|
বাঙালী মুসলমানদের নামকরন ও কিছু বাস্তবতা
আবু ইউসুফ |
|
‘নামের বড়াই করনাকো নাম দিয়ে কি হয়?’, ‘নাম দিয়া কাম কি?’, ‘নাম নয় কর্মই মানুষকে বড় করে’- এরকম অনেক প্রবাদের সাথে আমরা পরিচিত যেখানে নামকে গুরুত্বহীন করা হয়েছে। আসলেই কি নাম এতটা গুরুত্বহীন? হ্যাঁ প্রবাদগুলোর ভাবার্থ বিবেচনায় নিলে নাম আসলেই গুরুত্বহীন। কিন্তু নামের শাব্দিক দিক এখন আর গুরুত্বহীন নয় – এটা অনেক সময় বিড়ম্বনার কারণ, কখনো অর্থ দন্ড, কখনো বঞ্চনা, কখনো ধর্ম বিদ্বেষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমন কি নামের জন্য জেল জরিমানাও হতে দেখেছি। সন্ত্রাস নির্মুলের দুনিয়ায় নাম বিভ্রাটের জন্য আপনার মৃত্যু দন্ডও হতে পারে। আর ক্রসফায়ারের কথা বাদই দিলাম, এখানেতো আপনি লাল বাহিনীর মজিদ না পুর্ব বাংলার মজিদ এ বিচারের টাইমই নাই।
আর উচ্চশিক্ষা, বিদেশ গমন এসবের ক্ষেত্রে তো কর্মের চেয়ে নামই গুরুত্ব হয়ে উঠে বেশী।এই দেখুননা গতমাসেই ইন্ডিয়ার সুপার ডুপার ফিল্ম স্টার শাহরুখ খান শুধু ‘খান’ শব্দটার জন্য আমেরিকার বিমান বন্দরে কি নাজেহালইনা হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ইন্ডিয়ান এম্বাসেডরকে যেয়ে তবেইনা নাজাতের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। এবার চিন্তা করুন শাহরুখ খানের জায়গায় আমি আপনি হলে...... নামই জীবন প্রদীপ নিবিয়ে দিত। কাজেই আপনার সোনামনি, যাদুমনিদের নাম রাখার সময় বিষয়টি মাথায় রাখার অনুরোধ করছি।
আমাদের দেশে মুসলিমদের নামের ক্ষেত্রে মনে করা হয় নামের আগে মু, মোঃ, বা মোহাম্মদ না থাকলে মুসলমানের কাতারে থাকা যায় না। আর এ নিয়ে যে কত বিড়ম্বনা পোহাতে দেখেছি কত জনকে তার ইয়ত্তা নেই। যেমন ধরুন- এস এস সি-র সার্টিফিকেটে আছে মো আকরাম হোসেন, আবার পরবর্তী অন্য একটা সার্টিফিকেটে হয়ে গেছে মোহাম্মদ আকরাম হোসেন। এ সার্টিফিকেট তো চাকুরী ক্ষেত্রে গ্রহন যোগ্য হবেনা, দেশে যদিওবা হয় বিদেশে ১০০% হবেনা। এখন চিন্তা করুন এ নাম পরিবর্তন করতে অর্থ, সময়, ঘুষসহ কত ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়। আবার ইংরেজীতে যখন আমরা MD লিখি তখন বিদেশে অনেকে এটাকে মেনেজিং ডিরেক্টর বা মার্কেটিং ডিরেক্টর এরকম চিন্তা করে বসে। এখানেই শেষ নয়, মুসলমানিত্ত প্রকাশ করতে গিয়ে এ মুহাম্মদের জন্য অনেক সুযোগ থেকে (স্কলারশিপ, ভাল জব ইত্যাদি) বঞ্চিত হতে হয় , অনেক জায়গায় ধর্মীয় বিদ্বেষের শিকার হতে হয়। যেমনটা হতে হয়েছে শাহরুখ খানকে নামের শেষে ‘খান’ থাকার দরুন।
নামের আগে ‘মোহাম্মদ’ ব্যবহারের ইতিহাস সম্পর্কে যতদূর জেনেছি তা হল- ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আগমনের পর ধর্মান্তরিত মুসলিমরা তাদের অতীত সংস্কৃতি অনুযায়ী নামের আগে-পরে শ্রী, কুমার, দাশ, দত্ত, শীল, ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার অব্যহত রাখে। এমতাবস্তায় আলেমরা নামের সংস্কৃতি পরিবর্তনের উদ্যোগ হিসেবে মুসলিম নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ শব্দ ব্যবহারের প্রচলন করেন যাতে করে একজনের নাম শুনেই সে কোন ধর্মের আনুসারী বা সে মুসলিম কিনা তা সহজে বুঝা যায়। এবং লক্ষ্য করবেন পাক-ভারত-বাংলা (ভারতীয় উপমহাদেশে ) ছাড়া বিশ্বের অন্য কোন দেশের মুসলিম নামের ক্ষেত্রে মোহাম্মদ শব্দের প্রচলন নেই। এমনকি রাসুল (সাঃ) এর অনুসারী একজন সাহাবীর নামের সাথেও মোহাম্মদ শব্দ পাওয়া যাবেনা। যদি মোহাম্মদ শব্দের ব্যবহার মুসলমানিত্তের পরিচয় বহন করত তাহলে আমার বিশ্বাস সাহাবীরা সেটা অবশ্যই অনুসর করতেন। ধরুন আপনার নাম মোহাম্মদ আব্দুর রহিম অর্থাৎ রহমানের দাস, কিন্তু কাজকর্মে আপনার মধ্যে আবু জেহেল আর মিরজাফরের চরিত্র বিদ্যমান তাতে ঐ মুহাম্মদেই কি হবে আর আব্দুর রহিম দিয়েই বা কি হবে, আপনি কি মুসলমান হতে পারলেন?
তাহলে যে শব্দটা হাজারটা ঝামেলার জন্ম দেয়, যে শব্দটার প্রায়োগিক কোন তাৎপর্য নেই, যার মধ্যে মানুষ মৌলবাদ আর জঙ্গিবাদের গন্ধ খুজে, যার জন্যে মুসলিম ছাত্রদের উচ্চ শিক্ষার পথ সংকুচিত হয়ে আসে, এরকম একটি শব্দের ব্যবহার বাদ দিলে কি এমন ক্ষতি? এ কথা তো সত্যি জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলিমরা আজ অনেক পিছিয়ে, কাজেই ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায় আমাদের নিজেদের স্বার্থেই যেতে হবে। আর সে জন্য যদি কিছুটা কৌশলী হই তাতে ক্ষতি কি?
আমার জানামতে বাংলাদেশী মুসলিমরা ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম নাম পরিবর্তন করছে ব্যপকহারে, কেননা মুসলমানিত্তের গন্ধ পেলে আর আবেদন গ্রহনযোগ্য হচ্ছেনা। বর্তমান গবেষনায় দেখা গেছে ফ্রান্সে মুসলমানদের ফার্টালিটি হার প্রায় ৯%। কাজেই ফ্রান্স সরকার এখন থেকেই মুসলিম আধিপত্য ঠেকানোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। ইউরোপের আরও অনেক দেশই এ জাতীয় পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা করছে।
এবার আসি নামের বিস্তৃতির বিষয়ে। আপনার সোনামণির নাম কত বড় রাখবেন, কত শব্দে রাখবেন? সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল করিম খালাশী ,শরিফ মোহাম্মদ ফাইসুল ইসলাম ফারুকী, দেওয়ান মোহাম্মদ গাজী মতিউর রহমান...এরকম নাম যদি আপনার পছন্দ হয়ে থাকে তাহলে আপনাকে অনুরোধ করব বাংলাদেশী পাসপোর্টে নামের জন্য কতটুকু জায়গা বরাদ্দ আছে একটু পরখ করুন, বলতে পারেন এটাই হচ্ছে নামের জন্য স্ট্যান্ডার্ড স্পেস। এস এস সি, এইচ এস সি, বিসিএস এর ফরমফিলাপের জন্য এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ও এম আর (Optical Mark Reader) ফরম। বেশী শব্দের নাম হলে এ ফরম ফিলাপের ক্ষেত্রেও বিরক্তির উদ্রেগ হতে পারে বা প্রয়োজনীয় স্পেস নাও পেতে পারেন। এছাড়াও বিদেশে উচ্চ শিক্ষা, ভ্রমন, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে যে সমস্ত ফরম আপনাকে ফিলাপ করতে হয় তার অধিকাংশেই নাম লিখার জন্য সীমিত স্পেস থাকে। এসকল দিক বিবেচনায় দুই শব্দের নাম হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড নাম। কেননা নামের বিন্যাসটা ৯৫% ক্ষেত্রে এরকম- First Name - Last Name; Surname- Name; Family Name- Name; First Name-Surname . কিছু কিছু ক্ষেত্রে Middle Name এর অপশানও থাকে।তবে এটা (মধ্য নাম)না থাকলেও কোন সমস্যা নেই।
নামের বানান আরেকটি গুরুতপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে অভিবাবকদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। খামখেয়ালি করেও যেন সোনামণিরা নামের বনান ভুল না লিখে। আর নামের সহজ ও প্রচলিত বানান ব্যবহার করুন যেন যে কেউ শুনে আপনার নাম লিখতে পারে।
উপসংহারে বলব আপনার ছেলে বা মেয়ের জন্য দুই শব্দের সুন্দর অর্থবোধক নাম রাখুন। এমন নাম রাখুন যেন শেষ অংশটা ডাক নাম হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তাতে জীবনে অনেক জটিলতা এড়াতে পারবেন।
লেখকঃ পিএইচডি গবেষক, ইটালী, ইমেইল, ayousufcep@yahoo.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AbuYousuf |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
|