শুক্রবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ১৮ মে ২০১২; রাত ১২:২০ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

প্রসূতি ও নবজাতক হত্যাকান্ড বন্ধ হোক

আমিনুল ইসলাম জুয়েল

অসহায় এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলা কবিরন (৩৫) সাভার সদর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়েছিলেন সেবা নিতে। অসহায় কবিরনের পাশে ডাক্তার- নার্স কেউ আসেনি। মহিলাকে জরুরি সেবা দেওয়ার বদলে তাকে তখন ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার মত বিস্ময়কর পরামর্শ দেয়া হয়। সেই অসহায় মহিলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বের হয়ে ঢাকা মেডিক্যালে যাওয়ার জন্য লোকজনের কাছে অর্থ সাহায্য চান। জীবনের এমন ক্রান্তিকালে কেউ ভিক্ষা করতে নামে! শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উচ্চারণে বললে ‘সন্তানের মুখ ধরে একটু চুমো খাব’ এই আকুতি ধারণ করে তিনি একাকী অসময়ে চলে যেতে চাননি বলে শেষ চেষ্টা করেন। তার চেষ্টা সফল হয়নি আবার স্বাস্থ্যকেন্দ্র কর্তৃপক্ষও তাকে সহায়তা করেনি। কয়েক ঘন্টা তীব্র প্রসব বেদনা- কাতর মহিলা অবশেষে রাগে, ক্ষোভে, লজ্জায়, অপমানে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডের ওভার ব্রীজের ওপর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এতে মা এবং প্রসব হয়ে যাওয়া নবজাতক কিছুক্ষণ ছটফট করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে (সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক)।

গত বছর ২৪ আগষ্ট ঘটে যাওয়া কবিরনের এই মর্মস্পশী ঘটনা তুলে ধরতে গিয়ে মনে পড়ে রাজীব গান্ধী হত্যাকান্ডে জড়িত নলীনি শ্রীহরণ এর কথা। যার ফাঁসি স্থগিত হয়েছিল অন্তঃসত্ত্বা থাকার কারণে। পরবর্তীতে গান্ধী পরিবার তাকে ক্ষমা করেছেন। রাজীব গান্ধী তনয়া প্রিয়াঙ্কা গান্ধী তার সাথে জেলখানায় দেখা করেছেন। নলীনি কেন তার নিরপরাধ বাবাকে হত্যা করল, শুধু এটা জানার জন্য তিনি দেখা করেছেন। নলীনি ভুল স্বীকার করেছে। সে বলেছে, সে শুধু কিছু লোকের নির্দেশ পালন করেছে মাত্র। গান্ধী পরিবার তার প্রতি উদারতা দেখিয়েছেন নলীনি একজন ‘মা’ তাই। মাতৃত্বকালীন সময়টিকে সব দেশ, সব জাতি গুরুত্ব দেয়। অথচ আমাদের ডাক্তারদের কাছ থেকে কবিরন নামের সেই মহিলা ন্যূণতম মানবিকতা পাননি।

এক বছর আগে ঘটে যাওয়া কবিরনের প্রসঙ্গটি তুললাম এজন্য যে, দেশে গত এক মাস ধরে প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যু (ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর ভাষায় হত্যাকান্ড) নিয়ে বেশ হৈচৈ হচ্ছে। সব মৃত্যুই দুঃখজনক কিন্তু কবিরনের মৃত্যু যেন এসব দুঃখকেও হার মানায়। সর্বশেষ গত ১৪ সেপ্টেম্বরে সিরাজগঞ্জ ও বগুড়াতে ডাক্তারের অবহেলায় দু’জন প্রসূতি মারা গেছে। ৭ সেপ্টেম্বর পাবনার চাটমোহরের একটি ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় আইরিন খাতুন (২৫) নামে এক প্রসূতি ও তার নবজাতক অপারেশন টেবিলেই মৃত্যুবরণ করেছে। নিজেদের দায় এড়াতে ডাক্তার ও এনেসথেসিষ্ট রোগীকে ফেলে ক্লিনিক থেকে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় ডাক্তার ও অজ্ঞানকারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর মুন্সিগঞ্জে মায়া বেগম (২৮) নামের আরও একজন প্রসূতি পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে গেলেন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মামলায় বলা হয়েছে ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় এবং ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের অবহেলায় প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। এই মাত্র কয়েকদিন আগে সেখানকার দুটি ক্লিনিকে কোহিনূর বেগম (৩৩) এবং রঞ্জনা বেগম (৩৫) নামের দুজন প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে।

ঠাকুরগাঁয়ের আরেক কোহিনূর বেগম ভুল অপারেশনের শিকার হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার এক ক্লিনিকে ডাক্তার সিজার করতে গিয়ে প্রসূতি সালেহা বেগমের কিডনি নালী কেটে ফেলায় তার মৃত্যু হয়। পাবনার ঈশ্বরদীর একটি ক্লিনিকে একই দিনে দুই প্রসূতি রানী খাতুন (২৬) ও মাসুমা খাতুন (৩০) এর করুণ মৃত্যু হ’ল। লক্ষ্যণীয় এতগুলো ঘটনা গত এক মাসের মধ্যে ঘটেছে আর মৃত্যুবরণকারী প্রসূতিদের কেউই অপ্রাপ্তবয়স্ক নন বা অদক্ষ ধাত্রীর শরনাপন্ন হননি। তারা হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ডাক্তারদেরই অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার শিকার হয়েছেন। কয়েকদিন আগে আমরা দেখলাম চিকিৎসা অবহেলায় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশের নামকরা একটি বে- সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক এবং কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার হয়েছেন। গত ৬ সেপ্টেম্বরে নোয়াখালি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৬জন ডাক্তার ও নার্সের বিরুদ্ধে নবজাতক হত্যার অভিযোগ এনে মামলা হয়েছে। প্রসূতি বেডে শুয়ে কাতরাবেন কিন্তু গাইনি কনসালটেন্ট তার কর্মস্থলে আসবেন না আর এ অবস্থায় প্রসূতি বা নবজাতক এর মৃত্যু হলে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক কিভাবে এড়িয়ে যাবেন? নোয়াখালির সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। এখন দেশের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে আশংকাজনকহারে প্রসূতি ও নবজাতক এর মৃত্যুর ঘটনাগুলো স্বাভাবিক মৃত্যু না হত্যাকান্ড এ নিয়ে বিতর্ক ওঠা স্বাভাবিক।

দেশে প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যুর হার কমিয়ে আনার সরকারি পরিকল্পনাও কাজে আসছে বলে মনে হয় না। পরিসংখ্যানগুলো তো তাই বলে। দেশে যত শিশু মারা যায় তার বড় একটি অংশ মারা যায় ২৮ দিন হওয়ার আগে। নবজাতকের এই মৃত্যু মোট শিশু মৃত্যুর ৫৭ শতাংশ অথচ ১৯৯০ সালে এই হার ছিল ৩৯ শতাংশ। নবজাতকের মৃত্যু কমাতে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় ৫২ জেলায় কাজ হচ্ছে। ব্রাক ১০টি জেলায় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা কর্মসূচী (ইউএনএফপিএ) ছয়টি জেলায় কর্মসুচী বাস্তবায়ন করছে কিন্তু কাঙ্খিত সাফল্য আসছে না। দেশে জরুরি প্রসূতিসেবা কার্যক্রমও ভেঙে পড়েছে। মাতৃমৃত্যুর হার আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে। জাতিসংঘ বলছে পৃথিভীর যে সব দেশে মাতৃমৃত্যুর হার বেশী, বাংলাদেশ তার অন্যতম। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় জীবিত শিশু জন্ম দেয়ার ক্ষেত্রে প্রতি লাখে ৩২০ জন মা মারা যাচ্ছে। জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্তসংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স নেই। ফলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠালেও জরুরি সেবা পাচ্ছে না প্রসূতিরা।

ইউনিসেফ এর সর্বশেষ জরিপে যদিও বলা হয়েছে ৭৬ শতাংশ মা সন্তান জন্ম দেয়ার সময় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা পাচ্ছে না। আবার এমডিজি বিষয়ক সরকারের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গর্ভবতী বা প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর প্রধান কারণ প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ, খিঁচুনি, বাধাগ্রস্থ প্রসব এবং অনিরাপদ গর্ভপাত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনা প্রমাণ করে ভাল চিকিৎসকদের শরনাপন্ন হওয়ার পরও প্রসূতি ও নবজাতক চিকিৎসকদের ও হাসপাতাল বা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের অবহেলার শিকার হয়ে মারা যাচ্ছেন। ফলে সরকারের চালু করা জরুরি প্রসূতি সেবা কার্যক্রম সুফল বয়ে আনছে না। যদিও ২০০৯-১০ অর্থবছরে এ খাতে ৬২ কোটি টাকা, ২০১০-১১ অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৯০ কোটি টাকা করা হয়।

২০০৩ সাল থেকে দেশের ১৩২টি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সমন্বিত জরুরি প্রসূতি সেবা কার্যক্রম শুরু হয়। ৫৯টি জেলা হাসপাতালেও এ কার্যক্রম শুরু হয়। এ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার জন্য অনেক উপজেলায় ডিমান্ড সাইড ফাইনান্সিং (ডিএসএফ) বা মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কীম কর্মসূচী চালু করা হয়। এ কার্যক্রমের উদ্দেশ্য জরুরি সেবা প্রয়োজন ও গর্ভকালীন জটিলতা আছে এমন মায়েদের সেবা দেয়া। কিন্তু প্রসূতিরা জরুরি সেবা দুরের কথা কোন সেবাই পাচ্ছেন না। সিজারের জন্য শল্য চিকিৎসকের পাশাপাশি অ্যানেসথেসিষ্ট দরকার হয়। এক উপজেলায় এক জন থাকলে আরেকজন নেই। থাকলেও নানা অনিয়ম অব্যবস্থাপনার কারনে প্রসূতিদের কপালে আর সুযোগ- সুবিধা জোটে না। কিছুদিন আগে সিরাজগঞ্জ জেলায় ডিএসএফ কর্মসূচী চলা একটি উপজেলার একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ আমাকে বলছিলেন এই কর্মসূচীতে শল্য চিকিৎসকের বাড়তি অর্থ প্রাপ্তির পাশাপাশি প্রসূতিকেও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। ডাক্তারের প্রাপ্য অর্থই সেখানে ডেকে এনেছে অনর্থ। বাড়তি অর্থের লোভে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গাইনি বিশেষজ্ঞকে বাদ দিয়ে নিজেই সিজার করতে থাকেন। সিজার করলেই টাকা তাই যে সব রোগীর প্রসবকালীন কোন জটিলতা নেই তাদেরও সিজার করেন। পুরুষ ডাক্তার দিয়ে সিজার করানোয় রোগীর অভিভাবকদের আপত্তি সত্বেও তিনি তা করে গেছেন। ওদিকে প্রসূতিদের জানানোই হয়নি যে তাদের জন্য আর্থিক সুবিধা রয়েছে। অনেক ভুয়া প্রসূতিও দেখানো হয়েছে। এই হ’ল মাঠ পর্যায়ের প্রকৃত চিত্রের একটি নমূনা।

বাবা- মা ও একটি পরিবারের জন্য গর্ভধারণ ও শিশুর জন্ম অপার আনন্দ বয়ে আনে। অথচ প্রসবকালীন জটিলতায় তা একটি পরিবারের জন্য হরিষে বিষাদ হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে ভুল চিকিৎসার কারণেই তা বেশী হচ্ছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের কেউ একদিনে রোগী দেখেছেন তিন শ’ আর রাতে করেছেন অনেকগুলো অপারেশন, কেউ জরুরি কল পেয়েও কর্মস্থলে আসেননি, কেউ কিডনীর নালী কেটে ফেলেছেন, কেউ পরীক্ষা ছাড়াই অপারেশন করেছেন আবার কোথাও ক্লিনিকের নার্স বা কর্মচারীরা নিজেরাই সিজার করতে গিয়ে অঘটন ঘটিয়েছেন। প্রসুতি ও নবজাতককে রক্ষা করতে এসব অঘটন ঘটনপটিয়সী ডাক্তার ও ক্লিনিকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাকে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

লেখকঃ সাংবাদিক
jewelameen@gmail.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/AminulIslamJuwel
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy