শুক্রবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৮ মে ২০১২; রাত ১২:১৯ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

১৪ ডিসেম্বর বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের ৪০ তম শাহাদাত বার্ষিকী

আমানুল্লাহ নোমান

বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর একটি বিপ্লবের নাম। একটি চেতনার নাম, গর্বের অবিনশ্বর স্মারক। ক্ষণজন্মা এই মুক্তি সেনানীর জন্ম ১৯৪৯ সালের ৮ মার্চ বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার রহিমগঞ্জ গ্রামে। পিতা আব্দুল মোতালেব হাওলাদার রত্নগর্ভা মাতার নাম সাফিয়া খাতুন। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর শুধু বীরদের মধ্যেই শ্রেষ্ঠ নন শ্রেষ্ঠ জীবনের অন্যান্য অনুসঙ্গেও। প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন পাতারচর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি প্রাপ্ত হয়ে শিশুকাল থেকেই মেধার স্বাক্ষর রাখেন। মাধ্যমিক পড়াশুনা করেন মুলাদী মাহমুদজান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। প্রখর মেধাবী ছাত্র হওয়ায় জাহাঙ্গীর সবার কাছে ছিলেন স্নেহের পরম পাত্র। নিন্মোক্ত ঘটনা থেকে তার অসাধারণ মেধার পরিচয় পাওয়া যায়।

একদিন স্কুল পরিদর্শনে এসডিও এসে নবম শ্রেণীতে একটি অংক কষতে দেন। কিন্তু অংকটির সমাধান কেই দিতে পারেনি। তাতে হেডমাষ্টারের উপর চরম ক্ষুব্ধ হন। হেডমাষ্টার মান বাঁচাতে এসডিওকে বলেন আমার স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীতে এক ছাত্র আছে ও অসাধারণ মেধাবী। আমার বিশ্বাস এ অংকটি ঐ ছেলেটি পারবে। পরে হেডমাষ্টার স্যার মহিউদ্দিনকে ডেকে অংকটি কষতে দিলে মহিউদ্দিন খুব অল্প সময়ে অংকটির সমাধান দিলে এসডিও সাহেব খুশি হয়ে নিজের কলমটাতো উপহার দিলেনই সেই সাথে আরও বিশ টাকা উপহার দেন। ১৯৬৪ সালে এসএসসি পাশ করে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন বরিশাল বিএম কলেজ। ১৯৬৬ সালে এইচএসসি পাশ করে বিজ্ঞান মনস্ক এ তরুণ ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে। পড়াশুনা শেষ হতেনা হতেই উদ্বুদ্ধ হলেন দেশপ্রেমে। দেশসেবার ব্রত নিয়ে দৃষ্টি দেন সেনাবাহিনীর দিকে। ১৯৬৭ সালেসালে ১৫তম সর্ট সার্ভিস কোর্সের প্রশিক্ষণার্থী ক্যাডেট হিসেবে নির্বাচিত হন। প্রশিক্ষণের জন্য ১৯৬৭ সালের ৩ অক্টোবর ঢাকা ত্যাগ করেন। ১৯৬৮ সালে কমিশন প্রাপ্ত হয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন। এরই মধ্যে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। রক্তে যার মুক্তির নেশা চেতনায় যার স্বদেশ প্রেম তাকে আটকাবে কে? দেশের টানে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে করাচী থেকে পালিয়ে আসেন জাহাঙ্গীর। দূর্গম পথ পাড়ি দিয়েও নদী সাতরিয়ে পালিয়ে এস যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। দায়িত্ব পড়লো ৭নং সেক্টরের মোহিদপুরের সাব সেক্টরে। চালচলনে সাদাসিদে হলেও যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন অকুতভয় সাহসী সৈনিক। অসাধারণ সাহসের পরিচয় দিয়ে অল্প সময়েই টাইগার নামে পরিচিতি পেয়ে যান। রণাঙ্গনে সিংহ পুরুষ হলেও জাহাঙ্গীর ছিলেন অত্যন্ত আবেগী মানুষ। কিশোর এক মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে তিনি এতটাই কেঁদেছিলেন যে এর আগে তাকে এভাবে কেউ কাঁদতে দেখেনি। আচার ব্যবহারে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ছিলেন অনন্য। তার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে রাজাকাররা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যুগান্তকারী এ ঘটনাটি ঘটে আগারহাট যুদ্ধে।

পাকিস্তানীদের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য আগারহাট ক্যাম্পে রাজাকারদের একটি কোম্পানী অবস্থান করছিল। তাদেরকে পাকিস্তানীরা বিশেষভাবে বাছাই করে প্রশিক্ষণ দেয়। এই যুদ্ধে পাকিস্তানীদের আউটার ডিফেন্স পতন হওয়ার পরে রাজাকারেরা বাঙ্কার থেকে বের হয়ে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তখন রাজাকারেরা ভয়ে তটস্থ। কিন্তু আশ্চর্য! মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করেন। যেখানে মৃত্যু নিশ্চিত সেখানে তার ভালো আচরণে রাজাকারেরা ভুল বুঝতে পেরে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। চাপাইনবাবগঞ্জে শত্রু বাহিনীর সাথে তুমুল লড়াই চলছে। একের পর এক শত্রুঘাটি দখল করে চলছে মুক্তিযোদ্ধারা। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এলো ৭১ এর ১৪ ডিসেম্বর। চাপাইনবাবগঞ্জ এখনো শত্রুমুক্ত হয়নি। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সৈন্যদেরকে সাহস যোগাচ্ছেন। অনেকদিনের স্বপ্ন চাপাইনবাবগঞ্জ স্বাধীন করার। সামনের একটা বাড়ী থেকে অনবরত মেশিন গানের গুলি আসছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের এমন পরিস্থিতিতে সামনে এগুনো ছিল অসম্ভব। মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান দেখা যাচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিল।

জাহাঙ্গীর বুঝলেন এই মেশিনগান ধংস না করতে পারলে সামনে আর এগিয়ে যাওয়া যাবেনা। কারো সাথে কোন আলাপ না করেই নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধীরস্থির ভাবে বাম হাতে এসএমজি এবং ডান হাতে একটি গ্রেনেড নিয়ে ক্রলিং করে দ্রুত রাস্তা পার হন। যে বাড়িতে মেশিনগান ছিল ক্ষিপ্রগতিতে তিনি বাড়ীর কাছে ছুটে যান এবং উপরের দিকে অবস্থিত মেশিনগান পজিশনের দিকে গ্রেনেডটি ছুড়ে মারেন। গ্রেনেডটি প্রচন্ড শব্দে বিস্ফোরিত হয় এবং মেশিনগান পোস্টটিও ধংস হয়। কিন্তু শত্রুর লুকিয়ে থাকা স্লাইপারের গুলি এসে ভেদ করে জাহাঙ্গীরের কপাল। গুলির আঘাত রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। চলে যান না ফেরার দেশে। দেশ মাতৃকার টানে জীবন বিলিয়ে দেন তিনি। শুয়ে আছেন চাপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহাসিক ছোট সোনা মসজিদ কম্পাউন্ডে। আসলেই কি চলে গেলেন জাহাঙ্গীর? না তিনি আছেন বাংলাদেশের পতাকায়, মানচিত্রে ও ১৬ কোটি মানুষের প্রাণের মনিকোঠায়।

লেখকঃ- প্রতিষ্ঠাতা ও সেক্রেটারী, বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ফাউন্ডেশন।

http://www.sonarbangladesh.com/articles/AmanullahNoman
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy