|
পবিত্র স্থাপনার অবমাননায় জায়নবাদীরা
আশরাফ রহমান |
|
ইতিহাসের নিরিখে ফিলিস্তিন সংকটকে যদি বিভিন্ন দিক থেকে দেখা যায় তাহলে ফিলিস্তিন সংকটই সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো সংকট হিসেবে পরিগণিত হবে নিঃসন্দেহে। ফিলিস্তিনীদের ওপর গণহত্যা চালানো, সন্ত্রাসের মতো অপরাধ নির্যাতন করা, তাদেরকে তাদের নিজস্ব ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করা, তাদেরকে কারাগারে বন্দী করে নির্মম নির্যাতন চালানো, তাদের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দিয়ে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য করা, তাদের ভূখণ্ডের ওপর ইহুদিবাদীদের উপশহর নির্মাণ করা ইত্যাদি ঐ বৃহৎ ট্র্যাজেডির কিছু দিক। ফিলিস্তিন ঘটনার আরেকটি জঘন্য দিক হচ্ছে কোরআন এবং মসজিদের অবমাননা। কিছুদিন ধরে অধিকৃত ফিলিস্তিনে এ ধরনের অবমাননাকর এবং অমানবিক ঘটনা বেশ বেড়ে গেছে। কোরআন এবং মসজিদের অবমাননা ফিলিস্তিনীসহ বিশ্বের সকল মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে মারাত্মক আঘাত করেছে।
গত কয়েক মাসে ইহুদিবাদী উপশহরের অধিবাসীরা গাযা উপত্যকা এবং জর্দান নদীর পশ্চিম তীরে বেশ কয়েকটি মসজিদে হামলা চালিয়েছে এবং অনেকগুলো কোরআন পুড়িয়েছে। ইহুদিবাদীরা সম্প্রতি পশ্চিমতীরের বেথেলহাম শহরের নিকটবর্তী একটি গ্রামে মাসজিদুল আম্বিয়ায় হামলা চালায় এবং মসজিদটিকে ধ্বংস করার পর মসজিদের কার্পেট ও কোরআনগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এছাড়াও তারা মসজিদের দেওয়ালগুলোতে কুরুচিপূর্ণ এবং ইসলামের প্রতি অবমাননাকর বিভিন্ন শ্লোগানও লিখে যায়। পশ্চিম তীরের নাবলূস শহরের কাছে এবং গাযা উপত্যকাতেও একইভাবে বেশ কয়েকটি মসজিদে হামলা চালিয়ে অনুরূপ কুরুচির পরিচয় দিয়েছে তারা। ইহুদিবাদী উপশহরের অধিবাসীদের এই পাশবিক হামলা সবসময়ই ইহুদিবাদী সেনাদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সহায়তায় চালানো হয়ে থাকে।
অবশ্য ইহুদিবাদীদের হাতে মুসলমানদের পবিত্র স্থাপনাগুলোর অবমাননা নতুন কোনো ঘটনা নয়। সেই ১৯৪৮ সালে ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কিংবা তারো আগে থেকেই অর্থাৎ যখন ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠিগুলো ফিলিস্তিনীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে ব্যাপক রক্তপাত ঘটাতে শুরু করে তখন থেকেই ইসলামী স্থাপনাগুলোর অবমাননা শুরু করে ইহুদিবাদীরা। গেল কিছুদিন আগে ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুসলিম অবমাননার আরো একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। ইন্টারনেটে একটি ফিল্ম আপলোড করা হয়েছে। ঐ ফিল্মে ইহুদিবাদী ইসরাইলী এক সেনা ফিলিস্তিনী এক নারীকে ঘিরে নেচে নেচে তাকে মানসিকভাবে জ্বালাতন করে। ফিল্মে দেখানো হয়েছে ফিলিস্তিনী ঐ রমনীর হাত দেয়ালে ঠেকানো আর ইহুদিবাদী ঐ সেনার পাগলামিপূর্ণ নাচ তাকেঁ ভীষণভাবে বিরক্ত করে তুলেছিল। এ রকম মানসিক অত্যাচারের আরো একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। কিছুদিন আগে ফিলিস্তিনী কিছু পুরুষ বন্দীকে হাত-চোখ বেঁধে মানসিকভাবে উত্যক্ত করেছে এক ইহুদিবাদী নারী সেনা।
ইহুদিবাদী ইসরাইলী সেনাদের রুচি এতো হীন এবং নীচ যে ফিলিস্তিনীদের হত্যা করার পর স্মৃতিস্বরূপ তারা ঐসব লাশের ছবি তুলে রাখে। ইহুদিবাদী প্রচার মাধ্যমগুলো ফিলিস্তিনী বন্দীদের অনুভূতিতে আঘাত করার মতো গেইম বা ফিল্ম প্রচার করার মধ্য দিয়ে তাদের ওপর মানসিক নিপীড়নও চালিয়েছে। রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরআন কিংবা মসজিদে অগ্নি সংযোগ করার মতো অপরাধ, বন্দীদের ওপর যৌন নির্যাতন, বেসামরিক ফিলিস্তিণীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো ইত্যাদি ইহুদিবাদীদের ব্যর্থতা ও চরম দুরবস্থারই পরিচয় বহন করে। এটা একেবারেই স্পষ্ট যে হাত পা বাঁধা বন্দীর ওপর অত্যাচার চালানো এবং নিরীহ মানুষ হত্যা করা কোনোভাবেই গর্ব করার মতো কিংবা বীরত্ব দেখানোর মতো পদক্ষেপ নয়, বরং এগুলো ইহুদিবাদী সেনাদের মানবীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং নিরেট পাগলামির প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। অবশ্য এগুলো তারা করছে তাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে। কেননা তারা চায় তাদের সেনারা কোনো রকম মানবাধিকার বা মানবীয় সম্মান-মর্যাদার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে ফিলিস্তিনীদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে যাক এবং মুসলমানদের পবিত্র স্থাপনাগুলোর নির্বিচার অবমাননা করে যাক।
আসলে ইহুদিবাদীরা মুসলমানদের প্রথম কেবলা মাসজিদুল আকসাকে ধ্বংস করতে। ইহুদিবাদীরা সেই ১৯৬৭ সালে মুসলমানদের কেবলা দখল করার পর থেকেই মাসজিদুল আকসাকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করে এসেছে। মাসজিদুল আকসা ধ্বংস করার পেছনে তাদের অজুহাত হচ্ছে সোলায়মান (আ) এর উপাসনালয়ের ধ্বংসাবশেষের ওপর নাকি মাসজিদুল আকসা বানানো হয়েছে। সেজন্যে এই মসজিদ ভেঙ্গে ফেলে সেখানে আবারো সোলায়মান (আ) এর মাবাদ বা উপাসনালয় গড়ে তুলতে হবে। ইহুদিবাদীদের এই দাবী আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে কিংবা ইতিহাসের দিক থেকে কোনোরকম ভিত্তি নেই।
তারপরও বহু শতাব্দী পূর্বে কোনো কওমের হাতে কারো উপাসনালয় ধ্বংস হওবার মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে মুসলমানদের পবিত্র স্থান যা মানবেতিহাসের অন্যতম ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার হিসেবে স্বীকৃত, এমন স্থাপনা ধ্বংস করা কোন বিবেকবান মানুষ সমর্থন করতে পারে না্।
ইহুদিবাদীরা কিন্তু কখনোই যৌক্তিক কোনো তথ্য-প্রমাণ কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো রীতিনীতির তোয়াক্কা করে নি,তারা কেবল তাদের অবৈধ উদ্দেশ্যগুলো হাসিল করার পেছনেই লেগে ছিল, তা যে-কোনোভাবেই হোক, তারা কখনোই আইন কানুনের ধার ধারেনি। মাসজিদুল আকসা ঐতিহ্য ও ওয়াকফ সংস্থা কয়েকদিন আগে এক বিবৃতিতে বলেছে, এই মসজিদটিকে কট্টর ইহুদিবাদী একটি গোষ্ঠির মাধ্যমে ইহুদিয়ায়ন করার উদ্দেশ্যে একটি কনফারেন্স করা হয়েছে। ঐ কনফারেন্সে মুসলমানদের পবিত্র এই স্থাপনা কী করে ধ্বংস করা যায় সে ব্যাপারে বিভিন্ন পথ বাতলে দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনী ঐ প্রতিষ্ঠানটি কদিন আগে আরো একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইহুদিবাদীরা মুসলমানদের পবিত্র এই স্থাপনাটির তলদেশে ব্যাপক খনন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বহুবার খনন কাজ চালানোর ফলে মাসজিদুল আকসার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা সাধারণ একটি ভূমিকম্পেই মসজিদটি ধ্বংস হয়ে যাবে।
দুঃখজনক বিষয়টি হচ্ছে, এতো কিছুর পরও অনেক আরব দেশসহ বহু মুসলিম দেশ ইহুদিবাদী ইসরাইলীদের এহেন ন্যক্কারজনক পদক্ষেপের নিন্দা পর্যন্ত জানায়নি। ইহুদিবাদীরা ইসলামের ন্যায়কামী ও অত্যাচার-জুলুম প্রতিরোধী শিক্ষাগুলোকে তাদের বর্ণবাদী ও আধিপত্যবাদী চিন্তা বাস্তবায়নের পথে বাধা বলে মনে করে। এ কারণেই তারা লেবাননের হিযবুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনের জেহাদে ইসলামী দল এবং হামাসের বিরুদ্ধে লড়ছে। তাই কোরআন কিংবা মসজিদের মতো ইসলামী স্থাপনায় হামলা করা ইহুদিবাদীদের কাছে অপ্রত্যাশিত নয়। তারা এই পবিত্র স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বরং বোঝানোর চেষ্টা করছে যে তারা ইসলামকে ভয় পায়। ইহুদিবাদীদের বিরুদ্ধে তাই মুসলমানদের দৃঢ় ঐক্য গড়ে তোলা এবং তাদেরকে প্রতিরোধ করার কোনো বিকল্প নেই।
লেখকঃ সাংবাদিক |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AshrafRahman |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|