|
কাব্যের কম্পন
আল মাহমুদ |
|
কতকাল ধরে লিখে চলেছি তা এখন আর স্মরণ করতে পারি না। তাছাড়া আমার স্মরণশক্তিও মনে হয় কমে এসেছে। তবুও কান পেতে শুনি ধ্বনি তরঙ্গ পুলক সঞ্চারী নানা কথা। ভেতরটা ঠিক না থাকলে লেখাটা শেষ পর্যন্ত আমার ইচ্ছেমত চলে না। লিখি হয়তো ভেতরের তাগিদে। কিন্তু সব লেখারই কিছু না কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে। অবশ্য লিখতে পারলে মন হালকা হয় এবং মনে হয় এই তো আমি এখনও লিখতে পারছি। তবে লেখাটা এখনও অল্পবিস্তর বাইরে বেরুবার সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে। একদা আমার অভ্যাস ছিল মুহূর্তে একটু বেরিয়ে গিয়ে পরিবেশটা দেখে এসে লেখা নিয়ে বসে পড়া। এখন আর বাইরে যাওয়ার আমার তো কোনো উপায়ই নেই। শুধু ঘরে বসে চিন্তাভাবনা করে লেখার মতো কিছু মনে সঞ্চিত হলে তা লিখে ফেলা। আজকাল আর কি লিখব—এটা আগে থেকে ভেবে রাখি না। বরং লিখতে বসলেই নানারকম মনের জানালা খটখট করে খুলে যায়। হাওয়া আসে। পরিতৃপ্তির হাওয়া। কে যেন আমাকে খুব মৃদু শব্দে সম্বোধন করে বলে—হে কবি, হে উদাসীন, মানুষের জন্য স্বপ্ন রচনা করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। কিন্তু কবি ছাড়া এ কাজটি কেউ ঠিকমত করতে পারে না, সাহসও পায় না। অথচ মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত স্বপ্ন। মানুষের জীবনটাই হলো আধা-স্বপ্ন, আধা-বাস্তবতা। এর ওপর পা ফেলে হেঁটে যাওয়া খুবই কষ্টের কাজ। তবুও কেউ কেউ এ পথেই চলতে চেয়েছেন এবং চলতে গিয়ে নানা খানাখন্দে পড়ে আহতও হয়েছেন। তবুও তারা চলাতে বিরাম দেননি। তারা বলেছেন আমরা চলতে চলতে বলতে বলতে যাচ্ছি।
লেখকের ভাগ্যের কথা লেখক ঠিকমত বুঝতে পারে না। সে কেবল উপমায় শব্দে গন্ধে একটি নিজস্ব ঢংয়ে কিছু করতে যায়। বারবার এলোমেলো করে ফেলে। আবার নিজেই সব গুছিয়ে শব্দ নিয়ে খেলতে থাকে। মাঝে মাঝে তার মধ্যে চৈতন্যের উদয় হলে সে নিজেকে উদ্দেশ্য করে বলে এই জগতে একটিমাত্র খেলা আছে। সেটা হলো কাব্যের খেলা। ওই খেলায় মিল, ছন্দ, অন্তর্মিল ইত্যাদি।
আর আজ পর্যন্ত কেউ কাব্যের রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি। আবার একটি কথা আছে, যারা কাব্যের সাধনায় একবার আত্মনিয়োগ করে তারা কেউ কোনো অবস্থাতেই একেবারে খালি হাতে ফিরে না। কিছু না কিছু তাদের করতলে জমা হয়ে যায়। হয়তো এমন কিছু তারা আয়ত্ত করেন, যা ভাঙিয়ে তারা ভবিষ্যতে একটি পথ তৈরি করতে সক্ষম হন। কবিতার খেলায়, প্রকৃতপক্ষে কোনো জয়-পরাজয় নেই। কেবল স্বপ্নের কুহক কবিকে এক রহস্য থেকে আরেক রহস্যের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এই জগতেও মানুষের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা আছে। সবাই জিততে চায়। অথচ হারারও তো মানুষ থাকতে হবে। যে হারে সেও ওই মাঠেই দাঁড়িয়ে থাকে এবং যারা হেরে যায় তাদের সান্ত্বনার ভাষা শোনায়। বলে হারার মধ্যেও এক ধরনের আনন্দ আছে। যারা হেরে যায় তারাই কেবল সেই আনন্দের উপলব্ধি করতে পারে। মানুষের সৃজনরহস্যের প্রকৃতপক্ষে কোনো কূলকিনারা নেই। শত দুঃখে দারিদ্র্যে কষ্টের মধ্যেও হঠাত্ সে একটি এমন সুগন্ধময় বাক্য সৃষ্টি করে, যাতে প্রকৃতি এবং পরিবেশ শিহরণে কম্পিত হতে থাকে। সেই কাব্যের সুরভিতে চারদিক মো মো করতে থাকে। মানুষের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী কাজ হলো কিছু না করা। মানুষ যখন কিছু না করে চোখ মেলে দাঁড়িয়ে থাকে এবং মনে হতে থাকে সে কিছুই দেখছে না এবং এক অপরিসীম আনন্দের মধ্যে সে নিমগ্ন হয়ে থাকে—তখনই তার ভেতরে কিছু ভাবনা কাজ করে। কিন্তু ভাষা পায় না বলে সেই ভাবনাগুলো ভেতরেই থেকে যায়। |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AlMahmud |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| আল মাহমুদ হচ্ছেন বাংলা ভাষার সেরা কবি। |
|