|
রাজনীতি কখনো রাজাদের দেশে চর্চা হয়না!
আতিক মাহবুব |
|
রাজনীতি শব্দের উৎস হচ্ছে ইংরেজী politics শব্দ হতে। আর এটি এসেছে গ্রীক শব্দ polis থেকে,যার অর্থ দাঁড়ায় নগর। গ্রীক সভ্যতায় রাজারা যে জায়গায় যেখানে থাকতেন তার এলাকাভূক্ত স্থানকেই নগর বুঝাতো। পলিটিক্স তখন সেই নগরীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সময়ের পরিক্রমায় এখন আর রাজাদের সেই পলিটিক্স নেই। এখন পলিটিক্স শহরে, বন্দরে, পল্লীতে এমনকি যানবাহনে চড়ে বেড়াচ্ছে।
সাধারণত রাজনীতি বলতে যদি নীতির রাজ হয় তাহলে বোঝা যায় যে, যারা রাজনীতিতে আসবেন যাদের ধন মন হবে বড়, তারা হবেন বিবেকবান,ভাল বংশের শিক্ষিত ও বিচক্ষণশীল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। যাদের কথা হবে সুশ্রী, সুমধুর,ব্যবহার এক কথায় মার্জিত।
তবে সময়ের ব্যবধানে আজ রাজনীতি সংজ্ঞা ও বিষয়বস্তুর অনেক তফাৎ সৃষ্টি হয়েছে ।
মাত্র কয়েক বছর পূর্বেও আভিজাত্যে বজায় রাখতে লোকেরা রাজনীতিতে আসতো। কিংবা যারা ভাল ছাত্র আদব-কায়দায় ছিল রুচিবোধ, ছিল না ছোটলোকি বা গালিগালাজের ভাষা, তাদের মাঝে ছিল সহনশীলতা ও পরমসহিষ্ণুতা তারা রাজনীতি করতো। রাজনীতিতে তখন ধনীর পাশাপাশি মধ্যবিত্ত ও গরিব পরিবারের থেকেও আসতো। তবে তারা ছিল ‘কালচার্ড’।
তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে বর্তমান রাজনীতিতে নেতা-নেত্রীর ভাষা ব্যবহার ও অনুসৃত আচরণে রাজনীতির পট পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে। তাদের অধিকাংশের নেই কোন আভিজাত্য/ঐতিহ্য ও যোগ্যতা, যারা কখনো কৃষ্টিবান ছিলেন না, নেতা-নেত্রীর বডির্গাড কিংবা ব্যাগ বহন করে দলের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঢুকে পড়েছেন। অথবা যারা গোবরে পদ্মফুল হয়ে ফুটেছিলেন তারাও নেতৃত্বে আসছেন। ফলস্বরূপ গোবর গোবর গন্ধ থাকায় তাদের আচার ব্যবহার একসময় রাজনীতিকে রাজ-নীতি থেকে বস্তি বানিয়েছে।
এর মধ্যে অনেকের ছাত্র জীবনে নেই কোন ট্রেনিং, কোনো উজ্জ্বল ফলাফল বরং আছে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, লুটপাট খুন ও ধর্ষণের সেঞ্চুরিতে চ্যাম্পিয়ান। তাই তাদের কাছ থেকে রাজনীতি নামক বৃক্ষ থেকে সুমিষ্ট ফলের বিপরীতিতে পাচ্ছি টক ও মাকাল ফল।
ডাক্তার ও প্রকৌশলে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে যেভাবে বিষয়গত যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হতে হয় রাজনীতিতে এ ধরনের কোনো মাপকাঠি বা ‘স্ট্যান্ডার্ড’ না থাকায় সৃষ্টি হচ্ছে কলুষিত রাজনীতিবিদ ও রাজনীতি নিয়ে শিল্প ব্যবসায়ীদের। আর এই ব্যবসা থেকে অনেকে তড়িৎ সুফল পাওয়ায় ব্যবসাও এখন তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ। সকলে এই ব্যবসায় নামার ফলে দল হচ্ছে ঝাপটা-ঝাপটির বস্তুর মত। ফলে কাড়াকাড়ির এই প্রতিযোগিতা থেকে রাজ-অন্তরের সুশিক্ষিতরা সরে পড়তে বাধ্য হচ্ছেন।
অপরদিকে নব্য রাজনীতি ব্যবসায়ীদের গুন্ডামী ও মাস্তানীতে দেশ ও দশের বারটা ক্রমশ: বেজেই চলেছে। একেক ক্যাডাররা দেশের জন্য হয়ে উঠছেন বিপদজনক আর দলের জন্য মধ্যমণি। যেখানে আগেরকার রাজনীতিবিদদের নাম নিলে হৃদয় পবিত্র ভাবধারায় জেগে উঠতো সেখানে বর্তমান রাজনীতিবিদরা ভাষায় ও কাজে যে পর্যায়ে পৌছেছেন তাতে তাদের নাম শুনলে মুখে থু থু জমে উঠে।
এরমধ্যে তারা যে ভাষা ব্যবহার করছেন তাতে ভাষার যথাযথ ব্যবহার ও প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠে। আর এগুলো কোনো জাত-ইতর সম্প্রদায় ব্যবহার করেন কি না যথেষ্ট সন্দেহে থেকে যায়। প্রতিপক্ষের কর্মীকে সকাল-বিকাল নাস্তা করা, অমুকের চামড়া তুলে নেয়াসহ আরো বহু পিষে মারা ও কাঁদা ছোড়া ছুড়ির ভাষা ইতিমধ্যে নতুন প্রজন্ম রপ্ত করা শুরু করেছে।
তাছাড়া প্রধান দুই দলের অনুসৃত উত্তপ্ত বাক-বিনিময় জাতীয় সংসদ থেকে শুরু হয়ে এখন ডাইনিং টেবিলের বিতর্কের বিষয়। পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে পরপস্পরকে টানাটানি, নিজেদের পারিবারিক সীমাবদ্ধতা টানা হেচড়া,পরপস্পরের স্ত্রীকে নিয়ে নোংরা কটুক্তি, ভিন্ন দেশের দালাল আখ্যায়িত করা সহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে গণতন্ত্র চর্চার বিপরীতে খোদ সংসদের টেবিলও এখন ব্যবহৃত হচ্ছে বিতর্ক ও প্রতিযোগিতার আসর। তুচ্ছ কারণে অহেতুক হৈ হুল্লোড়, ঠেলাঠেলি, গালিগালাজ, চোর বদমায়েশ ডাকা ইত্যাদি এখন রাজনীতির ভাষার অস্ত্র। আর এসব রাজনীতিবিদদের গর্ভ থেকে যে গণতন্ত্র প্রসব হচ্ছে সেই গণতন্ত্র কতটুকু সুস্থ থাকবে তা সহজেই অনুমেয়।
তবে এসবের মধ্যে কিছু ব্যক্তিদের পদচারণায় রাজনীতির মাঠে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। একদল উৎকৃষ্ট শ্রেণীর আত্মপ্রকাশ ঘটছে। তবে সেইসব নিন্ম শ্রেণীর ঠেলায় তারাও ঠিকে থাকতে পারছেন না। কারণ নিম্ন শ্রেণীর দাপট এখন সর্বত্র।
রাজনীতির মোকাবিলায় রাজনীতি দিয়ে করার পরিবর্তে যে দেশে সন্ত্রাস, উপহাস, টিটকারী, ব্যক্তিগত চরিত্র হনন ও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করা হয় সেখানে গণতন্ত্রের অবাধ বিচরণ ও লালন কতটুকু যুক্তিগত হবে তা ভাববার বিষয়।
তবে এটাও জানা দরকার যে, জণগণ আগের চেয়ে এখন বেশি রাজনীতি সচেতন, তাই যে বা যারা রাজনীতির মধ্যে এসব নোংরা ও কাঁদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত তাদের বোঝা উচিত জনগণ হয় রাজনীতি বর্জন করবে নয়তো তাদেরকে বর্জন করবে।
লেখকঃ শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী, শাবিপ্রবি, সিলেট। |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/AtikMahbub |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
আতিক মাহবুব, পুরো নাম মো: আতিকুর রহমান। জন্ম ১০ই মে, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থানার আলালপুর গ্রামে। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তৃতীয়। বর্তমানে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। পড়াশুনার পাশপাশি পরিচয় সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন।
লেখালিখির হাতেখড়ি সপ্তম শ্রেণী থেকে। এ পর্যন্ত অসংখ্য গল্প, কবিতা ও কলাম দেশের জনপ্রিয় জাতীয় পত্রিকা, মাসিক, ত্রিমাসিক ও ষান্মাসিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। |
|