দুই
প্রবীণ নেতা প্রণব মুখার্জির সফরে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ নিয়ে গত পর্বে দুকথা লিখেছিলাম। ভেবেছিলাম, তার সঙ্গে ভারতের দিনগুলোর কিছু স্মৃতি এ পর্বে আলোকপাত করব। কিন্তু ড. মূসা সাদিক প্রসঙ্গে ছোট্ট একটি মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক ফোন পেলাম। খুব শর্টকাটে বলার কারণে অনেকেই ব্যাপারটি বুঝতে পারেননি। তাই বঙ্গবন্ধুর ছোট বোন খাদিজা হোসেনকে নিয়েই প্রথম অগ্রসর হচ্ছি। ৬ মে সোনারগাঁও হোটেলে আমরা যে ঘরে বসেছিলাম, সেখানে ড. মূসা সাদিক ছাত্রলীগের আরও তিনজন নেতাকে নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। মূসা সাদিক এমনিতে খুব ঝটপটে মানুষ। কথাবার্তায় খুব ধুপদুরস্ত চটপটে। অনেক বড় বড় বই প্রকাশ করেছেন। তার দু-একটা আমাকেও দিয়েছেন। তাই আমাকে পেয়ে হয়তো কিছুটা আত্দহারা হয়ে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরের ভয়াবহ দিনগুলোর কথা তুলে ধরতে গিয়েই বঙ্গবন্ধুর ছোট ভগি্নপতি সৈয়দ হোসেনের প্রসঙ্গ এনেছিলেন। খুব সম্ভবত সৈয়দ হোসেন তখন সংস্থাপনের এডিশনাল সেক্রেটারি। তাকে গ্রেফতার করলে স্বাভাবিকভাবেই তার স্ত্রী খাদিজা হোসেন হয়তো অনেক আশা করে মূসা সাদিককে ফোন করেছিলেন। আজ থেকে ৪০ বছর আগে মূসা সাদিক তো তখন একেবারে বাচ্চা।
এখনই প্রধানমন্ত্রীর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে চলাফেরার সুযোগ পেলে যে আহ্লাদবোধ করেন নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধু থাকতে অল্প বয়সে আরও নিকট আত্দীয়ের মতো করতেন। স্বাভাবিক কারণেই সৈয়দ হোসেনের স্ত্রী আপনজন ভেবে মূসা সাদিককে ফোন করতেই পারেন। খাদিজা হোসেনের ফোন পেয়ে মূসা সাদিক কীভাবে সাবধান করতে চেয়েছিলেন তা তিনিই জানেন। তবে এটা সত্য, তখন সব ফোনই সেনাবাহিনীর লোকজন টেপ করত। সে কথাটা যেভাবেই তাকে বলতে চান না কেন বেগম খাদিজা হোসেন যথার্থই বলেছিলেন, তার ভাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একমাত্র কাদের সিদ্দিকী ছাড়া আর সব গরু-ছাগল রেখে গেছে কিনা। বলেই রাগ করে ফোন রেখে দিয়েছিলেন। কথাটা আমার না, কথাটা আজকেরও না। আজ থেকে ৩৮ বছর আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহের ছোট বোনের কথা, এই সেদিন মূসা সাদিকের মুখে শোনা। ছাত্রলীগের ছিল তিনজন। আমার ছেলেমেয়ে তিনজন। আমি, আমার স্ত্রী, আর আমার সহকর্মী ফরিদ। সব মিলিয়ে ১০। এটা হারাধনের ১০টি ছেলের মতো নয়। এ ১০ খুবই অর্থবহ। এ থেকে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু এবং প্রকৃতই বঙ্গবন্ধুর প্রিয়জনরা আমায় কতখানি বিশ্বাস করতেন, ভরসা করতেন। তাই এখন স্বার্থান্ধ কেউ অন্য গীত গাইলেই তা খুব একটা জমজমাট হবে না। সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর ছোট ভগি্নপতি সৈয়দ হোসেনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক তেমন ভালো ছিল না।
দু-একটি ছোটখাটো ঘটনার কারণে তা আরও তিক্ত হয়েছিল। সারা জীবনই মুখচোরা স্বভাবের ছিলাম। নিজে থেকে কারও কাছে যেতে খুব একটা ভালো লাগে না। ক্ষমতাবান কারও কাছে তো নয়ই। তাই বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতে তার ভগি্নপতি সৈয়দ হোসেনের সঙ্গে বলতে গেলে তেমন যোগাযোগই ছিল না। ১৯৭৫-এ জেলা গভর্নর পদ্ধতি প্রবর্তন হলে বঙ্গভবনে মাসব্যাপী ট্রেনিং হয়। সেখানে বাধ্যতামূলক সমবায়ের ওপর সৈয়দ হোসেন ১২-১৪টি লেকচার দেন। যেহেতু তার প্রতি আগে থেকেই মনে বিদ্বেষ ছিল তাই তার বক্তৃতায় কোনো মনোযোগ দেইনি। গল্পগুজব করেই কাটিয়েছি। তৃতীয় বা চতুর্থ দিন বক্তৃতার শেষদিকে হঠাৎ কি প্রসঙ্গে যেন আকৃষ্ট হই। স্বাভাবিক কারণে কয়েকটি ছোটখাটো প্রশ্ন করি। তিনি বেশ সাবলীলভাবে উত্তর দেন। খুব সম্ভবত ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ছিল তার ক্লাস। আরও প্রশ্ন করলে বিরতির সময় বিষয়গুলো জেনে নিতে বললেন। গভর্নর প্রশিক্ষণে যারা বক্তৃতা করতেন তারা যেমন আমাদের স্যার বলতেন, আমরাও তাদের স্যার বলতাম। ওইদিনই মধ্যাহ্ন বিরতিতে দুনিয়ার ফিরিস্তি নিয়ে তার সামনে বসলাম। ভদ্রলোকের প্রতি তখনো তেমন কোনো শ্রদ্ধা ছিল না। যেহেতু উদ্দেশ্য ছিল তার কাছ থেকে কিছু জানা, সম্ভব না হলে তাকে আটকানো বা ঠেকিয়ে বিব্রত করা। তাই স্বাভাবিক কারণেই একটা ডেমকেয়ার ভাব তো ছিলই। কিন্তু প্রথম বৈঠকেই বিস্মিত হলাম।
ভেবেছিলাম যেহেতু বঙ্গবন্ধুর ভগি্নপতি জ্ঞান-বুদ্ধি ছাড়াই মাতব্বরি করেন। শত চেষ্টা করেও অখুশি হতে পারলাম না। তারপর চার অথবা পাঁচ দিন তাকে নিয়মিত পেলাম। খুব আগ্রহ নিয়ে তার বক্তৃতা শোনলাম। বক্তৃতা সম্পর্কে তৈরি করা কাগজগুলো যত্নসহকারে দেখলাম। ১০-১২ দিনের মধ্যে সমাজ গঠন, সমাজ বিকাশ, সমাজের উত্থান-পতন, জমিজমা ও সম্পদ বণ্টন_ এসব আমার কাছে নতুন নতুন ঠেকতে লাগল। এর মধ্যে হঠাৎ বঙ্গবন্ধু নিহত হলেন। সর্বস্বান্ত হয়ে অজ্ঞাতবাসে চলে গেলাম। তারপর '৭৭-এ ভারতে ঘটল আরও মহাবিপর্যয়। অনেক ঝড়ঝাপ্টা অতিক্রম করে তখন কেবলই মোটামুটি একটা স্থিতি অবস্থায় এসেছি। এদিকে নেতাজী সুভাষ বোসের এক সময়ের ব্যক্তিগত সহকারী শ্রী সমর গুহ এমপির মাধ্যমে জয় প্রকাশজীর সানি্নধ্য পেয়েছি। জয় প্রকাশজীর মাধ্যমে চন্দ্রশেখর, মুধু লিমায়ে, জর্জ ফার্নান্দেজ, বিজু পট্টনায়েক, সুরেন্দ্র মোহন, রবি রায়, অশোক দণ্ডপাথ এ রকম আরও অনেকের সঙ্গে পরিচয় এবং যোগাযোগ হয়েছে, ধীরে ধীরে কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গেও একটা যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। '৭৭-এ জনতা পার্টি গঠিত হলে প্রিয়রঞ্জন দাস মুন্সী কংগ্রেস ছেড়ে সেদিকে চলে যান। কিন্তু সুব্রত মুখার্জি, সোমেন মিত্র, সৌগত রায়, সাধন পাণ্ডে, রাজেশ খৈতান, নুরুল ইসলামরা কংগ্রেসেই থেকে যান। অন্যদিকে চট্টগ্রামের মাস্টারদা সূর্যসেনের ঘনিষ্ঠ কর্মী সিপিএমের গণেশ ঘোষের মাধ্যমে জ্যোতি বসু ও অন্যদের সঙ্গে একটি বিশ্বাসযোগ্য ঘনিষ্ঠতা হয়। বিশেষ করে জ্যোতি বসুর স্ত্রী কমলা বসু টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী গার্লস স্কুলের ছাত্রী হওয়ায় তিনি আমায় খুবই আপন করে নিয়েছিলেন।
ছোট বোন শুশুমাকে শান্তি নিকেতনে ভর্তি করা নিয়ে বেশ কয়েকবার দিলি্ল-কলকাতা ছোটাছুটি করায় তখনকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিএসএম শাখার যুগ্ম সচিব মুচকুন্দ দ্যুবের মাধ্যমে জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়। তিনি তখন নতুন দিলি্লর খান মার্কেটের কাছে পান্ডারা রোডের উ ?? ১৬ ডেপুটি সেক্রেটারিদের জন্য নির্ধারিত একটি বাড়িতে থাকতেন। আমাকে পেয়ে তিনি ভীষণ অভিভূত হন। আমার সঙ্গে প্রথম যখন পান্ডারা রোডের বাড়িতে নেত্রীর দেখা হয় তখন জয় মনে হয় স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি। চায়না ক্লে নিয়ে শুধু খেলত। পুতুল ছিল আরও ছোট। '৭৮-এর কোনো সময় একদিন হঠাৎ জননেত্রী শেখ হাসিনার চিঠি পেলাম_ 'ছোট ফুপা এসেছেন তোমাকে খুঁজছেন। তাড়াতাড়ি চলে এসো।' মনে হয় চিঠিটা মাসের শেষের দিকে পেয়েছিলাম। দিলি্ল যাওয়ার মতো হাতে তেমন টাকা ছিল না। তখন ফোনের ব্যবস্থাও ছিল মান্ধাতার আমলের। বর্ধমান থেকে শত চেষ্টা করেও ফোনে কথা বলতে পারলাম না। আবার তখন ফোনে রেস্ট্রিকশনও ছিল, জননেত্রীর ফোনেও যেমন, আমার ফোনেও তেমন। পরদিন কলকাতা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলাম। তখনই বুঝলাম বাড়িতে ফোন থাকলেও সব জায়গা থেকে আমাদের কাছে ফোন আসে না। আর সবার কাছে আমরাও ফোন করতে পারি না। কলকাতা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রথম জানাল আমি তার সঙ্গে কথা বলতে পারি কিনা বা কলকাতা থেকে দিলি্লতে জননেত্রী হাসিনার ফোনে কথা বলা যাবে কিনা। ঘণ্টাখানেক পর অনুমতি এলো কথা বলতে কোনো বারণ নেই।
আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক চেষ্টা করে বোনকে পাওয়া গেল। আমার কণ্ঠ শুনেই তিনি উদ্বেল হয়ে উঠলেন। বললেন, 'পারলে তুমি আজই চলে এসো। ছোট ফুপা তোমাকে খুঁজছেন। তোমাকে নাকি তার খুবই দরকার।' বললাম, 'দুদিন পর হলে কেমন হয়? মাকে বাসার খরচ দিয়ে আসতে হবে। আমারও দিলি্ল যাওয়ার মতো পয়সা নেই।' তিনি বললেন, 'তবুও চলে এসো।' কি আর করা, বোনের আদেশ। তখনই পরদিন রাতের দিলি্লর টিকিট করলাম। তখন হাওড়া থেকে দিলি্ল তৃতীয় শ্রেণীর ভাড়া ছিল ২৩-২৪ টাকা। ৬ টাকা সিট রিজার্ভেশন। সব মিলিয়ে মনে হয় ২৯ টাকা। প্রথম শ্রেণী ছিল ১৩০ টাকা। সেখানেও রিজার্ভেশন সাড়ে ৬ বা ৭ টাকা। সব মিলিয়ে ৬০০-৭০০ টাকাই দিলি্ল ভ্রমণের জন্য যথেষ্ট। সরকারিভাবে যারা দেখাশোনা করেন তাদের পরদিন ডাকলাম। তারা বললেন, 'ঠিক আছে আপনি যান কোনো অসুবিধা হবে না।' মার কাছে কয়েক বছরের জমানো ২০০০ টাকা ছিল। আমারও মুজিবকোটের পকেটে সেই কবে কোনকালের কিছু টাকা ছিল। টাকার অসুবিধা শুনে ছোট বোন শাহানা তার জমানো ৩০০ টাকা নিয়ে হাজির হলো। কি কারণে শুশুও তখন বাড়িতে ছিল। ওর কাছেও ৪০০-৫০০ টাকা ছিল। এসব দেখে চিন্তা অনেকটা কেটে গেল। ১০০০-১২০০ টাকাসহ দুলাল অথবা সখিপুর গজারিয়ার লুৎফরকে নিয়ে দিলি্লর পথে বেরিয়ে পড়লাম। দিলি্লতে থাকা-খাওয়ার অসুবিধা ছিল না।
জে-১৮৮১ সি আর পার্ক বলতে গেলে আমার স্থায়ী ঠিকানা। পরদিন রাতে গিয়ে দেখা করলাম জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। ছোট ফুপা সৈয়দ হোসেন আমাকে দেখে ভীষণ খুশি হলেন। মনে হয় দুই-সোয়া দুই বছর পর তার সঙ্গে দেখা। ততদিনে তিনি আমার গুরু হয়ে গেছেন। তাকে যথেষ্ট সম্মান করা শুরু করেছি। আমার মাথা গতর হাতিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কদিন থাকতে পারবা? সেই যে বঙ্গভবনে বাধ্যতামূলক সমবায় নিয়ে আলোচনাগুলো করেছিলাম তা তো শেষ হয়নি। তোমাকে আর হাসুকে নিয়ে ওটা শেষ করতে চাই।' বললাম, '১০-১৫ দিন থাকতে কোনো অসুবিধা নেই।' ছোট ফুপা সৈয়দ হোসেন বললেন, '১০-১৫ দিনে তো কিছুই হবে না। আমি এ যাত্রায় তিন মাস থাকব। তোমাকে অন্তত দুই মাস সময় দিতে হবে। দুই মাসে না হলেও সকাল-বিকাল ৮০টি ক্লাস করব।' আমার ভিমড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা। হাসিনা আপা চোখ টিপলেন। আমি রাজি হলাম। কারণ সৈয়দ হোসেনের বঙ্গভবনের ক্লাসগুলো আমার খুব ভালো লেগেছিল, আকৃষ্ট করেছিল। শুরু করলেন প্রশিক্ষণ। ছাত্রছাত্রী দুজন। ছাত্র মনোযোগী ছাত্রী একটু অন্য রকম। একবার বসালে দুই ঘণ্টার আগে ছাড়তেন না। তেমন কিছু নোট নিতে বলতেন না। প্রতিদিন অতি সামান্য দু-একটি প্রশ্ন করতেন। উত্তর দিতে না পারলেও অসন্তুষ্ট হতেন না। কিন্তু যা তিনি প্রস্তুতি নিতেন বড় নিষ্ঠার সঙ্গে দারুণ সুন্দরভাবে নানা উপমা দিয়ে একের পর এক বুঝিয়ে যেতেন। মাঝেসাজে মনে হতো তার কথা মনে না রেখে উপায় নেই। তার কথাগুলো আপন মহিমায় মস্তিষ্কে ঢুকে যেত।
অপ্রয়োজনীয় পুরনো কথা এক অমোঘ শক্তিতে বের করে দিয়ে স্মৃতিতে জায়গা করে নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বসতেন কিন্তু আগ্রহ নিয়ে সময় দিতেন না কিংবা পারতেন না। সব সময় এটা-ওটা করতেই থাকতেন। ওয়াজেদ দুলাভাইও মাঝে-মধ্যে বসতেন। আমাকে একা পেলে বলতেন, 'ফুপা এত জানেন, আগে তো কখনো বুঝিনি।' প্রায় দুই-আড়াই বছরে চার অথবা পাঁচবারে ছয়-সাত মাসে দেড়-দুশ ঘণ্টা তিনি আমাকে সমাজ, শাসন, সম্পদ, সম্পদ আহরণ, সমবায় এসব বুঝিয়েছেন। বিশেষ করে রাসূলে কারীম (সাঃ), নবুয়ত, খোলাফায়ে রাশেদীন, ইসলাম এবং ইসলামের অর্থ, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব। অবাক লাগত তার চমৎকার বিশ্লেষণ শুনে। ইদানীং প্রতি মুহূর্তে মনে হয় ওই সময় বঙ্গবন্ধুর পরম সুহৃদ আগ্রহ করে আমাকে যদি দুই কলম শিক্ষা দিয়ে না যেতেন আজ এই চরম দুঃসময়ে কোথাও ঠাঁই পেতাম না। তাই খাদিজা হোসেনের মৃত্যু আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। যারা রাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে কাজ করবেন না বলে শপথ নিয়েছেন মন্ত্রিসভায়, তারা আজ রাগ-বিরাগের কারখানায় পরিণত হয়েছেন। কেউ নিরাসক্তভাবে কথা বলেন না, সত্য বলতে কি বলতে পারেন না। কত ঘি চন্দন খরচ করে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে আনলেন।
তাকে আকাশে ওড়ার সময়ও দিলেন না। আমাদের প্রবীণ অর্থমন্ত্রী কি অসম্ভব অরুচিকরভাবে শাশ্বত বাঙালির সব সভ্যতা-ভব্যতা ধ্বংস করে সম্মানী অতিথি সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন তা আমাদের জাতীয় সম্মান আর মর্যাদাকেই শুধু খাটো করেছে তা নয়। আমরা যে একটি অতিথিপরায়ণ জাতি বহু বছরের সেই ঐতিহ্যটিও একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আমাদের হাজার হাজার বছরের সভ্যতায় অতিথিকে কটুবাক্য প্রয়োগের কোনো নজির নেই বরং অতিথির কটুবাক্য সহ্য করার বহু নজির আছে। তাই বুড়ো বয়সে 'রাবিশ রাবিশ' বলে চিৎকার করলেই কি সবাই তাকে মাথায় তুলে নাচবে? এটা কি সম্ভব? তাই দায়িত্বশীলদের সময় থাকতে সংযত হওয়া উচিত। তাদের ব্যবহারে একটি জাতি কেন বার বার এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
কথা ছিল প্রণব মুখার্জিকে নিয়ে। আমিও সেদিকে এগুতে চেয়েছিলাম। হঠাৎ সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ফোন করেছিল। আজ জগৎ সংসার অনেক বদলে গেছে। কিন্তু তবু কিছু নেতাকর্মী যারা '৭৫-এ আমার সঙ্গে নিদারুণ কষ্ট করেছে, পরিবেশগত কারণে এদিক-ওদিক ছিটকে পড়লেও বাস্তবে তারা কিছুই ভুলতে পারে না। পুরনো দিনের কোনো কষ্টের কথা কোথাও শুনলেই আমার সঙ্গে তা ভাগ করতে চেষ্টা করে। অনেক অসুবিধা তবু সব সময়ই ওরা অমনটা করে। তার মধ্যে সুলতান মনসুরও একজন। সুলতান প্রথমত সিলেটের বাবরুল হোসেন বাবুলের খুবই অনুরক্ত ভক্ত ছিল। '৭৫-এর প্রতিরোধ সংগ্রামে সে বাবুলের কর্মী হিসেবেই আমার কাছে অসম্ভব গুরুত্ব পায়। বড় ভালো মানুষ সুলতান। সুলতান, নারায়ণগঞ্জের নাসিম ওসমান এমপি, সিলেটের শাহ আজিজ, জলিল, সাভারের গিয়াস, গৌর, বৈদ্য, মাহবুব, জগলুল পাশা, বাবুল হক ওরা বঙ্গবন্ধুর জন্য যা করেছে, এখন যারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হালুয়া রুটি খাচ্ছে তারা তার লক্ষ ভাগের এক ভাগও করেনি। সুলতান ফোন তুলেই বলেছিল, 'স্যার, আপনি ঠিকই লিখেছেন। ইন্দিরাজী বিরোধী দলের নেতা হয়ে কলকাতা এলে গৌড়, বৈদ্য, গিয়াস, নাসিমের সঙ্গে আমাকে যে চিঠি দিয়ে নিজাম প্যালেসে পাঠিয়েছিলেন, হাজার হাজার মানুষের মধ্যে বাঘা সিদ্দিকীর লোক বলে সুব্রত মুখার্জি যখন আমাদের ইন্দিরাজীর কাছে নিয়ে গেলেন, ইন্দিরাজী আপনাকে কত যে পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন তা তার প্রতিটি কথায় বুঝেছিলাম। সেখানে প্রণবদাও বসেছিলেন।' সুলতানকে বলেছিলাম, 'কি বলব, সব তো ভুলে যেতে বসেছি। তুমিও দুই কলম লিখ।' সুলতান বলেছে, 'অসুবিধা আছে, তবু লিখব।' দেখা যাক কি করে। তবে আমি যখন শুরু করেছি তখন শেষ তো করতেই হবে। তা না হলে পাঠকরা অন্ধকারে থাকবে।
সত্যিকার অর্থে অনেকের মতো আমি খুব একটা সর্বত্র স্বতঃস্ফূর্ত নই। সব সময় একটি বাধো বাধো ভাব মনের মধ্যে কাজ করে। অন্যদিকে সাড়া না পেলে খুব একটা এগুতে পারি না। যখন যেখানে যতটুকু সাড়া পেয়েছি সেখানে নিজে থেকেও সাড়া দিতে পেরেছি। কিন্তু কারও কাছেই কখনো ঘ্যান ঘ্যান করতে পারিনি। হ্যাঁ, একবারের জায়গায় দুইবার কোনো কোনো জায়গায় হয়তো তিনবারও গেছি। কিন্তু তার বেশি খুব একটা পারিনি। আর আত্দমর্যাদা বিকিয়ে কখনো কিছুই করতে পারিনি। এক্ষেত্রে প্রণবদাও ব্যতিক্রম নন। আজ থেকে ৩৫-৩৬ বছর আগের কথা। প্রণবদা একজন খুবই কর্মচঞ্চল তরুণ তুর্কি নেতা। ইন্দিরাজী কতবার বলেছেন, 'প্রণব হচ্ছে হিউম্যান কম্পিউটার।' ভারতের রাজনীতির অনেক কিছুই তার নখদপর্ণে। প্রথম প্রথম যখন তার কাছে যেতাম বেশ নিয়মনীতি মেনে চলতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখলাম আমি যেন তাদের পরিবারের মানুষ হয়ে গেছি। প্রবাসে সর্বহারা আশ্রয়হীন মানুষ আমি। তাদের বাড়িতে গাড়ি থেকে নামতেই কাজের লোকেরা ছুটে আসত। প্রণবদার একেবারে ছোট ছেলে পিন্টু যাকে তারা স্বামী-স্ত্রী যমুনার পাড়ে বেড়াতে গিয়ে পেয়েছিলেন। কোলে পিঠে মানুষ করেছেন। আমি যখন দাদার বাড়ি যাওয়া শুরু করি তখন পিন্টু তিন-চার বছরের।
খুবই ছোটাছুটি করত। আর দাদা-দিদির একমাত্র মেয়ে মুন্নী। একেবারে পরীর মতো দেখতে। এখন পৃথিবীর নানা জায়গায় ভারত নাট্যম করে বেড়ায়। ওর নিজের একটি নৃত্যগীতের দল আছে। লেখাপড়া করে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে চাকরি নিয়েছিল। কিন্তু কেন যেন ছেড়ে দিয়েছে। সেই মুন্নী পড়ত টু-থ্রিতে। বড় ছেলে অভিজিৎ এখন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য। সে তখন এইট-নাইনে পড়ত। সেই সময় থেকে দাদার বাড়িতে আমার যাওয়া-আসা। কয়েক মাস পর থেকে মন্ত্রীর অফিস ঘরে খুব একটা বসতে হতো না। বাড়ির ভেতরে বসানো হতো। আমি গেলেই পিন্টু এসে কোলে চড়ে বসত। মুন্নী গল্প শুনতে চাইত। কত গল্প যে ওকে বলেছি তার কোনো হিসাব-কিতাব নেই। মুন্নীকে মা বলে ডাক দিলে যেখানেই থাকুক ছুটে আসত। এখন যেমন বাইরে থেকে এসে কুশিমনিকে মা বলে হাঁক দিলে একটি ধমক ঠিকই দেয় কিন্তু ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে। প্রণবদার মেয়ে মুন্নীও ঠিক তেমনটা করত। বছরখানেক যেতে না যেতে এমন হলো, আমি দিলি্লতে গেলে মুন্নী যেমন আমার জন্য খাবার রেখে দিত, মুন্নীর মা দিদি শুভ্রা মুখার্জিও কোনো কিছু না খেয়ে আসতে দিতেন না।
দিলি্ল থেকে আমি যখন বর্ধমান ফিরতাম মুনি্ন ওর ছোট ছোট গল্পের বই আমাকে দিয়ে দিত ট্রেনে বসে পড়ার জন্য। ওর বই পড়ে ওকে যে কত গল্প শুনিয়েছি তাতে মুন্নীর কতটা কাজ হয়েছে জানি না। আমার জ্ঞান বেড়েছে অনেক। দিলি্লতে গেলে এসি সেনের বাড়ি ছিল আমার বাড়ি। বলতে গেলে তার গাড়িও ছিল আমার। অন্ততপক্ষে সকাল আর রাতের দিকটা। তখন দিলি্লর রাস্তাঘাটে কোনো ভিড় ছিল না। তালকাটোরা রোডই বলি আর দুই বা তিন নম্বর যন্তর মন্তর রোডই বলি, চিত্তরঞ্জন পার্ক থেকে ১২-১৩ মিনিটের বেশি সময় নিত না। দিলি্ল ছাড়া আর কোথাও আমি একা চলাফেরা করিনি। অনেক সময় সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার সময় প্রণবদার বাড়ি যেতাম। তিনি সে সময় লনে বসে পেপার পড়তেন। আমি সেখানে শরিক হলে খুবই খুশি হতেন। রাজ্যের পত্রিকা পড়ে স্নান আহার করে দাদা যেতেন মন্ত্রণালয়ে আর আমি বাড়ি ফিরতাম। এমন ঘটনা ঘটেছে বহুদিন বহুবার। আমি সময়ের কথা যেহেতু অসময়ে বলতাম না, কোনো দরকারি কথা নিয়ে বার বার ঘ্যান ঘ্যান করতাম না, এ কারণে প্রণবদা আমাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। বহুবার সে কথা তিনি বলেছেনও, 'তোমার এত অসুবিধা, তারপরও আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলি, তুমি তো কোনো কাজের কথা বল না। তুমি এভাবে থাক কি করে?' মাঝেসাজে বলতাম, 'না থেকে উপায় কি?'
(চলবে)
লেখক :রাজনীতিক
(সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন,১৫,০৫,১২) |