শুক্রবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৮ মে ২০১২; রাত ১২:০৬ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

মরিচীকার পথে

আল আমীন

আকরাম হোসেন সকালের পত্রিকা পড়ছিলেন। সামনেই রয়েছে ছোট টি-টেবিল, তাতে তার সদ্য শেষ করা চায়ের কাপ। তিনি কি যেন ভাবছেন আর বার বার পত্রিকার ছবিগুলোর দিকে তাকাচ্ছেন। পত্রিকায় একটি ছেলের ছবি ছাপা হয়েছে। বীভৎস সেই ছবি। তিনি মনে করতে চেষ্টা করছেন এই ছবিটি তার পরিচিত কারোরই হবে। পত্রিকার বাকি ছবিগুলো আরো বীভৎস। সেগুলোর দিকে তাকিয়ে তিনি থাকতে পারছেন না। পারবেনই বা কিভাবে? একজন মানুষকে সবাই মিলে পিটানোর ছবি, একজন মানুষের খুলি বের হয়ে যাওয়া রক্তাক্ত ছবি রয়েছে, সেগুলো কি দেখা যায়! যে মানুষগুলো আক্রমণ করেছে তাদের সবার হাতে নৌকার বৈঠা। বৈঠা থাকবে পানির কাছে, রাজপথে বৈঠা দিয়ে কি করছে? ছবি দেখে বোঝা যাচ্ছে, লগিবৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষগুলোকে সাপের মত হত্যা করা হয়েছে। তিনি সেই ছবিগুলোকে লুকানোর চেষ্টা করে শুধুমাত্র একটি ছবির দিকে মনোযোগ দিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন। সেই ছবিটিতে একটি সুন্দর ছেলের ছবি দেয়া হয়েছে। পত্রিকার ভেতরের খবরগুলো দেখে তার আত্মা ঠান্ডা হয়ে গেল। গতকালের পল্টনে লগিবৈঠার আক্রমনে আক্রান্ত মানুষগুলোর ছবি এইগুলো।

অবশেষে আকরাম হোসেন ছেলেটিকে মনে করতে পারলেন। হ্যা, ছেলেটিকে তিনি চেনেন। তারই কলিগের ছেলে। তার সাথে দেখা হয়েছিল একদিন। অনেক বিনয়ী ছেলেটি। তার মত একটি ফুটফুটে ছেলেকে লগিবৈঠা দিয়ে মেরে ফেলল। না, এদেশের মানুষ এর ভিতর আর মানবতা বলতে কিছুই রইল না।

আকরাম হোসেন তার ছেলেকে ডাকলেন-“রাকিব, রাকিব”। স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চস্বরে তিনি ডাকলেন। সাধারণত তিনি কখনো এত উত্তেজিত হন না। তিনি আবারো ডাকলেন –“রাকিব। রাকি...” তার ডাকের শেষে রাকিব এসে উপস্থিত হল। রাকিব এতক্ষণ পড়াশুনায় ব্যস্ত ছিল তাই তার আসতে একটু দেরি হল। রাকিব ক্লাস এইটে পড়ে। কিশোর বয়সে ছেলেদের যেরকম চেহারা হয় তা থেকে ভিন্ন নয় রাকিব এর চেহারা। আকরাম সাহেব তাকে বললেন-“তুমি আর বাইরে যাবে না?” রাকিব প্রশ্ন করল “কেন বাবা?” “দেশের অবস্থা ভাল না। যেকোন সময় যেকোন কিছু ঘটে যেতে পারে। তোমার কাছে যে ইসলামী বইপুস্তক সেগুলো নিয়ে আসো। আমি এগুলো পুড়িয়ে ফেলব। এইগুলো ঘরে রাখা নিরাপদ নয়। যেভাবে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে....” একটানে এই কথাগুলো বলে আকরাম হোসেন থামলেন। তিনি একটু ইতস্তত করলেন তিনি মানুষ পিটানোর কথাটা ছেলেকে বলতে চাননি। কিন্তু উত্তেজনার বসে বলে ফেলেছেন। রাকিব কিছু বুঝে না উঠতে পেরে বলল-“বাবা, কি হয়েছে?” আকরাম সাহেব একটু দম নিয়ে বললেন- কিছুই হয়নি, তুমি বইগুলো নিয়ে এসো। আকরাম সাহেবের এইরকম মূর্তি রাকিব এর আগে কখনো দেখেনি। তাই সে বইগুলো নিয়ে আসল। বইগুলোর মধ্যে হাদীস আর কুরআনের কিছু বই ছিল। সে বইগুলো আকরাম সাহেবের সামনের টি-টেবিলের সামনে রাখল। আকরাম সাহেব বইগুলো নিয়ে রাকিবকে বললেন- তুমি যাও।

রাকিব কিছুই বুঝতে পারল না, তার বইগুলো এইভাবে কেড়ে নেওয়ার মানে কি? কেনই বা তার বাবা আজ এমন করছেন। আকরাম সাহেব শুধু এইটুকু বললেন, তুমি আর এইগুলো ধরবে না। তিনি বইগুলো নিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন।এরপর থেকে রাকিব ইসলামী বইগুলো তার পাশে আর কখনো পায়নি। তার বাবা তাকে আর কখনো ইসলামী বইগুলো দেয় নি।

দেবার কথাও না, তিনি যে খবর পত্রিকায় দেখেছেন। সব বাবা মার উচিত তার সন্তানকে ইসলামী বইপুস্তক থেকে দূরে রাখা। বলা তো যায় না, কখন কি হয়ে যায়... কোন বাবা-মা ই চায় না তার সন্তান লগিবৈঠার আঘাতে মারা যাক।

চার বছর পর
রাকিব এখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। তার বাবা মা আর ছোট বোনটাকে নিয়ে আগের বাসাটাতেই ওরা থাকে। আজ শবে বরাত।
হাজার রাতের শ্রেষ্ঠ রাত। যেকোন ধর্মপ্রাণ মানুষ এইদিনে ইবাদাত থেকে দূরে থাকে না। সবার মতই আজকে রাকিব পাঞ্জাবী গায়ে মসজিদে যাচ্ছে। অন্যান্য সময় সে মসজিদে না গেলেও আজ ঠিকই জামায়াতের প্রথম কাতারে তার স্থান সে করে নিয়েছে। ইশার নামাজ যথারীতি শেষ হল। পুরো মসজিদে মানুষে গম গম করছে। ইশার নামাযের পর বয়ান। বয়ানেও রাকিব বাদ গেল না। দশটার দিকে সবাই মিলে মসজিদ থেকে বের হয়ে এল। বের হওয়ার সময় রাকিব মুজাহিদ ভাইকে দেখল মসজিদের এক কোনে বসে ইসলামী আলোচনা করতে। রাকিব মুজাহিদ ভাইকে এড়িয়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেল। রাকিব এর সাথে মিশুক, নিপুন, অন্তু এর দেখা। তার কাছাকাছি বয়সের ওরা সবাই। অন্তরংগ বন্ধু বললে কম বলা হবে না ওদের। মিশুক ই বলে বসল, কি করবি, সারা রাত। রাকিব বলে বসল, আমি বাসায় যাব। মিশুকই বলল, বাসায় যাবি মানে। আমরা আজকে আড্ডা দিব। তুইও থাকবি আমাদের সাথে । “না, আমি থাকতে পারব না” রাকিবের উত্তর “আব্বা বকা দিবে”। “আরে আজকে শবে বরাত না, আংকেল কিছু বলবে না। বললে, বলবি মসজিদে ছিলাম।” মিশুক, নিপুন, অন্তু ওদের সম্মতি নিয়ে তারা রওনা দিল অজানার উদ্দেশ্যে।

আকরাম হোসেন যথারীতি নামাজ কালাম পড়ে ঘুমিয়ে গেলেন। আজকে ইবাদাতের রাত হওয়ায় তার ঘুমাতে একটু দেরি হল। তারপরও ভালই ঘুম পেয়েছিল তার চোখে। হঠাৎ তিনটার দিকে একটি দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে উঠে গেলেন। স্বপ্নটিতে তিনি দেখলেন নিজের পোষা সাপ তাকে দংশন করছে। তিনি এত কষ্ট করে যে সাপকে পুষেছেন সেই শাপই তাকে দংশন করছে। তিনি বুঝতে পারলেন না সেই স্বপ্নের মানে কি? তিনি ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস পানি খেয়ে ঘুমিয়ে গেলেন। ফজরের নামাজের সময় তিনি নামাজে গেলেন। মসজিদে গিয়ে রাকিবকে পেলেন না। রাকিব এর মোবাইল এ কল দিলেন। কিন্তু সেটা বন্ধ পাওয়া গেল। রাকিবের খোঁজে তার বন্ধুদের বাসায় খোঁজ নিতে গেলেন। তাদেরকেও তিনি পেলেন না। এক অজানা আশংকায় তিনি মুজাহিদের বাসায় গেলেন। মুজাহিদ সারারাত ইবাদত বন্দেগী করে মাত্র ঘুমিয়ে ছিল। কাকার ডাকাডাকিতে সে ঘুম থেকে উঠে আসল। “বাবা, রাকিবকে দেখেছিলা?” “হ্যা আংকেল কালকের ইশার নামাজের সময় দেখা হয়েছিল। আমার পাশে দাড়িয়েই নামাজ পড়েছে। এরপর আর দেখা হয়নি।” “আচ্ছা ঠিক আছে” বলে আকরাম সাহেব নিজের বাসার দিকে হাটা ধরলেন।

এক অজানা আশংকা নিয়ে আকরাম সাহেব টেলিভিশন খুললেন। নিয়মিত আপডেট দিচ্ছে টেলিভিশন এর নিউজ টিকার। সাভারের আমিন বাজারে ছয় ডাকাত গণ পিটুনিতে নিহত। খবরটা দেখেই কেন যেন বুকটা মুচড় দিয়ে উঠল। এই সময়ই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ছোট মেয়ে নিপা গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। মুজাহিদ বিধ্বস্ত হয়ে তার সামনে এসে উপস্থিত। তার সংগে আরো কয়েকটি ছেলে। “কি হয়েছে বাবা?” আকরাম সাহেব বসা থেকে উঠে দাড়ালেন। “আংকেল আপনি বসুন।” আংকেলের চারপাশে অন্যান্যরা এসে উপস্থিত। আকরাম সাহেব কিছুই বুঝতে পারলেন না। মুজাহিদ বলা শুরু করল “আপনি যাবার পরই আমি একটি ফোন পাই আমিনবাজার এলাকা থেকে। আমাকে বলা হয় থানায় যেতে। থানা আমাদের এলাকার কিছু ছেলেকে ডাকাত সন্দেহে ধরেছে।”আকরাম সাহেবের টেলিভিশনে দেখা নিউজটির কথা মনে পড়ে যায়। তিনি বুঝতে চেষ্টা করছেন তার ছেলেকে ডাকাতি মামলায় হয়ত আটক করা হয়েছে। এত ভদ্র ছেলে ডাকাতি করতে যাবে না সেটা পাগলেও বুঝতে পারবে। মুজাহিদ তার কথা চালিয়ে যেতে থাকে “আমি থানায় যেয়ে রাকিবকে দেখতে পাই। আপনাকে আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে।”

আকরাম হোসেন সানন্দে রাজি হয়ে যান থানায় যাওয়ার জন্য। পুলিশে উনার অনেক পরিচিত লোক আছে। তিনি গেলে পুলিশ তার ছেলেকে ছেড়ে দেবে । এতটুকুন ছেলে আর যাই হোক ডাকাতি করতে পারে না । এটা নিশ্চয়ই ওসি সাহেব বিশ্বাস করবেন। হ্যা হয়ত তাকে কিছু মার দেয়া হতে পারে। তার চ্যানেল ওনেক বড় । তিনি সরকারী দলের আমলা তিনি বললে তার ছেলেকে না ছেড়ে পারবে না।

কিন্তু তিনি বুঝে পাচ্ছেন না- কিভাবে ডাকাত দলের সাথে তার ছেলে যুক্ত হল। ভাবনার উথালপাথাল করতে করতে তাদের গাড়ি গিয়ে উপস্থিত হল সাভার থানায়। ওমা উনি এই সব কি দেখছেন, ছয়টি লাশ থানার সামনে পরে আছে। মিশুক এর বাবা মাও এসেছে । তারা একটি লাশকে জড়িয়ে ধরে কাদছে। তিনি বুঝার চেষ্টা করছেন, কি হতে যাচ্ছে। তার ছেলে লাশ হবে সেটাতো অসম্ভব। সে কোন রাজনীতি করে না। কারো সাথে শত্রুতা করে না। তাকে তো মারার কোন প্রশ্নই আশে না। কিন্তু লাশগুলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে তিনি কি দেখতে পাচ্ছেন। ছেলেটিকে দেখতে তো তার ছেলের মতই মনে হচ্ছে। হ্যা, তার ছেলে রাকিবই তো তার সামনে। লাশ হয়ে পড়ে আছে থানার মেঝেতে। তিনি লাশের সামনে গিয়ে আছড়ে পড়েন। তিনি হাউমাউ করে কান্না শুরু করেন- “আমার ছেলে রাকিব। রাকিব রে...........” আশে পাশের মানুষের ভিতর থেকে মুজাহিদ এসে জড়িয়ে ধরে আকরাম সাহেবকে। “আংকেল আপনি শান্ত হন। সবাইকে একদিন মরতে হবে।”

মুজাহিদ এর কথাগুলো শেষ হতে পারেনা। তার আগেই আকরাম সাহেব বলতে থাকেন “আমার পোষা সাপেই আমাকে কামড়েছে। আমার পাপই আমাকে খেয়েছে। আমি আমার ক্ষতিটা নিজেই করেছি। সেইদিন যদি আমি ওর কাছ থেকে কোরআন হাদীসের বইগুলো কেড়ে না নিতাম, তাকে যদি ইসলাম শিখাতাম, সে এই রকম হতে পারত না। এইভাবে তাকে মরতে হত না। মুজাহিদ আমি তোমাকে নিষেধ করেছিলাম আমার ছেলের সাথে না মেশার জন্য। আমি যে কি ভুল করেছি সেটা এখন আমি দেখতে পারছি। আজ ও যদি তোমাদের সাথে থাকত, সে শহীদি মৃত্যু পেত। আজ তার মৃত্যু হল ডাকাতের মৃত্যু।” আকরাম সাহেব বলতে থাকেন “ মুজাহিদ তোমার দলের ছেলেগুলো যখন নিহত হয়েছিল তখন আমি আমার দলকে সমর্থন করেছি। আমি ভেবেছিলাম আমি আমার দলকে সমর্থন করে আমার ছেলেকে রক্ষা করতে পারব। তাই তোমাদের থেকে আমি ওকে দুরে সরে থাকতে বলতাম। আমি তোমাদের ভাল কাজগুলোকে ভাল চোখে দেখতাম না। আমি তোমাদের ন্যায্য বিচার এর দাবীকে মানতে চাইনি। তোমাদের ভাল ছেলেগুলোর হত্যার বিচার তারা পায়নি আমিও আমার ছেলের বিচার পাবো না। আমি যদি সেই দিন সেই দলকে, দলের লোকদের ঘৃণা করতাম তাদের যদি ক্ষমতায় বসাতে সাহায্য না করতাম তাহলে আমার ছেলে এই পরিণতির সম্মুখীন হত না। আমি নিজেকে অনেক ক্ষমতাধর মনে করেছিলাম, মনে করেছিলাম সরকারী দল, পুলিশের সাথে সম্পর্ক থাকলে কিছু হবে না। কিন্তু আল্লাহ আমার বিচার করেছেন। আমার ছেলেকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গিয়েছেন। আল্লাহ এমনভাবে যেন কোন বাবা মার বুক খালী না হয়। হে আল্লাহ যারা মানুষকে হত্যা করে তাদের বিচার তুমি কর। তাদের তুমি দুনিয়াতেই শাস্তি দাও।”

সেই সময় সেই মোনাজাতের সাথে সাথে আল্লাহর ফেরেশতারা মোনাজাতে শামিল হয়েছিল। ক্ষীণ সময়ের জন্য হলেও সাভার সহ বাংলার আকাশ প্রকম্পিত হয়েছিল আমীন শব্দে।

ইমেল এড্রেস-alaminkista@gmail.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/AlAmin
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy