কাজী সালাহউদ্দীনের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ফরিদপুর হাইস্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হওয়ার দিন। ধীরস্হির স্বভাবের। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। সহপাঠী অন্যান্য বন্ধুর মতো তার সঙ্গে আমার একটা সাধারণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ক্লাস সেভেনে যখন উঠি, তখন স্কাউটদের এক জাম্বুরিতে এসে আমি সালাহউদ্দীনকে আবার নতুনভাবে আবিষ্কার করি। ওর নেতৃত্ব দেয়ার সহজাত ক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করে। কুচকাওয়াজ পরিচালনার আশ্চর্য গুণাবলী দেখে মনে হয়েছে, ও একদিন বড়মাপের দলনেতা হবে। হ্যাঁ, তাই হয়েছিল। কিন্তু তাকে আমরা মনে রাখিনি। স্কুলজীবন শেষ করে আমি রাজেন্দ্র কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হই আর সালাহউদ্দীন ভর্তি হয় মানবিক শাখায়। কলেজ জীবনে লেখাপড়ার পাশাপাশি আমি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও জড়িয়ে পড়ি। তাই সালাহউদ্দীনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হতো কম। কিন্তু যখন দেখা হতো, তখনই ওর ঠোঁটে ফুটে উঠত সেই পরিচিত হাসি। জিজ্ঞেস করত, বন্ধু কেমন আছ?
ইতোমধ্যে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এগারো দফা কর্মসুচিসহ। ঐতিহাসিক কারণে তখন রাজনীতির নিয়ামকশক্তি ছাত্রসমাজ। দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। চারদিকেই একটা বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্হা। শেষ পর্যন্ত পাক সমর শাসকরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। ১ ডিসেম্বর, ১৯৭০ সালে নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করা সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র। দিনক্ষেপণ হতে থাকে একের পর এক। ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসার কথা। কিন্তু তার আগে ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান এক ঘোষণায় তা স্হগিত করেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে সমর শাসকরা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি নয়। শেষ পর্যন্ত পাক সমর শাসকদের চক্রান্তে গণরায় উপেক্ষিত হওয়ায় ঐক্যবদ্ধ বাঙালিরা বাধ্য হয় স্বাধীনতা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে। দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চুড়ান্ত বিজয়। আমরা লাভ করি স্বাধীন পতাকা, স্বাধীন ভুখন্ড। ১৬ ডিসেম্বরের মাত্র ৭ দিন আগে ৯ ডিসেম্বর ফরিদপুর শহরের উপকণ্ঠে ধোপাডাঙা চানপুর নামক স্হানে পাক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনী সালাহউদ্দীন গ্রুপের দিনব্যাপী সরাসরি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেই যুদ্ধে শহীদ হয় সালাহউদ্দীনসহ সাত বীর মুক্তিযোদ্ধা।
দুই.
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বাতাসে কথা ছড়িয়ে পড়তে থাকে, পাক আর্মি যে কোনো সময় ফরিদপুর আক্রমণ করতে পারে। একটা অস্হির অব স্হা তখন। যদি হানাদার বাহিনী এসে পড়ে, তাহলে কীভাবে ফরিদপুর শহর এবং ফরিদপুরবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে হবে, চলছে সেই আলোচনা। এদিকে প্রতিদিনই স্হানীয় তরুণ ও মধ্য বয়সীদের নিয়ে ফরিদপুর ষ্টেডিয়ামে চলছে ড্যামি রাইফেল নিয়ে মার্চপাষ্ট। গেরিলা যুদ্ধের মহড়া। এভাবেই এক একটি দিন অতিক্রান্ত হতে থাকে। এপ্রিলের শেষ দিকে ফরিদপুর শহর ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে থাকে। যারা গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছিল, তাদের অনেকেই শহর ছেড়ে গেছে। আমার পক্ষেও শহরে অবস্হান করা নিরাপদ ছিল না। এরকম অবস্হায় একদিন আমাদের মহল্লার এক বন্ধু নওফেলের সঙ্গে আমার দেখা হয়। ফরিদপুর পুলিশ লাইনের উল্টো দিকে মদের ডিপোর পুকুরঘাটে বসে তার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ঠিক হয় ওইদিন সন্ধ্যায় সে এবং ডা. রুনু (ইমরান মজুমদার)আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে। আমি বাসায় কাউকে না জানিয়ে নওফেলের সঙ্গে হেঁটে রওনা দিই। পথে ডা. রুনু এসে যোগ দেন। শহরের উত্তর প্রান্তে চুনারঘাটে এসে নিঃশব্দে একটি এক মালাইয়ের নৌকায় উঠি। এ সময় ছইয়ের ভেতর থেকে একজন আমার নাম ধরে ডাক দিল। বলল আতাহার, ভেতরে এসে বসো। কণ্ঠস্বর পরিচিত। কিন্তু কে, বুঝতে পারছিলাম না। কাছে গিয়ে চমকে উঠি, আমারই দীর্ঘদিনের সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাজী সালাহউদ্দীন। অপার বিস্ময়ে আলোড়িত হই। মোমিন খাঁ-ঘাটে অবস্হিত সালাহউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে গিয়ে উপস্হিত হই। সেখানে বেশক’জনই আছে আমার আগের পরিচিত। ফরিদপুর শহরের ছেলে তারা। প্রত্যেকের চোখে-মুখে বিশ্বাসের জ্বলজ্বলে আলো। এমন পরিচিত বান্ধব পরিবেশ পাবো, ভাবতেই পারিনি। তার ওপর দলের কমান্ডার সালাহউদ্দীন। আমার বন্ধু।
সালাহউদ্দীনের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে-যে কোনো অপারেশনে যাওয়ার আগে শীর্ষ কয়েক জনকে নিয়ে সে পরিকল্পনা করতো। ম্যাপ এঁকে শত্রুর অবস্হান দেখিয়ে বোঝাত কীভাবে অগ্রসর হতে হবে, আর অগ্রসরবর্তী গ্রুপকে সহায়তা দেয়ার জন্য আরো একটি গ্রুপ কীভাবে কোথায় অবস্হান নেবে। অবাক হতাম এই ভেবে যে, একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাপতির গুণাগুণ ও কীভাবে আয়ত্ত করল। তার ছক আর পরিকল্পনামাফিক প্রতিটি অপারেশনই শেষ অবধি সফল হতো। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ফরিদপুর শহরে গুরুত্বপুর্ণ স্হাপনায় একাধিকবার গ্রেনেড চার্জ।
এসব আক্রমণের লক্ষ্য ছিল পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের মনোবল ভেঙে দেয়া। কাজটি যে জটিল তা বলাইবাহুল্য। আমাদের বড় সাফল্য আসে কামারখালী আর গোয়ালন্দঘাট অপারেশনে। ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা নৌবাহিনীর দু’সদস্য আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। তাদের নিয়েই সালাহউদ্দীন এই দুটি অপারেশনের সফল নেতৃত্ব দেয়। সাফল্যের তালিকায় আরো আছে ফরিদপুর-গোয়ালন্দ মহাসড়কের বারোখাদা ব্রিজ অপারেশন, খানখানাপুর রেল ব্রিজ অপারেশন। এসব অপারেশনের ভেতর দিয়ে শত্রু পক্ষকে শুধু ঘায়েল করা হয়নি, তাদের অস্ত্রশস্ত্রও আমাদের দখলে এসেছে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে মোমিন খাঁ ঘাটে হানাদার পাকবাহিনী দ্বারা আমরা হঠাৎ আক্রান্ত হই। সে সময় বাধ্য হয়ে আমাদের ক্যাম্প সরিয়ে নিতে হয় খলিলপুরে। পরে সেখান থেকে নগরকান্দা থানার চিতারবাজার ও বিভাগদির মধ্যবর্তী গ্রাম নতুবদিয়ায় ক্যাম্প স্হানান্তরিত হয়। এখানে আসার পর আমাদের গ্রুপের একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটে। শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে হেমায়েত তালুকদারের গ্রুপের সঙ্গে সালাহউদ্দীন গ্রুপ যুক্ত হয়ে বৃহৎ ও শক্তিশালী মুক্তিযোদ্ধা দলে পরিণত হয়। তখন থেকে এই গ্রুপটি পরিচালিত হতো যৌথ নেতৃত্বে। নতুবদিয়ার এই ক্যাম্প থেকেও ফরিদপুর শহর এবং ফরিদপুর-যশোর মহাসড়কের টহলদানকারী হানাদার বাহিনীর কনভয়ের ওপর গেরিলা পদ্ধতিতে আক্রমণ পরিচালিত হতো।
৮ ডিসেম্বর রাত ১০টার দিকে সালাহউদ্দীন আমাকে ডেকে নিল। বলল ৯ ডিসেম্বর সকালে অপারেশনে যেতে হবে। হাতে আঁকা একটা ম্যাপ আমাকে দেখাল। তাতে শত্রুপক্ষের অবস্হান চিহ্নিত।
পরদিন ৯ ডিসেম্বর। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে মার্চপাষ্ট করে সারিবদ্ধ হয়ে আমরা ২১ জন মুক্তিযোদ্ধা তৈরি হয়ে নিলাম। সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ছিল একটি এলএমজি, একটি ২ ইঞ্চি মর্টার, ২টি ষ্টেনগান, বাকিগুলি সব এসএলআর ও ৩০৩ রাইফেল। তাছাড়া আমাদের অনেকের কাছেই ছিল ২টি করে গ্রেনেড। সালাহউদ্দীন ও হেমায়েত তালুকদার আমাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিল। সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে সালাহউদ্দীনের নেতৃত্বে অপারেশনস্হলের উদ্দেশে আমরা এগুতে থাকি।
তাম্বলখানা খামারবাড়ির প্রায় এক মাইল পশ্চিমে, ফরিদপুর কামারখালী হাইওয়ে থেকে একটি অর্ধপাকা সড়ক কিছুটা দক্ষিণ-পশ্চিমমুখো হয়ে ধোপাডাঙা-চানপুরের দক্ষিণ পাশ দিয়ে করিমপুর বাজার স্পর্শ করে সোজা পশ্চিমে চলে গেছে। সকাল ১০টার দিকে ধোপাডাঙা-চানপুরের এ রাস্তা পর্যন্ত আমরা বাধাহীনভাবে এগিয়ে আসি। রাস্তাটির উত্তরে দু’বর্গমাইলব্যাপী একটা খোলা চক। পুরোটাই আবাদযোগ্য জমি। শুধু পুর্বদিকে একটা অংশে আখক্ষেত। চকের ঠিক মাঝবরাবর রয়েছে সমতল ভুমি থেকে প্রায় দশ ফুট উঁচুতে মাটির টিলার মতো দেখতে জায়গার ওপর শুধু একটি বাড়ি। এর চতুর্দিকে চকের জমি। সালাহউদ্দীন রাস্তা পার হয়ে এই খোলা চকের ভেতর দিয়ে উত্তরমুখী অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিল। তার নির্দেশ অনুযায়ী এগুতে থাকি। এক সময়ে চকের মাঝ বরাবর সেই টিলার মতো মাটির ঢিবির ওপর বাড়ির কাছে এসে পৌঁছাই। আমরা কয়েকজন দ্রুত মাটির ঢিবি বেয়ে ওই বাড়ির আঙিনায় উঠে আসি। দেখি একজন লোকও নেই। শুন্য উঠানের এক কোণে লম্বা লোহার ভান্ডে আখের রস গুড় বানানোর জন্য জ্বাল হচ্ছে। কেমন যেন খটকা লাগল মনে। সেখান থেকে নেমে আসতে যাব, ঠিক সেই সময় চতুর্দিক থেকে বৃষ্টির মতো শুরু হয় গুলি। থেকে থেকে মর্টার শেল এসে পড়ছে আমাদের চারদিকে। বুঝতে অসুবিধা হয় না পাক-সেনারা আমাদের ঘিরে ফেলেছে। ওই অবস্হায় সালাহউদ্দীন নির্দেশ দিল, তোমরা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে বাড়ির তিন দিকে গিয়ে পজিশন নাও এবং চেষ্টা করো প্রতিপক্ষের ব্যুহ ভেঙে বেরিয়ে যেতে। সালাহউদ্দীন ও নওফেল দলের অধিকাংশ সদস্য নিয়ে বাড়িটির পুর্ব ও দক্ষিণ দিক থেকে প্রতিরোধের জন্য এগিয়ে গেল। আর আমি বাড়ির পশ্চিমে চকের ভিতর দিয়ে এগুতে থাকি। প্রচন্ড গোলাগুলির ভেতর দিয়ে সময় গাড়িয়ে চলছে। আমার পাশাপাশি ছিল ফরিদ (সালাহউদ্দীনের ছোট ভাই), ওহাব, ইদ্রিস ও সিরাজ। এই বিরুপ অবস্হার ভেতরেও আমরা শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাই একটা উঁচু দেড় ফুট প্রস্হের লম্বা আইল। এই আইলের উত্তর পাশে পুরো শরীর আড়ালে রেখে আমরা ধীরে ধীরে ক্রলিং করে পশ্চিমে এগুতে থাকি। শিলাবৃষ্টির মতো অসংখ্য গুলির আঘাতে খেতের মাটির চাকাগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে মর্টার শেল এসে পড়ছে। তার ভেতর দিয়েই পাল্টা গুলি চালিয়ে একটু একটু করে আমরা দক্ষিণ-পশ্চিমে এগুতে থাকি।
পেছনে পড়ে থাকল সালাহউদ্দীন, নওফেল, খোকন, বাদশা, হামিদ, মমিন, আওয়াল, হামিদ, মজিবর, জাফর, সোহরাব, নয়ন, ইদ্রিস, শাহাদত, কালা কাদের ও উকিল। ওরা তখনও প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সালাউদ্দীনের হাতে ছিল এলএমজি। তার শব্দও শোনা যাচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ শত্রুপক্ষের একটি বুলেট ওহাবের মাথা এফোঁড়-ওফোঁড় করে চলে যায়। মৃদু গোঙানির মতো ছোট একটা শব্দ শোনা গেল মাত্র। তারপর নিথর হয়ে পড়ে থাকলো তার নিষ্প্রাণ দেহ। আমাদের গ্রুপের সবচাইয়ে কম বয়েসী, ক্লাস নাইনের ছাত্র ওহাবের লাশ এভাবে ফেলে চলে আসতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু আমরা নিরুপায়। বিকাল চারটার দিকে চকের পশ্চিমের শেষ মাথায় একটি খালের পাড়ে এসে পৌঁছাই আমি, ফরিদ, সিরাজ ও ইদ্রিস। সেই খাল পাড় হয়ে নিরাপদ স্হানে এসে দ্রুত খবর দিই হেমায়েত ভাইকে। তিনি এসে পৌঁছানোর পর সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে করেই হোক পাক আর্মির ঘেরাওয়ের মধ্যে আটকে পড়া সহযোদ্ধাদের উদ্ধার করতে হবে। খবর দেয়া হলো পার্শ্ববর্তী মুক্তিযোদ্ধা-গ্রুপ ইলিয়াসকে। তিনি তার দলের চার মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে যোগ দিলেন আমাদের সঙ্গে। আমরা মিলিতভাবে চেষ্টা করলাম পেছন থেকে পাক আর্মির ওপর পাল্টা আক্রমণ পরিচালনার। এতে হয়তো আটকেপড়া সহযোদ্ধাদের বেরিয়ে আসার একটা পথের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। আমরা কিছুটা পথ এগিয়েও গেলাম। কিন্তু আকস্মিকভাবে বাধাগ্রস্ত হলাম। আমাদের লক্ষ্য করে শত্রুপক্ষের অস্ত্র থেকে বৃষ্টির মতো বুলেট বেরিয়ে আসতে থাকে। সামনে আর এগুলো সম্ভব হলো না। পাশে তাকিয়ে দেখি, হেমায়েত ভাইয়ের ডান হাত মারাত্মকভাবে আহত। রক্ত ঝরছে। তার হাত থেকে এসএমজি মাটিতে পড়ে যায়। শত্রুপক্ষের একটি বুলেট তার আঙুল ফুটো করে বেরিয়ে গেছে। আহত হেমায়েত ভাইয়ের দ্রুত চিকিৎসা দরকার। ডা. রুনুকে খবর দেয়া হলো। এ অবস্হায় ইলিয়াস বললেন, এত কম লোকবল, অস্ত্র আর রসদ নিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়া বোকামি ছাড়া কিছু না। কথাটি সত্যি। একটা নিয়মিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া কী করে আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাব? বুকের ভেতরে কষ্ট অনুভুত হলো। তাহলে কী আমাদের প্রিয় সঙ্গীদের আমরা মুক্ত করতে পারব না। অজান্তেই চোখের পাতা ভিজে ওঠে।
তিন.
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে আসে। যুদ্ধস্হল থেকে মাইল দেড়েক দুরে আমরা অবস্হান নিই। অপেক্ষায় থাকি সহযোদ্ধারা কখন ফিরে আসে। কেউ কেউ এর মধ্যে ফিরেও এসেছে। কিন্তু ফেরেনি ৭ বীর মুক্তিযোদ্ধা। কোনোদিন আর ফিরে আসেননি সেই সাহসী যোদ্ধা কাজী সালাহউদ্দীন, নওফেল, ওহাব, হামিদ, মজিবর, আওয়াল ও সোহরাব। (সূত্র, আমার দেশ, ১৬/১২/২০০৮)