|
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী প্রসঙ্গে
আতাউর রহমান |
|
যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ১৯৭২-এর পর শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের দ্বারা সম্ভব হয়নি, উপরন্তু যারা আটক ছিল তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছিল, তাদের বিচার এখন হচ্ছে। এর জন্য ট্রাইব্যুনালও গঠিত হয়েছে, যারা এই বিচার কাজ পরিচালনা করছেন। যথাসময়ে এ কাজ না করে দুর্বোধ্য দেরিতে এ কাজ শুরু হলেও এতে দোষ নেই। কারণ প্রকৃত ক্রাইম বা অপরাধ তো দেরির জন্য অবিচারযোগ্য হয় না। অপরাধের বিচার কাজের ন্যায্যতা সব সময়েই থাকে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে বর্তমান আলোচনার উদ্দেশ্য, এর একটি দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। সে দিকটি হল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বলতে আসলে যা বোঝায়, সেটা এখন ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যে বিচার হচ্ছে তার মাধ্যমে হচ্ছে না। এ বিষয়ে আমি সংক্ষিপ্তভাবে আগেও লিখেছি, কিন্তু এখানে আরও একটু খোলাসাভাবে এটা বলার চেষ্টা করব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন যৌথভাবে একটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। সেই ট্রাইব্যুনাল বিচার করে যাদের শাস্তি দিয়েছিল তার মধ্যে হিটলারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিবেনট্রপ ছাড়া বাকি সবাই ছিল সামরিক বাহিনীর লোক। যুদ্ধ যারা করে, যুদ্ধাপরাধের জন্য তারাই দায়ী এবং সরাসরি যুদ্ধ হল সামরিক বাহিনীর ব্যাপার। এ কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য নুরেমবার্গ ট্রায়ালে যাদের শাস্তি হয়েছিল, একজন ছাড়া তারা সবাই ছিল সামরিক বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের অফিসার।
বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তানিরা সামরিক বাহিনীর কোন বাঙালি অফিসার বা জওয়ানকে নিজেদের পক্ষে পায়নি। পুলিশ বাহিনীর কোন সদস্যও তাদের সঙ্গে থাকেনি। কাজেই ১৯৭১ সালের ৯ মাসজুড়ে যারা আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে এক নিষ্ঠুর লড়াই করেছিল, লাখ লাখ নিরীহ মানুষ খুন করেছিল, অসংখ্য নারী ধর্ষণ করেছিল, লাখ লাখ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তারা ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোক। এ কাজের মূল হোতা তারা হলেও তাদের এই অপরাধমূলক কাজে সহায়তার জন্য তারা এদেশীয় কিছু বেসামরিক লোক দিয়ে গঠন করেছিল রাজাকার, আলবদর ইত্যাদি বাহিনী। অনেক সময় অনেককে তারা বাধ্য করেছিল তাদের এই ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীতে যোগদান করতে। কোন কোন রাজনৈতিক দল ও হাতেগোনা কিছু বুদ্ধিজীবীও এ কাজে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে সাহায্য করেছিল।
এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বলতে যাদের বিচার হচ্ছে তারা হল পাকিস্তানি বাহিনীর এই দ্বিতীয়োক্ত সহায়তাদানকারী। এর মধ্যে যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের বিচার হওয়া দরকার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সহায়তাকারীদের এভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলেও যাদের সহায়তা করার জন্য এরা অপরাধী, তাদের জন্য কোন বিচারের কাঠগড়া নেই। বর্তমানে যে যুদ্ধাপরাধী ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে, সেই ট্রাইব্যুনালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিহ্নিত ১৯৫ জন অপরাধী অফিসার এবং সেই সঙ্গে বেসরকারি পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে কোন ব্যবস্থা নেই! শুধু ব্যবস্থা নেই তা-ই নয়, তার কোন উল্লেখও এই বিচার প্রসঙ্গে শোনা যায় না!!
এদেশীয় বেসামরিক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এখন হচ্ছে। কিন্তু পাকিস্তানি বেসামরিক যুদ্ধাপরাধীদের খবর কী? ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সব থেকে বড় ও বিপজ্জনক যুদ্ধাপরাধী ছিল জুলফিকার আলী ভুট্টো। শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলনে গিয়ে প্রকাশ্য মঞ্চে জুলফিকার আলী ভুট্টোর গালে চুমু খেয়ে তাকে নিজের পরম বন্ধু বলে সম্বোধন করেছিলেন! এর পরই তিনি ভুট্টোকে বাংলাদেশের পরম বন্ধু হিসেবে ঢাকায় আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে রাজকীয় সংবর্ধনা দিয়েছিলেন!! যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে এক নম্বর আসামি করে যাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কথা ছিল তাকে যে শুধু মাফ করেই দেয়া হয়েছিল তা-ই নয়, তাকে পরম বন্ধু ও মিত্র হিসেবে আহ্বান করা হয়েছিল! কিন্তু ভুট্টো ছিল কার বন্ধু? কার মিত্র? বাংলাদেশের জনগণের, না শেখ মুজিবের? বাংলাদেশের জনগণের কোন বন্ধু তো নয়ই, এমনকি পরম ও চরম শত্র“ ছিল জুলফিকার আলী ভুট্টো। সেই ভুট্টো যদি শেখ মুজিবের পরম বন্ধু হয়, তাহলে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে শেখ মুজিবের সম্পর্ক দাঁড়ায় কী রকম? এসব তো বানিয়ে বলা অথবা কারও বিদ্বেষপ্রসূত কোন কথা নয়।
এ হল এক তর্কাতীত ঐতিহাসিক সত্য।
যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্তানি সামরিক অফিসারকে ভারত ১৯৭২ সালে নিজেদের সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে গেল। তারপর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব, তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদের অন্যান্য সদস্য এবং আওয়ামী লীগ নেতারা বলতেই থাকলেন যে, সেই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি সামরিক অফিসারের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে। কিন্তু সে বিচার হল না, হওয়া সম্ভব ছিল না। সেটা সম্ভব হতো যদি ১৯৫ জনকে ভারতে যেতে না দিয়ে বাংলাদেশে আটক রাখা যেত। তা হয়নি। পরে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত নিজেদের স্বার্থের অঙ্ক কষে ১৯৫ জন পাকিস্তানি সামরিক অফিসারকে পাকিস্তানে ফেরত দেয় এবং বাংলাদেশও এই এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এটা কি কোন দেশপ্রেমমূলক কাজ ছিল? এ কাজ কি জঘন্যতম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন না করে তাদের মাফ করে দেয়ার শামিল ছিল না? হ্যাঁ, তা-ই ছিল এবং সেটা করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বারা, শেখ মুজিবের দ্বারা। এসব কথা মতলববাজ লোকেরা ভুলে গেলেও যারা সত্যিকার অর্থে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান তাদের ভোলার কথা নয়। তারা ভোলেননি।
কাজেই বর্তমানে সরকার যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করেছে সে প্রক্রিয়া যাতে সঠিক হয়, তার জন্যই পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়টিও এখন সামনে আনা দরকার। এর কারণ সহজবোধ্য। আসল যুদ্ধাপরাধীদের বাদ দিয়ে শুধু তাদের সহযোগীদের বিচার যদি করা হয়, তাহলে সে বিচারকে কখনও ন্যায়বিচার বলা চলে না। কাজেই যথাযথভাবে এ বিচার সম্পন্ন করার জন্য পাকিস্তানি সামরিক ও বেসামরিক যুদ্ধাপরাধীদেরও এখন হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
দেখা যাচ্ছে যে, সরকার এখন দেশের বাইরে দীর্ঘদিন বসবাসরত বাঙালি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য দেশে ফেরত আনার চেষ্টা করছে। এরকম দু’জন ব্রিটিশ নাগরিককেও দেশে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য তারা ব্রিটিশ সরকারকে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু এভাবে বাঙালি যুদ্ধাপরাধীদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়ার জন্য কেন সরকার এবং সরকার গঠিত ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে পাকিস্তান সরকারের কাছে দাবি করা হচ্ছে না? শেখ মুজিবুর রহমানের মতো বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকারও কি তাদের মাফ করেছেন? এ কাজ যে বিশ্বের যুদ্ধাপরাধী বিচারের ইতিহাসে এক অদৃষ্টপূর্ব দৃষ্টান্ত এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সরকার যা-ই বলুক, জনগণ কখনও পাকিস্তানি অপরাধীদের মাফ করতে পারেন না। তারা শুধু বাঙালি নয়, পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদেরও বিচার চান।
সরকারি লোকজন এখন প্রায়ই চিৎকার করেন যে, চক্রান্তকারীরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার চেষ্টায় নিযুক্ত আছে। এটা ঠিক, যেসব পার্টির লোকজনকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আটক করে তাদের বিচার করা হচ্ছে তারা এই বিচারের বিরোধী। কিন্তু এর মধ্যে কোন চক্রান্ত নেই। তারা প্রামাণ্যভাবেই এটা করছেন। এর বাইরে এমন কেউ নেই যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছেন। কাজেই এই চক্রান্তের কথা বলে আসলে বিচারপ্রক্রিয়া নির্বিঘœ করা অপেক্ষা নিজেদের স্বার্থে এবং হাজারো সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই এই প্রচারকাজ সরকারের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে। জনগণের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। তবে প্রকৃত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতার বাইরে রেখে যে বিচার এখন হচ্ছে, এতে সাধারণ মানুষের উৎসাহিত হওয়ার কিছু নেই। তারা এ নিয়ে যে বিশেষ উৎসাহবোধ করেন এমনও নয়।
বাংলাদেশ সরকার থেকে এখন পাকিস্তানকে বলা হচ্ছে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতে। তারা ক্ষমা চাওয়ার ধারেকাছেও নেই। তারাও ভালোভাবে জানে যে, শেখ মুজিবুর রহমান অনেক আগেই তাদের মাফ করে দিয়ে গেছেন। কাজেই তাদের তরফ থেকে এখন মাফ চাওয়ার কোন প্রশ্ন নেই। কিন্তু তাদের তরফ থেকে সে প্রশ্ন না থাকলেও এখন যেহেতু এখানে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, সে কারণে এই বিচারকে ন্যায়সঙ্গত করার জন্য আওয়ামী লীগ জোট সরকার এবং তাদের দ্বারা গঠিত ট্রাইব্যুনালের উচিত পাকিস্তানকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতে বলা নয়। ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি সামরিক ও বেসামরিক যুদ্ধাপরাধীদের এখানে বিচারের জন্য পাঠানোর দাবিই পাকিস্তান সরকারের কাছে করা দরকার। সে দাবি যদি এ সরকার না করে, তাহলে লোক ঠকানোর জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করলেও প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নস্যাৎ করার ক্ষেত্রে তারাই সব থেকে বড় চক্রান্তকারী হিসেবে চিহ্নিত হবে।
(সূত্র: যুগান্তর,২২/০৪/১২)
|
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AtaurRahman |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| লেখক : অভিনেতা-নাট্যনির্দেশক |
|