|
গণমাধ্যম ও রাজনীতি
আশিক মোহাম্মদ শফি |
|
বর্তমান যুগে রাজনীতিতে গণমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ই গণমাধ্যম রাজনীতি, জনমানস, জনমত ও সরকারী এজেন্ডা নির্ধারলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমার মতে এই গণমাধ্যমের প্রভাব, সাধারণভাবে আমরা যা ভাবি তার থেকেও অনেক বেশী। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এ সম্পর্কিত কিছু তাত্ত্বিক আলোচনা করতে চাই।
আমরা অনেক সময় ভাবি যে, গণমাধ্যম সাম্প্রতিক কালে বেশী ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে। কিন্তু আসলে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অনেক আগে থেকেই গণমাধ্যমের প্রবল ক্ষমতা ছিল। উনিশ শতকের শুরুতে সংবাদপত্রের বিকাশ হওয়ার সময় থেকেই রাজনীতিতে সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন ও বইপত্রের একটা ভূমিকা ছিল। ১৯৫০ সালের পর থেকে টেলিভিশন, ভূ-উপগ্রহ, আন্তর্জাল ও মুঠোফোনের বিকাশের পর গণমাধ্যম এখন আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। রাজনীতিতে তাই গণমাধ্যমের প্রভাবও অনেক বেশী প্রবল ও শক্তিশালী।
গণযোগাযোগ শাস্ত্রের তত্ত্ব মতে রাজনীতিতে গণমাধ্যমের কয়েক রকম প্রভাব আছে। প্রথম ও প্রধান প্রভাবটি হচ্ছে ‘এজেন্ডা নির্ধারণী প্রভাব’ বা agenda-setting effect। এর মূল মর্ম হল: গণমাধ্যম সাধারণ মানুষকে ধারণা দেয় যে এসময়কার মূল এজেন্ডা গুলো কি। গণমাধ্যমে যে বিষয়গুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশী আলোচনা হয়, জনগণ সে বিষয়গুলোকেই জনজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে প্রতীয়মান করে। সরকার বা কোন রাজনৈতিক দলকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে জনগণ গণমাধ্যমে প্রতিফলিত প্রধান ইস্যুগুলোর ভিত্তিতেই রায় দেয়। উদাহরণ স্বরুপ, বর্তমানে দেশে যেসব ইস্যু গণমাধ্যমে প্রধান আলোচিত বিষয়, সেগুলো হলো শেয়ার বাজার, সীমান্তে গোলাগুলি ও পৌরসভা নির্বাচন। এই তত্ত্বমতে কোন একটা জরিপ করে সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞেস করলে তারাও এই ইস্যুগুলোকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলবেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেকে হয়তো বলবেন, যে গণমাধ্যম তো বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে, অর্থাৎ কোন বিষয় জনমনে গুরুত্ব পেলেই তা গণমাধ্যমে গুরুত্ব পায়। কিন্তু গবেষণা দেখা গেছে, অধিকাংশ সময়ই তা হয় না। এজেন্ডাগুলো গণমাধ্যম থেকে জন মনে যায়, কিন্তু জনমন থেকে গণমাধ্যমে আসে না।
উদাহরণ স্বরুপ, সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনের খবর দেশের পত্রপত্রিকায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে ছাপানো হয়েছে, যার ফলে এখন জনমনেও এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।। সংবাদপত্রগুলো তো আর জনগণের মতামত জানার করার জন্য কোন জরিপ করেনি। সংবাদপত্রের পাতাগুলোতে ছোট করে এখবরটি প্রকাশিত হলে জনগণ এটা নিয়ে এতো ভাবতো কিনা তা সন্দেহ আছে।
এই এজেন্ডা নির্ধারণী প্রভাবের একটা বড় নিদর্শন লক্ষ্য করা যায় নির্বাচনের সময়। অধিকাংশ নির্বাচনে দেখা যায়, গণমাধ্যমের শীর্ষ বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করেই জনগণ ভোট দেয়। যেমন গত নির্বাচনে আগের সময়গুলোতে মিডিয়াতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল দুর্নীতি, খাদ্যদ্রব্যের দাম, জঙ্গীবাদ। জনগণ এ বিষয়গুলোতে চারদলীয় সরকারের পারফরম্যান্স বিবেচনা করেই ভোট দিয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, গণমাধ্যমের এই এজেন্ডা নির্ধারণী প্রভাব বিশ্বের সবকটি গণতান্ত্রিক দেশেই রয়েছে।
এ তত্ত্বের আরেকটি পরিবর্ধন হল ‘আরোপিত এজেন্ডা নির্ধারণ প্রভাব’ বা attribute agenda-setting theory। এ তত্ত্বমতে গণমাধ্যম শুধু জনমনে এজেন্ডাই ঠিক করে দেয় না। প্রতিটি এজেন্ডার কিছু উপ-ইস্যু থাকে। মিডিয়া প্রতিটি এজেন্ডার উপইস্যুও ও একটি আরোপিত ভাবমূতিও ঠিক করে দেয়।
উদাহরণ স্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের দেশের গণমাধ্যমে বেশ ভালো কভারেজ পায়। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যে উপ-ইস্যুগুলো নিয়ে বেশী লেখালেখি হয় তা হলো ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকরাজনীতি, হলগুলোর পরিস্থিতি, ক্যাম্পাসের অপরাধচিত্র এসব। এসব উপ-ইস্যু মিলিয়ে গণমাধ্যম গ্রাহকের মনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আরোপিত ইমেজও তৈরি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি কেমন বোঝাতে গিয়ে একজন মানুষ সম্ভবত উপরের টপিকগুলোর আলোকেই বিচার করেন।
আরেকটি উদাহরণ মতে, দেশের রাজনীতিবিদরা গণমাধ্যমে প্রচুর কভারেজ পান। রাজনীতিবিদদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, ক্যারিয়ার আর দোষ-গুণ আছে। দেখা যায় যে মিডিয়া শুধু কিছু রাজনীতিবিদদের প্রচুর কভারেজ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেই না, রাজনীতিবিদদের ব্যক্তিত্বের কিছু দিককে জনমনে অধিকতর প্রস্ফুটিত করে তোলে। যেমন দেখা যায়, ধানমন্ডীর আওয়ামী লীগ নেতা হাজী মকবুল জনমনে সন্ত্রাসী হিসেবে, তারেক রহমান দুর্নীতিবাজ, নাজমূল হুদা পাগলাটে, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বাচাল হিসেবে জনমনে পরিচিত। কিন্তু তাদের ব্যক্তিত্বের অন্য বহু দিকও আছে। কিন্তু গণমাধ্যমে বহুল আলোচনার ফলে এই আরোপিত ভাবমূতিই আজ প্রতিষ্ঠিত।
গণমাধ্যমের এই এজেন্ডা নির্ধারণী ও আরোপিত এজেন্ডা নির্ধারণী প্রভাব অনেক সময় আমরা যা আপাতত মনে করি তার চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী হতে পারে।
বিশেষত রাজনীতিতে বর্তমান সময়ে আমরা খুব কমই রাজনীতিবিদদের সরাসরি সংস্পর্শে এসে তাদেরকে গভীরভাবে জানতে পারি। জনগণ মূলত গণমাধ্যমের দ্বারা রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পকে ধারণা করে ও সেই ধারণার উপর ভিত্তি করে ভোট দেয়। তাই রাজনীতিতে গণমাধ্যমের শক্তিশালী প্রভাবকে তুচ্ছ করার উপায় নেই।
গণযোগাযোগ শাস্ত্রের আরেকটি ভিন্ন ধরনের তত্ত্ব হলো 'নিরবতার চক্র' বা Spiral of silence theory. এ তত্ত্ব বলে যে বাংলাদেশ বা জাপানের মতো দেশ, যেখানে গণতন্ত্র ও স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম আছে, সেখানে জনমত একধরনের 'নিরবতার চক্রের' ভিতর দিয়ে যায়। দেশের আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে মানুষ প্রথমে ধারণা করার চেষ্টা করে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত কোনটি কোনদিকে। সে প্রথমে বোঝার চেষ্টা করে যে তার মতামতটি সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত কিনা এবং তার মতামতের সপক্ষে জনমত পরিবর্তিত হচ্ছে কিনা। যদি সে বুঝতে পারে যে, তার মতামত সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়, বরং সংখ্যালঘিষ্ঠ, তখন সে বিষয়টির ব্যাপারে চুপ থাকে, বা নীরবতা অবলম্বন করে। আবার একজন মানুষ যখন দেখে যে জনমত ক্রমাগত তার মতামতের বিরুদ্ধে অবস্থানে যাচ্ছে, তখনও সে চুপ থাকার (মতামত প্রকাশ থেকে বিরত থাকার) চেষ্টা করে। এভাবে যখন ক্রমাগত সংখ্যালঘিষ্ঠ জনমত মতামত প্রকাশ থেকে বিরত থাকে, তখন সংশ্লিষ্ট সবাই ধারণা করে নেয় যে, সংখ্যগরিষ্ঠ মতামতের বাইরে আর কোন মতামত নেই। এভাবে সংখ্যালঘিষ্ঠ মতামত নীরবতার এক দুষ্টচক্রে পড়ে যায়।
গণমাধ্যম এই নীরবতার চক্রের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ জনগণ গণমাধ্যম থেকেই জানতে পারে জনমত কোন পক্ষে আছে। গণমাধ্যম জনগণকে জানিয়ে দেয় কোন ধরনের মতামত সবচেয়ে জোরদার ও কোন ধরনের মতামত দিলে প্রকাশ্যে কোন অসুবিধা হবে না।
উদাহরণ স্বরুপ, গত ইরাক যুদ্ধের আগে আমেরিকায় মিডিয়াগুলোতে যুদ্ধের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। ফলে অধিকাংশ মানুষ ইরাক আক্রমনকেই সমর্থন করতে থাকেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যুদ্ধের কয়েক মাস আগে থেকে মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগ (যা পরে কিছুই পাওয়া যায়নি) ছাপা হতে থাকে। কিন্তু অস্ত্র না থাকার ব্যাপারে বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয় নি। তাই জনগণ ইরাকে হামলা করা উচিৎ বলে মনে করতে থাকে। পুরো বিষয়টির সাথে দেশাত্মবোধ জড়িত থাকায় অনেকেই ইরাক যুদ্ধের বিরোধীতা করতে বা মতামত দিতে সংকোচবোধ করেছিল। যুদ্ধের বিরোধীতা করলে সন্ত্রাসীদের সহযোগী বা দেশদ্রোহী এমন আখ্যা পেতে হবে ভেবে যুদ্ধবিরোধী মানুষরাও নীরব থেকেছেন। ফলে আমেরিকার গণমাধ্যমে শুধু যুদ্ধের সপক্ষের মতামতগুলোই আসতে থাকে, আর যুদ্ধবিরোধী মতামত প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায়। সবশেষে ২০০৬ সালে যখন বুশ ইরাক আক্রমণ করে, তখন প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ জনগণ তাতে সায় দিয়েছিল। গনমাধ্যমে বিষয়টি ভারসাম্যের সাথে উপস্থাপিত হলে হয়তো জনমত (ক্রমান্তরে সরকারী পদক্ষেপ) অন্যরকম হতে পারত।
বর্তমানে আমরা গণমাধ্যমের যুগে বসবাস করি। রাজনীতিসহ আমাদের জীবনের বহু ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া আছে। এসব বিষয়ে আরেকটি লেখায় আরো আলোচনা করার ইচ্ছে রইলো।
লেখক: লেখক ও গবেষক, গণযোগাযোগ বিভাগ, স্নাতোকোত্তর কোর্সে অধ্যয়নরত, টেক্সাস টেক বিশ্ববিদ্যালয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AshikMohammadShafi |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| লেখক পরিচিতি: লেখক ও গবেষক আশিক মোহাম্মদ শফি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন গ্রাজুয়েট। বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস টেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ বিষয়ে স্নাতোকোত্তর কোর্সে অধ্যয়নরত আছেন। |
|