|
দেশপ্রেম, আন্তরিকতা ও সংস্কৃতি সচেতনতায় আমরা তোমাদের কাছে ঋণী
মোঃ আদনান আরিফ সালিম (অর্ণব) |
|
বাংলায় বহুল প্রচলিত একটা প্রবাদ আছে দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা নাকি কেউ বোঝেনা বা বুঝতে চায় না। আর আমাদের বাংলাদেশে বাসকারী বাঙালিদের একটা মারাত্মক বদভ্যাস নিজের সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে পুরোদস্তুর বিদেশী সাজার একটু চেষ্টা করা নিদেনপক্ষে একটু অভিনয় করা। আমরা এটা সেই মাইকেল কবি থেকে শুরু করে আজকালকার আধুনিকতার মুখোশ পরে থাকা অনেককেই দেখি। আসলে মেকুলের সেই জঘণ্য উক্তির কথা মনে পড়ে গেল। আমি মেকুলের উক্তিটি পাই শ্রম, জ্ঞানতাত্ত্বিক ও চিন্তাজাগতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের পা-চাটা কুত্তার মতো অনুগত দাস তৈরীর একটি অনুকল্প হিসেবে। মিনিট অফ এজুকেশান এর মধ্য হতে মেকুলের সেই কুখ্যাত উক্তির অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি অনেকটা এভাবে “আমরা যাদের শাসন করি তাদের ও আমাদের মধ্যে এমন কিছু সত্ত্বার জন্ম দিতে হবে যারা তাদের ও আমাদের মাঝে ভাব বিনিময়ের জন্য মিডিয়া হিসেবে কাজ করবে। তারা তাদের শারীরিক গঠন আর বর্ণে যদিও থাকবে ভারতীয় তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক জগত, রুচি, আচার আচরণ, নীতিবোধ প্রভৃতির ক্ষেত্রে মানদন্ড হবে পুরোদস্তুর ইংরেজদের মতো। আজকালকার বাঙালিদের আধুনিক সাজার রঙ ঢং দেখলে আমার মনে হয় মেকুলের কথা মতো তৈরী হওয়া পা-চাটা কুত্তার সংখ্য নেহায়েত মামুলি নয়।
তাই যে কারণেই হোক প্রবাসী বাংলাদেশীদের এই দেশত্ববোধ মাতৃভূমি ও মায়ের প্রতি এই ভালাবাসা আসলেই সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। তারা দেশ থেকে অনেক দুরে থাকলেও কেন জানি দেশ, মা ও মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েননি। তাঁরা এখনো তাদের মায়ের ভাষা ও সংস্কৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করেন। তারা এটা খুব কষ্টের সাথে হলেও ধারণ করেণ বাংলাদেশ তাদের মাতৃভূমি, তাঁদের মা তাদেরকে এই দেশের বুকেই জন্ম দিয়েছেন, দেশ তার সঙ্গে সঙ্গে থাকে, স্মৃতিতে জ্বলে, অনুভবে লুকিয়ে রয়, দৃষ্টিভঙ্গিতেও ধরা পড়ে আর তাদের আচরণে অভিব্যক্তিতে তা স্পষ্টত প্রতীয়মান হয়। দেশে বাস করে দেশকে অনেকে সহজেই উপেক্ষা সহজেই কিন্তু দেশের বাইরে থেকে দেশকে না দেখেও মা আর মাতৃভূমির প্রতি নাড়ির টান দেখিয়ে তারা একদিকে দেশের রেমিটেন্স বাড়াতে সচেষ্ট অন্যদিকে দেশের সমাজ সংস্কৃতিকে এখনো শতকষ্ট হলেও বুকে আগলে রাখতে চেষ্টা করেন।
অন্তর্গত বৈষম্যকে আরো প্রবল থেকে প্রবলতর করেছে, সর্বত্র ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প কারখানা ব্যক্তি মালিকানায় চলে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। তাদেরই টাকার অতিরিক্ত দাপটে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা পেতে হলে যেতে হবে প্রাইভেট ক্লিনিকে কিংবা কোন নার্সিং হোমে। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সঙ্কুচিত, রাজপথে অনেকটা পা ফেলাই দায় আজ তাদের প্রাইভেট কারের দাপটে। আর সেই সব গাড়ি যে পরিমাণ দুষিত গ্যাস ছাড়ছে তা শারীরিকভাবে পর্যুদস্ত করে দেয় মানুষ ও গাছপালাকে ইত্যোকার আরো কত কথা। কারণ সুশীল নামধারী এই সব মুখোশ পরা শয়তানরা তাদের স্বর্গরাজ্য এই ধরণের সস্তা কিছু বুলিকে খুবই প্রবলভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমেই আজ অবধি তাদের স্বর্গরাজ্য টিকিয়ে রেখেছে।
আসলে আমার এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে মনে পড়ছে হোজ্জার একটা কাহিনী। সেই শিশুকালে নাসির উদ্দীন হোজ্জার একটা গল্প পড়েছিলাম। নাসির উদ্দীন হোজ্জা একদিন তার স্ত্রীর সাথে অভিমান হয়। একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে ঠিক হয় যে প্রথম কথা বলবে সেই দোষী। এর পর স্ত্রী চালাকি করে পাশের বাড়ীতে চলে যান আর হোজ্জা মশাই বাড়ীতে থাকা অবস্থাতেই বাড়ীতে চোর ঢোকে। কিন্তু হোজ্জা মশাই সামনের উপর দিয়ে চুরি করতে দেখেও কিছু বলেন নাই। পরে তার স্ত্রী এসে উনাকে বলেন। সব দোষ তুমার। তোমার কারণেই এই চুরি হয়েছে।
আসলে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা পুকুর চুরি করেও সন্তুষ্ট না হয়ে বঙ্গোপসাগর চুরি করার স্বপ্ন দেখেন। তাদের অনেক ক্ষমতা তাই তাদের আমরা কিছু বলিনা বা বলার সাহসও রাখিনা। কিন্তু খুব সহজেই গালি ঝাড়ি এই সব প্রবাসীদের এরা নাকি টাকার গরম দেখায়। এদের গাড়ির অত্যাচারে রাস্তাতে নামা যায়না। এই কয়দিন আগে আমাদের দেশের একজন বেহায়া রাজনীতিবিদ দেশের শেয়ার বাজারে ধ্বসের জন্য এই সব প্রবাসীদের কথা বলতে কোন রকম লজ্জা পাননি। আসলে লজ্জা নারীর ভূষণ এটা তো আজ রাজনীতিবিদদের জন্য না। তাছাড়া বিশ্ববেহায়া যে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দীর্ঘদিন অধিষ্ঠিত ছিলেন আর নয়নের মণি হিসেবে বিগত নির্বাচনে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের কাছেই আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত সফল হলেও অন্তত পুনরায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেষ জীবনের সান্ত্বনা পুরষ্কারটা তার কপালে জোটেনি, এটা জুটলেও বিচিত্র কিছু হতোনা। আর যুদ্ধাপরাধীরা মুক্তিযুদ্ধের অনুষ্ঠানে সাড়ম্বরে অংশগ্রহণ করা, মন্ত্রী হিসেবে গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করা কিংবা বিশেষ রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ডের সাথে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় আলুপটলের মতো সহজলভ্য হওয়াতে আমাদের অনেকটা জোকার জাতিতে পরিণত হতে হয়েছে। আমরা হাসি কারণে অকারণে হাসি যা অন্যদের কাছে আমাদের জোকার প্রমাণ করতে যথেষ্ট।
বিদেশে প্রবাসীদের জন্য খুবই কঠিন একটা কাজ মাতৃভাষা চর্চা করা। এখানে এসে অভিভাবকদের অবহেলাতে বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে মাতৃভাষা ভুলতে চলেছে বলে অনেক বুদ্ধিজীবী লম্বা চওড়া বুলি আওড়ে থাকেন, পাশাপাশি তাদের পোশাক আশাকের পশ্চিমা ধাচের কথা তো থাকছেই। মেয়ের বান্ধবীর দিকে লোলুপ দৃষ্টিদানকারী একজন জরাগ্রস্ত সংস্কৃতি বোদ্ধার মুখে আমরা বরাবরই দেশের সংস্কৃতি আর জীবন ধারাকে ভাষা পেতে দেখি। কিন্তু আমাদের দেশের টিভি পর্দাতেই যেখানে উনার অর্ধাঙ্গিনীকে আঁটসাঁট টি-শার্ট আর খাড়ুর বেশ খানিকটা উপরে জিন্স পরতে দেখি সেখানে এই প্রবাসীদের ছেলেমেয়েরা প্রবল শীতে ফতুয়া, পাঞ্জাবী বা শাড়ি পরে আমাদের সংস্কৃতির জাত রক্ষা না করলে সমস্যা কোথায়। আর ভাষার আগ্রাসনের ক্ষেত্রে বাংলিশ বা হিংলার কথা নাই বলি।
প্রবাসীরা আতঙ্কে থাকে তাঁদের মাতৃভাষা ভুলে যাবে বলে, আর আমাদের দেশে প্রতিযোগীতা চলে মাতৃভাষা ভোলা যায় কী করে কত দ্রুতলয়ে। দেশের প্রধান বোদ্ধাশ্রেণীর নৈতিকতার স্খলন আর অর্থের বদলে মতামতের বিনিময় প্রবাসীদের মনে এই দুশ্চিন্তা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে পীড়াদায়ক হয়ে দেখা দিয়েছে, এভাবে একটি সমাজ চলতে পারে কিনা, তার স্পষ্ট প্রতিফলন আমরা পাই তাদের লেখাগুলোকে যখন মন থেকে বোঝার চেষ্টা করি। এর ঐক্যটা কোথায়? না, ঐক্য সে খুঁজে পাবে না। দেশপ্রেম সে প্রবাসীদের মধ্যে যতোটা দেখেছি, দেখে আসলেই যার পর নাই উৎফুল্ল হয়েছি। কিন্তু দেশে বাসকারী অনেক বাঙালির মধ্যেই তা দেখতে না পেয়ে বার বার দমে গেছি।
দেশের অর্থলোভী বোদ্ধার যারা দেশের গোষ্ঠী উদ্ধার করেই নিজের পেটপুজো সম্পন্ন করেন আর অর্থকড়িতে উদর স্ফীত করে থাকেন তাদের একটা টানা শ্লোগানে পরিণত হয়েছে দেশে নিরাপত্তা নেই, শান্তি নেই, তেল নেই গ্যাস নেই এক কথায় এই হাড় হাভাতে দেশে কিছুই নাই। সরকার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, অস্ত্র ও বোমার ব্যবহার বাড়ছে, অপরাধী তার সাজা পাচ্ছেনা আর সাজা পাচ্ছে না বলেই অপরাধকর্ম লাগাতারহারে বেড়েই চলেছে। ক্ষমতার ছত্রছায়ায় প্রকৃত অপরাধ সুযোগ সন্ধানীরাই করে থাকে যারা সব সময় পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। তাদের আসলে কোন দল নেই তারা সব সময় সরকারি দলের বা ক্ষমতাসীন দলের বলেই পরিচিত থাকে। রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল তাদের গিরিগিটির মতো রঙ পাল্টাতে সাহয্য করে। অপরাধের পর অনেকটা গঙ্গাস্নান করে তারা তাদের সকল অন্যায় ও পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হয়ে আসেন।
প্রবাসীরার জানে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় তাদের দেশ আর আগের সোনার বাংলাদেশ নাই। তবুও মা তো। মায়ের প্রতি সন্তানের আর সন্তানের প্রতি মায়ের ভালবাসা কখনো ম্লান হয় না। এই কথাকে চিরন্তন প্রমানণ করতেই মনে হয় তারা দেশকে ভালবাসে। তারা জানে দেশের নদী-নালা, খাল-বিল, পার্ক, খোলা মাঠ সব আগের মতো নাই। আর পার্শ্ববর্তী বন্ধুরাষ্ট্র বেশি বন্ধুত্ব দেখাতে গিয়ে রক্তচোষার কায়দায় পানি চুষে নিয়ে এদেশের প্রধান নদীগুলোর গতিপথ বন্ধ করে দিয়েছে তবুও তারা অন্তত চোরের উপর রাগ করে মাটিতে আহার করার প্রত্যাশী নন।
তারা এটুকু জানেন একাত্তরে পাকিস্তানি তষ্কররা এদশে গণহত্যা চালিয়েছিল, তাদের আচরণ ছিল দৈত্যের মতো, হিংস্র শ্বাপদের মতো, তারা মানুষ মেরে, বাড়িঘর পুড়িয়ে, ধর্ষণ করে, সব কিছু লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল। পাশাপাশি তারা এও জানে হিংস্র শ্বাপদরূপী হানাদাররা চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু দেশী হানাদাররা তৎপর হয়ে উঠেছে মহোৎসাহে, তারা দৈত্য, অতটা হিংস্র নয় তবে তারা অনেকটা হায়েনার মতো কুটিল, নীচ আর নোংরা। একাত্তরে আমারা পাক হানাদারদের দমন করতে এক একান্ত বন্ধুকে পেয়েছিলাম, যাদের বন্ধুত্বের ঋণ শোধরাতে আজও আমাদের পানিশূন্য হয়ে শুকিয়ে মরতে হয়, আর লাশ হয়ে কাঁটাতারে ঝুলতে হয় ফেলানীর মতো নিষ্পাপ কিশোরীকে। বন্ধুত্বের দাবি মেটাতে আজ আমাদের বোনকে কাঁটাতারে কেন ঝুলতে হয়, আর এই মৃত্যু কিভাবে বন্ধুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তার ক্ষেত্রেও প্রবাসীরা সোচ্চার।
মায়ের কাছ থেকে দুরে থাকা সন্তান যেমন প্রতিনিয়ত মাকে স্মরণ করে এই সব প্রবাসী বাংলাদেশী শুধু অর্থকড়ি উপার্জন করেই তাদের কাজে ক্ষান্ত দেননি। তাঁরা এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তাই আমরা তোমাদের কাছে ঋণী। বিদেশ বিভুঁই মাতৃভূমি থেকে তোমাদের যে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি এর জন্য তোমাদের ভূমিকা আসলেই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। আর দেশে থেকে দেশের বিরুদ্ধে প্রচারণা করে যে সব ইতর প্রাণী নিজ আখের গোছাতে এই সব প্রবাসীদের দেখে বিপথ থেকে ফিরে আসতে পারেন। আসুন আমরা লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে তাজা রক্তের দামে কেনা দেশটাকে ভালবাসতে শিখি। আর দেশের বদনাম করে সুশীল সাজার চেষ্টা না করি। একটা সুন্দর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাতে কাজ করি। সবার মিলিত প্রচেষ্টা আমাদের স্বপ্ন দেখাতেই পারে। আর আমাদের ভুলে গেলে চলবে না তাদের স্বপ্নই সফল হয় যারা স্বপ্ন দেখতে জানে। আর সেই স্বপ্ন দেখতে জানে যে স্বপ্ন দেখার সাহস রাখে। আর সবার মিলিত প্রচেষ্টাই এই স্বপ্ন দেখার সুযোগ করে দিতে পারে।
লেখকঃ ব্লগার ও কলামিস্ট
http://www.aurnabarc.blogspot.com/ |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AdnanArifSalim |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
লেখক পরিচিতি
বিশেষত অর্ণব আর্ক ছদ্মনামে অধিক পরিচিত। বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। ইতিহাস ঐতিহ্যের গবেষণা এবং লেখালেখির সাথে জড়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই। বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর সব কয়টি ব্লগেই পদচারণা রয়েছে। দেশের বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে ইতিহাস ঐতিহ্য, রাজনীতি ও হাস্যরসাত্বক লেখাগুলো প্রকাশিত হচ্ছে। |
|
অসাধারণ উপলদ্ধি।