বৃহস্পতিবার, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৭ মে ২০১২; রাত ১১:৫৯ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

ট্রানজিট-করিডোরঃ বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার উপর প্রভাব

আকাশ খান

বাংলাদেশ এবং এদেশের জনগণের জন্য বর্তমান সরকার বিপুল বিজয়ে ক্ষমতায় আরোহনের পরপরই ট্রিপল 'T' (Transhipment/Corridor, Taskforce and TIFA) বাস্তবায়নের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে- অবশ্য ক্ষমতায় আরোহনের আগে�" বর্তমান সরকারের নীতি নির্ধারকদের বিভিন্ন বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বুঝা গিয়েছিলো এ সরকার বিদেশীদের কাছে ‘এক-ঝাঁক �"য়াদা’ করেই ক্ষমতায় আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো যার মাঝে ‘ভারতকে ট্রানশিপমেন্ট বা কারডোর সুবিধা প্রদান’ একটি। ‘ট্রানজিট’ বলতে সাধারণতঃ আমরা বুঝি, কোনো একটি দেশ কর্তৃক দ্বিতীয় কোন দেশের মহাসড়ক, রেলপথ এবং বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় আরেকটি দেশ থেকে দ্রব্যসামগ্রী আমদানি বা তৃতীয় কোন দেশে মালামাল বা দ্রব্যসামগ্রী রপ্তানি করা; অন্যদিকে ‘করিডোর’ হলো দেশের এক অংশ থেকে অন্য অংশে মালামাল বা দ্রব্যসামগ্রী পরিবহনের উদ্দেশ্যে অপর একটি দেশের অন্তর্গত মধ্যবর্তী পথ বা মহাসড়ক ব্যবহার করা। ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি ১৯৭৪, ১৯৮০ সালের দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি এবং সর্বশেষ ১৯৯৩ সালের সাপটা (SAPTA) চুক্তির বরাত দিয়ে, ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে ‘করিডোর’ সুবিধা দাবী করে আসছে। ১৯৯৯ সনের ২৮ জুলাই, তৎকারীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) এর সভাপতিত্বে অনুষ্� িত কেবিনেট বৈ� কে ভারতকে করিডোর সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিলো।

অন্যদিকে, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ভারত ট্রানশিপমেন্ট বা করিডোর সুবিধা দেয়ার জন্য ক্রমাগত পরামর্শ দিয়ে আসছে এবং ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নেপাল �" ভুটানে যেতে ‘ট্রানজিট’ সুবিধা পাবার শর্ত হিসেবে এই ‘ট্রানশিপমেন্ট’ কে শতারোপ করেছে। উল্লেখ্য, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পূর্বে ভারত �" পাকিস্তানের মধ্যে ট্রানজিট সুবিধা বিদ্যমান ছিলো এবং ১৯৪৭ সালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পাদনের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর উপযুক্ত না থাকায় পূর্ব-পাকিস্তানের জন্য কলকাতার মধ্য দিয়ে ছয় মাসের জন্য ট্রানজিট সুবিধা প্রদানের জন্য পাকিস্তান ভারতকে জোর অনুরোধ করেছিল, প্রত্যুত্তরে, ভারতীয় নেতা বল্লভ ভাই প্যাটেল জবাব দিয়েছিলেন যে, ছয় দিন কেন, ছয় ঘণ্টা�" সম্ভব না।

ট্রানজিটের ক্ষেত্রে ইউরোপ �" আসিয়ান অভিজ্ঞতা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বাস্তবতা
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি �" ধ্বংসযজ্ঞ পূরণকল্পে নিজেদের মধ্যকার সংহতি �" ঘনিষ্�  যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে। অন্যদিকে, কিছু ইউরোপীয় রাষ্ট্র �" মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাম্যবাদী চীন �" রাশিয়ার প্রভাবকে প্রতিরোধ করতে পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য UNESCAP গ� নের মাধ্যমে এশিয়ার দেশগুলোকে ১৯৫৯ সালের ‘এশিয়ান হাই�"য়ে’ �" ১৯৬০ সালের ‘ট্রান্স-এশিয়ান রেল�"য়ে’ নির্মাণে সমঝোতায় আসতে চাপ প্রয়োগ করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিলুপ্তপ্রায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে অনুসরন করে ইউরোপের জনগণ একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে এবং European Consciousness বা আন্ত-ইউরোপীয় ট্রানজিট ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রেরণা যোগায়। ইউরোপের জনগোষ্� ীর একই ধর্ম, খ্রীস্টীয়বাদের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, রোমান ক্যাথলিক সভ্যতার উত্তরাধীকারিত্ব, স্থানীয় সংস্কৃতির সংরক্ষণ, একে অপরের মতামতের প্রতি সম্মান, সাদৃশ্যপূর্ণ শিক্ষা অর্জন- এসব বিষয় ইউরোপীয়দের দ্রুত পরস্পরের কাছাকাছি আসতে সহায়তা করে। দক্ষিন এশিয়ার, বিশেষ করে ভারতের নীতি নির্ধারকদের একটা বিরাট অংশ বর্ণবাদী আচরণ হতে এখনো বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়নি এবং এক ধরনের অদূরদর্শী �" সংকীর্ণ মানসিকতার ফলে ভারতের প্রান্তিক জনগোষ্� ী উন্নতির সুবিধা পাচ্ছেনা এবং নীতিনির্ধারকদের এ একমুখো নীতির ফলে সন্ত্রাসের কেন্দ্রভূমি এখন দক্ষিণ এশিয়ায় স্থানান্তরিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, ১৯৪৭ সালের পর স্বাধীন ভারতের সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর বিরোধ এবং অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়; একটা বৃহৎ দেশ হ�"য়া সত্ত্বে�" ভারত দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে বিশ্বাস �" সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়। এক জাকি তত্ত্ব ব্যর্থ হয়ে তিন জাতি সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ স্বাধীন হ�"য়ার মাধ্যমে। ১৯৭১ সালে সাবাধীনতা অর্জনের অব্যবহিত পরে বাংলাদেশের সাথে আলোচনায় প্রয়াত ডি, পি, ধরকে দমদম বিমানবন্দরে জেনারেল জ্যাকব যেসব বিষয়ে নিশ্চয়তা নিতে অনুরোধ করেছিলেন সেগুলো হচ্ছে- ১) বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, ২) ১৬৫ টির মত ছিটমহলের বিষয়ে অমীমাংসীত প্রশ্নটিকে যৌক্তিকীকরণ এবং ৩) চট্টগ্রাম বন্দরে ভারতের প্রবেশাধিকার। প্রত্যুত্তরে ডি পি ধর যদি�" বলেছিলেন, আপনি একজন সৈনিক, এই বিষয়গুলো রাজনীতিবিদদের হাতে ছেড়ে দিন এবং উপযুক্ত সময়ে এসব বিষয়ে আলোচনা করা হবে (সূত্রঃ Surrender at Dacca: Birth of a Nation”, General Jacob), কিন্তু বাস্তবিক অর্থে ১৯৭২ সাল থেকে ভারত এর উত্তর-পূর্বাঞ্চল রাজ্যগুলোতে মালামাল বহন এবং চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশাধিকার পা�"য়ার ক্ষেত্রে ‘ট্রানজিট’ এর নামে ‘করিডোর’ সুবিধা দিতে বাংলাদেশের উপর চাপ প্রয়োগ করা শুরু করে।

এক্ষত্রে অনেক বিশেষজ্ঞ বা বুদ্ধিজীবি ভারতকে করিডোর প্রদানের ক্ষেত্রে ইউরোপের উদাহরণ দেন, কিন্তু ইইউ-ভুক্ত দেশসমূহের আন্ত-বাণিজ্যের হার অনেক উচ্চ, অথচ ভারতের আরোপিত ট্যারিফ �" নন-ট্যারিফ বাধার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের মধ্যে এ হার মাত্র ৪ শতাংশ। তাছাড়া�", ইউরোপীয় ইউনিয়নে অংশগ্রহনকারী দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা �" ঐক্য সফল হয়েছিল কারণ, তাদের পরষ্পরের স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ত্ব রক্ষায় আন্তরিকভাবে অংগীকারাবদ্ধ,সেখানে সিকিম বা ভুটানের মতো ক্ষুদ্র ডেনমার্ক বা নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রগুলো কখনো ফ্রান্স বা ইতালি দ্বারা সার্বভৌমত্ব হারানোর ভয় নেই। তাছাড়া�" নিজস্ব স্বার্থ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত এশীয় মহাসড়ক ((Asian Highway)) এর গতিপথের নকশা ভারতের বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরিবর্তনের কোনো উদাহরণ নেই এবং এর ফলে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত ১৫০০ কি·মি· রাস্তা অতিক্রম করতে হবে। অন্যদিকে, যদি টেকনাফ থেকে ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত প্রস্তাবিত রাস্তা তৈরী হয়, তবে বাংলাদেশ আসিয়ানের বিশাল বাজারে প্রবেশ করতে পারবে এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হবে। নীতিবিশ্লেষক ভবানী দাসের মতে আগামী ৫-১০ বছর পর বাংলাদেশ, ভারত �" আসিয়ানের মধ্যে একটা সেতুতে পরিণত হবে।

আন্তঃরাষ্ট্র যোগাযোগ ব্যবস্থার আসিয়ান অভিজ্ঞতা

পূর্ব-এশীয় রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রচেষ্টা, সাধারণ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সাধারণ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক উন্মুক্তকরনের সুবিধার বিষয়ে আসিয়ান নামক আঞ্চলিক সংঘ গ� নে প্রভাবিত করে। পূর্ব এশীয় অর্থনীতি বার্ষিক গড়ে ৭-৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে বিশ্বে এ হার গড়ে প্রায় ৩ শতাংশ। এভাবে বৃদ্ধি পেলে এসব দেশের অর্থনীতি আগামী ২০-২৫ বছরের মাধ্য জাপানের বর্তমান প্রবৃদ্ধি স্তরে পৌঁছে যাবে। তাছাড়া�", চীনের সাথে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য বাংলাদেশের হয়ে থাকে। এ অবস্থায় দ্রত প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং শিক্ষার সুযোগ ভারতের চেয়ে চীনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে “একচেটিয়া বিক্রেতা” হিসেবে ভারত সার্বিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। আসিয়ানের সাথে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি অনুপাত ৬২·৪ শতাংশ হলে�" ভারতের সাথে তা মাত্র ৩-৪ শতাংশ। সন্দেহাতীতভাবে আসিয়ানের সাথে বাংলাদেশের ট্রানজিট চুক্তি লাভজনক হবে।

তাছাড়া�" বর্তমানে আসিয়ানের সাথে ট্রান্সপোর্ট, সড়ক এবং রেল যোগাযোগ না থাকায় জনগণ কোনো উপায়ন্তর বা সুযোগ না থাকায় ভারতের সাথে বাণিজ্য �" সেবা গ্রহণ করছে। সিপিডি (২০০০) এর গবেষণায় পা�"য়া যায় যে, ভারতে গমনরতদের ২৮ শতাংশ চিকিৎসা সেবা �" পর্যটন উভয় কারনেই ভারতে গিয়েছিল এবং এর মাঝে ভারত সফররত বাংলাদেশী নাগরিকদের ৮৫ শতাংশ বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্ত্বে�" ভারত গমন করেছেন অধিক নিশ্চয়তার জন্য। আসিয়ান ভুক্ত দেশগুলোতে ট্রানজিট সুবিধা ভারতের চেয়ে সাশ্রয়ী এবং দক্ষ পণ্য �" সেবা বাণিজ্য গ্রহণে মানুষকে আগ্রহী করবে এবং ব্যবসায়ী ব্যক্তিবর্গ, স্বাস্থ্য �" শিক্ষা সেবা সন্ধানকারী এবং পর্যটকদের তুলনামূলকভাবে চিন্তার সুযোগ হবে। আসিয়ানের সাথে ট্রানজিট এর ক্ষেত্রে আকস্মিক বিদ্রোহী হামলা, নারী �" শিশু পাচার, হালকা অস্ত্র �" বিস্ফোরক চোরাকারবারী জনিত নিরাপত্তা সমস্যা নেই যেমনটি ভারতের ক্ষেত্রে বিদ্যমান। এছাড়া�" আসিয়ান ভুক্ত দেশসমূহে ট্রানজিট বাংলাদেশী ব্যবসায়ী, ছাত্র, সেবাদাতাদের মায়ানমার/ চীন থেকে শুরু করে ইউরোপ পর্যন্ত ভ্রমন উপভোগ করে এসব দেশের অর্জিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্বন্ধে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান �" তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে।

ভারতের সাথে করিডোর/ট্রানশিপমেন্ট বাস্তবায়নে লাভ-লোকসানের খন্ডচিত্র

নেপাল �" আফগানিস্তানের মতো ভূমি বেষ্টিত দেশ না হ�"য়া সত্ত্বে�" ভারত ১৯৭২ সাল থেকে করিডোর সুবিধা প্রদানের জন্য বাংলাদেশের উপর চাপ দিয়ে সৃষ্টি করে আসছে। তাছাড়া, বাংলাদেশ �" ভারতের মধ্যে বেশ কিছূ বিতর্কিত বিষয় রয়েছে যেমন- টাটা’র বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশের উপর ভারতের চাপ যেখানে ভারত নিজ দেশে ‘ বাংলাদেশী বিনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা’ এখনো বহাল রেখেছে, ৫৪ টি আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধ, ভারতের একপাক্ষিক সিদ্ধান্তে গঙ্গা নদী থেকে পানি প্রত্যাহার, ভারতের বাংলাভাষী মুসলিমদের বাংলাদেশে পুশ-ইন, বিএসএফ কর্তৃক সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায়শই বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা, বাংলাদেশী পণ্যের বিপক্ষে ট্যারিফ �" নন-ট্যারিফ বাধা, স্থল সীমানা নির্ধারণ, অমীমাংসিত ছিটমহল বিষয়, সীমানায় বেড়া দেয়া, ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের অপরাধীদের আশ্রয় প্রদান, তালপট্টি দ্বীপ নিয়ে বিরোধ, নাশকতামূলক উপাদান দ্বারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ / প্রভাববিস্তার, বাংলাদেশে ৫ লক্ষ ভারতীয়ের অবৈধ বসবাস, মংলা বন্দর ব্যবহার করার জন্য নেপালে ট্রানজিটের অনুমতি প্রদান না করা এবং নেপালে যেতে বাংলাবন্ধ রুট ব্যবহারে ভারতের বাধা-নিষেধ। এগুলো বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য প্রধান বিবেচ্য বিষয়। ভারতকে করিডোর অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি নির্ধারণে যদি�" একটি পরিপূণ গবেষনা এখন পর্যন্ত হয়নি, তবু কিছু প্রাথমিক গবেষনা হতে একটি সমালোচনামূলক নিরীক্ষণ নিম্নে দেয়া হলো।

জাতীয় নিরাপত্তার উপর প্রভাব

মুম্বাই আক্রমনের ঘটনায় দুটো বিষয় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, প্রথমত তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোদী যুদ্ধের প্রধান কেন্দ্র দক্ষিণ এশিয়ায় স্থানান্তরিত হচ্ছে এবং যার প্রভাব বাংলাদেশে�" নিশ্চিতভাবে পড়বে - পারমাণবিক চুক্তির ছদ্মাবরণে এক মেরু কেন্দ্রিক বিশ্বে ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র �" ইসরায়েলের মধ্যকার উষ্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে যার প্রাথমিক লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উ� ছে। পাশাপাশি এ ধারনা�" প্রবল হচ্ছে যে, ‘সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি হ্রাস’ এর নামে মুসলিমদের রাজনৈতিক �" সামাজিক ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করার জন্য ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র �" ইসরায়েল একযোগে কাজ করছে। আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্�  দেশ বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত হ�"য়ায় এবং ভারতে সন্ত্রাসের ব্যাপক বিস্তার লাভ করায় বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন রাজনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক সম্পদ �" বন্দর ব্যবস্থাপনায় ভারতের হস্তক্ষেপ এবং নিরাপত্তাহীনতা ভবিষ্যতে বাড়বে। বাংলাদেশ একটি শান্তিময় বিশ্বের প্রতি অঙ্গিকারবদ্ধ এবং অন্যান্য জাতিসমূহের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

ইতোমধ্যে,বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে একই সাথে ভারতকে ট্রানজিট এর নামে করিডোর প্রদান এবং কথিত জংগী দমনে ‘দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স’ গ� নের তোরজোড় দেখে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় উদ্দেশ্য কারো মহৎ নয় এবং বাংলাদেশকে আরেকটি ‘পাকিস্তান’ বানানোর প্রাথমিক আয়োজন সম্পন্ন হতে চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের থেকে ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে কোন প্রকার ‘করিডোর’ বা ‘ট্রানশিপমেন্ট’ সুবিধা দেয়া হয় তাহলে ভারতের আশ্রয়ে ধর্মীয় উগ্রপন্থি, সাম্যবাদী চরমপন্থি �" বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আরো ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্বশাসন আন্দোলন আরো জোরদারের আশংকা রয়েছে। আমাদের এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, জেএমবি ক্যাডাররা ভারত থেকেই বিস্ফোরক দ্রব্যের সরবারাহ পেয়েছিলো এবং সম্প্রতি ভারতে একের পর এক ক্রমাগত বিস্ফোরণে ভারতীয় সেনাবহিনীর একাধিক কর্মকর্তার জড়িত থাকা এবং ইসরাইল সংযোগ বাংলাদেশর জাতীর নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং ভবিষ্যতে ঢাকা-কলকাতা রেল সংযোগ�" বাংলাদেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। করিডোর বা ট্রানশিপমেন্টের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক, বাংলাদেশ বিরোধী কর্মকান্ড বা নাশকতামূলক উপাদান তীব্র আকার ধারণ করবে।

ভারত সবসময়ই তার নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সব ধরনের কর্মপরিকল্পনাসমূহ প্রণয়ন করে থাকে। বিচ্ছন্নতাবাদী আন্দোলন প্রতিহত করতে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৫ লক্ষ সেনা মোতায়েন রেখেছে। এ অবস্থায় ভারতকে এ অঞ্চলে করিডোর সুবিধা প্রদান এবং একই সাথে ’সাউথ এশিয়ান ট্রাস্কফোর্সে�" ব্যানারে বাংলাদেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব �" নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে। এমনকি অন্যান্য শক্তি দ্বারা প্রণোদিত হয়ে ভারত,বাংলাদেশ �" পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আল-কায়েদা বা উলফা সেনা ধ্বংস করতে সেনা তৎপরতা চালানোর স্পর্ধা দেখাতে পারে। পরিবহনকৃত বাণিজ্যপণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা অনেক বেশী ব্যয়বহুল হবে এবং এই সুযোগে পণ্য পরিবহনের আবরণের নিচে ছোট ছোট অস্ত্র বাংলাদেশের ভূ-খন্ডে চোরাচালান হতে পারে। এর ফলে, ভারত বাণিজ্য নিরাপত্তার নামে বাংলাদেশের স্বার্তে�" পক্ষের লোকদের উপর অধিকার চর্চা করতে পারে।

‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত মাদক, নারী �" শিশু পাচারের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পথ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চোরাকারবারীদের নিকট আরো বেশী আকর্ষনীয় হয়ে পড়বে এবং যেহেতু প্রতিদিন প্রায় ২০০০ ভারতীয় ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, ভারতীয় ব্যবসায়ী �" পর্যটক বাংলাদেশে আসছে এবং প্রায় ৫ লক্ষ ভারতীয় বাংলাদেশে অবৈধভাবে বসবাস করছে, আর সেই সাথে বাংলাদেশ এইচআইভি/এইডস সংক্রমনের উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে, ২০১০ সাল নাগাদ ভারতের এইডস রোগীর সংখ্যা ২০ মিলিয়নে পৌঁছে যাবে এবং এইচআইভি/এইডস ইতোমধ্যেই ভারতের একটি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে (General B. Singh, 2 September 2005)।

বাণিজ্য এবং আর্থ-সামাজিক প্রভাব

অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দিক চিন্তা করলে�", ভারতকে যদি বাংলাদেশ ‘করিডোর সুবিধা’ প্রদান করে, তাহলে ৩০ মে·টনের ভারতীয় যানবাহনের জন্য বাংলাদেশকে নতুন সড়ক �" মহাসড়ক নির্মাণ করতে হবে এবং ফলশ্রুতিতে, হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। বাংলাদেশের অবকা� ামোগত উন্নয়নের ৯০ শতাংশ বৈদেশিক অর্থায়নের উপর নির্ভরশীল এবং করিডোর এর জন্য যে অবকা� ামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন হবে তা বৈদেশিক ঋণের উপর নির্ভরশীল হয়ে বাংলাদেশকে আর্থিকভাবে দে�"লিয়া হ�"য়ার উপক্রম হবে। এছাড়া�" আমরা জানি যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের এক-দশমাংশ ডুবে গেলে বাংলাদশের ভূমির পরিমাণ কমে যাবে এবং করিডোর বা ট্রানজিট প্রদানের ফলে অতিরিক্ত আরো ভূমি কমে যেয়ে সীমিত ভূমিতে ১৫-২০ কোটি মানুষকে পূনর্বাসন �" ব্যবস্থাপনা করা অসম্ভব হয়ে যাবে।

‘বাজার অর্থনীতি’র দৃষ্টিকোন থেকে স্বাস্থ্য সেবা, পর্যটন এবং কতিপয় টেকসই �" ক্ষণস্থায়ী দ্রব্য আমদানীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ �" ভারতের সম্পর্ক হচ্ছে ‘দ্বি-পাক্ষিক একচেটিয়া’। গত অর্থ বৎসরে চীনকে পেছনে ফেলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি এখন সর্বোচ্চ এবং ২০০৬-০৭ অর্থ বৎস�"ে প্রায় ২০·৯ বিলিয়ন ডলার আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশ ভারতে মাত্র ২৪২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করে যা বৈধ আমদানির ১২-১৫ শতাংশ। যদি করিডোর অনুমোদিত হয় তাহলে অনানুষ্� ানিক বাণিজ্য বিশাল অনুপাতে বেড়ে যাবে, যা বাংলাদেশ বিরাট অংকের আর্থিক ক্ষতির কারণ। ফলে, বাণিজ্য-ঘাটতির উপর আরো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং বাংলাদেশী পণ্যের উপর আরোপিত ট্যারিফ �" নন-ট্যারিফ বাধা তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে ট্রানশিপমেন্ট কোন বিকল্প পন্থা হ�"য়া উচিত নয় ।

নেপালের বিশিষ্ট গবেষক থাপলিয়াল (১৯৯৯) এর মতে “বহির্বিশ্বে নেপালের রপ্তানির একটা বিরাট অংশ হয় কলকাতা বন্দরের মাধ্যমে যা ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত ভারে জর্জরিত এবং এটি নেপালি পণ্য দক্ষতার সাথে পরিচালনা �" খালাসের দায়িত্ব পালনে অক্ষম”। বাংলাদেশ �" নেপালের মধ্যে দুরত্ব হচ্ছে মাত্র ৬১ কিমি· এবং বাংলাদেশ �" ভুটানের মধ্যে তা ৬৮ কিমি·। বাংলাদেশ সীমান্তে একটি অভিবাসন অফিস খুলেছে, কিন্তু নেপাল �" বাংলাদেশ উভয় দেশের বারবার অনুরোধ সত্ত্বে�" ভারতের পক্ষ থেকে এখনো কোন অভিবাসন অফিস স্থাপন করা হয়নি। ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রবেশের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে বন্দর ব্যবহারকে বাংলাদেশের সাথে দর কষাকষির বিষয় হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

সিপিডির (২০০০) মতে, বাংলাদেশের ৫৭ শতাংশ রোগী চিকিৎসার জন্য ভারতে ভ্রমন ক�"ে, অন্যদিকে ভারতের পক্ষ থেকে এ হার শূন্য। মাত্র ১০-২০ শতাংশ বাংলাদেশী যাত্রী ব্যবসার জন্য বাংলাদেশে ভ্রমন করে এবং খুব কম সংখ্যক বন্ধু-বান্ধব �" আত্মীয়-স্বজনদের দেখতে ভ্রমন করে; ঢাকা-কলকাতা রেল সেবা ভবিষ্যতে একটা ‘বড় অ্যাম্বুলেন্স’ এ পরিণত হবে। সিপিডির রহমান (২০০০) এর গবেষণা অনুযায়ী, রোগী প্রতি গড় খরচ হিসাব করা হয়েছিলো প্রায় ৬০০ ডলার। এছাড়া�", স্থানীয় শিল্পসমূহ বিশেষ করে শাড়ি, পোশাক, অন্যান্য অটেকসই দ্রব্য এবং কৃষি পণ্যের জন্য যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারকগণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
যদি�" কতিপয় ভারতীয় গবেষণা দেখায় যে করিডোর প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ বছরে ৫০০০ কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন করতে পারবে, কিনতু কি টরিমাণ ব্যয় অবকা� ামো রক্ষনাবেক্ষণ �" নিরাপত্ত্‌ প্রদানে ব্যয় হবে তার পুরো লাভ-ক্ষতির কোনো হিসাব বাংলাদেশ বা ভারতে কোনো গবেষনায় পরেস্কার ভাবে ।ু� ে আসেনি এবং আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশের আমলাতাস্ত্রিক প্রশাসন এখন পর্যন্ত এ ব্যাপা�"ে কোনো উদ্যোগ গস্খহণ করেনি। আমত্মে উপরোক্ত স্বল্প পরিসর গবেষনায় লাভ-ক্ষতির যে প্রাথমিক চিত্র ফুটে উ� েছে তাতে কোনো শভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বা দেশ্রপমিক জনগণ ভারতকে করিডোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। বহুপাক্ষিক ট্রানজিট প্রদানের আগে একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা বিবেচনা সাপেক্ষে অতি দ্রুত একটি নিরপেক্ষ সমীক্ষা করা উচিত।

(লেখকঃ আকাশ খান; pri.bdesh@gmail.com)
http://www.sonarbangladesh.com/articles/AkashKhan
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy