|
বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর সাফল্য-ব্যর্থতা এবং ভবিষ্যৎ
আনিসুর রহমান |
|
বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী কাজ করছে অর্ধ শতাব্দীরও বেশী সময় ধরে। দলটি কখনো ক্ষমতায় না যেতে পারলেও (২০০১-২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতার ২ শতাংশেরও কম ভাগ পেয়েছিল) সবসময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে এবং দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আগামীতেও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সাথে দলটির একটা সম্পর্ক আমাদের নিয়তির মতই হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে দলটি সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।
সাফল্য:
ক. পৃথিবীর যে কয়েকটি হাতে গোনা ইসলামী আন্দোলন নিষিদ্ধ না হয়ে নিজ নামে কাজ করতে পারছে জামায়াতে ইসলামী তার অন্যতম। শুধু তাই নয়, চরম বিরূপ বিশ্ব পরিস্থিতিতেও (২০০১ এর ৯/১১ এর পর) দলটি সরকারের অংশীদার হিসাবে পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিল এবং গণতান্ত্রিক দল হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্টিফিকেট পেয়েছিল।
খ. অন্যান্য মুসলিম জনগণ থেকে বাংলাদেশের জনগণের সাংস্কৃতিক ও ধর্মচিন্তার কিছু পার্থক্য রয়েছে যা একটি ইসলামী আন্দোলনের জন্য অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে। বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটেছিল সুফীবাদে প্রভাবিত ইসলাম প্রচারকগণের মাধ্যমে। তারা ইসলামের মরমী রূপটিকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। অপরদিকে দীর্ঘদিন ইংরোজ ও এদেশী হিন্দু জমিদারদের অধীনে থাকার কারণে আমাদের ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে পৌত্তলিকতার বীজ ব্যাপকভাবে বপন করা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রেই হিন্দু ধর্মের ছাচে ফেলে ইসলামের একটা সংস্করণ তৈরী করা হয়েছিল, যা জনগণ বিশ্বাস করতো। জামায়াতে ইসলামীকে তার কর্মকান্ডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করতে হয়েছে ইসলামের সঠিক ধারণার বিস্তার ঘটাতে। এ ক্ষেত্রে সংগঠনটিকে যথেষ্ট সফল বলা যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলাম যে একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান সে সম্পর্কে তেমন কোন দ্বিমত নেই।
গ. অন্যান্য অনেক ইসলামী আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে জামায়াতের সাফল্য বেশী। আরব বিশ্বে ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াতের সব থেকে বড় হাতিয়ার হচ্ছে কোরআন। মহান আল্লাহর নিজের কথা মানুষের মনে যেভাবে আলোড়ন তুলতে পারে, অন্য কিছু সেভাবে পারে না। কিন্তু তার পরও ইখওয়ানুল মুসলিমীনের মত সংগঠন তেমন কোন গণভিত্তি অর্জন করতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে তারা সন্ত্রাসবাদের সাথে জড়িত হয়ে গেছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত হত্যার সাথে তারা জড়িত ছিল। মিসরের মত দেশে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আগ্রাসন তারা রুখতে পারেনি। খোদ আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু আগেই মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।
ঘ. শিবির বিগত তিন দশক ধরে ইসলামী আন্দোলনের প্রচুর সংখ্যক নেতা, কর্মী ও সমর্থক তৈরী করেছে। বর্তমানে সমাজের সকল সেক্টরে তারা রয়েছে।
ঙ. বাংলাদেশের ডানপন্থী বুদ্ধিজীবি মহলের উপর জামায়াতের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বস্তুত: ডানপন্থী বুদ্ধিজীবিদের অধিকাংশই ইসলামী আন্দোলনের সমর্থক।
চ. আর্থিক, শিক্ষা ও সেবা খাত এবং মিডিয়াতে দলটি যথেষ্ট অগ্রসর হতে পেরেছে।
ছ. নারীদের মধ্যে কাজের ক্ষেত্রে দলটির অগ্রগতি দুনিয়ার অনেক ইসলামী আন্দোলন থেকে বেশী। যেখানে আরব বিশ্বের কিছু ইসলামী আন্দোলন নারীদের ভোটাধিকারের বিরোধিতা করছে, সেখানে জামায়াতে ইসলামী নিজ দলেও নারীদের নেতৃত্বকে উৎসাহ দিচ্ছে।
জ. সমাজ সেবামূলক কাজেও জামায়াতের অগ্রগতি প্রশংসনীয়।
ঝ. সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের শ্লোগানটি জামায়াতই প্রথমে চালু করে এবং দীর্ঘদিন ধরে একমাত্র এই দলটিই সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের জন্য জনমত গঠন করে আসছিল। একথা বললে অতুক্তি হবে না যে, জামায়াতের কারণেই জনগণকে এ কথা বিশ্বাস করানো গেছে যে, সৎ লোকেরাও নেতা হতে পারে।
সীমাবদ্ধতা:
ক. গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি না হওয়া:
জামায়াতে ইসলামী শুধু যে রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সমর্থন অর্জন করতে পারেনি তাই নয়, বরং দলটি সাধারণ জনগণের নিকট তেমন কোন গ্রহণযোগ্যতাও পায় নি। সবথেকে আশংকার কথা হচ্ছে, জামায়াত ঠেকাও এখন নির্বাচনে জেতার আকর্ষণীয় শ্লোগানে পরিণত হয়েছে। জামায়াতের কারণে ২০০৮ এর নির্বাচনে চারদলীয় জোটের বিরুদ্ধে তরুণ ভোটারদের একটি বিরাট অংশ ভোট দিয়েছে। বাংলাদেশে জনসমর্থনহীন প্রচুর বাম দল রয়েছে। তাদের জনসমর্থন না থাকলেও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কোন ব্যক্তি বা ছাত্র উক্ত দলভূক্ত হওয়ার কারণে তাকে প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয় না। এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র ইসলামের বিরুদ্ধে বাতিলের প্রতিরোধ হিসাবে দেখলে ভুল হবে।
খ. জামায়াতকে গণমানুষের দল হিসাবে গড়তে না পারা:
জামায়াতের কর্মী সংখ্যা বড় দলগুলোর তুলনায় খুব একটা কম না হলেও সাধারণ জনগণের মধ্যে সমর্থন খুব একটা বেশী নয়। অভিযোগ রয়েছে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেতারা জনগণের সাথে মেশেন না এবং তাদের দু:খ কষ্টে এগিয়ে আসেন না। সরকারী কর্মকর্তাদের মত অফিস করতেই তারা বেশী সাচ্ছ্যন্দ বোধ করেন। নেতারা যদি জনগণের বিপদ-আপদে তাদের পাশে না দাঁড়ান, তাহলে জনগণ কেন তাদেরকে সমর্থন করবে? শুধুমাত্র আদর্শিক কারণে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া খুব কঠিন এবং ব্যাপক জনগণের ক্ষেত্রে তা অনেকটাই অসম্ভব। জামায়াত নেতাদের গণবিচ্ছিন্নতার কারণে একই ব্যক্তি একাধিকবার এমপি হওয়ার ঘটনা খুব বেশী দেখা যায় না।
গ. ইসলামী শক্তির মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি না হওয়া:
অধ্যাপক গোলাম আযম একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁর জীবনের সবথেকে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে বাংলাদেশের ইসলামী শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করতে না পারা। এ ক্ষেত্রে ছোট ছোট ইসলামী দলগুলোর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী, ক্ষমতার লোভ ইত্যাদি দায়ী থাকলেও, জামায়াত বড় দল হিসাবে তার দায়িত্ব ঠিকমত পালন করেনি। চারদলীয় জোট ক্ষমতায় থাকাকালে জামায়াতে ইসলামীর সাথে ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের বিরোধ চরমে পৌঁছে যা অনেক সময়ই প্রকাশ্য রূপ ধারণ করেছে। এর মূল কারণ ছিল উক্ত দলগুলো থেকে কোন মন্ত্রী না বানানো। জামায়াতের বক্তব্য ছিল, এটি তাদের সাথে বিএনপির সমস্যা। কথাটি হয়তো মিথ্যা নয়। কিন্তু, এই সমস্যা দূর করতে জামায়াতের পক্ষ থেকে কোন উদ্যোগ নেয়া হয় নি। বস্তুত: চারদলীয় জোটের পুরো সময়ে ইসলামী দলগুলোকে এক প্লাটফর্মে নিয়ে আসার বিষয়ে কোন উদ্যোগ জামায়াত নেয় নি। এর ফলে এক পর্যায়ে শায়খুল হাদীসের মত নেতা, যিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে প্রত্যক্ষভাবে নির্যাতিত হয়েছিলেন, তিনিও আওয়ামী লীগের সাথে জোট বাঁধেন।
ঘ. ইসলামী স্কলার তৈরী না হওয়া:
প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোন বড় মাপের ইসলামী স্কলার তৈরী হয়নি যারা আমাদের ধর্মচিন্তার ক্ষেত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেন। এমন কোন ইসলামী চিন্তাবিদ আমাদের নেই যার রচিত বই-পত্র বাংলাদেশের বাইরে আদৃত হচ্ছে। এ ধরণের স্কলারগণ সাধারণ মানুষের মননশীলতার উপরে প্রভাব বিস্তার করেন এবং তাদেরকে ইসলামী আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তোলেন। দলের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, ইসলামী দলগুলোর নিজেদের মধ্যকার সমস্যা - ইত্যাদি নিরসনে তারা ভূমিকা রাখতে পারেন। আন্তর্জাতিক (অন্তত: ইসলামী বিশ্বে) গ্রহণযোগ্যতা থাকায় দেশে ইসলামী আন্দোলন নির্যাতনের শিকার হলে তারা বহির্বিশ্বের সমথর্ন যোগাড় করতে পারেন।
সাফল্য ও সীমাবদ্ধতাকে যে বাইরের ফ্যাক্টরগুলো প্রভাবিত করেছে:
ক. দীর্ঘদিন পরাধীন থাকার কারণে এ অঞ্চলের জনগণের মধ্যে নেতৃত্ব এবং শাসক সমার্থক হিসাবে রয়েছে। জনগণ তাদেরকেই ভোট দেয় বা রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করে যাদের সরকার গঠনের সম্ভাবনা থাকে। শাসক শ্রেণীই রং পাল্টে বিভিন্ন দলের নামে দেশ শাসন করেছে। ইংরেজরা চলে যাওয়ার সময় মুসলমানদের মধ্যে তখন যারা শাসক শ্রেণীতে ছিলেন, তারাই মুসলিম লীগের নেতৃত্ব দেন। মুসলিম লীগ থেকেই প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পরে আওয়ামী লীগ তৈরী হয়। ৭৫এর পট পরিবর্তনের পর ক্ষমতায় বসে জিয়াউর রহমান বিএনপি তৈরী করেন যাতে আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ ও অন্যান্য দলের নেতারা যোগ দেন। এখনও এমপি নির্বাচন করতে গেলে জনগণ এলাকার প্রতিষ্ঠিত ও আর্থিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরকেই সাধারণত ভোট দেয়। জামায়াতে যেহেতু প্রচলিত নেতাদের রং বদলে নেতা হবার সুযোগ নেই, তাই জামায়াত নেতাদের পক্ষে ভোট পাওয়া কষ্টসাধ্য। আদর্শিক কারণে ভোট দেয়া, দল করা ইত্যাদি বাংলাদেশে খুব একটা প্রচলিত নয়। তবে এর ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। সরকার গঠন করতে পারবে না, কিন্তু সব সময় জনগণের পাশে থাকে - এ ধরণের নেতৃত্বকেও জনগণ সমর্থন দিয়ে থাকে।
খ. বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলন ভূ-রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘদিন আমেরিকার সুদৃষ্টি পেয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে আমেরিকা চেয়েছে রাশিয়া ও ভারতের প্রভাব খর্ব করতে। ৭৫এর পট পরিবর্তনে তাই আমেরিকার একটি শক্তিশালী ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়। এমনকি বর্তমানেও আমেরিকা চাইবে না জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে। কেননা, তাতে ইসলামী ঐক্যজোটের মত কট্টর দলগুলি শক্তিশালী হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া বাংলাদেশ নিয়ে আমেরিকা ও ভারতের স্বার্থ কাছাকাছি থাকলেও তা পুরোপুরি এক নয়। আমেরিকা সম্ভবত: চাইবে না, বাংলাদেশের স্বাধীনতা পুরোপুরি হারিয়ে যাক। জামায়াতের আমীর মওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ভাষায়, বনসাই হিসাবে জামায়াতকে দেখতে চায় আমেরিকা এবং পশ্চিমা বিশ্ব। |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AnisurRahman |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
|