|
বৃদ্ধাশ্রমে কেন বাবা-মায়ের আশ্রয়
আহসান শরিফ |
|
বুড়ো বাবার সঙ্গে বাড়ির আঙ্গিনায় বসেছে সিফাত। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় এখানে কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন দুজনে। সেই ছোট্ট সিফাত বেশ বড়ো হয়েছে। বয়স সাঁইত্রিশ কি আটত্রিশ। বিভিন্ন বিষয়ে কথা হচ্ছে। সামনে সুন্দর গাছ। বাতাসে হেলছে গাছের ডাল। একটা কাক ডালে বসে দুজনের মনযোগ কাড়ে। কাক দেখিয়ে বাবা সিফাতের কাছে জানতে চাইলেন, এটা কী? উত্তরে সিফাত বলল- বাবা, এটা ‘কাক’। বাবা আবার জিজ্ঞেস করলে, সিফাত উত্তর দেয়। তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলে কিছুটা বক্রতা নিয়ে ছেলে বলে, ‘কাক’! কিছুক্ষণ পর আবার জানতে চাইলে চেঁচামেচি দিয়ে ছেলে বলে, এটা কাউয়া! বাবা, এটা কাউয়া! এরপর আবার জানতে চাইলে ছেলে রেগে ওঠে বলে, ‘তুমি সব সময় এক কথা হাজার বার জানতে চাও! কতবার বললাম, এটা কাউয়া! এটা কাউয়া!! এটা কাউয়া!!! এরপর ঘর থেকে ডাইরি বের করে বাবা সিফাতকে পড়তে বললে, সিফাত পড়ে- আমার ছোট ছেলে সিফাতের সঙ্গে বারান্দায় বসেছিলাম। একটা কাক দেখে ও পঁচিশবার জানতে চাইল। আমি পঁচিশবার উত্তর দিলাম। ও খুশি হল। ওর জন্য আমার মায়াও বাড়ল।
ঊনসত্তর বছরের বুড়ো সামিউল হক [ছদ্মনাম] ছিলেন একজন কলামিষ্ট। বাড়ি যশোর। চাকুরি করতেন চারুকলায়। ষোল বছর আগে স্ত্রী মারা গেছে। সংসারে এক ছেলে এক মেয়ে। চাকুরির টাকা দিয়ে উত্তরায় করা বাড়িটি রেখেছেন প্রিয় সন্তানের নামে। ছেলে ব্যাংকার। মেয়ে থাকে আমেরিকা। ৯ বছর আগে তার চাকুরির মেয়াদ শেষ হলো। এ ৯ বছর তিনি বৃদ্ধাশ্রমে। ছেলের বউ এবং পুত্র-সন্তান আছে। মেয়েরও আছে স্বামীর সংসার। তারা বেশ সুখে আছে। নিজস্ব বাড়ি থাকার পরও বৃদ্ধাশ্রমে থাকার কারণ জানতে চাইলে সামিউলের ভেতরে যেন আগুন জ্বলে ওঠে। দীর্ঘশ্বাস বেরোয় তার ভেতর থেকে। কোন কারণ বলতে নারাজ তিনি। বললেন, ‘এখানে নিরিবিলি পরিবেশ। নিরিবিলি থাকতে ভালো লাগে।’ চাপাচাপি করলেও বললেন না তিনি। রেগে ওঠে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, ‘বললে হবে কী! আপনি কি সমাধা করতে পারবেন? শেখ হাসিনা পারবে? খালেদা পারবে? কেউ পারবে না।’ বাসায় যাওয়া হয়, নরম করে জানতে চাইলে, বললেন, ‘না, কোথাও যাই না।’ ছেলে-মেয়েরা আপনার কাছে আসে? উত্তরে, ‘ওরা ১লা বৈশাখে এসে কিছুক্ষণ থেকে চলে যায়। সারা বছরে আর আসে না।’ বৃদ্ধাশ্রমের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা জানতে চাইলে বলেন, ‘এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা নিজেদের করতে হয়। আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ভালো নয়। আমাদের বিনোদনের কোন সামগ্রী এখানে নেই। নেই বড়ো কোন ডাক্টার বা চিকিৎসার সু-ব্যবস্থা। ভাড়া বেশি। চিকিৎসা সেবা নেই। কর্মচারীদের ব্যবহার খারাপ। বৃদ্ধভাতা দেয়া হয় না। আরো কতো যন্ত্রণা!’ কোন কোন বৃদ্ধাশ্রমের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে, এ বিষয়ে কথা বলতে তারা অনিহা প্রকাশ করে।
হজরত উওয়াইস কুরুনি [র.] রাসূলের (স.) জীবদ্দশায় ঈমান এনেছিলেন। ইয়ামান ছিলেন বলে হজরত রাসূলে আকরাম (স.) এর জিয়ারত নসিব হয়নি। এটি ছিল তার জীবনের সবচে বড় প্রত্যাশা। এতে তিনি সাহাবি হতে পারতেন [দুনিয়ার হাজার ওলি মিলেও একজন সাধারণ সাহাবির ঘোড়ার পায়ের নিচের বালির সমপরিমাণ মর্যাদার অধিকারী নয়]। একবার লোক মারফত রাসূলের [স.] কাছে আরজি পেশ করলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার মা অসুস্থ, আমি চাচ্ছি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে, আসব?’ উত্তরে রাসূল [স.] বললেন, ‘আমার কাছে না এসে তুমি তোমার মায়ের সেবা করো।’ হজরত উওয়াইস কুরুনি রাসূলের [সা.] দরবারে এলেন না। মায়ের সেবা করলেন। পরে হজরত উমরকে [রা.] রাসূলে আকরাম [সা.] ওসিয়ত করে গেলেন, ইয়ামানে উওয়াইস কুরুনি নামে একজন মানুষ আছেন। তাকে পেলে দোয়া চেয়ে নিয়ো। রাসূলের [সা.] ইন্তেকালের পর উওয়াইস কুরুনিকে খুঁজতে লাগলেন হজরত উমর। অনেক দিন পর তাকে পেয়ে দোয়া করালেন। [মুসলিম শরিফ]
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর [রা.] হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সাহাবি রাসূলের [সা.] কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমি নিজ দেশ ত্যাগ করে আপনার সঙ্গে হিজরত এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্যে জিহাদের বাইয়াত নিতে এসেছি। আমি আশা করছি এতে আল্লাহর কাছ থেকে সাওয়াব এবং উত্তম প্রতিদান পাওয়া যাবে।’ রাসূল [সা.] সাহাবিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার বাবা-মায়ের কেউ কি জীবিত আছেন?’ সাহাবি বললেন, ‘জ্বী, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার বাবা-মা দুজনই জীবিত আছেন।’ এরপর রাসূল [সা.] বললেন, ‘তুমি কি প্রকৃত সাওয়াবের আশা করো?’ সাহাবি বললেন, ‘জ্বী, ইয়া রাসূলাল্লাহ!’ তখল রাসূল [সা.] বললেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে হিজরত এবং জিহাদে অংশগ্রহণ না করে তোমার বাবা-মায়ের কাছে যাও। তাদের সেবা করো। তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো। [মুসনাদে আহমদ]
উপরে সামাজিক চিত্র এবং হাদিস দুটি আমরা পড়লাম। আমরা মানুষ এবং মুসলমান হিসেবে বিষয়টি বোধগম্য হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের সমাজে কজনে বাবা মায়ের সেবা করি? তাঁদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করি? আদৌ করি কী? কেন করি না? ‘... তোমরা তোমাদের পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো; তাদের একজন কিংবা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তা হলে তাদের সঙ্গে বিরক্তিসূচক কিছু বলো না এবং কখনো তাদের ধমক দিয়ো না, তাদের সঙ্গে সম্মানজনক ভদ্রজনোচিত কথা বলো। [সুরা বনী ইসরাঈল : আয়াত ২৩]’ পবিত্র কোরআনের এ আয়াতসহ বহু আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বাবা-মায়ের সেবা করতে বলেছেন। তাদের আরামের প্রতি লক্ষ রাখতে বলেছেন। বলেছেন তাদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করতে। নবীজী [সা.] জিহাদ থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বাবা-মায়ের খেদমত করাকে। তিনি অভিশাপ দিয়েছেন তাদেরকে, যারা বুড়ো বাবা-মায়ের দুজন বা কোন একজনকে পেল, অথচ তাদের সেবা করে গুনাহ মাপ করাতে পারল না।
কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমই কি বুড়ো বাবা-মায়ের জন্য আরামদায়ক? কেন এ বৃদ্ধাশ্রম? বছরে একদিন সাক্ষাৎ করা, এটাই কি বাবা-মায়ের সঙ্গে সুন্দর আচরণ? এতেই কি তাদের হক আদায় হয়ে যাচ্ছে? যে বাবা-মা পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখিয়েছেন। নিজে না খেয়ে খাইয়েছেন।
কোলে-কাঁধে নিয়ে বড় করেছেন। অবাধে মল-মূত্র পরিষ্কার করেছেন। কিছুই কি তাদের পাওয়ার নেই? তাদের সঙ্গে কেন এই অনিয়ম, অবিচার? আমরা তো মৃত্যু থেকে বাঁচতে চেষ্টা করলেও জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চেষ্টা করি না, অথচ চেষ্টা করলে জাহান্নাম থেকে বাঁচা যাবে। কিন্তু মৃত্যু...?
লেখকঃ মার্কেটিং ডিরেক্টর, দেশ মাটি হাউজিং লি. |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AhsanSorif |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|