তিন কিলোমিটার এলাকা থেকে লোকজনকে সরে যাবার নির্দেশ দেয়া হয়। স্যার দিকে চল্লিশ প্লাটুন আর্মড পুলিশ বিডিআর সদর দফতরে প্রবেশ করে। এরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সমন্বয়ে গ� িত একটি প্রতিনিধিদল বিডিআর সদর দফতরে আসে এবং আত্মসমর্পণ শুরু হয়ে যায়। আত্মসমর্পণ স্যা সাতটায় শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আত্মসমর্পণের সংখ্যা ৫০০-এর মতো ছিল। অথচ বিডিআর সদর দফতরে কমপক্ষে দশ হাজারের বেশি জ�"য়ান ছিল।

দ্বিতীয় দিবসের এই গোটা দিনে আলোচনার ক্ষেত্রে নতুন কিছুই ঘটেনি। প্রধানমন্ত্রীর আগের দিনের ক্ষমা ঘোষণায় যা ছিল পরের দিনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বিদ্রোহীদের জন্য নতুন কিছু ছিল না। দ্বিতীয় দিনে নতুন দুইটি ঘটনা ঘটে। মহাজোটের প্রতিনিধি দলের বিডিআর সদর দফতরে যা�"য়া এবং সেনাবাহিনীর ট্যাংক কামান সাঁজোয়া বাহিনীর বিডিআর সদর দফতরে আসা। এই দুইটি নতুন বিষয়ের মধ্যে মহাজোটের প্রতিনিধিদল বিডিআর সদর দফতরে আসা এবং সেনাবাহিনীর ট্যাংক সাঁজোয়া যান কামান বহর বিডিআর সদর দফতরের সামনে মোতায়েন হ�"য়া। পর্যবেক্ষক মহলের অভিমত, প্রথম দিনই যদি সরকার সিরিয়াস হতেন, প্রধানমন্ত্রী তার ক্ষমা ঘোষণার সাথে আত্মসমর্পণের সময় নির্দিষ্ট করে সেনাবাহিনীর সর্বাত্মক সমাবেশ ঘটাতেন তাহলেই বিদ্রোহ সমস্যার সমাধান প্রথম দিনই হয়ে যেত। এখন সবারই মনে প্রশ্ন যে, তাহলে দু’দিন সময়ক্ষেপণ করা হলো কেন? এ সম্পর্কে�" চারদিকে নানা অভিমত ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারমধ্যে একটি অভিমত হলো, লাশ গুম করা, নিহত বহু লাশকে গোপন করা, খুনিদের পালিয়ে যাবার সুযোগ দেয়া এবং লুকানো সেনা অফিসারদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করার সুযোগ দেয়া। আসলে বিদ্রোহের এই দুই দিনে এ ঘটনাগুলোই ঘটেছে। অন্তত প্রথমদিনের স্যার আগে�" বিদ্রোহ দমন করা গেলে নিহতের সংখ্যা যেমন কম হতো, লাশ গুম করা এবং খুনিরা পালাবার সুযোগ পেত না। অনেকেই মনে করেন, শুরু থেকেই বিডিআর জ�"য়ানরা পালানো শুরু করলে�" দ্বিতীয় দিন দিবাগত রাতে তারা দলে দলে পালাবার সুযোগ গ্রহণ করে। বলা হচ্ছে দ্বিতীয় দিন বিকালে আ�"য়ামী লীগ নেতা ফজলে নূর তাপস বিডিআর সদর দফতরের চারদিকের তিন কিলোমিটার এলাকা থেকে লোকজনকে তাৎক্ষণিকভাবে সরে যাবার ঘোষণা প্রচার করে। এটা বিদ্রোহী বিডিআরদের পালাবার একটা মহাসুযোগ দান করে। তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নামা দিশেহারা লোকদের কাতারে শামিল হয়ে পালিয়ে যায়। অবশিষ্টরা পালিয়ে যায় রাতে, যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী �" তার পুলিশরা অস্ত্রসমর্পণে ব্যস্ত ছিল। এ ব্যাপারে দৈনিক যায়যায়দিন তার রিপোর্টে সুন্দর বক্তব্য তুলে ধরেছে। যায়যায়দিনের রিপোর্ট লিখেছে, “পিলখানা বিডিআর সদর দফতর থেকে হাজার হাজার বিডিআর সদস্য কিভাবে পালিয়ে গেল? এ প্রশ্ন এখন সবখানে। সাধারণত সদর দফতরে প্রায় ১০ হাজার বিডিআর জ�"য়ান অবস্থান করেন। বুধবার সকালে�" দরবার উপলক্ষে রাজধানীর বাইরে থেকে কয়েকশ’ বিডিআর কর্মকর্তা সেখানে যোগ দেন। সকালে বিডিআর বিদ্রোহ শুরু হ�"য়ার পর বুধ �" বৃহস্পতিবার তাদের প্রায় সবাই চারপাশে সেনা-পুলিশ �" র‌্যাব পরিবেষ্টিত অবস্থায় আটকা পড়েন। দফায় দফায় আলোচনা করে তারা সময়ক্ষেপণ করছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর বিকালে সেনাসদস্যরা বিডিআর সদর দফতরের প্রবেশ পথগুলোর বাইরে যুদ্ধ সরঞ্জামের মজুদ বাড়ালে ভেতরে বিডিআর সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। তখন ধানমণ্ডি-হাজারীবাগ এলাকার এমপির নির্দেশে বিডিআর বেষ্টনীর আশপাশের তিন কিলোমিটার এলাকার বাসিন্দাদের জানমালের স্বার্থে নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং করা হয়। ফলে স্যার আগেই ব্যাপক এলাকা ফাঁকা হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, এ সুযোগেই হাজারীবাগ এলাকা দিয়ে হাজার হাজার বিডিআর সদস্য পালিয়ে যায়। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গণকটুলী স্কুলের পাশে বিডিআরের দেয়ালের ভেতরে বিডিআর সদস্যদের প্রচুর পরিমাণ পোশাক বাথরুম �" এর পাশে মাটিতে খোলা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ধারণা করা হয়, বৃহস্পতিবার রাতে অস্ত্রসমর্পণের পর বিডিআর সদস্যরা তাদের পোশাক খুলে রেখে সিভিল পোশাক পরে এখান থেকে পালিয়ে গেছে। পালাতে গিয়ে কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর �" সাভার এলাকায় র‌্যাব �" পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে ২ শতাধিক জ�"য়ান। আর সদর দফতরে পা�"য়া গেছে মাত্র ৪২৬ জনকে।”

বিডিআরদের পালানোর বিষয়টা বিরাট জিজ্ঞাসার সৃষ্টি করেছে। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিডিআর সদর দফতরের চারদিকে উপযুক্ত পাহারার ব্যবস্থা না করে তাদের পালানোর সুযোগ দিয়েছে। তারা রাজনৈতিক আলোচনা চালালেন, সামরিক পদক্ষেপ নিলেন না, কিন্তু সদর দফতরের চারদিকে উপযুক্ত পাহারার ব্যবস্থা করায় কোনো দোষ তো ছিল না। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেন সজ্ঞানে এ পাহারার ব্যবস্থা করেনি। দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো নিহতদের পোড়ানো এবং গণকবরের কাজ বিদ্রোহীরা কখন করলো? প্রথম দিন এবং দ্বিতীয় দিন সরকারের প্রতিনিধিদল বিডিআর সদর দফতরে যা�"য়া আসা করেছে। বিশেষ করে দুই রাতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার সহযোগীসহ বিডিআর সদর দফতরে ছিলেন। নিশ্চয়ই তাদের উপস্থিতিতেই লাশ পোড়ানো �" গণকবরের কাজ চলেছে।

সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি মানুষকে পীড়া দিচ্ছে সেটা হলো বিদ্রোহের দু’দিনের আলোচনার কোনো বক্তব্যে জীবিত আটক সেনা কর্মকর্তারা কোথায় কিভাবে আছে তা জানা যায়নি। অথচ বিদ্রোহের ক্ষেত্রে পণবন্দি উদ্ধারের ক্ষেত্রে অপরাধীদের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্� ার প্রথম সুযোগে জেনে নেয়া হয় যে পণবন্দিরা বা ভিকটিমরা কোথায় আছে, কিভাবে আছে? বিদ্রোহীদের সাথে আলোচনার প্রথম শর্তই হয় বন্দী অথবা পণবন্দিরা কোথায় আছে, কিভাবে আছে তা দেখাতে হবে। কিন্তু বিদ্রোহের দু’দিন যারা বিদ্রোহীদের সাথে আলোচনা করেছেন তারা কেউ এ দায়িত্ব পালন করেননি। তারা নিজেরা�" এ তথ্য দেশবাসীকে জানাননি এবং জিজ্ঞেস করলে�" এ সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দেননি। অথচ উদ্বিগ্ন দেশবাসী এ সম্পর্কিত খবরই তাদের কাছে প্রথম আশা করেছিল। দুঃখজনক হলে�" আলোচনাকারীরা সব সময় বিদ্রোহীদের দাবি দা�"য়া নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং মানুষকে জানিয়েছেন। অথচ বিদ্রোহীদের ভিকটিম যারা, তাদের বিষয়ে পীড়াদায়ক নীরবতা তারা অবলম্বন করে গেছেন। অভিজ্ঞমহল একমত যে, ২৫ তারিখে প্রধানমন্ত্রী বিদ্রোহী প্রতিনিধি দলের সাথে বৈ� ক করা এবং হত্যাকারীসহ সকলকে ক্ষমা ঘোষণার কমপক্ষে এই শর্ত হ�"য়া উচিত ছিল যে, নিহতের লাশ �" জীবিত অফিসার �" তাদের পরিবারবর্গের মুক্তি দেয়া এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অস্ত্র ত্যাগ করা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এই স্বাভাবিক বিষয়টি করেননি। এটা কি শুধু তার বিচ্যুতি? বিচ্যুতি বলে মেনে নেয়া ক� িন।

আর একটি বড় বিষয় হলো, যখন ভেতরে সেনা অফিসারদের হত্যা করা হচ্ছে, তাদের পরিবার-পরিজনদের উপর নির্যাতন করা হচ্ছে, তখন বাইরে মিছিল করা হয় বিদ্রোহীদের সমর্থনে। সে মিছিলের শ্লোগান ছিল ‘বিডিআর জনতা ভাই ভাই’। এ মিছিল সম্পর্কে দৈনিক ইত্তেফাক তার রিপোর্টে বলেছেঃ “গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে পিলখানা বিডিআর সদর দফতরের তিন নম্বর গেটে শতাধিক বেসামরিক তরুণ ‘বিডিআর-জনতা ভাই ভাই’ বলে শ্লোগান দিতে থাকে। তারা শ্লোগান দিয়ে বিডিআর-এর দাবির সমর্থনে মিছিল বের করে। মিছিলটি নিউ মার্কেট হয়ে নীলক্ষেত মোড়ে আসলে অবস্থানরত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাদের ধা�"য়া করে। তবে তিন নম্বর গেটে দফায় দফায় মিছিলকারীদের মধ্যে একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের দেখা যায়। তারা সেখানে সকাল থেকে স্যা পর্যন্ত অবস্থান করে বলে স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি জানান। মিছিলকারীদের মাঝে মাঝে গেটে প্রহরারত বিদ্রোহীরা গুলিবর্ষণ করে উৎসাহ যোগাতে দেখা যায়। এই সকল স্থানীয় নেতা-কর্মী বিদ্রোহীদের আন্দোলন আর�" বেগবান করার জন্য নানাভাবে প্রভাবিত করতে দেখেন বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেন।”

ইত্তেফাক রিপোর্টে উল্লেখিত ‘একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা’ কারা? উল্লেখ্য, এই মিছিলগুলো শুধু বাইরে হয়েছে তা নয়, এই মিছিলগুলো বার বার বিডিআর সদর দফতরে�" প্রবেশ করেছে। বিদ্রোহীদের কবল থেকে উদ্ধার হ�"য়া লেঃ কর্নেল শামস�" এই কথা তার সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন। তিনি তার সাক্ষাৎকারের এক জায়গায় বলেছেন, “পরদিন (২৬/০২/০৯) বেলা ১২টার দিকে বাইরে থেকে পাঁচ নম্বর গেট দিয়ে একটা মিছিল দরবার হলে আসে। এ মিছিলে মিশে যায় বিডিআর সদস্যরা। মিছিল করতে করতে তারা বাইরে চলে যায়। আবার বেলা দুইটায় আরেকটা মিছিল আসে। এ মিছিলের ভেতরেই বাদবাকি বিদ্রোহীরা মিশে যায়।”

এ থেকে প্রমাণ হয় বিদ্রোহী �" মিছিলকারিরা একই গোত্রভুক্ত। এই মিছিলকারিরা কারা? কোন দলের? একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, বিদ্রোহীদের সাথে যারা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছিল, তাদের মধ্যে রয়েছেন জাহাঙ্গীর কবীর নানক এবং ব্যারিস্টার ফজলে নুর তাপস। বিডিআর সদর দফতর এলাকা তাদের নির্বাচনী এলাকার অন্তভুêক্ত। এলাকার সবকিছুর সঙ্গে তারা পরিচিত। সেজন্যেই দেখা গেছে বিদ্রোহের গোটা দুইদিন তারা এই এলাকায় ছিলেন। বলা যায় বাইরের দিকটা তারাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন। বিদ্রোহের দ্বিতীয় দিন বিকেলে বিডিআর সদর দফতরের চারদিকের তিন কিলোমিটার এলাকা থেকে লোকজনকে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে সরে যাবার যে ঘোষণা, তা তাপসই দিয়েছিলেন। সুতরাং বলা যায়, যারা চারদিকে মিছিল করেছে তারা তার চেনা বা তার নিজেদেরই লোক হবে। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় দিন ১২টার দিকে মিছিলকারিরা যখন সদর দফতরে প্রবেশ করে তখন তাপসকে দেখা যাচ্ছে ঐ এলাকায় ছিলেন। তিনি এই ১২টার দিকেই বলেন, ২টার দিকে অস্ত্র সমর্পণ শুরু হবে। আবার ২টার দিকে আরেকটা মিছিল বিডিআর সদর দফতরে প্রবেশ করে, তখন মহাজোটের প্রতিনিধিদলের তিনজন প্রতিনিধি বিডিআর সদর দফতরে প্রবেশ করেন। অর্থাৎ সরকারের মন্ত্রী, এমপি, প্রতিনিধিরা �" মিছিলকারীরা এক সাথেই বিডিআর সদর দফতর এলাকায় সক্রিয় ছিলেন। সরকারের প্রতিনিধিরা যখন অস্ত্রত্যাগের জন্যে কাজ করছিলেন, তখন মিছিলকারীরা খুনীদের পালিয়ে দেবার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। বলা হচ্ছে, তিন কিলোমিটার এলাকা থেকে লোকজন সরানোর ঘোষণা ছিল প্রকৃত পক্ষে বিদ্রোহীদের পালানোর কভার সৃষ্টি করার জন্যেই। এরপর মিছিলকারীদের পরিচয় সম্পর্কে আর কিছু কি বলার প্রয়োজন আছে? কে না জানে যে, পুলিশ অর্থাৎ সরকার না চাইলে বিদ্রোহের স্থান বিডিআর সদর দফতরের বাইরে মিছিল করা কারই সাধ্য ছিল না। উচিত ছিল বিদ্রোহী এলাকার চারদিক থেকে কারফিউ পরিবেশের সৃষ্টি করা। কিন্তু সেটা না করে বিদ্রোহের এলাকাকে গণ জমায়েতের স্থানে পরিণত করা হয়েছিল কেন? প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়েছেন বিডিআর সদর দফতরের ৫নং গেট খোলা ছিল কেন? যেখান দিয়ে অধিকাংশ বিদ্রোহীরা পালিয়ে যায়। তার এ কথায় মানুষের মধ্যে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। কেমন করে প্রধানমন্ত্রী এমন উদ্ভট �" বেআইনি প্রশ্ন করতে পারেন! গোটা দেশ শেখ হাসিনার সরকারের শাসনে, তেমনি বিডিআর সদর দফতর এলাকা�" এর ৫ নং গেট�" সরকারেরই নিয়ন্ত্রণে। কেন এ গেট খোলা ছিল, কেন এ দিক দিয়ে বিদ্রোহীদের পালানোর সুযোগ করে দেয়া হলো, এ প্রশ্ন তো বিরোধী দলই করবে সরকারকে।

গোটা বিদ্রোহ দমন কাজের সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বিডিআর সদর দফতরে শতাধিক সেনা অফিসারকে হত্যা �" তাদের পরিবারের উপর নির্যাতনকারী খুনি দলের সরদার তৌহিদকে বিডিআর-এর ভারপ্রাপ্ত ডিজি’র দায়িত্ব দেয়া। হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে আসা সেনা অফিসারদের বক্তব্য এবং বিদ্রোহীদের সাথে সরকারের আলোচনা থেকে এ কথা পরিষ্কার, ডিএডি তৌহিদই ছিল খুনিদের সর্দার। সরকার�" এটা নিশ্চিতই জেনেছিলেন, তা না হলে তাকে বিদ্রোহী প্রতিনিধি দলের নেতা মেনে তার সাথে আলোচনায় বসলেন কেন। এরপর�" খুনি সরদারকে বিডিআর-এর নেতা বানানো কিসের ইঙ্গিত দেয়? তাকে কি নেতা এজন্যেই বানানো হয়েছিল যাতে খুনিদের পালানো নিশ্চিত হয়, গুম করা লাশ গোপন থাকে, সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের উপর নির্যাতন আড়াল করা যায়, হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজের চিহ্ন মুছে ফেলা যায়?

এসব প্রশ্নের উত্তর সানের দায়িত্ব তদন্ত কমিশনের। তবে এই পোস্টমর্টেমের উপসংহারে আমি বলতে চাইঃ

ফ সেনাবাহিনীকে বিদ্রোহী দমনের অনুমতি না দেয়া সকল বিচারে অযৌক্তিক এবং সেই কারণে উদ্দেশ্যমূলক�"।

ফ প্রকাশিত তথ্য মোতাবেক প্রস্তুতিসহ সেনা সদস্যরা সাড়ে দশটার মধ্যে বিদ্রোহ-এলাকায় পৌঁছেছিল। এ সময় সেনাবাহিনী এ্যাকশনে গেলে দুপুরের পর �" পরবর্তীকালে যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তা হতে পারতো না। এতে আর�" প্রায় শ’ খানেক সেনা অফিসারের জীবন বাঁচত।

ফ নানক, তাপস ব্যক্তিবর্গকে বিদ্রোহীদের সাথে আলোচনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল সম্ভবত এই কারণে যে, তারা ঐ এলাকার এমপি। এ মানসিকতাটা অনেকটা কোন ট্রেড ইউনিয়নের ধর্মঘট মোকাবিলার মত। অবস্থার গুরুত্বকে খাটো করে দেখাই এর কারণ।

ফ বিডিআর হেড কোয়ার্টারে দশ থেকে পনের হাজার বিডিআর সদস্যের বিদ্রোহ, প্রায় দু’শ সেনা অফিসারকে আটক এবং তাদের হত্যা শুরু করা ছিল একটা সামরিক ব্যাপার। একে রাজনৈতিক বিষয় মনে করাকে শুধু অন্যায় অযৌক্তিক নয়, উদ্দেশ্যমূলক মনে করার�" অবকাশ আছে।

ফ আক্রান্ত বিডিআর প্রধানের জীবন বাঁচানোর আবেদনমূলক যে টেলিফোন প্রধানমন্ত্রী ৯টা ৩০ মিনিটের মধ্যে পেয়েছিলেন, সেটা ছিল একটা SOS (আমাদের জীবন বাঁচান)। এই SOS পা�"য়ার পর তাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্যে তাৎক্ষণিক সামরিক ব্যবস্থা না নেয়া, দীর্ঘ সাড়ে ৩ ঘণ্টা (৯.৩০মিঃ-১টা) পর বিদ্রোহীদের যোগাযোগের জন্যে প্রতিনিধি দল তৈরি করা, প্রতিনিধি দল বিদ্রোহীদের সাথে যোগাযোগ করতে দুই ঘণ্টা সময় নেয়া এবং রক্তপাত বরে শর্ত ছাড়াই বিদ্রোহীদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় বসা �" দুই ঘণ্টা ধরে আলোচনা করার মাধ্যমে মোট সাড়ে সাত ঘণ্টা সময় নষ্ট করা ছিল SOS-এর প্রতি চরম বিদ্রুপের শামিল।

ফ রক্তপাত ব �" নির্যাতন-নিপীড়ন পরিহার নিশ্চিত না করে এবং আটক সেনা কর্মকর্তারা কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কিভাবে আছেন তা দেখার জন্যে তাদের সাথে সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ না করে অর্থহীন দরকষাকষিতে ৩৪ ঘণ্টার�" বেশি সময় ব্যয় করা সকল বিচারে অগ্রহণযোগ্য।

ফ বিদ্রোহের তিরিশ ঘণ্টার আলোচনা কথাবার্তা প্রমাণ করেছে বিদ্রোহের ভিকটিম সেনা কর্মকর্তাদের জীবন নয়, বিদ্রোহী খুনিদের নিরাপত্তা �" দাবি-দা�"য়া পূরণই ছিল সরকারের মুখ্য লক্ষ্য।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/AbuSohaiel
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy