ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটবে, তা বেশ বোঝা গিয়েছিল বিধানসভা নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই। ২০০৯ সালে লোকসভা নির্বাচন এবং গত বছর পৌর নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস বামফ্রন্টকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছিল। এবারে ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বামফ্রন্টের ঝুলিতে পড়েছে মাত্র ৬১টি। অন্যদিকে তৃণমূল-কংগ্রেস জোট পেয়েছে ২২৮টি আসন। ২০০৬ সালের নির্বাচনে ঠিক এর বিপরীত ফলই হয়েছিল। বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী তৃণমূল-কংগ্রেস জোটের বিজয়ের পেছনে যেমন মমতার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি কাজ করেছে, তেমনি ৩৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্টের ব্যর্থতাও।
লাল বাড়ীর ইতিহাস:
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি সাধারণত দুটি বাড়ি নিয়ে আবর্তিত হয়। বাড়ি দুটিই লাল। দুটি বাড়িরই অবস্থান কলকাতার কেন্দ্রস্থলে। একটি বিবাদিবাগে। এই বিবাদিবাগ আগে ডালহৌসি স্কয়ার নামে পরিচিত ছিল। আর অন্যটি ধর্মতলায়। দুটি বাড়ির একটি রাজ্য সচিবালয়—মহাকরণ। আবার বলা হয় রাইটার্স বিল্ডিংও। অন্যটি পৌরভবন—কলকাতা পৌর করপোরেশনের অফিস। রাইটার্স বিল্ডিংকে বলা হয় ১ নম্বর লালবাড়ি আর পৌর ভবনকে বলা হয় ২ নম্বর লালবাড়ি। এই দুই বাড়ির দুই প্রধান চেয়ারে বসেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও কলকাতার মেয়র। আর এই দুই বাড়িকে কেন্দ্র করেই এখনো পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবর্তিত হয়।
এই লালবাড়ির দখল নিয়ে পাঁচ বছর পর পর লড়াই হয়। দুই নম্বর লালবাড়িটার দখল নিয়ে সর্বশেষ লড়াই হয়েছিল ২০১০ সালে। সেদিনের লড়াইয়ে দুই দলের কমান্ডার ছিলেন তখনকার কলকাতার মেয়র বিকাশ ভট্টাচায্য আর বর্তমান মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়। বিকাশ ছিলেন বামদলের লাল ঝান্ডা নিয়ে আর শোভন ছিলেন তৃণমূলের কমলা-সাদা-সবুজ রঙের ঝান্ডা নিয়ে। সেই লড়াইয়ে পরাজিত হয়েছিল লাল ঝান্ডার দল। আর জয়ী হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের কমলা-সাদা-সবুজের দল।
এবার লড়াই হলো কলকাতার ১ নম্বর লালবাড়িটার দখল নিয়ে। একদিকে লাল ঝান্ডাধারী বুদ্ধদেব ভট্টাচায্য, অন্যদিকে কমলা-সাদা-সবুজ ঝান্ডাধারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই লড়াইয়ে হেরে গেলেন বুদ্ধদেব। জিতলেন মমতা।
কলকাতার এই ১ নম্বর লালবাড়ির ইতিহাস পুরোনো। এটি এক ঐতিহাসিক বাড়ি। ব্রিটিশ ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে কর্মরত কেরানী বা রাইটার্সদের জন্য ১৬৩০ সালে এটি তৈরি করা হয়েছিল। ১৬৯৫ সালের ২৫ জুন এ বাড়িকে রাইটার্স বিল্ডিং হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ যেসব কর্মচারী কেরানীর পদে কাজ করতেন, তখন তাঁদের বলা হতো রাইটার্স। আর সেই রাইটার্স থেকে হয়ে যায় রাইটার্স বিল্ডিং—আজকের মহাকরণ—রাজ্য সচিবালয়। তখন এই ভবন এলাকার ব্যাপ্তি ছিল ২ দশমিক ৮ একর জমি। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ একর। এখন এখানে ছয় হাজার সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন।
আর ভারত স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই এই লালবাড়িটাকে নিয়ে কলকাতার রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে। ব্রিটিশরাও রাজত্ব করে গেছে এই ভবনে বসে। সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই এই লালবাড়ি আজ এক ঐতিহাসিক ভবন হিসেবে স্বীকৃত। রাজনীতিও চলে এই লালবাড়ি ঘিরে। নির্বাচনের আগে দাবিও জোরদার হয় এই লালবাড়ির দখল নিয়ে। কে নিতে পারে এই লালবাড়ির দখল।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এই বাড়ির অধিকাংশ সময় দখল ছিল কংগ্রেসের হাতে। সেই ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭—দীর্ঘ ৩০ বছর। আবার দীর্ঘ ৩৪ বছর দখলে রাখল বামফ্রন্ট। এবার নতুন করে এই বাড়ি দখলে রাখার জন্য জনগণের কাছ থেকে সার্টিফিকেট পেলেন মমতা।
মমতাই হচ্ছেন এই বাড়ির প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী। শুধু তা-ই নয়, এই ভবনে এর আগে সাতজন মুখ্যমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করে গেছেন। মমতা হলেন অষ্টম মুখ্যমন্ত্রী, যিনি এই বাড়ির দখল পেলেন। এর আগে এই বাড়ির দখল ছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হাতে। ছিলেন প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ (১৯৪৭-৪৮), ডা. বিধান চন্দ্র রায় (১৯৪৮-৬২), প্রফুল্ল চন্দ্র সেন (১৯৬২-৬৭), অজয় কুমার মুখার্জি (১৯৬৭ সালের মার্চ থেকে নভেম্বর), প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ (১৯৬৭-৬৮), অজয় কুমার মুখার্জি (১৯৬৭-৭১), সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় (১৯৭২-৭৭) ও জ্যোতি বসু (১৯৭৭-২০০০)। আর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিলেন ২০০০-২০১১ পর্যন্ত।
বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের সফলতা:
প্রথম থেকেই সিপিএমএ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও সিপিএম যে জনগণকে কিছুই দেয়নি এই বক্তব্য ভুল। প্রথমত বলা দরকার যে, ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় এসে সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট জনগণকে কংগ্রেসি সন্ত্রাসের কবল থেকে মুক্ত করেছিল। ইন্দিরা গান্ধী ও সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের ফ্যাসিস্ট সরকারি সন্ত্রাস জনগণের জীবনকে এমন নিরাপত্তাহীন এবং অতিষ্ঠ করেছিল যে, তার হাত থেকে রক্ষা লাভই হয়ে দাঁড়িয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের জনগণের প্রথম প্রয়োজন। সিপিএম ক্ষমতায় বসে তাদের সে প্রয়োজন সন্তোষজনকভাবেই মিটিয়েছিল। জনগণ শান্তি ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সিপিএমএর পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন।
অন্যান্য বামপন্থী দলকে নিয়ে বামফ্রন্ট গঠন ছিল সিপিএমএর এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এর মধ্যে তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় ছিল। প্রথম দিকে সিপিআই এই ফ্রন্টের মধ্যে না থাকলেও পরে তারা এতে যোগ দিয়েছিল এবং এসইউসি প্রথম দিকে এই ফ্রন্টে থাকলেও পরে বের হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৭ সালে গঠিত বামফ্রন্ট একটি শক্তিশালী জোট হিসেবে আজ পর্যন্ত টিকে থাকা সমগ্র উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য ব্যাপার।
৩৪ বছরের শাসনকালে সিপিএম শুধু যে জনগণকে কংগ্রেসী সন্ত্রাস ও নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করে নিরাপত্তা দিয়েছিল তাই নয়। ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে তারা যা করেছিল, সেটা বিপ্লবী না হলেও খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বর্গাচাষীদের জমি থেকে ইচ্ছেমতো সরিয়ে দেয়া বন্ধ করার জন্য তারা আইন করেছিল। বর্গাচাষীদের ফসলের চার ভাগের তিন ভাগ দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল।
বামফ্রন্টের ব্যর্থতা:
১৩ মে নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হওয়ার পর বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু ওই দিনই বলেছেন, এই ফলাফল তাদের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। তারা সবকিছু পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, নির্বাচনে তাদের জয় হবে। কিন্তু তাদের সেই সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে। যে মাপের পরাজয় তাদের হয়েছে তাতে তাদের এই সিদ্ধান্ত অবাক হওয়ার মতো। কারণ এই ভুল সামান্য বা প্রান্তিক নয়। এর মাপ তাদের পরাজয়ের মাপের মতোই। এ বিষয়টি উল্লেখযোগ্য এ কারণে যে, তাদের নির্বাচনী পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনগণের চিন্তা-চেতনা, তাদের প্রতি জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদিরই বিশ্লেষণ। কাজেই যখন তারা বলেন যে, নির্বাচন সম্পর্কে তাদের পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে তখন একথা বোঝার অসুবিধা নেই, শারীরিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনগণের চিন্তাভাবনা ও তাদের প্রতি জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তাদের ধারণাও সম্পূর্ণ ভুল। এই ভুলের বিবিধ কারণ থাকলেও সব থেকে বড় কারণ হল, বামফ্রন্টের অন্য শরিকদের কথা বাদ দিয়েও এই ফ্রন্টের নেতা সিপিএমের জনবিচ্ছিন্নতা।
তারা শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়েছিল, যদিও এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। স্কুল পর্যায়ে ইংরেজি শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে তারা বিভ্রাট ঘটিয়েছিল। ভারতীয় শাসনতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে বাধ্য থাকার জন্য ভূমি সংস্কার ক্ষেত্রে তারা আরও অগ্রসর পদক্ষেপ নিতে না পারায় তাদের ভূমি সংস্কার সংকটাপন্ন হয়েছিল। তাদের সংস্কার ভূমি মালিকানার ক্ষেত্রে এক ধরনের নতুন কায়েমি স্বার্থ সৃষ্টি করেছিল। এই স্বার্থের সঙ্গে সিপিএমএর লোকজনও জড়িত হয়েছিল।
এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এখানে সম্ভব নয়। তবে এটা বলা দরকার, ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে সিপিএমএর মধ্যে অনেক ধরনের সুবিধাবাদী লোকের প্রবেশ ঘটেছিল। এদের সঙ্গে মার্কসবাদ, লেনিনবাদ, সমাজতন্ত্রের কোন সম্পর্ক থাকেনি। তারা পার্টির মধ্যে ঢুকে দল ভারি করেছিল ও সেই সঙ্গে শুরু হয়েছিল সবকিছুর দলীয়করণ যা শেষ দিকে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। এর ফলে শুধু যে জনগণের মধ্যে এক ধরনের বঞ্চনার বোধ সৃষ্টি হয়েছিল তাই নয়, প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি ক্ষেত্রে মান নিচের দিকে নামতে নামতে সমগ্র ব্যবস্থাই ভেঙে ফেলার উপক্রম করেছিল। এসব মিলে জনগণের সঙ্গে সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের বড় রকম জনবিচ্ছিন্নতা ঘটেছিল।
জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ও ষষ্ঠ বামফ্রন্ট সরকারের আমলে চুরি-দুর্নীতি নেতৃত্বের একেবারে শীর্ষ লেভেলে বিশেষ না থাকলেও মাঝারি ও নিম্ন মাত্রায় লক্ষণীয় হয়েছিল।
ষষ্ঠ বামফ্রন্ট সরকারের শেষ দিকে বয়সের কারণে জ্যোতিবাবু মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতো সরকারের ও বিমান বসুর মতো পার্টির উচ্চ পর্যায়ের নেতারা কেউই দুর্নীতিপরায়ণ নন, কিন্তু তাদের নেতৃত্বাধীন সপ্তম সরকারের আমলে সিপিএম ও বামফ্রন্ট অনেক ধরনের গণবিরোধী কাজ করে দ্রুত জনবিচ্ছিন্ন হয়েছিল। ঋণের জালে জড়িত হয়ে, ঋণ পরিশোধ এবং উন্নয়নমূলক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব না থাকায় হঠাৎ করেই শিল্প উন্নয়নের জন্য তারা ব্যস্ত হন। অনেক বন্ধ কারখানা সচল করার দিকে মনোযোগ না দিয়ে নতুন শিল্প করার জন্য তারা নীতি নির্ধারণ করেন। এ কাজ করতে গিয়ে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণ তারা যেভাবে করেছিলেন, সেটাই তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। কৃষকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, মতবিনিময় ও তাদের সমর্থনের কোন তোয়াক্কা না করে সরকারি ক্ষমতার জোরে তারা কৃষকদের জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে সেই কৃষকদেরই বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন, যাদের ওপর ভর করে, যাদের বিপুল সমর্থনে তারা ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন এবং পরবর্তী কয়েকবার নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছিলেন। নন্দীগ্রামে তারা পুলিশকে দিয়ে গুলি চালিয়ে কৃষক হত্যা করেছিলেন। জঙ্গলমহলে শুধু পুলিশ নয়, তাদের পার্টি ক্যাডাররাও অনেকে আদিবাসীদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন করেছিল। অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ কারণে সিপিএম জনগণের মধ্যে তার সমর্থন হারিয়েছিল। মধ্য শ্রেণীর মধ্যেও তাদের বিরুদ্ধে বড় রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের অনেক ব্যর্থতা ও সেই সঙ্গে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষেত্রে ব্যপক দলীয়করণের কারণে।
অনেকের ধারণা, বামফ্রন্ট এবার হয়তো পরাজিত হতো, কিন্তু তাদের পরাজয় এতো বিরাট হতো না, যদি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ক্রমাগত একগুঁয়েমি, জেদ ও অপরিণামদর্শিতার পরিচয় না দিতেন। তিনি রাজ্যের শিল্পায়নের নামে চীনের কুম্যনিস্ট সরকারের কায়দায় সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে কৃষক ও নারী নির্যাতন চালাতে গিয়ে তার সরকারের বাম গণতান্ত্রিক চরিত্রটি হারিয়ে ফেলেন।
যে পঞ্চায়েত প্রথা প্রবর্তন ছাড়া বামফ্রন্ট সরকার রাজ্যের গ্রামের মানুষের বিপুল সমর্থন অর্জন করেছিলো, গত এক দশক ধরে সেই পঞ্চায়েত প্রথা দলীয়করণ এবং তাতে অবাধ দুর্নীতি প্রবিষ্ট হওয়ায় কংগ্রেসি আমলের শাসন ও বামফ্রন্টের শাসনের মধ্যে সাধারণ মানুষ আর কোনো পার্থক্য দেখতে পায়নি। সশস্ত্র ক্যাডারভিত্তিক (হার্মাদ নামে পরিচিত) রাজনীতি ও বামফ্রন্টের প্রধান দল সিপিএমকে গণবিচ্ছিন্ন করেছে।
যে মাওবাদীদের এককালে সিপিএম সমর্থন জুগিয়েছে, বর্তমানে তাদের সঙ্গে সিপিএমের যুদ্ধরত অবস্থা। মাওবাদীদের দমনের নামে বামফ্রন্ট সরকার রাজ্যের বিস্তীর্ণ প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোকে পুলিশি স্টেটে পরিণত করেছে এবং মাওবাদীদের সহায়তা দানের জন্য মমতা ব্যানার্জির দলকে দায়ী করে প্রচারণা চালিয়েছে। এই প্রচারণা সিপিএমের জন্যই বুমেরাং হয়েছে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অপশাসন, প্রশাসন ও পুলিশ দলীয়করণ এবং সাম্প্রদায়িক চক্রগুলোর সঙ্গে আপস বামফ্রন্ট সরকারের ভাবমূর্তিতে গত এক দশক যাবত্ যে কালিমা লেপন করেছে, সেই কালিমা মোচনে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং তার চাটুকার সহকর্মীরা কিছুমাত্র উদ্যোগ নেননি; পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসী শাসনের শেষদিকের মতো গণবিচ্ছিন্ন অপশাসন চালিয়ে গেছেন। ফলে এই অপশাসনে বিরক্ত, বিরূপ ও বিক্ষুব্ধ ভোটদাতারা ব্যালটের সাহায্যেই তাদের ক্ষমতা থেকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করে ছাড়লেন। নির্বাচনে স্বয়ং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যসহ অধিকাংশ মন্ত্রী ও সিনিয়র সহকর্মীদের পরাজয় এরই সাক্ষ্য বহন করছে।
বামফ্রন্টের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোন কারণে এভাবে পাহাড়সম বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হলেন? এক কথায় বলতে গেলে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাঁধে দুই লাখ কোটি রুপির ঋণের বোঝাই কি প্রধান কারণ? বিশ্লেষণ হতে পারে ৩৪ বছরের বাম-শাসনের অবসানের পেছনে কোন কোন কারণ রয়েছে। নন্দীগ্রামের কথা এক বাক্যে যে কেউ উত্থাপন করবেন মমতার উত্থানের জন্য। সিঙ্গুর নিয়ে যে আন্দোলন হলো, সেখানে গান্ধীর অনুকরণে অনশন করে মানুষের নজর কাড়তে সক্ষম হলেন মমতা। কোটি কোটি টাকার ঋণের বোঝা থাকার পরও রাজ্যের বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারলেন না বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। শিল্পায়ন হয়নি বললেই চলে। অন্তত অন্য রাজ্যগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গ। সমাজতান্ত্রিক নীতিকে ঠিক রেখে সেখানে বিনিয়োগ সুবিধা সম্প্রসারণের চেষ্টা করতে গিয়েও তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। সংখ্যালঘুদের বিষয়েও বামফ্রন্ট কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের বড় একটি অংশ বেঁকে বসে। তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় বামফ্রন্টের দিক থেকে।
তৃণমূলের যেভাবে জনপ্রিয় হয়:
১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস শুধু পরাজিত হয়েছিল তাই নয়, রাজনৈতিকভাবে তাদের অবস্থা দাঁড়িয়েছিল অনেকটা উচ্ছেদ হওয়ার মতো। তাদের কোন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যকারিতা থাকেনি। এদিক থেকে দেখলে ১৯৭৭ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমএর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তি আর থাকেনি। বিরোধী শক্তির এই কার্যকর অনুপস্থিতিই ছিল এত দীর্ঘদিন থেকে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকার অন্যতম কারণ। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বামফ্রন্টের ষষ্ঠ মেয়াদের সময় মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৃণমূল সংগঠিত হতে শুরু করে এবং সপ্তম সরকারের আমলে দ্রুত তাদের শক্তি বৃদ্ধি হয়। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, জঙ্গলমহল ইত্যাদি এলাকার পরিস্থিতিতে বামফ্রন্টের নীতি ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মমতা ব্যানার্জি প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হন। মধ্য শ্রেণীর মধ্যেও তার প্রভাব বৃদ্ধি হয়। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী শক্তির যে শূন্যতা ছিল তা পূরণ হয় এবং বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য অবলম্বন হিসেবে জনগণ মমতা ব্যানার্জির পতাকার নিচে দাঁড়ান।
পার্টি বলতে যা দাঁড়ায় তৃণমূল সে রকম কোন জিনিস নয়। মমতা ব্যানার্জিই সেখানে ষোল আনা। ২০১১ সালে জনগণ তৃণমূল বা তাদের শরিক কংগ্রেসকে ভোট দেননি, ভোট দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। প্রকৃতপক্ষে এই ভোটযুদ্ধ হয়েছে সিপিএম ও মমতা ব্যানার্জির মধ্যে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মমতা প্রথম থেকেই ছিলেন কংগ্রেসের লোক। ১৯৯৮ সালে প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধের ফলে কংগ্রেস থেকে বের হয়ে তিনি গঠন করেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু এভাবে পৃথক সংগঠন করায় তার ও তার দলের লোকদের রাজনৈতিক চরিত্রের কোন পরিবর্তন হয়নি। জনগণ তাকে যে ভোট দিয়েছে সেটা সিপিএম বিরোধিতার ক্ষেত্রে তিনি প্রতীকে পরিণত হওয়ার কারণে, তার কোন কর্মসূচির দিকে তাকিয়ে নয়।
ব্যক্তি মমতার কারিশমা:
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় পালাবদলের প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ণ এক ত্যাগী রাজনীতিক, যিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে তরুণ বয়সে সমর্থকদের নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করে পশ্চিমবঙ্গে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন। পরে বিভিন্ন উত্থান-পতনের মাঝ দিয়ে কঠিন সময় অতিবাহিত করে আজ তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন! সাদাসিধে জীবনযাপনকারী এবং অবিবাহিতা এই রাজনীতিক হলেন মমতা ব্যানার্জি। ২০১১ সালের নির্বাচনে বিস্ময় সৃষ্টিকারী এই রাজনীতিক হলেন রাজ্যের পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি। যদিও শাসক বামপন্থীদের বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেস সংগ্রাম করেছে তথাপি এর মূলশক্তি হলেন মমতা ব্যানার্জি।
তার দল তৃণমূল একাই বিধানসভায় সরকার গঠন করার মতো শক্তি অর্জন করেছে। কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসনে জয়ী হয়েছে। কংগ্রেস এই আঁতাত করে লাভবান হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে যে রাজনৈতিক ঝড়ে বামপন্থীরা উড়ে গেছে, এই ঝড়ের চোখ হলেন মমতা ব্যানার্জি। বর্তমান সময়ে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে কার্যত একাই কোন রাজনৈতিক দলকে এতটা সাফল্য দেয়ার দৃষ্টান্ত নেই। উল্লেখ্য, দক্ষিণের তামিলনাড়- রাজ্যেও এবার মহিলা রাজনীতিক জয়ললিতা জয়রাম বড় জয় পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন কিন্তু তার রাজ্যের প্রেক্ষিত ভিন্ন। তিনি আগেও সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ডিএমকে দলের প্রধান নেত্রী হলেও সেই দল তৃণমূলের মতো এতটা মমতা ব্যানার্জি নির্ভর নয়। মমতা তৃণমূলের শুধু স্রষ্টাই নন, কঠিন সময় অতিক্রান্ত করেছেন রাজনীতিতে। কোন কোন সময় মনে হয়েছে, রাজনৈতিক অন্ধকারে তিনি যেন হারিয়ে যাচ্ছেন- খুঁজে বের করাই যেন কষ্টসাধ্য। তবু মমতা ব্যানার্জি হারিয়ে যাননি। একবার লোকসভা নির্বাচনে তার তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি আসনের মধ্যে মাত্র একটিতে জয়ী হয়। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন মমতা সম্ভবত হারিয়েই গেলেন রাজনীতি থেকে। কিন্তু আশার কথা ছিল, সেই একমাত্র জয়ী প্রার্থী ছিলেন এই মমতা ব্যানার্জি।
অনেক চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করেই মমতা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আজ পশ্চিমবঙ্গে অনবদ্য ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন- এটা তার দীর্ঘদিনের লালিত বাসনা। কিন্তু বড় কথা হল, তিনি অনুপম ইতিহাস রচনা করলেন। সোনিয়া গান্ধীর কংগ্রেস যখন বামফ্রন্টের কাছে রাজনৈতিকভাবে সাম্প্রতিককালে অনেকটা অসহায় প্রতীয়মান হচ্ছিল, তখন মমতাই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে লালদুর্গের পতন ঘটালেন। মাত্র কয়েক বছরেই তিনি এটা সম্ভব করলেন।
রেলমন্ত্রী হিসেবে সাফল্যও তাঁর জন্য সুবিধা বয়ে আনে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের সমর্থন আদায়ে তিনি কৌশলী ছিলেন, সেই কৌশলেও তিনি বিজয়ী হয়েছেন।
বিলাসিতা বিবর্জিত এবং অত্যন্ত সহজ-সরল জীবনযাপনকারী মমতার নবযুগের শাসনকালে জনগণের কল্যাণ হবে এটাই প্রত্যাশা। তিনি বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের রেলমন্ত্রী, আগেও এই দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু রেলভ্রমণ করেছেন সাধারণ যাত্রীর মতো। ব্যতিক্রমধর্মী এই রাজনীতিক সত্যিকার অর্থেই ভারতের রাজনীতির ঝড়ের চোখ।
মমতার থেকে আমরা যা শিখতে পারি:
পশ্চিমবঙ্গ আর আমাদের দেশের রাজনৈতিক অবস্থা বা প্রেক্ষাপট এক রকম নয়। তাই একটির অভিজ্ঞতা দিয়ে আরেক জায়গায় কৌশল প্রনয়ন করতে গেলে তা খুব একটা যৌক্তিক বা গ্রহন যোগ্য হবে বলে মনে করি না আমি। তথাপি, কিছু ব্যপার এখানে আমি আলোচনা করতে চাই, যা কিছুটা হলেও আমাদের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
* মমতাকে কি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তার যে বিশেষ গুনটি সবার আগে চোখে পড়ে, তা হলো তার মানবিকতা। আরও নির্দিষ্ট করে বললে বলা যায়, তার যে ভীষন রকম প্রো-পিপল বা গণমুখী আচরণ, তা আমাদের এখানকার রাজনীতিবীদরা শিখতে পারেন। উচ্চ বিত্ত বা মধ্য বিত্ত যদি একটু খেপেও যায়, তবুও গরীব মানুষের পক্ষে শক্ত একটা অবস্থান নিলে তার একটা ভালি ফলাফল যে পরে পাওয়া যায়, তা এই বিধান সভার নির্বাচনে প্রমানীত হয়েছে। অথচ, আমাদের দেশে প্রথমে তেল ও পরে গ্যাসের দাম ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি করার পরও আমাদের রাজনীতিবীদরা সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারেন নি। এমনকি গ্যাস ভাড়াকে কেন্দ্র করে পরিবহন সেক্টরে যে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে এবং মানুষের যে দুর্ভোগ বেড়েছে, তারও বলিষ্ঠ কোন প্রতিবাদ চোখে পড়েনি আমার।
* মমতার এই ভীষন রকম গনমুখী আচরনটি তার দিদি ইমেজ তৈরীতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। সারা পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন মত ও পেশার মানুষ তাকে যেভাবে দিদি বলে, তার দ্বারা বোঝা যায় মানুষের মনের ভেতরের কত গভীরে অবস্থান সংহত করতে পেরেছেন মমতা ব্যনার্জী।
* আমি তারা নিউজটা মাঝে মাঝে দেখি। আমি মিডিয়াতে মমতা তথা তৃণমূলের ক্যাম্পেইনের যে স্টাইলটা দেখেছি, তা রীতিমতো অবাক করেছে আমায়। এত গোছানো এবং জাস্ট কিছু সময়োপযোগী কিছু শ্লোগান বা টাইটেল দিয়ে যেভাবে তারা ভোটারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা শিক্ষণীয়। বিভিন্ন বয়সী লোকদের জন্য বিশেষ করে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আলাদা মেসেজ দেয়ার চেষ্টাও ভাল লেগেছে আমার। ইলেকশনের মাত্র দিন ১৫ আগে, বাত্য বসু নামের এক নির্মাতা একটি চলচিত্র মুক্তি দেন, যেখানে মমতা ব্যনার্জীর একটি গৌরবজ্ঝল ছবি মানুষের কাছে কৌশলে পৌছিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে জানলাম, এই ব্রাত্য তৃণমূল থেকে টিকেট পেয়ে নির্বাচনে অংশ নেন আবার বিজয়ীও হন। তার মানে ঠিক ইলেকশনের সময়ই যাতে মুভিটা রিলিজ দেয়া যায়, সে হিসেব করেই ছবির নির্মানও শুরু হয়েছিল।
* মমতার অনেকগুলো বক্তব্য শুনলাম। একই রকম কথা। কথার ফুল ঝুড়ি। অনেক অনেক প্রতিশ্রুতি। তার মাঝেও যেটা দেখলাম, মমতা ব্যানার্জী খুব সুন্দর করে গত ৩৪ বছরের বামফ্রন্টের ব্যর্থতা তার বক্তব্যে তুলে ধরেন। একেবারে পয়েন্ট করে। প্রতিটি ব্যর্থতায় দলের অবস্থান এবং আগামীতে ক্ষমতায় গেলে কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করবেন, তাও জানিয়ে দেন তিনি। এক কথায়, সিপিএম সরকারের দূর্বলতা খুব স্বার্থকতার সাথেই ভোটারের সামনে উপস্থাপন এবং তা কাজে লাগাতে পেরেছেন মমতা বন্দোপাধ্যায়।
* মমতা ১৯৯৭ সাল অবধি কংগ্রেস করতেন। পরে সেখান থেকে বের হয়ে গড়লেন তৃণমূল। আমার খুব ভালভাবেই মনে আছে, তৃণমূল নেত্রীকে ৮-১০ বছর আগেও খুব অবহেলা করতো সবাই। পাগলে কিনা বলে ছাগলে কিনা খায়, এ মর্মে উপহাসও করতো তাকে। এমনকি মিডিয়াগুলো বা বামফ্রন্টের মন্ত্রীরাও প্রকাশ্যে সমালোচনা করতো তার। এরপরও হাল ছাড়েন নি তিনি। বরং সাধনা করে গেছেন। বছরের পর বছর মানুষের কাছে সিপিএম এর ব্যর্থতার বয়ান গেয়ে গেছেন তিনি। এরই মাঝে নিজেকে আর দলকে গুছিয়েও নিয়েছেন খুব। মমততার এই অধ্যাবসায়টা নিজেদের উন্নয়নের কাজেও লাগাতে পারি আমরা।
* মমতার তৃণমূল ২০০১ সালে কেন্দ্রে বিজেপির সাথে সরকারের অংশীদারিত্ব নিয়েছিল। আবার এর পরের দু দফায় কংগ্রেসের সাথে ভিড়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেছেন তিনি। একবার বিজেপি, একবার কংগ্রেসের সাথে মিলে কাজ করায় কিছুটা সমালোচনা শুনতে হয়েছে তার। কিন্তু মানুষের পক্ষে থাকলে এই অবস্থান পরিবর্তন যে কোন বিষয় হয়ে দাড়াতে পারেনা, তাও প্রমান করে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জী। আমাদের দেশেও বার বার জোট পরিবর্তনটাকে ভালভাবে দেখেনা সবাই। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল যদি সত্যিকার ভাবে মানুষের জন্য কাজ করে, তাহলে মানুষের মাঝে তার যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরী হয়, এটাও বোধ হয় বিশ্বাস করার সময় হয়েছে। তাই কোন্ জোটে যাবেন, তার চেয়ে অনেক জরুরী হলো, কোন সিদ্বান্ত নিলে মানুষের মাঝে আপনি টিকে থাকবেন, সেই ব্যপারে কৌশল প্রনয়ন করা।
* সুব্রত বা শোভনের মত, কংগ্রেস বা বিজেপির অনেক হাই প্রোফাইল নেতাকে গত কয়েক বছরে দলে ভিড়িয়েছেন মমতা। আমি ঐ সময়ে খবরে দেখতাম, এই দলে ভেড়ানোর কৌশল নিয়ে মিডিয়া অনেক সমালোচনা করতো মিডিয়া। এমনকি, যারা দল ছেড়ে যেত, তাদেরকেও নানাভাবে নীতিহীন প্রমানের চেষ্টা চলতো। কিন্তু আসলে সব সমালোচনা শুনেও, তাতে কর্ণপাত না করে আসলে যে মমতা ভেতরে ভেতরে তার দল গুছাচ্ছিলেন, বা দলের অবস্থান সংহত করছিলেন, তার প্রমাণ মিললো এবারের বিধানসভা নির্বাচনে।
* পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা বরাবরই বামঘেষা। তারা সবাই শ্র্রেনী বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন সব সময়। আমরা ছোটকাল থেকেই যারা নচিকেতা বা সুমন এর গান শুনি, তারাও এই ব্যপারটা জানি। ৭/৮ মাস আগে দেখলাম, মমতা একদিন নচিকেতার বাড়ীতে গেলেন। কি নিয়ে যেন আলাপ করলেন তারা। বের হয়ে মিডিয়াকে বললেন গান বাজনা নিয়ে আড্ডা দিয়েছেন তারা। কিন্তু আসলে নচিকেতাকে বশে আনলেন মমতা। আর এবার ইলেকশনের ক্যাম্পেইনে দেখলাম, সুমন আর মমতা দিদি একই গাড়ীতে। শুধূ তাই নয়, কবীর সুমনের ইন্টারভিউ শুনলাম। তার জীবনের নাকি একটাই ব্রত এখন, তা হলো মমতা ব্যানার্জীকে বাংলার মূখ্যমন্ত্রী বানানো। আপাদমস্তক কম্যুনিস্ট এই এই শিল্পী বা বুদ্ধিজীবিদের কি যাদু নিয়ে সম্মোহন করলেন মমতা, তা নিয়েও ভাবতে পারি আমরা।
* মমতার তৃনমূলে অনেক মুসলমানের ঠাই মিলেছে। যে মুসলমানেরা কম্যুনিস্ট ধারাতে যায় না, আবার সেক্যুলার কংগ্রেসে গিয়েও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেনি, তাদের আশ্রয় মিলেছে মমতার কাছে। আর মুসলমানের সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গে কম তো নয়, যার পুরো ফায়দা মমতা তাই এই বিধানসভার ভোটে আদায় করে নিয়েছেন।
* রেলমন্ত্রী হিসেবে মমতার একটি দূর্নীতিমুক্ত ইমেজ আছে। যা পশ্চিমবঙ্গ তার একটি ভিন্ন ইমেজ তৈরীতে সহায়তা করেছে। রেল বিভাগের উন্নয়ন করে নিজের যোগ্যতাও প্রমাণ করেছেন তিনি। তাছাড়া কেন্দ্রে মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে ভারতের প্রধান প্রধান রাজনীতিবীদদের সংস্পর্শে, বিশেষ করে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী ও প্রধানমন্ত্রী মানমোহান সিং এর যে আস্থা অর্জন করেছেন তিনি, তা তাকে যে একটি ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে তা বলাই বাহুল্য।
* আর সর্বোপরি মা, মাটি মানুষের পক্ষে তার বলিষ্ঠ অবস্থান ও স্লোগানই, তাই যেতাকে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বানিয়ে দিয়েছে, তা বোধ হয় তার নিন্দুকেরা স্বীকার করবেন।
চূড়ান্ত ফলাফল:
দল ভোট আসন
বামফ্রন্ট ৪১ ৬১
সিপিএম ৪০
ফরওয়ার্ড ব্লক ১১
আরএসপি ৭
সিপিআই ২
ডিএসপি ১
তৃণমূল জোট ৪৯ ২২৭
তৃণমূল কংগ্রেস ৩৯ ১৮৪
কংগ্রেস ১০ ৪২
এসইউসিআই ১
অন্যান্য ১৫ ৬
স্বতন্ত্র ৬ ২
গুর্খা জনমোর্চা ৩ ৩
এসপি ১
প্রসঙ্গ: নির্বাচন কমিশন:
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন থেকে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। সেখানে নির্বাচন কমিশন যেভাবে পুরো নির্বাচন পরিচালনা করেছে, তাতে তাদের দক্ষতা, সততা ও নিরপেক্ষতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। কমিশনের বিরুদ্ধে কেউ পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনেনি। পরাজিত পক্ষও নির্বাচন বাতিল করার দাবি জানায়নি। শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন কার্যকর হলে সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। এটাই প্রমাণ করে দিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। গণমাধ্যমগুলো যথার্থভাবেই নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনের প্রধান নায়ক বলে অভিহিত করেছে। বাংলাদেশেও নির্বাচন কমিশন নির্বাচন-প্রক্রিয়াকে ত্রুটিমুক্ত করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত সেই উদ্যোগকে সর্বাত্মক সহায়তা করা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে পরিচালনার বিকল্প নেই।
আগামী দিনে আমাদের প্রত্যাশা:
যৌক্তিক কারণেই পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার পালাবদলের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের দৃষ্টি নিবন্ধ। এ রাজ্যের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থল ও রেলপথে সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াও রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত। রাজনৈতিকভাবে দুই দেশের বাসিন্দা হলিও ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ভাষা-সংস্কৃতির দিক থেকে আমরা অভিন্ন উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি। চলতি বছর যৌথভাবে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন সেই বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে। বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে কিংবা বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে রাজ্য সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ প্রসঙ্গে আমরা গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সইয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সিপিএম নেতা জ্যোতি বসুর ভূমিকা স্মরণ করতে পারি। ২০১০ সালে নয়াদিল্লিতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্তবিরোধ নিষ্পত্তি ও ছিটমহল বিনিময়ের ব্যাপারে মতৈক্যে পৌঁছালেও তা যৌক্তিক পরিণতি পেয়েছে বলা যাবে না; বিশেষ করে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিটি আটকে ছিল পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের জন্য। এখন নির্বাচন হয়ে গেছে এবং তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথও নিয়েছেন। স্বভাবতই বাংলাদেশ অবিলম্বে তিস্তার পানিবণ্টন ও সীমান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধান আশা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের কাছে ইতিবাচক ভূমিকাই প্রত্যাশিত।
ভালো থাইকেন