শুক্রবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৮ মে ২০১২; রাত ১২:১৪ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

সময়ের প্রত্যাশা (বর্তমান সময়ের গতি প্রকৃতি নিয়ে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষণ)

আলী আহমাদ

মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক সময়ে গণঅভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটছে। তিউনিশিয়া আর মিশরে সরকারের পতন ঘটে গেছে। ইয়েমেন, লিবিয়া আর সিরিয়ায় সংঘাত চলছে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আর এই অঞ্চলের মানুষের এই বিস্ফোরণকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নানা ভাবে পর্যালোচনা করছেন। এই পরিস্থিতির উপরে অতি সম্প্রতি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সেই দেশের ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম শীর্ষনেতা আহমেত দাভোতোগলু আল জাজিরা নিউজ চ্যানেলের ৬ষ্ঠ ফোরামে একটি বক্তব্য প্রদান করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতির সাথে এই বক্তব্যটি ভীষণ রকম প্রাসংগিক হওয়ায় পাঠকের জন্য তা উপস্থাপন করা হলো।

আমরা প্রায়ই বলি, সময় আসলে জবাব দিবো, বা সময়ে টের পাবে কিংবা এমনও বলি যে, সময়ই সব সমস্যার সমাধান করে দেবে।

আসলে কি সময় এখনো আসেনি। না, আমি বরং বলবো, যে সময় চলে এসেছে, বরং বুঝতে কিছুটা দেরী হয়ে গেছে আমাদের। আমি এখানে সময় বা ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

আমাদের ভাবনার ধরণ বা প্রক্রিয়া নিয়ে শুরুতে আলোচনা করা যাক। একই সংগে বিভিন্ন ইস্যুতে আমাদের সম্ভাব্য কৌশল নিয়েও ভাবা যাক। চারপাশে বিভিন্ন জিনিসের প্রতিনিয়ত যে রূপান্তর বা পরিবর্তন ঘটছে, প্রথমত তাতে আমাদের প্রতিক্রিয়া কি হচ্ছে?

তারপর আমরা ভাববো আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, যা কিনা আমাদের নিয়তি। আমাদেরকে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মাঝে একটি যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে। তা করতে হলে সুনির্দিষ্ট কিছু কৌশল প্রণয়ন করতে হবে আমাদের। এই কৌশলের প্রথম কথা হলো, আমাদের চারপাশে যা কিছু ঘটছে, তাকে ইতিহাস বা সময়ের সাধারণ পরিক্রমা বা ধারাবাহিকতা হিসেবেই মেনে নিতে হবে। যদিও ঘটনাগুলো স্বতস্ফুর্তভাবেই ঘটছে, তথাপি এগুলোকে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বা সময়ের পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করাই মঙ্গলজনক।

কেন আমরা ইতিহাসের ধারাবাহিকতার মধ্যে দিয়ে যাই? কারন পরিবর্তন সব সময়ই খুব আকাংখিত ও অপরিহার্যতম একটি বিষয়। আসলে আমরা যে দেখছি, বা যা নিয়ে এখানে লিখছি, তা মূলত গত শতকেরই নানা ঘটনার এক ধরনের মূল্যায়ন বা খতিয়ান বা আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে অনিবার্য কোন পরিনতি।

আমাদের এই অঞ্চলে গত শতকে দুটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। একটি হলো ঔপনিবেশিকতার আবির্ভাব আর আরেকটি হলো স্নায়ু যুদ্ধ। এই দুটি বিষয়ই এ অঞ্চলের জাতিরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরী করেছে। ঔপনিবেশিকতার কারনে ১৯৩০, ৪০, ৫০ দশকে আমাদের এই অঞ্চল ঔপনিবেশিক কলোনীতে রূপান্তরিত হয়েছিল এবং এখানকার উপজাতি আর অন্যন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে মোটা দাগের বিভাজন তৈরী হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সিরিয়া ছিল ফরাসী ঔপনিবেশিকতার অধীনে, আর ইরাক বৃটিশের। ফলশ্রুতিতে, এই দুই দেশ বিশেষ করে বাগদাদ আর দামেস্কের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে যে সৌহার্দের বন্ধন ছিল, তা এই ঔপনিবেশিক যুগের কারণে সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে যায়, এবং এই দুই অঞ্চলের মধ্যকার অর্থনৈতিক কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।

অপরদিকে স্নায়ু যুদ্ধের কারণে অনেক গুলো দেশ বিভক্ত হয়ে যায়। যেমন দক্ষিণ ইয়েমেন আর উত্তর ইয়েমেন। আবার যে দেশ গুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একসাথে ছিল, তারাও ভাঙ্গনের মুখে পড়ে যায়। এমনকি তাদের মধ্যে বৈরীতাও তৈরী হয়। যেমন তুরস্ক আর সিরিয়ার মধ্যে যে সীমানা, তা দুটি দেশের সীমানা রেখার মত নয়, বরং একই ঘরের মধ্যে একটি বিভাজন রেখার মত। তারপরও সীমানার এই বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতেই হবে, কারণ এটাই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। ইউরোপের কিছু বুদ্ধিজীবি, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ব্যক্তিও প্রায়শই মনে করেন, আরব অঞ্চলের দেশগুলোতে আসলে গণতান্ত্রিক চর্চার কোন প্রয়োজন নেই, কারণ এই এলাকার মানুষ গণতান্ত্রিক চেতনা সমন্ধে যথেষ্ট অবগত নয়। তাদের জন্য বর্তমানে প্রচলিত রাজতন্ত্র বা কর্তৃত্বসূলভ শাসনব্যবস্থাই অধিকতর শ্রেয়। এমনকি ইসলামী জংগীবাদ বা চরমপন্থা নিবারণেও কর্তৃত্বসূলভ শাসনব্যবস্থা বা রাজতন্ত্র অধিকতর কার্যকর এমন দাবী করে এই দেশগুলোতে রাজতন্ত্রকে পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছে অনেকেই। আবার যেসব দেশে নামকাওয়াস্তে গণতন্ত্র আছে, তারাও বলছে, গণতন্ত্রের কিছু ঝুঁকি আছে এবং এই ব্যবস্থা অনেক দেশকেই নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

আমি জোর গলায় বলতে চাই, এই সব অভিযোগই অমূলক, ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, একজন সাধারণ তুর্কী, কিংবা আরব, কিংবা তিউনিশ নাগরিকই ইতিহাসকে পাল্টে দিতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা অন্য অনেক কিছুর তুলনায় ভাল। আরবীয়রা বরং অন্য অনেক জাতির তুলনায় অনেক বেশী কদর করতে জানে গণতন্ত্রকে। সাম্প্রতিককালে, আরব দেশগুলোতে যা ঘটছে, তা আসলে এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের আকাংখা ও চাহিদারই বহি:প্রকাশ। আর সবাইকেই এই গণজাগরণকে ইতিহাসের স্বাভাবিক ধারাবহিকতা হিসেবেই দেখতে হবে এবং এই আন্দোলনকেও তাই সর্বাত্মকভাবে সম্মান করতে হবে।

যদি আমরা সত্যিকার অর্থেই মানুষের এই আকাংখা আর তার বহি:প্রকাশকে সম্মান জানাতে চাই, তাহলে এই পরিবর্তনের হাওয়ার সাথে আমাদের সমাজ, সম্প্রদায়, বা নৃ-তাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর একটি যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে। কেননা যারা এই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনের ধারাকে অনুধাবন করতে পারবে, তারাই নতুন ইতিহাস গড়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারবে।

বর্তমানে যা দেখছি আমরা তা যদি অতীত হয়, তাহলে এর ভবিষ্যত কি? বর্তমান তো কিছুই নয়, সময়ের যাত্রার একটি ধাপ বা পর্যায় মাত্র। আর ভবিষ্যত হলো আমাদের নিয়তি। প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের একটি সাধারণ গন্তব্য বা চিন্তাধারা রয়েছে। এই গন্তব্যটা কতটা সাধারণ বা কমন হয়ে উঠতে পারলো, বা একটি এলাকার মানুষের যে আকাংখা বা স্বপ্ন, তার সাথে আমার ভাবনা বা স্বপ্নের সামঞ্জস্য রয়েছে, তার উপরই ভবিষ্যতের স্বার্থকতা বা আমাদের সফলতা নির্ভর করে। বড় বা তাৎপর্যপূর্ণ কোন ঘটনা যখন ঘটে, তখন যারা গতিশীল মানুষ তারা সেই ঘটনার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনাকে যাচাই করে নিতে পারে। যেমন: তুরস্কের মানুষের ভাবনা আমরা বুঝতে পেরেছি, বা সেই ভাবনাকে নতুনভাবে গড়ার একটা সুযোগ আমরা পেয়েছিলাম, যখন প্রধানমন্ত্রী এরদোগান গাজায় ইসরাইলী আক্রমনের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং ত্রাণবাহী জাহাজে ইসরাইলী সৈন্যদের নির্মম আক্রমনের বিরুদ্ধে আমরা অবস্থান নিয়েছিলাম। যেহেতু বর্তমান সময়টি তথ্য প্রযুক্তির যুগ, তাই এই ভাবনা গুলো তৈরীতে মোবাইল বা তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানীগুলো বিরাট ভূমিকা রাখে। এই কোম্পানীগুলোর গতিবিধি ও কার্যক্রমের মধ্য দিয়েও আপনি সহজেই এই সময়ের মানুষের চিন্তার অবস্থান ও স্বরূপ সমন্ধে ধারণা করে নিতে পারবেন।

আমরা বর্তমান সময় এবং সংকটকে যদি রাজনৈতিক সুনামি বলে অভিহিত করি, তাহলে এর প্রতিকার হিসেবে আমাদের সেই ব্যবস্থাই নেয়া উচিত যা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা নিয়ে থাকি। দুর্যোগ মুকাবেলায় প্রথমে যা করতে হয়, তা হলো, জরুরী পরিস্থিতিতে নেয়া পদক্ষেপ। প্রথমত মানুষের জীবন বাঁচানো এবং এই দুর্যোগ প্রতিরোধ, দ্বিতীয়ত মানুষের জীবনকে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসা, তৃতীয়ত সংস্কার ও এই অঞ্চলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সংস্কার করা, যেভাবে ভুমিকম্পের পর একটি শহরে নুতন করে দালান কোঠা তৈরী করা হয়।

একটি শহর নতুন করে গড়া বা সংস্কার করতে চাইলে প্রথমত আপনার কাছে আপনার স্বপ্নের শহরের একটি নকশা বা প্ল্যান থাকা দরকার। আপনার কিছু ভিশন থাকা দরকার, সেইসাথে নতুন শহর গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাসও থাকা জরুরী আপনার মাঝে।

এ ক্ষেত্রে যেই কৌশলগুলো আপনাকে অবলম্বন করতে হবে, তার প্রথমটাই হলো আত্ম বিশ্বাস। গোটা আরব জুড়ে আজ যে বিক্ষোভ চলছে, তার পেছনে মূল যে দাবী গণমানুষের, তাহলো নিজেদের সম্মান ও আত্ম মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবী। আমি সম্প্রতি ইউরোপীয় কিছু মন্ত্রীর সাথে হাঙ্গেরীতে একটা বৈঠক করলাম। সেখানে আমি তাদের বলেছি, আজ তিউনিশিয়া বা মিশরে যুবকেরা যে বিক্ষোভ করছে, তা কিন্তু তারা টাকা পয়সা বা আরাম আয়েশের জন্য করছেনা, তারা এটি করছে শুধুমাত্র নিজেদের সম্মান ও আত্ম মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য।

দিনের পর দিন আমরা অপমান সয়েছি। কারণে অকারণে অপমান সইতে হয়েছে আমাদের। এখন আমরা সম্মান চাই, আত্ম মর্যাদা চাই। এই দাবীতে আরবরা নতুন ইতিহাস গড়তে চাইছে, একে সম্মান করতে হবে আমাদের।

১০ দিন পূর্বে আমি প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ গুলের সাথে মিশরে গিয়েছিলাম। সেখানে আমরা অনেক প্রখ্যাত নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করেছিলাম, অন্তবর্তীকালীন সরকারের কর্তাব্যক্তিদের সাথেও বসেছিলাম। কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে বৈঠকটি আমরা করেছিলাম, তা হয়েছিল যুবকদের সাথে। আমি তাদের অনেকের নাম এখনও মনে করতে পারি, যেমন সেখানে ছিল মোস্তফা নাগার, আব্দুর রহমান সামির, ডালিয়া হোসেন, সালাবি প্রমুখ।

তাদের সাথে কথা বলার পর আমি এই অঞ্চলের ভবিষ্যত বা সম্ভাব্য গতিবিধি সম্বন্ধে আরো অনেক বেশী নিশ্চিত ও আত্মবিশ্বাসী হয়েছি। এই যুবকেরা জানে তারা কি চায় এবং তারাই আগামী দিনে মিশরের ভাগ্য বা ভবিষ্যত তৈরী করবে। তারা চায় সম্মান, আর তাদের এই চাওয়াটাকে আমি সালাম জানাই। তারাই আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম আর সেই ভবিষ্যত যদি সুন্দর ভাবে গড়তে চাই, তাহলে তাদের কথা শুনতে হবে আমাদের। আমরা নিরীহ, নিষ্ক্রীয় যুব প্রজন্ম চাই না, বরং চাই সক্রিয় যুবক সম্প্রদায়। আমরা সেই যুবক চাই, যারা সমালোচনাও করতে পারে। তারা যখন আমাদের সমালোচনা করবে, তা শুনতে হবে আমাদের, কেননা তারাই তো ভবিষ্যত গড়বে আমাদের। এর আগে ১৯৬৮ ও ১৯৮০ সালে ইউরোপে যেমন বিক্ষোভ হয়েছিল, এবার আরবেও তাই হচ্ছে। ইউরোপের সেই বিপ্লবকে যদি আমরা সম্মান করি, এবারের আরবীয় বিপ্লবকেও তাহলে আমাদের সম্মান জানাতে হবে।

দ্বিতীয়ত আমাদের কিছু রাজনৈতিক নীতিমালা তৈরী করা প্রয়োজন। পরিবর্তন বা রূপান্তর যাই বলি না কেন, তা আসলে সামাজিক প্রয়োজন বা চাহিদারই একটা অংশ। আমি শেষবার যখন তিউনিশিয়া গিয়েছিলাম, তখন সেখানকার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠককালে আমি তাদের বলেছিলাম, যে আপনারা ইবনে খালদুনের পরবর্তী প্রজন্ম। তাই সুদক্ষ ও কর্মতৎপর জনপ্রশাসন পাওয়া আপনাদের অধিকার। ইবনে খালদুনের পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে আপনাদের বুঝতে হবে যে পরিবর্তন আমাদের চাওয়া না চাওয়ার উপর নির্ভর করে না, বরং এটা সমাজের স্বাভাবিক গতি প্রকৃতিরই একটি অংশ। যদি সময় বা ইতিহাসের কোন স্বাভাবিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আপনি অবস্থান গ্রহণ করেন, আপনার পরাজয় তাহলে অনিবার্য। যত বড় জাদরেল বা ক্যারিশমাটিক নেতাই আপনি হন না কেন, সময়ের পরিবর্তনকে আপনি থামাতে পারবেন না। কারও এটিও মনে করা উচিত নয় যে, একটি নেতৃত্ব, বা একটি সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল কিংবা একটি দলের শাসনই সে দল বা এলাকার স্থিতিশীলতার একমাত্র গ্যারান্টি। বরং একটি দেশের স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি সেই দেশের মানুষ।

প্রেসিডেন্ট গুলও সেই বৈঠকে তার ভাষণে বলেন, কোন নেতারই মনে করা ঠিক নয় যে, তিনি সব সময় তার দেশ বা দলকে নেতৃত্ব দেবেন। আমরা অবশ্যই আমাদের জনগণের উপর আস্থা রাখবো। কেউ যদি মনে করেন, তার দলের বা দেশের স্থিতি তার উপরই নির্ভর করে, তাহলে বুঝে নিতে হবে যে, তিনি তার কর্মীবাহিনীর উপর পরিপূর্ণ আস্থা রাখতে পারছেন না। এমনকি তিনি সাধারণ মানুষের লালিত স্বপ্নকেও ধারণ করতে পারছেন না।

একারণে যখনই কোথাও পরিবর্তনের হাওয়া লাগবে, বা মানুষ পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকবে, স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে তা বুঝতে হবে এবং সেই হাওয়ার সাথেই তাল মিলাতে হবে। সেই পরিবর্তন বুঝে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট গুল, আর ব্রাজিলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে এক মহিলা আসলেন দীর্ঘদিন পর। যদি আমরা সময়কে নেতৃত্ব দিতে চাই, তাহলে পরির্বতনের জোয়ারের বিরুদ্ধে না দাড়িয়ে, বরং পরির্বতনের কারণগুলোকে উপলব্ধি করতে হবে আমাদের।

এবারে আসুন, ভাবি যে, পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটা কেমন হবে? খুব অস্থির বা আবোল তাবোল পরিবর্তন কারও কাম্য হওয়া উচিত নয়। বছরের পর বছর, গৃহযুদ্ধ, উত্তেজনা, বহিঃশত্রুর আগ্রাসন বা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেকার দূরত্ব দেখতে দেখতে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এখন বিরক্ত। আমাদেরকে মানুষের এই অনুভুতিটাকে ধারণ করে এমন এক কৌশল প্রণয়ন করতে হবে, যাতে এই সমস্যার একটি সুন্দর সমাধান হয় এবং পরিবর্তনটাও কাংখিত উপায়ে হয়।

আরেকটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা কৌশলও খুব জরুরী আমাদের জন্য। আমাদেরকে নিরাপত্তা আর স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে সব সময়। আমাদের সরকার (তুরস্ক সরকার) ২০০২ সালে যখন প্রথমবারের মত ক্ষমতায় আসে, প্রধানমন্ত্রী এরদোগান তখন একটি ভাষণ দিয়েছিলেন আর পরবর্তীতে সেই ভাষণটি আমাদের সরকারের মূল নীতি বা রাজনৈতিক দর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঐ ভাষণে এরদোগান বলেছিলেন, আমাদের সরকারের মূল লক্ষ্য জনগণের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। সৃষ্টির শুরু থেকেই, মানুষ মূলত নিরাপত্তা আর স্বাধীনতা- এই দুটি জিনিসের জন্য লালায়িত ছিল। রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তিও ছিল এই বিষয়দুটি। আমরা যদি স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গিয়ে নিরাপত্তার ব্যপারটিতে ছাড় দেই, তাহলে সমাজে অস্থিরতা তৈরী হবে। আর যদি আমরা নিরাপত্তার খাতিরে স্বাধীনতাকে বিসর্জন দেই, তাহলে আমাদের ঘাড়ে স্বৈরতন্ত্র চেপে বসবে, যেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা বা ব্যক্তি মত বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকবেনা।

রাজনৈতিক লক্ষ্য বা সফলতা তখনই অর্জিত হবে, যখন রাজনৈতিক নের্তৃত্ব, সরকার বা কোন দল তার দেশের মানুষকে নিশ্চয়তা দিতে পারবে যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আর অখন্ডতা, সার্বভৌমত্ব বা স্বাধীনতা একই সাথে সুরক্ষিত থাকবে। জনগণ একই সাথে নিরাপত্তা আর স্বাধীনতা-দুটোরই স্বাদ উপভোগ করতে পারবে। এর কোনটিই অন্যটির বিকল্পও হতে পারে না। তুরস্কে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের পূর্ববর্তী নেতৃত্ব থেকে শুনে আসছিলাম, যে, জাতীয নিরাপত্তা বজায় রাখার স্বার্থে স্বাধীনতা একটু কম উপভোগও করা যায়। আমরা বা আমাদের দল, এই চিন্তাধারার সাথে একমত ছিলাম না। আমরা নিরাপত্তার অজুহাতে স্বাধীনতা হারাতে রাজী ছিলাম না। বরং আমরা এই চিন্তাধারার একেবারে বিরুদ্ধে ছিলাম। আমরা বলেছি, জনগণের অধিকতর স্বাধীনতার কথা। কেননা, যদি জনগণ অনেক বেশী স্বাধীন হয়, তাহলেই বরং জাতীয় নিরাপত্তা বেশী নিশ্চিত হয়। কারন, রাষ্ট্র আর জনগণের মধ্যে একটি শক্ত এবং দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। যদি কখনো রাষ্টপক্ষ তার জনগণকে তার জন্য হুমকি মনে করে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের পতন অনিবার্য। তাই তুরস্কে আমরা প্রথম অভ্যন্তরীণ হুমকির এই বিষয়টিকে সমূলে উচ্ছেদ করেছি। নাগরিক কখনোই তার রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হতে পারে না। যদি আদৌ এরকম কোন নাগরিক থেকেও থাকে, যে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দাড়াতে পারে, তথাপিও রাষ্ট্রপক্ষের তাকে হুমকি হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া উচিত নয়।

আন্তর্জাতিক শত্রুর আগ্রাসন থেকে বাচার জন্য আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে নিয়ে আসতে হবে। যদি প্রতিদিন আপনাকে অভ্যন্তরীণ বা বহি:শত্রুর আক্রমনের ভয়ে তটস্থ থাকতে হয়, তাহলে আপনি এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তিতে থাকতে পারবেন না। প্রতিদিনই আপনাকে এই নিয়েই ভাবতে হবে যে, কিভাবে আপনি বাইরের একটি হুমকিকে মুকাবেলা করবেন। এই সংকট থেকে বাঁচার জন্য প্রতিক্রিয়ার তুলনায় অনেক বেশী জরুরী হলো ভিশন বা দুরদর্শীতা। তাই নিরাপত্তা আর স্বাধীনতার বিষয়টি সুরক্ষিত রেখেই প্রতিটি বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে আমাদের।

দ্বিতীয়ত, আমাদের বুঝতে হবে যে, রাজনীতির মধ্য দিয়ে আসলে আমরা কি অর্জন করতে চাই? রাজনীতি হলো একটি হাতিয়ার। এটা কোন উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নয়। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে, জনগণকে সুখে রাখা, শান্তিতে রাখা। রাজনীতির মূল্যবোধ, রাজনৈতিক ক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশী কার্যকর। আজ যার হাতে যে ক্ষমতা, তা কাল হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধ স্থায়ী হয়। রাজনৈতিক মূল্যবোধ বলতে বোঝায় সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন এবং সঠিক প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থা। আমাদের রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ধাপে এই বিষয়গুলোকে সত্যিকার ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমাদেরকে এটাও মাথায় রাখতে হবে, যে আমরা যারা ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার চেষ্টা করি, রাজনৈতিক মূল্যবোধের ব্যপারগুলো তাদের জন্য খুব পরিচিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা যখনই হযরত উমর (রাঃ) এর জীবন নিয়ে আলোচনা করি, দেখি যে, তিনি তার জীবনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসনের মত বিষয়গুলোকে মানবিক মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তাই রাজনৈতিক এই শিষ্টাচারগুলো বা গণতন্ত্রের এই মূল্যবোধগুলো আমাদের মাধ্যমে উপস্থাপন করা কঠিন কোন কাজ নয়। এগলো সবই মানবিক মূল্যবোধ এবং আমাদেরকে অবশ্যই এর প্রতি সম্মান রাখতে হবে।

আর তৃতীয় বিষয়টি হলো, এ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় সামাজিক বা রাজিনৈতক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে কোন ভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে ব্যাপারে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। আমাদের স্বার্থেই সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। বিপ্লব মানেই ধ্বংস নয়। বিপ্লবের নামে প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেমের ধারাবাহিকতার ধারণা ও প্রয়োজনীয়তা থেকে যদি সরে আসি, তাহলে আমরা নিরেট যুক্তি থেকেও অনেকটাই সরে পড়বো। মিশরের বিপ্লব সেক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ। মিশরের সেনাবাহিনী কখনোই সরাসরি মিশরীয় মানুষের সাথে সংঘাতে জড়ায়নি। আরেকটা ব্যাপার, মিশরে ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিটি ধাপেই নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিকে কোন একক ক্ষমতা না দিয়ে বরং সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব বা ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আরেকটা বিবেচনার বিষয়ও আছে। পৃথিবীতে সেই সেনাবাহিনী শক্তিশালী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, যারা রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়ায় না। রাজনীতিতে যদি সামরিক আর বেসমারিক গোষ্ঠীর ভূমিকা পৃথকভাবে নিরুপণ করা না যায়, তাহলে সংকট অনিবার্য। মিশর সফরের সময় বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার ব্যপারে তানতায়ীর যে আগ্রহ দেখেছি, এ কারণেই তা ভাল লেগেছে আমাদের।

তুরস্কও এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ক্রান্তিকাল পার করেছে। তবে প্রতিবারই যথেষ্ট দ্রুততার সাথে বেসামরিক ব্যক্তি বর্গের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে প্রতিক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে খুব সচেতনভাবে। ইরাকে আমাদেরকে অনেক বেশী সংকট মুকাবেলা করতে হয়েছে, কারণ ইরাক যুদ্ধের সময় সেখানকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দূর্বল বা ধ্বংস করা হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদল তাই এমনভাবে হতে হবে যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সুরক্ষিত হয় আর যারা সঠিকভাবে ক্ষমতার পালাবদল চায়, তাদেরকেও এক্ষেত্রে সহায়তা করা দরকার।

চতুর্থত, রাজনীতির কিছু নীতিমালা আছে যাকে রাষ্ট্রের আইনী ভিত্তি হিসেবেও দাঁড় করানো উচিত আর দেশের মানচিত্র বা ভূমিও কোনভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না। আমাদের এই অঞ্চলে এমনিতেই অনেক বিভাজন, এর পর আবার দেশে দেশে বিভক্তি বা দূর্বল রাষ্ট্র হিসেবে কাউকে আলাদাভাবে চিত্রায়ন করার কোন সুযোগ নেই। বরং আমাদের এখন আরো অনেক বেশী একতাবদ্ধ হয়ে থাকা উচিত। লিবিয়া বর্তমানে এই সংকট পার করছে, ইয়েমেনে ক্ষমতার পালাবদলের সময়ও লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে সেখানে নতুন করে কোন বিভাজনের সূত্রপাত না হয়।

ঔপনিবেশবাদ ও স্নায়ু যুদ্ধের সময় আমাদের মাঝে যথেষ্ট বিভাজন ঘটেছে। এখন কোন পরির্বতন করতে হলে এমনভাবে করতে হবে, যাতে আর বিভাজন না হয় এবং নতুন নতুন যুদ্ধের বা সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত না হয়ে যায়। আমরা আশা করবো, বর্তমানের এই গণঅভূত্থানের পর আশে পাশের সব রাষ্ট্রই বিভাজনের পথ ছেড়ে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠবে, কারণ এই বিপ্লবের মধ্য দিয়েই জনগণের সাথে এই রাষ্ট্রগুলোর কর্তৃপক্ষের নতুন করে একটি সম্পর্ক তৈরী হয়েছে।

পঞ্চমত, একটি রাজনৈতিক দর্শন সবসময় কঠোরভাবে মানতে হবে, তা হলো, ক্ষমতার পালাবদলের এই প্রক্রিয়ায় কোনভাবেই কোন বিদেশী শক্তিকে হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়া যাবে না। পালাবদলের এই প্রক্রিয়াটি সংশিষ্ট জনগণের মাধ্যমেই সুসম্পন্ন করা উচিত। স্থানীয় জনগণকেই তাদের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ দেয়া উচিত। আর এমন একটি শক্তির সেই বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়া উচিত, যারা জনগণের আশা আকাংখার সুঠিক প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। তবে কোনভাবেই কোন বিদেশী শক্তিকে এই প্রক্রিয়ায় জড়িত করা ঠিক নয়, কারন তাতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠবে। দেশের মানুষেরও সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা থাকা উচিত। প্রতিটি দেশের মানুষ আলাদা মানসিকতা ধারণ করে, আর সেই দেশের নিয়তি নির্ধারণে সেই মানসিকতাই সর্বাগ্রে বিবেচনা করা উচিত।

ষষ্ঠ বিষয় হলো, একটি আঞ্চলিক স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করা। কোন বিদেশী হস্তক্ষেপ বা আগ্রাসন নয়, আঞ্চলিক স্বত্বের বিষয়টি আসলে একটু অন্যরকম। যেমন আমাদের এই অঞ্চলের বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিবীদ বা নীতি নির্ধারকদের অনেক বেশী একতাবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসতে হবে এই এলাকার ভবিষ্যত নির্ধারণ করার জন্য। আমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে একসাথে ছিলাম। তাই মিশরে, ইয়েমেনে, লিবিয়ায়, ইরাকে বা লেবাননে যা ঘটছে, তা আমাদের ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। তাই এইসব প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর জনগণের চাওয়া বা প্রত্যাশার সাথেও আমাদের সংহতি প্রকাশ করা উচিত। প্রতিবেশী এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরো কিছু আঞ্চলিক ফোরাম গঠিত হওয়া দরকার। গতানুগতিক কোন ফোরাম নয় যেখানে শুধু প্রেসিডেন্ট, রাজা বা মন্ত্রীদের মত বিনিময় হয়ে থাকে। বরং কথাবার্তা, মত বিনিমিয় বা সংলাপ হওয়া উচিত এই অঞ্চলের সম্ভাব্য সুযোগ বা সম্ভাবনা নিয়ে আর এই বিষয়গুলোকে পূঙ্খানুপৃঙ্খরূপ দেয়ার জন্য প্রতিটি অঞ্চলের বুদ্ধিজীবি ও মিডিয়ার মধ্যেও ব্যাপকভাবে এবং নিয়মিতভাবে মতের বা ধারণার বিনিময় হওয়া প্রয়োজন।

মূল নীতি বলতে এতক্ষণ যা আলোচনা করলাম, তার মধ্যে মানসিক নীতিমালা বা কৌশল হিসেবে আছে আত্মবিশ্বাস, আর পরিবর্তন আর রূপান্তর হচ্ছে সামাজিক কৌশল। এর পাশাপাশি আরও আছে, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা, স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা, আর দেশের ভৌগলিক অখন্ডতা নিশ্চিত করা। যদি এই বিষয়গুলোই হয় বিবর্তন বা রূপান্তরের মানদন্ড, তাহলে সুনির্দিষ্ট ভিশনকে সামনে রেখে আমাদের স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদী কৌশল কেমন হবে? মধ্যপ্রাচ্যকে যখন কনসেপ্ট হিসেবে আঞ্চলিক কোন ফোরামে আলোচনার জন্য তোলা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মাথায় বা চিন্তায় প্রথম যা আসে, তা হলো উত্তেজনা, সহিংসতা, অনুন্নয়ন প্রভৃতি। কিন্তু আসলে মধ্যপ্রাচ্যের এই চিত্রায়নটি সঠিক নয়।

এটি আসলে একটি পশ্চিমা ধারণা। আমাদের এই মধ্যপ্রাচ্য এক দশক বা শতাব্দী নয় বরং সহস্রাব্দের পর সহস্রাব্দী জুড়ে সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। এই অঞ্চলের কোন শহরের বয়সই ২০০০ বছরের কম নয়। আমাদের সভ্যতা যথেষ্ট পুরোনো। আমাদের এই অঞ্চলে যখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো একটি নির্দিষ্ট কাঠামো নিয়ে কাজ করতে শুরু করে, ইউরোপের বহু জায়গায় তখনো শহর বা গ্রাম গড়েই ওঠেনি। আমাদের রয়েছে, সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক সম্পদের ভান্ডার। আজও যদি মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদগুলোকে ব্যবহার না করা হয় বা মধ্য প্রাচ্য যদি তার সম্পদকে কুক্ষিগত করে নিজের কাছে রেখে দেয়, সমগ্র পৃথিবী একেবারে নিথর, নির্জীব বা কর্মহীন হয়ে পড়বে। তাছাড়া আমাদের যেহেতু বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের অভিজ্ঞতাও রয়েছে, তাই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে আমাদের এই অঞ্চলের যে যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

এই অঞ্চলকে যদি আমরা স্থিতিশীল, স্বাধীন, সমৃদ্ধ, সাংস্কৃতিকভাবে অগ্রসর তথা একটি উন্নত সভ্য জাতি হিসেবে দাড় করাতে চাই, তাহলে এটাই উপযুক্ত সময়, আমাদের কৌশল বা ধ্যান ধারণা নিয়ে পর্যালোচনা করার। আর এই বিবর্তনের মূল হাতিয়ার আমরাই। একটু আগেই আমি যেমন বলেছি, বর্তমানে আশেপাশের দেশে, অর্থাৎ সাধারণ মিশরীয়, তিউনিশীয় বা লিবীয় নাগরিকরা যে পরিবর্তন ঘটাতে চাইছে, তার মধ্য দিয়ে তারা আসলে সময়ের বীরোচিত নায়ক হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিবে। তারা সময়ের পরিবর্তনের জোয়ারে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন চাইছে আর এটা চাওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে। আর এই পরিবর্তন যথাযথভাবে করতে পারলেই, আমাদের এই অঞ্চলে সহিংসতার হার কমে আসবে। দেশগুলোর মধ্যে, সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে এমনকি নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীগুলোর মাঝেও বৈরীতা হ্রাস পাবে।

পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে নিজস্ব সম্পদের উপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে আমাদের। সেই সাথে রাজনীতিবীদদের এবং বুদ্ধিজীবিদের মধ্যেও ভাবনা ও মতামতের বিনিময় বাড়াতে হবে। নিজেদের ভেতর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ মজবুত করতে হবে। আমাদের যে লক্ষ্য তা অর্জন করা দু:সাধ্য নয়। যদি আমরা নিজেদের ভিশন নিয়ে পরস্পরের মধ্যে আলোচনা করতে পারি, তাহলে অবশ্যই আমরা একমত হওয়ার মত একটি জায়গায় পৌছতে পারবো এবং মধ্যপ্রাচ্যকে বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির সুতিকাগার হিসেবে নতুন করে উপস্থাপন করতে পারবো।

প্রেসিডেন্ট লুলা যেমনটি বলেছেন, যে বিশ্ব আজ একটি নতুন নেতৃত্ব ও কৌশল দেখার অপেক্ষায়। জাতিসংঘ কেন্দ্রিক ভাবনা চিন্তারও অবসান হওয়া জরুরী। বিশ্বজুড়ে গত বছর যে অর্থনৈতিক মন্দাভাব আমরা দেখলাম, তারপর ভারসাম্য বা ইনসাফের ভিত্তিতে নতুন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাও এখন সময়ের দাবী। শ্রদ্ধার ভিত্তিতে নতুন এক সামাজিক সংস্কৃতিও গড়তে হবে আমাদের। আর পশ্চিমাদের ধারণা মত নয়, বরং আমি বলবো, আমাদের এই অঞ্চল অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের সেই সম্ভাবনা আছে, নিজেকে বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উপস্থাপন করার।

বর্তমানে দেশে দেশে যে যুব প্রজন্ম নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের এই সংগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাদের এই বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। আর আমাদের দায়িত্ব হলো, তরুণ প্রজন্মকে সে সুযোগ করে দেয়া, যাতে তারা নিজেদের স্বপ্ন, আকাংখা আর প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজ ভূমিকে সাজিয়ে নিতে পারে।

অনুবাদ ও সম্পাদনা: আলী আহমাদ মাবরুর
ইমেইল: amabrur@yahoo.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/AliAhmad
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
প্রবাস থেকে প্রবাসী লিখেছেন, ০৩ জুলাই ২০১১; রাত ০১:১৯
লেখকে অশেষ ধন্যবাদ এনম একটি গুরুত্বপূর্ন ভাষনের বাংলা অনুবাদ করার জন্য। পড়লে বুঝা য়ায় তুরষ্করে নেতৃবৃন্দের দূরদৃষ্টি কত প্রখর? । আমি মনে করি বাংলাদেশে এ ধরনের দূরদৃষ্টি সম্পন্ন লিডার দরকার।

আসলে বাংলাদেশের মানুষের কাছে নিজেদের সম্মান ও আত্ম মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অনুভুতী যদি সত্যিই থাকতো কিংবা কেউ যদি তা জাগতে পারতেন তাহলে আধিপত্যবাদীর তবেদার মানষিকতার ও বাকশালী ফ্যসিষ্ট চরিত্রের ক্ষমতালিপ্সু অসৎ নেতৃত্বের অবসান হতে দেরী হতনা । বস্তুাপচা দূর্নীতিপরায়ন এসব নেতা নেতৃত্বকে কবে বঙ্গপোসাগরে ফেলা যেত তা বলার প্রয়োজন নাই।
61403
ঢাকা থেকে মোঃ জসীম উদ্দীন লিখেছেন, ০৩ জুলাই ২০১১; সকাল ১০:৫৪
তুরস্কের পররাষ্ট্রমণ্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই এই যুগোপযোগী ভাষণের জন্য। তাঁর এ ভাষণ বিেশষ করে মুসলিম জাতি গোষ্ঠীর জন্য পথপ্রদর্শক। আজ মুসলিম নেতৃবৃন্দের নতুন করে ভাবতে হবে তাঁদের কর্মসূচী নিয়ে। ঢেলে সাজাতে হবে তাঁদের নতজানু ও পরনির্ভরশীল নীতিকে। আসুন আমরা নিজস্ব রুচিশীল সংস্কৃতির চর্চা বৃদ্ধি করি, আমাদের মাঝে ভুল বুঝাবুঝি দূর করি, বৃহৎ স্বার্থে আমাদের মাঝে আবার ঐক্য তৈরি করি, তৈরি করি নিজস্ব অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জোট, তাহলে নতুন করে এক গৌরবোজ্জ্বল ও সোনালী যুগের সুচনা হবে, যা এই যুগের সচেতন যুবসমাজের একমাত্র দাবী।
61421
bogura থেকে monoar লিখেছেন, ০৪ জুলাই ২০১১; সকাল ১১:২৯
আমাদের স্বপ্ন পুরনের দিক নির্দেশনা এখান থেকেই সংগ্রহ করে নিতে পারি। নেতারাও পাবেন তাদের পথ চলার পাথেয়।
61572
আল খোবার - সৌদি আরব থেকে আব্দুল হান্নান চৌধুরী লিখেছেন, ০৪ জুলাই ২০১১; সন্ধ্যা ০৭:৩৩
ইনশাল্লাহ আগামীতে তুরষ্ক ইসলামি দুনিয়ার নেতৃত্ব দেবে, এ মূহূর্তে কেহই ইসলামি জগতের প্রতিনিধিত্ব করেনা। এটা আসলে মুসলমানদের জন্য দুর্ভাগ্য বটে। অাল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের জন্য কাউকে না কাউকে নির্দিষ্ট করে দেবেন ইনশাল্লাহ।
61622
ঢাকা থেকে মনসুর-উল-হাকিম লিখেছেন, ০৬ জুলাই ২০১১; সকাল ১০:৫০
তুরষ্ক থেকেই আবার উদয় হোক না কেন ইসলামি দুনিয়ার নতূন সূর্য্য!!
শুভেচ্ছান্তে ধন্যবাদ।
61793
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy