|
“অবাক পৃথিবী, অবাক তাকিয়ে রয়”
আকলিমা আক্তার হিনু |
|
প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ‘নোবেল পুরস্কার’ কার ভাগ্যে জোটে তা দেখার জন্য। চিকিৎসা, রসায়ন ও অর্থনীতির মধ্যে সবচেয়ে বেশী আগ্রহ থাকে সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের প্রতি। এ বছর শান্তিতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নোবেল প্রাপ্তী ছিল বোধকরি ২০০৯ সালের সেরা চমক। নরওয়ের নোবেল কমিটি যখন শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা দেন তখন সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকরা বাকরুদ্ধ হয়ে যান, কাকাডাকা ভোরে যখন প্রেসিডেন্টকে ঘুম থেকে জাগিয়ে পুরস্কার প্রাপ্তির কথা জানানো হয় তখনও প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল “অবিশ্বাস্য”। পরে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বারাক ওবামা বলেছেন “আমি স্পষ্ট করে বলছি, এটাকে আমার ব্যক্তিগত কাজের স্বীকৃতি মনে করছিনা। বরং সব দেশের মানুষ যে আকাঙ্খা পোষণ করে এরই সমর্থনে আমেরিকার নেতৃত্বের প্রতি স্বীকৃতি”। তিনি আরও বলেন, “সত্য করে বলতে হয় বিশিষ্ট্য যে ব্যক্তিদের এ পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে আমি তাঁদের কাতারে দাঁড়ানোর যোগ্য নই”। এ পুরস্কার আমার জন্য কাজে নেমে পড়ার ডাক”।
প্রেসিডেন্ট ওবামা যথার্থই বলেছেন, কেননা, ক্ষমতা নেবার পরপরই তিনি চিরাচরিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেন। মুসলিম বিশ্বের সাথে বুশ আমলে যে টানাপোড়েন চলছিল তা থেকে বেরিয়ে এসে মুসলিম বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হন এবং কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে এক যুগান্তকারী ভাষণ দিয়ে মুসলিম বিশ্বের কাছে আস্থাভাজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। তিনি ইসরাঈল ও ফিলিস্তিন বিষয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে একটা কার্যকর আলোচনায় বসার কথা বলেন। পশ্চিম তীরে ইহুদী বসতী স্থাপন বন্ধ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আশা ব্যক্ত করেন। প্রেসিডেন্ট ওবামা কুখ্যাত গুয়ানতানামো কারাগার বন্ধের ঘোষণা দেওয়াসহ বিশ্ব্যব্যাপী সি.আই.এ এর (C.I.A) গোপন নির্যাতন সেল বন্ধের নির্দেশ দেন। ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে তিনি সাহসের পরিচয় দেন। জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবেলায় গ্রিনহাউন নির্গমন কমাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন। পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে চিরশত্রু রাশিয়ার সাথে জোট বেধে পরমাণু অস্ত্র কমিয়ে একটি সুন্দর বাসযোগ্য বিশ্ব গড়ার চুক্তিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ ও বারাম ওবামা আলোচনা শুরু করেছেন। আমেরিকা ও রাশিয়ার মত দুই বৃহৎ পরমাণু শক্তিধর দেশের সদিচ্ছা ছাড়া পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়া সম্ভব নয় তা ওবামা উপলব্ধি করেছেন এবং সেইমত কাজ করে চলেছেন। আন্তর্জাতিক কূটনেতিক তৎপরতা জোরদার এবং বিশ্বের সকল মানুষের প্রতি মানুষের সহযোগিতা বাড়ানো, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করে মানুষের মধ্যে আশাবাদী মনোভাব জাগ্রত করার ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি এ পুরস্কার। নোবেল কমিটি জানায়, ২০০৯ সালে শান্তির সপক্ষে ওবামার বিভিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বিশ্বব্যাপী পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধে তাঁর ভূমিকার কারণে ওবামাকে এ বছরের ‘নোবেল শান্তি’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। নোবেল কমিটির কমিটির চেয়ারম্যান বলেছেন, এ বছর বিশ্বে ওবামা ছাড়া এমন আর একজনকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি যিনি তাঁর কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে আলফ্রেড নোবেলের স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছেন। উল্লেখ্য যে, আলফ্রেড নোবেল তার দলিলে লিখে গেছেন, “যিনি জাতিতে জাতিতে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন, যুদ্ধ বন্ধে বা নিরস্ত্রীকরণে এবং শান্তির প্রচার ও প্রসারে সর্বোচ্চ ভূমিকা রেখেছেন তিনি মনোনীতি হবেন নোবেল পুরস্কারে।
কিন্তু ক্ষমতা নেবার মাত্র নয় মাসের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এ পুরস্কার পাওয়ায় বিশ্বব্যাপী সমালোচনা করা হচ্ছে নোবেল কমিটির। এ বছর যে সমস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১৭২ জনের তালিকা চুড়ান্ত করা হয়েছিল তার মধ্যে বারাক ওবামার নাম ছিল না। এটা সত্য যে সারাজীবন ত্যাগ, তিতিক্ষা, সংগ্রাম করে যারা মানবতার সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন তাদেরকে উপেক্ষা করে যিনি কেবল উদ্যোগ নিচ্ছেন কাজ করার, কাজের ফলাফল সুদূর অতীত তাঁকে পুরস্কার দেওয়ার সমালোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। পশ্চিমাদের প্রভাব নোবেল পুরস্কারে সব সময় ছিল। পশ্চিমা ঘেষা না হলে নোবেল পুরস্কার লাভ করা সম্ভব না এমন দুর্নাম আছে। তারপরও অনেকাংশে এই পুরস্কার যোগ্য ব্যক্তির হাতে শোভা পায় এ কথা সত্যি। যুগের পর যুগ যারা নিরলসভাবে মানব সেবায় অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন ত্যাগ আর তিতিক্ষা করে নিজের জীবন তুচ্ছ করে মানব কল্যাণে নিয়োজিত সেই সব মানুষকে পুরস্কৃত করে নোবেল কমিটি নিজেদের গৌরবান্বিত করেছে।
মাদার তেরেসার কথা বলা যায়। মানবতার সেবায় নিয়েজিত এই মহিয়সী নারী তাঁর সারা জীবন উৎসর্গ করেছেন মানব কল্যাণে। জন্মভূমি আলবেনিয়া ছেড়ে ভারতবর্ষে চলে আসেন মানব কল্যাণে নিয়োজিত হবার জন্য। অশিক্ষিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষকে শিক্ষার আলো দেবার জন্য প্রথমে তিনি শিক্ষা কাজে নিয়োজিত হন। প্রথম যৌবনে দেশ ত্যাগ করা এই দরদী নারী কলকাতায় ‘মিশনারীজ অব চ্যারিটি’ প্রতিষ্ঠা করেন যার শাখা সারা বিশ্বব্যাপী। মাদার তেরেসা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির বাণী পৌঁছে দিতে বিশ্বের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন। যেখানেই বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তিনি সেখানেই ছুটে গিয়েছেন ত্রাণকর্তা হিসেবে। এছাড়া মানুষের মুক্তির জন্য, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করা মনীষী, অং সান সূচী, দালাইলামা, ইয়াসীর আরাফাত, ডেসমন্ড টুটু, নেলসন মেন্ডেলা, মার্কিন লুথার কিং প্রমুখ মানব দরদী যারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে আলোর দ্যুতি জ্বালিয়ে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন সেইসব মানুষকে পুরস্কৃত করে নোবেল কমিটি যেমন এ পুরস্কারকে বিশ্বের দরবারে সবেচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে তেমনি বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ শুরু করার জন্য সমালোচিত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থিউডর রুজভেল্ট, উড্রো উইলসন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার, ইসরাঈলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন ও শিমন পেরেজ এর মত মানুষকে ‘নোবেল শান্তি’ পুরস্কার দিয়ে ‘নোবেল পুরস্কারকে’ প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তেমনি ভারতের অহিংস আন্দোলনের জনক মহাত্মা গান্ধী যিনি নিজের বিলাস জীবন ত্যাগ করে ক্ষুধা দারিদ্র আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন সেই মহান পুরুষকে সাম্রাজ্যবাদীদের প্রভাবের কারণে ১৯৩৭, ৩৮, ৩৯ ,৪৭, ৪৮ সালে মোট পাঁচ পাঁচ বার মনোনীত করেও পুরস্কার না দিয়ে ‘নোবেল পুরস্কারকে’ কলঙ্কিত করেছে।
এক সময় আফ্রিকায় সাদা মানুষেরা জাহাজে করে গিয়ে স্বাধীনভাবে বনে-বাদরে ঘুরে বেড়ানো তরতাজা, বলিষ্ঠ যুবকদের শিকারী জাল দিয়ে পশুর মত শিকার করে জাহাজে ভরে শিকলে বেধে দীর্ঘ পথ অভুক্ত রেখে, অমানুষিক নির্যাতন করে, পশুর মত আচরণ করে আমেরিকায় এনে সেই সব কালো মানুষদের কৃতদাস হিসাবে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে দিত। একটি কুকুর বা বিড়াল বুকে জড়িয়ে ধরে যে মানুষ আদর করছে সেই সমাজেই এইসব কালো কৃতদাসদের আগুনে পুড়িয়ে মারা হতো। কারাবন্ধী করা সহ অমানুষিক নির্যাতন করা হতো। মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকার অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হতো কালো মানুষদের ক্ষেত্রে। কৃতদাসদের জীবনের ভয়াবহ অবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছে অ্যালেক্স হ্যালীর বিখ্যাত ‘Roots’ নামক বইটিতে। যে আমেরিকায় ষাটের দশকেও পাশাপাশি সিটে সাদা আর কালো মানুষ একই বাস বা ট্রেনে চলাচল করতে পারতনা। মানবতা যেখানে নীরবে নিভৃতে কেঁদেছে শত শত বছর ধরে। বিধাতা যেন মুচ্কি হেসেছিলেন এ বছর। সেই আমেরিকাবাসী আফ্রিকার কালো এক সন্তানকে বিশ্ব নেতৃত্বের ভার দুহাত তুলে অর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে বারাক ওবামার সততা, দক্ষ নেতৃত্বের জন্য, বাগ্মিতার জন্য যোগ্যতার জন্য। নির্বাচনে ওবামা তাঁর ক্যারিসম্যাটিক ব্যাক্তিত্বের জোরে লক্ষাধিক লোকের জনসমাবেশ করার প্রমাণ দিয়েছেন। ব্যাক্তি ওবামার সততার. দক্ষতার, আন্তরিকতার প্রতি কারো দ্বিমত নেই। বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ওবামা সামনের দিনগুলোতে কতটুকু অবদান রাখতে পারবেন তা আগামীতে দেখার অপেক্ষায় থাকবে বিশ্ববাসী। প্রেসিডেন্ট ওবামার সফলতাই ‘নোবেল শান্তি’ পুরস্কারকে সার্থকতা দেবে।
|
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AklimaAkterHinu |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
|