সম্প্রতি এক দ্বিপ্রহরে এক মসজিদের অজুখানায় অজু করার সময় লক্ষ্য করলাম, হাউজের যে স্থানটিতে হাত দিয়ে পানি নিচ্ছি আমি, তার ঠিক নিচে পানিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি বড়সড় পাঙ্গাস মাছ। আমি আশ্চর্য বোধ করলাম এবং আমার মনে হলো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ পানির নিচে এক/দু’মিনিটের বেশি সময় টিকে থাকতে পারে না, অথচ মাছেরা দিব্যি জীবন পার কর দেয় পানির নিচে। পানির বাইরে ডাঙ্গায় মাছ বাঁচে না। অন্যদিকে আমার বেঁচে থাকার এবং ঠিকঠাক মত ফাংশন করার জন্যে ডাঙ্গাই উপযুক্ত পরিবেশ। অর্থাৎ একেক প্রাণীর জন্যে একেক পরিবেশ উপযুক্ত। জগতের প্রত্যেকটি প্রাণীর বেঁচে থাকার এবং ফাংশন করার জন্যে নির্ধারিত এবং অনুপম একটি ইকোসিস্টেম আছে, যাকে নিচ্ (Niche) বা কুলুঙ্গি নামে ডাকা হয়। নিচ্ হলো জীবনের ফাংশনের জন্যে উপযুক্ত শর্তসমূহ এবং তার বাস্তবরূপ। উদাহরণস্বরূপ, মানুষের নিচ্ হলো পৃথিবীর উপরস্থ সূর্যালোকিত পরিবেশ যেখানে তাপমাত্রা কমবেশি ক্র ৯৫৬; সেন্টিগ্রেড, চাপ ৭৬ সে· মি· পারদ। চারদিকে সবুজ গাছপালা, পর্যাপ্ত পানি, বায়ুতে বিশুদ্ধ অক্সিজেন থাকা চাই মানুষের নিচে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড না থাকা চাই। সূর্য থেকে অতিবেগুনী রশ্মি যেন ভূপৃষ্ঠে না পৌঁছায়, কারণ অতিবেগুনী রশ্মি DNA ভেঙ্গে ফেলে। তাই বায়ুমন্ডলের ওজোন স্তর ঠিকঠাক মত থাকা চাই, কারণ ওজোন স্তর সূর্য থেকে আসা অতিবেগুনী রশ্মি শোষণ করে নেয়। ওজোন স্তর মানুষের নিচের এক প্রধান উপাদান। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে প্রাণীর জীবন ধারণের উপযুক্ত পরিবেশ বজায় রাখার জন্যে ঋতুচক্র অত্যন্ত জরুরী বিষয়। পৃথিবীর সর্বত্র সারা বছর জুড়ে সমান হারে সূর্য রশ্মি পতিত হলে পৃথিবীর এক এলাকা সময়ের সাথে সাথে উত্তপ্ত হবে, আর কোন কোন এলাকা শীতল থেকে শীতলতর হতে থাকবে। ঋতু বলে তখন কিছু থাকবে না। পৃথিবীর ঋতু চক্রের পেছনে নিয়ামক হলো পৃথিবীর এটিচুড। অর্থাৎ পৃথিবীর অক্ষ তার কক্ষতলের সাথে ২৩·২৫ ডিগ্রি কোণে হেলানো বলেই পৃথিবীতে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত ইত্যাদি ঋতুর আগমন-প্রস্থান চলে সারা বছর জুড়ে। এভাবেই রচিত হয়েছে মানুষের Niche. প্রাণিজগতের প্রত্যেকটি প্রজাতির জন্যে নিচ্ ভিন্ন ভিন্ন। নিচ্ প্রাণিজগতের জন্যে বেঁচে থাকা ও যথাযথ ফাংশনের জন্য এক একটি প্রাকৃতিক কুলুঙ্গি।
সন্দেহ নেই নিচ্ এবং সেখানে বসবাসরত প্রাণিকুল হঠাৎ করেই আবির্ভূত হয়নি। সময়ের সাথে চলমান প্রক্রিয়ায় একেক প্রজাতির প্রাণী একেকটি নিচ্ প্রাপ্ত হয়েছে। এখন যদি কোন নিচ্ ধ্বংস হয়ে যায়, তবে সেই নিচ্-এর প্রাণিকুল ধ্বংস হয়ে যেতে বাধ্য। যেমন, যদি সবুজ গাছপালা ধ্বংস করে ফেলা হয়, তবে জলবায়ুর উপর মারাত্বক বিরূপ প্রভাব তথা উষ্ণতা বৃদ্ধি, সাগরের পানির লেভেল বৃদ্ধি, ঘন ঘন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের মত দুর্যোগ নেমে আসে। অর্থাৎ নিচ্ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিচ্ প্রাণিকুলের বেঁচে থাকার আধার। প্রশ্ন হলো, নিচ্ কি স্বয়ংউদ্ভুত কোন প্রাকৃতিক প্রাণাধার? আমার গবেষণাপ্রসূত অভিমত এই যে, নিচ্ স্বয়ং উদ্ভূত নয়, বরং নিচ্ একটি নকশা বা ডিজাইনের বাস্তবায়ন। যেমন, মানুষের চোখের sensitivity সবুজ আলোয় সর্বোচ্চ। এখন দেখুন, ভূপৃষ্ঠের যেদিকেই তাকাই, দেখি শুধু সবুজ গাছপালা। এতে করে মানুষের চোখের উপর চাপ কম পড়ে এবং সে কারণে চোখ দীর্ঘদিন কর্মক্ষম থাকে। মানুষের কর্ণের শ্রবণশক্তি ২০ থেকে ২০০০ হার্জ। ভূ-পৃষ্ঠের প্রাকৃতিক উৎস বা মানবসৃষ্ট শব্দতরঙ্গ অধিকাংশই এই সীমার মধ্যেই থাকে। সুতরাং মানুষের কর্ণের যে সীমাবদ্ধতা তা মানুষের জন্যে প্রয়োজনীয় এবং যথেষ্ট। এভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এখানে একটি ডিজাইন আছে। যে ডিজাইন প্রাণিকুল ও তার নিচ্-এর মধ্যে একটি সাম্যাবস্থার নিশ্চয়তা দেয়। এই ডিজাইন যেন আর্কিটেক্ট যে Sense of proportionality ব্যবহার করে একটি স্থাপনার খন্ডাংশগুলোকে সমগ্র স্থাপনার সাথে সামঞ্জস্যশীল করে তৈরী করেন, তার মত। শুধু সৃষ্টি নয়, বিষয়টি হলো সৃষ্টি ও সুসামঞ্জস্য সাধন। এই সামঞ্জস্য সাধনের দ্বারাই নিচ্ ও প্রাণিকুলের মধ্যে সাম্যাবস্থার নিশ্চয়তা বিধান করা হয়। ডিজাইন ছাড়া এই সামঞ্জস্য সাধন অসম্ভব।
অনেক শিক্ষিত মানুষ আজকাল মানবজাতিকে পুরোপুরি প্রাকৃতিক অসচেতন বিবর্তন ও নির্বাচনের ফসল বলে অভিহিত করেন এবং ডিজাইনের উপস্থিতিকে অস্বীকার করেন। এজন্যে তারা মানুষ বা অপরাপর অনেক প্রাণীর এক বা একাধিক অঙ্গের ডিজাইনে ত্রুটি আছে বলে প্রচার করেন। উদাহরণস্বরূপ, তারা মানুষের চোখের কাঠামোকে ত্রুটিপূর্ণ এবং এর তুলনায় অক্টোপাশের চোখকে আদর্শ ও সর্বোন্নত চোখ বলেন। ‘ঈশ্বর মানুষের চোখ ডিজাইন করতে গিয়ে efficiency দেখাতে পারেননি’। এমন মন্তব্য ও সেসাথে বিদ্রুপবাণে তারা ঈশ্বর বিশ্বাসীর হৃদয়কে ভেঙ্গে তছনছ করেন। এর জবাবে বলব, বাস্তবে মানুষের চোখ অক্টোপাশের চোখের চেয়ে অনুন্নত মনে হতে পারে, কিন্তু মানুষের দৈহিক কাঠামো এতই অনুপম যে, অক্টোপাশ তার ধারে কাছেও আসে না। অর্থাৎ মানুষের কেবল একটি অঙ্গ অন্য কোন প্রাণির তেমন অঙ্গের চেয়ে অনুন্নত বিবেচিত হতে পারে, কিন্তু মানুষের সার্বিক কাঠামো তার প্রয়োজনের সাথে এতই সুসংগত ও অন্যান্য প্রাণির সার্বিক কাঠামোর চেয়ে এতই উন্নত যে, মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা নামে ডাকা হচ্ছে। এ সম্পর্কে নিম্নোক্ত আল্লাহর বাণী প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘আল্লাযি খালাক্বা ফাছাওয়া’। অর্থাৎ তিনি সৃষ্টি করেন ও সুসমন্বিত করেন। (আল কুরআন, ৮৭ঃ২)।
এ জগতের সকল মানবীয় ডিজাইনের প্রধান অনুসঙ্গ হলো সুসমন্বয় বা সামঞ্জস্য সাধন। আল্লাহও তাই বলেন যে, তিনি কেবল সৃষ্টি করে থেমে থাকেন না, বরং সৃষ্ট বস্তুসমুহের আঙ্গিক কাঠামোর সুসামঞ্জস্য বিধান করেন তিনি। ফলে আল্লাহ জগতের সেরা ডিজাইনার। তার অপূর্ব সব ডিজাইনের ফলশ্রুতি এই অপূর্ব ভূমন্ডল ও নভোমন্ডল।
এবারে ফিরে যাই নিচ্ প্রসঙ্গে। নিচ্ সংক্রান্ত প্রধান বিষয় হলো, এর অভাবে কোন প্রাণিই যথাযথ ফাংশন ও জীবন ধারণ করতে পারে না। নিচ্ না থাকলে জড় বা জীব কোন কিছুই Sustain করতে সক্ষম হয় না। ফলে, জগতের ছোট থেকে ছোট, বড় থেকে বড়, জড় কি জীব, সবকিছুই Sustenanceএর জন্য নিচের উপর নির্ভরশীল। এই নিচের মাধ্যমে জগতের ঈশ্বর জগতকে Sustain করার শক্তি যুগিয়ে থাকেন। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনের নিম্নোদ্ধৃত আয়াত প্রনিধানযোগ্য। ইংরেজিতে আয়াতের ভাষ্য এরকমঃ It is God who sustains the heavens and the earth, lest they cease (to function) : And if they should fail, there is none-not one- can sustain them thereafter : Verily He is most Fore bearing, Oft-Forgiving. (Quran, 35:41).
অর্থাৎ জগতের অস্তিত্ব moment by moment নির্ভর করে Allah থেকে পাওয়া এর Sustenance এর উপর। এটি এক প্রকারের সৃষ্টিকর্ম। অর্থাৎ আল্লাহ প্রতিটি ছোট থেকে ছোট, বড় থেকে বড়, জড় কি জীবকে প্রতিটি মুহুর্তে function করার উপযোগী Sustenance দিয়ে যাচ্ছেন। Christian Metaphysics I Islamic Quranic Science ও অনুযায়ী উপরোক্ত সৃষ্টিকর্মকে বলা হয়, Creatio Continuans বা Continuous Creation· বস্তুতঃ আল্লাহর সৃষ্টিসংক্রান্ত তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছেঃ (১) Creatio Ex-nihilio, (২) Creatio Originans, এবং (৩) Creatio Continuans। এই তিন ধরনের সৃষ্টিকর্মের বিষয়েই আল-কুরআনে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে, তন্মধ্যে উপর্যুক্ত (৩৫ঃ৪১) আয়াত Creatio Continuans এর প্রমাণ। ইতিপূর্বেকার Scripture তথা Bible এ এই তিন ধরনের সৃষ্টির কথাই আছে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায় Dr.Willian Lane Craig লিখিত অনেকগুলো প্রবন্ধে। The British Journal for the Philosophy of Science, Vol. 4 (1990), PP.473-491 প্রবন্ধটি অত্যন্ত সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সম্মৃদ্ধ।
ঈশ্বর বহুভাবে জগতের মঞ্চে উপস্থিত আছেন। তন্মধ্যে একটি হলো তিনি প্রাণিজগতের বিভিন্ন প্রজাতির জন্য ভিন্ন ভিন্ন নিচ্ বা কুলুঙ্গি সৃষ্টি করে দিয়ে প্রাণিজগতকে মুহুর্তে মুহুর্তে টিকিয়ে রাখছেন। প্রতিটি নিচ্ অত্যন্ত জটিল নকশার বাস্তবরূপ। অর্থাৎ ঈশ্বর জগতের সনাতন এবং একই সঙ্গে সর্বাধুনিক ডিজাইনার। ডিজাইনের উপস্থিতি অস্বীকার করা এবং জগতকে প্রাকৃতিক অসচেতন নির্বাচনের ফসল বলে অভিহিত করে মানুষের ডেসটিনি সম্পর্কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য প্রদর্শন করা এক ধরনের অজ্ঞানতার বহিঃপ্রকাশ।
লেখকঃ অধ্যাপক, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।