|
জ্বালানী সঙ্কটে দিশেহারা দেশের মানুষ
আল মামুন |
|
গ্রীষ্মের শুরুতেই লোড শেডিংয়ের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে দেশের মানুষ। মার্চের শেষে বিদ্যুতের দাম আবার বেড়েছে। পাইকারি গ্রাহক পর্যায়ে এ নিয়ে গত তিন বছরে পাঁচবার দাম বাড়ানো হলো। ইতিমধ্যে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এর প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ীদের হচ্ছে ক্ষতি, পরীক্ষার সময় ছাত্র-ছাত্রীদের প্রস্তুতিতে হচ্ছে ব্যাঘাত, হাসপাতালে চলছেনা অপারেশন থিয়েটার। লোডশেডিংয়ের তীব্রতায় বেকায়দায় পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী গার্মেন্টস ও চিংড়ি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। বিদ্যুতের সীমাহীন সংকটের কারণে শিল্পখাতে নেমে আসছে স্থবিরতা। বিদ্যুতের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে জিনিসপত্রের দাম ও সব ধরণের শিল্প উৎপাদনের ব্যয়ও যাবে বেড়ে, যা মূল্যস্ফীতিকে চাপে রাখবে এবং দেশের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিদ্যুৎ চাহিদা ইতিমধ্যে ৭৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। সরকারের দাবী অনুযায়ী গত তিন বছরে ৩৩০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করার পরও কার্যকর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমান হচ্ছে মাত্র ৫০০০ মেগাওয়াট। ফলে ২৫০০ মেগাওয়াটের মত ঘাটতি রয়েই যাচ্ছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, বর্তমান বিদ্যুৎ অবকাঠামো ৮০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। কিন্তু গ্যাস, পানি ও জ্বালানী সঙ্কটের জন্য বিদ্যুৎ প্লান্টগুলো নিরবচ্ছিন্ন চলতে না পারায়, উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমান ৫০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারছেনা। সময় সময় সরকারের মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের মুখে ২০১২ সালের মধ্যে জনগণকে লোডশেডিং মুক্ত বাংলাদেশ উপহার দেয়ার বিভিন্ন শ্লোগান শোনা গেলেও, বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছেনা। সরকার ২০১৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৯০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তবে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানী কোত্থেকে আসবে এবং এজন্য পর্যাপ্ত তহবিল আছে কিনা সে নিয়ে সরকার এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
গ্যাস সেক্টরেও চলছে হাহাকার। গ্যাসের উপর ভাসছে দেশ, এর মজুদ অফুরান। এ ধরণের অনুমানের উপর নির্ভর করে গ্যাসের যথেচ্ছা ব্যবহার করা হয়েছে এবং সুদুরপ্রসারী পরিনামের কথা না ভেবে দেশব্যাপী গ্যাসলাইন সম্প্রসারণের প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ফলে গ্যাসের আবিষ্কৃত মজুদ এখন শেষ হবার পথে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমান হল ২০.৬১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। আর এখন অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৯.৮৭ টিসিএফ! গ্যাসের অভাবে মিল-কারখানা এমনকি বাসাবাড়িতেও সংযোগ দেয়া যাচ্ছেনা। সরকার বিগত তিন বছরে উৎপাদন ক্ষমতা ৬৫ কোটি ঘনফুট বাড়ালেও গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় অতিরিক্ত গ্যাস তোলা সম্ভব হচ্ছেনা।
সম্প্রতি ১০টি অনুসন্ধান ও উন্নয়ন গ্যাসকূপ খনন এবং দু’টি কম্প্রেসর ষ্টেশন স্থাপনের জন্য পেট্রোবাংলা, রাশিয়ান গ্যাস উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রমের সাথে চুক্তির কাজ শেষ করেছে। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সরবরাহ বৃদ্ধি করার বিশেষ বিলের আওতায় বিনা টেন্ডারে গ্যাজপ্রমকে কাজ দেয়ায় দেশে বিদেশে সমালোচনা হচ্ছে। উপরন্তু ২০১১ সালের ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ও রেভেনিউ ওয়াচ ইনস্টিটিউটের যৌথ জরিপে বিশ্বের সবচেয়ে অস্বচ্ছ কোম্পানী হিসেবে গ্যাজপ্রমের নাম উঠে আসাতে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও সম্ভাব্য দুর্নীতি নিয়ে এখন কথা হচ্ছে।
এদিকে কয়লা উত্তোলনের কাজেও তেমন বিশেষ অগ্রগতি দেখা যাচ্ছেনা। নির্বাচিত সাংসদবর্গ ও জ্বালানী বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সুপারিশ সত্ত্বেও সরকার কয়লা উত্তোলনের ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেনা। বিদেশ থেকে কয়লা আমদানী করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে সরকার। আমদানীকৃত কয়লা দেশের খনিতে মওজুদ কয়লার চেয়ে অনেক বেশী ব্যয়বহুল জেনেও সরকার কয়লা উত্তোলনে কেন যে গড়িমসি করছেন তা বোধগম্য নয়। কয়লা সম্পদ আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করে রাখার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বর্তমান প্রজন্মকে লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে রেখে আগামী প্রজন্মকে আলোকিত করার কথা ভাবা অযৌক্তিক।
ভারতে থেকে চড়ামূল্যে ৫০০-১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানীর কথা সরকার বিবেচনা করছে। ফুলবাড়ি এবং বড়পুকুরিয়ার কয়লা ব্যবহার করে খুব সহজেই ২০০০ মেগাওয়াটের পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করা সম্ভব। অথচ তা না করে, সুন্দরবনের মত সংরক্ষিত জায়গার কাছাকাছি, ভারত থেকে কয়লা আমদানী করে পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য ভারতের এনটিপিসি ও পিডিবির মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। নিজ দেশের কয়লা ভিত্তিক প্ল্যান্টগুলোতে কয়লা সরবরাহ করতে ভারত এখন রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের প্ল্যান্টগুলোর জন্য ভারত কয়লা সরবরাহ করবে কিভাবে?
ইদানিং কুইক রেন্টাল, তরল জ্বালানী নির্ভর ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। এজন্য পিডিবিকে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, জ্বালানী খাতে সমন্বয়হীনতা, দুর্বল অবকাঠামো, প্রশাসনে দূর্নীতি ইত্যাদির কারণেই আজকেই এই পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়েছে। তবে অতীতে কি হয়েছে তা নিয়ে আর কালক্ষেপণ না করে জ্বালানী সমস্যাকে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হলে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ সঙ্কটে জর্জরিত জনগণের ধ্যৈর্যের বাধ যাচ্ছে ভেঙ্গে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবীতে সাধারণ মানুষ এমনকি নারীরাও রাস্তায় নেমে আসছে, মানববন্ধনে অংশ নিচ্ছে। দেয়ালের লিখন পড়তে সরকার ব্যর্থ হলে, আগামী নির্বাচনে ভোটের বাক্সে লোডশেডিংয়ের কালো অন্ধকার নেমে আসতে পারে।
|
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AlMamun |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
আশির দশকের কিংবদন্তী গান 'তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে' এর গীতিকার আব্দুল্লাহ আল মামুন। চট্টগ্রাম কলেজের সেই তারুণ্যের দিনগুলিতে প্রখ্যাত ব্যান্ড সোল্সের জন্য বেশ কিছু সুপারহিট গান রচনার পাশাপাশি তুখোড় কিছু কবিতাও লিখেছেন তিনি। বাড়ী সাগরপারের দেশ কক্সবাজার। চাঁটগা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও তৎকালীন চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে প্রকৌশলী ডিগ্রী অর্জন করে পূরকৌশল বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার হাতছানি, আল মামুনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে টেনে নিয়ে যায় স্বদেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রবাসে। গত দুই দশক ধরে অষ্ট্রেলিয়ার সিডনীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন আল মামুন। প্রকৌশলী হলেও সিডনীতে তাঁর পরিচিতি হল মূলতঃ একজন অসাধারণ সঙ্গীত শিল্পী, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও শুদ্ধ ধারার সাংস্কৃতিক আয়োজক হিসেবে।
সিডনীর বাংলা কম্যুনিটি রেডিওর পথিকৃত আল মামুন একজন দক্ষ রেডিও সাংবাদিক ও উপস্থাপক। ১৯৯৪ সাল থেকে প্রায় দেড় দশকেরও বেশী সময় ধরে তিনি অষ্ট্রেলিয়ার বহুজাতিক রেডিও সংস্থা এস বি এস এর বাংলা অনুষ্ঠানের সহযোগী উপস্থাপক হিসাবে কাজ করেছেন। ّইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তার একমাত্র কাব্যগ্র্রন্থ 'খুঁজে পেয়েছি প্রিয়তমা'। ২০০৮ সালের জুনে সিডনী ছেড়ে কাতারের দোহায় এসেছেন আল মামুন কনসালট্যান্টের চাকুরী নিয়ে। |
|