|
সংবিধান সংশোধন মাছ-ভাত নয়
ব্যারিষ্টার রফিকুল হক |
|
সাক্ষাৎকার : ব্যারিস্টার রফিক-উল হক
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলফাজ আনাম ও রেজা মাহমুদ
ব্যারিস্টার রফিক-উল হক দেশের খ্যাতিমান আইনজীবী। প্রবীণ এই আইনজীবীর জন্ম ১৯৩৫ সালে কলকাতায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন ১৯৫১ সালে। ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে এলএলবি পাস করেন। এরপর অ্যাডভোকেট হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। ১৯৬১ সালে বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে তৎকালীন পাকিস্তানের নাগরিক হয়ে চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৬৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ১৯৭৩ সালে আপিল বিভাগে সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে যোগ দেন। সংবিধান সংশোধন, আইনের শাসন এবং দেশের সাম্প্রতিক পরিস্খিতি নিয়ে তিনি নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলফাজ আনাম ও রেজা মাহমুদ
নয়া দিগন্ত : সংবিধান সংশোধন নিয়ে এখন বিতর্ক চলছে, এ বিতর্ককে আপনি কিভাবে দেখছেন?
রফিক-উল হক : সংবিধান সংশোধনের জন্য এত দিন পরে একটি কমিটি করেছে সংসদ। মাঝে বিএনপি’র সময় দুটো কমিটি হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বুলেট নয়, ব্যালটের মাধ্যমে ক্ষমতা আসে। এ কথা আমি ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে বলেছি। আমি বলেছি বুলেট থেকে ব্যালট এসেছে, এখন আপনাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। শুধু বুলেট টু ব্যালট বললে হবে না, ব্যালটে আসার পরে তা ব্যবহার করতে হবে। একে অপরকে সারাক্ষণ দোষারোপ করলে তো ব্যালটের সদ্ব্যবহার হবে না। তবে যেহেতু একটি কমিটি করেছে সে জন্য সবাই উৎসুক আছে কী তারা করে।
নয়া দিগন্ত : এই কমিটি নিয়েও তো বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে।
রফিক-উল হক : এ ব্যাপারে আমার দুটো বক্তব্য। সংবিধান সংশোধনের কমিটি হলো, সেখানে আইনমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য নেই। আইনমন্ত্রীর তো কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার কথা। সংবিধান সংশোধন তো মাছ-ভাত নয়, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাহমুদুল ইসলামের মতো লোক যিনি প্রকৃত অর্থে সংবিধান বিশেষজ্ঞ। এরপর ড. কামাল হোসেনের মতো লোকদের নেয়া উচিত ছিল। শুধু এমপি হলেই তারা সংবিধান সম্পর্কে জানবেন এটি মনে হয় ঠিক নয়। হতে পারে তারা পণ্ডিত মানুষ।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে রাখা হয়েছে। তিনি প্রথম সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সাথে ছিলেন। কিন্তু তিনি সেই সংবিধানে স্বাক্ষর করেননি। প্রসেডিংয়ে দেখছি তিনি সেই সংবিধানের ব্যাপারে ভিন্ন মত দিয়েছিলেন। অথচ তিনি হচ্ছেন কমিটির ডেপুটি লিডার, যিনি ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাবেন।
আমি আশা করি, সংশোধনীর মাধ্যমে তবু সত্যিকারে যদি গণতন্ত্রে ফিরে আসার চেষ্টা করেন, মার্শাল ল যাতে কখনো না আসতে পারে সেটি যদি স্পষ্ট উল্লেখ করেন তাহলে ভালো হবে। মার্শাল ল হলে শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। তাহলে আর কেউ সাহস পাবে না। পাকিস্তানেও আদালতের একটি রায়ে সেনাবাহিনীর সদস্যদের শপথ নিতে হয় তারা ক্ষমতা নেবেন না কিংবা রাজনীতিতে জড়াবেন না। আমাদের এমন কিছু নেই, আমি বলছি না পাকিস্তানকে অনুসরণ করতে, তবে এ ধরনের কিছু যদি থাকে তাহলে ভালো হয়। এগুলো করলে ভালো হবে, তবে তা বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ের ভিত্তিতে হতে হবে তা নয়।
নয়া দিগন্ত : বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এসব সংশোধনীর পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
রফিক-উল হক : এই উদ্যোগ যদি সিনসিয়ারলি ব্যবহার করা না হয় তাহলেই সমস্যা। যেমন, যদি বলা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার অগণতান্ত্রিক
সরকার, তাকে চলে যেতে হবে। এ ধরনের কথা বলা সোজা। বলতে পারেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার অগণতান্ত্রিক সরকার তার অধীনে আমরা নির্বাচন করব কেন? কিন্তু আমাদের দেশের অবস্খা কী তা-ও ভাবতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্খা থাকা উচিত নয়। পাঁচ বছর একটি সরকার দেশ চালাতে পারে, কিন্তু নির্বাচন করতে পারবে না। কিন্তু সেই পরিবেশ তো আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি। আপনি ভোলার নির্বাচন দিয়ে তো বিচার করতে পারেন সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। দেখা যাচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন আছে।
এই ব্যবস্খা যদি তুলে দেয়া হয় তাহলে আগামী নির্বাচনে হয়তো অনেক দল অংশ নেবে না। এ পরিস্খিতিতে চিন্তা করে দায়িত্বশীলতার সাথে করতে হবে। বিরোধী দলকে বলব মওদুদ আহমদের মতো লোককে কমিটিতে রাখা উচিত ছিল। তার যদি কোনো আপত্তি থাকত সেটা বলে চলে আসতে পারতেন। যেমন ’৭২-এর সংবিধানের ব্যাপারে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আপত্তি দিয়েছিলেন।
নয়া দিগন্ত : সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে সরকারের শরিক জাতীয় পার্টি বলছে রাষ্ট্রধর্ম কিংবা বিসমিল্লাহ তুলে দেয়া হলে তারা সরকারের সাথে
নেই। অপর দিকে বিএনপি বলছে, সরকারের এ ব্যাপারে ম্যান্ডেট নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর এ ধরনের বিপরীতমুখী অবস্খান নিয়ে সংবিধান সংশোধন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে?
রফিক-উল হক : বিরোধী দল বিপরীত অবস্খান নিয়েছে। সরকারি দল যদি বলে তোমাদের স্বর্গে নিয়ে যাবো, বিরোধী দল বলবে না আমরা যাবো না। বিএনপি’র সেক্রেটারি বলেছেন, কমিটি গঠন করতে পারে না। আর্টিক্যাল ৭৬ দেখুন। এ অনুযায়ী কমিটি করতে পারে। এসব কথা হচ্ছে বলার জন্য বলা। আমি বলব বিরোধী দলকে সত্যিকার অর্থে ভূমিকা রাখতে হবে। এই কমিটিতে মওদুদ আহমদ ভূমিকা রাখতে পারতেন। আপনি যদি ’৭২, ’৭৩, ’৭৪ সালের দিকে তাকান, সংবিধান বিষয়ে যত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে তাতে মওদুদ আহমদের আইনজীবী ভূমিকা ছিল।
নয়া দিগন্ত : ’৭২-এর সংবিধানে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির কথা বলা আছে। বলা হচ্ছে সে ব্যবস্খার দিকে ফিরে গেলে এখন যে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্খা ও বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে এবং সমাজতন্ত্রের কী হবে?
রফিক-উল হক : দেখুন আপনি কখনোই ’৭২-এ ফিরে যেতে পারবেন না। ’৭২-এর সংবিধান একটি ভালো এবং আদর্শ সংবিধান এতে কোনো সন্দেহ নেই। যখন এটি প্রণয়ন করা হয়, তখন বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন তার সোনার টুকরা ছেলেরা এটি মেনে চলবেন। কিন্তু শিগগিরই তিনি উপলব্ধি করলেন তারা সোনার টুকরা নয়, লোহার টুকরা। এ জন্য প্রথম সংবিধান সংশোধন করতে হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে। দ্বিতীয় সংশোধনী আনা হলো বেরুবাড়িসহ বিভিন্ন ছিটমহল বিনিময়ের জন্য। তৃতীয় সংশোধনী আনা হলো সবচেয়ে মারাত্মক ডিটেনশন দেয়ার বিধান রেখে বিশেষ ক্ষমতা আইন। আর করা হলো জরুরি আইন জারি করার বিধান। যার ফল আমরা পেলাম সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। এরপর চতুর্থ সংশোধনীতে তো সব শেষ করে দেয়া হলো। এখন বলা হচ্ছে, ’৭২-এর সংবিধানের মূল ধারায় ফিরে যাবে। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সব কিছু তো তন্ন তন্ন করে শেষ করে দেয়া হলো। প্রেসিডেন্ট সবর্ময় ক্ষমতার অধিকারী হলেন। কোনো রাজনৈতিক দলই থাকল না। ’৭২-এ ফিরে যাওয়ার কথা বলে অন্যের সমালোচনার সাথে নিজের সমালোচনাও করা দরকার।
নয়া দিগন্ত : বলা হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের নির্দেশনার আলোকে সংবিধান সংশোধন করা হবে।
রফিক-উল হক : সুপ্রিম কোর্ট এই রায়ের ওপর এখনো পর্যবেক্ষণ দেয়নি। আজ ছয় মাস হতে চলছে, এখনো সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ আসেনি। অথচ প্রতিদিন বলা হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার আলোকে আমরা এই কমিটি করছি। কে এই নির্দেশনা দিলো? এই রায়ে তো কোথাও সংবিধান সংশোধনের নির্দেশনা দেয়া হয়নি। যদি পর্যবেক্ষণসহ পঞ্চম সংশোধনী টিকে যায়, তবে তা দেশের আইন। এর জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে তা তো বলা হয়নি। সংবিধান নিয়ে এ ধরনের হালকা কথাবার্তা তো বলা উচিত নয়।
নয়া দিগন্ত : আদালতের রায় প্রকাশের আগেই কমিটি গঠন কতটা যৌক্তিক হয়েছে?
রফিক-উল হক : কমিটি করুক। আগে কমিটি করে রাখতে পারে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ না আসা পর্যন্ত তারা বলতে পারে না কী করবে না করবে। এই রায়ে কতটা রাখা হবে কিংবা না রাখা হবে তারা তো তা জানে না। সংসদের অবশ্যই সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা আছে, তবু অবশ্যই দেখতে হবে আপিল বিভাগ এ ব্যাপারে কী বলছে।
নয়া দিগন্ত : আমরা সাধারণভাবে জানি সংবিধান রচনা ও সংশোধনী করে সংসদ আর সংবিধানের ব্যাখ্যা প্রদান করে সুপ্রিম কোর্ট, কিন্তু আদালত এখন সংবিধান সংশোধনের কাজ করছে বিষয়টিকে কিভাবে দেখেন?
রফিক-উল হক : সুপ্রিম কোর্ট তো সংবিধান সংশোধনের কোনো নির্দেশনা দেননি। আপনি ভারতের সংবিধান দেখুন, সেখানে কয়েক হাজার সংশোধনী এসেছে। সময়ের সাথে সংবিধান সংশোধন হবেই। এ কারণে যে কমিটি হয়েছে তাদের ভেবেচিন্তে দেশের স্বার্থের জন্য সংশোধনী আনতে হবে। ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করতে হবে। সংবিধান তো এক দিনের জন্য হয় না, সর্বকালের জন্য। ৩৮ বছর পর আজকে বড় আকারে সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হচ্ছে। তাদের অন্তত ভবিষ্যৎ ৫০ বছরের চিন্তা মাথায় রাখতে হবে। এমন কিছু যেন না করা হয় আরেকজন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যেন না বদলে ফেলে তা চিন্তা করে কাজ করতে হবে। আমি বলব এমন কিছু করবেন না যাতে নির্বাচন হলো না কিংবা কেউ সে নির্বাচনে অংশ নিলো না।
নয়া দিগন্ত : প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জামায়াতসহ কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের ইচ্ছা তার নেই; অপর দিকে মন্ত্রীরা বলছেন পঞ্চম সংধোধনী বাতিলের রায় কার্যকর হলে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হবে, তাদের এই বক্তব্যের অর্থ কী বলে মনে করেন?
রফিক-উল হক : তা যদি হয় তাহলে এত কথা বলার দরকার কী? কী রায় দেয় দেখি না কেন? তার আগেই এসব বলে নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে কী লাভ?
নয়া দিগন্ত : বর্তমানে সংবিধান সংশোধনের সাথে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কথা হচ্ছে। প্রসঙ্গটি কেন আনা হচ্ছে বলে মনে করেন?
রফিক-উল হক : এ দেশের মানুষ অনেক বেশি সেকুলার, অনেক বেশি অসাম্প্রদায়িক। আমি আগেও দেখছি এখনো দেখছি। আমি ভারতে যাই, সেখানে আমার জন্ম। বাংলাদেশের মতো ভারত সেকুলার নয়। তারা প্রেসিডেন্ট কিংবা স্পিকার মুসলমান করছে বলে সেকুলার এটা ঠিক নয়। বাংলাদেশের চেয়ে ভারত সেকুলার নয়। সেকুলার হচ্ছে মনের কথা। আপনি প্রতিবেশীর সাথে কেমন ব্যবহার করছেন, এ দেশের মানুষ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে চলে। মানসিকতার দিক দিয়েও এ দেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক নয়।
নয়া দিগন্ত : আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধানের প্রতি তাদের গভীর আস্খার কথা প্রকাশ করে থাকেন, কিন্তু দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যেমন সংসদ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্খা কমে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, কেন এমন কথা আসছে?
রফিক-উল হক : সত্যিকারের গণতন্ত্রের জন্য আপনি সংবিধান সংশোধন কমিটি করছেন। অথচ প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। একটি লোককে কোনো মতে জেলে ঢুকিয়ে ৩০-৪০ বছরের মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখাচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হচ্ছে। মাহমুদুর রহমানের সাথে যে ব্যবহার করা হলো-এই কি মত প্রকাশের স্বাধীনতা? তবু বলব আমাদের আপিল বিভাগ সাহস দেখিয়েছে। কাগজ বের হয়েছে। আমি বর্তমান প্রধান বিচারপতিসহ সবাইকে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানাই। তারা অন্তত মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আরো অনেক মৌলিক অধিকার খর্ব হচ্ছে। সরকার বলছে, আমরা এমন একটি সংবিধান করব যাতে মানুষের আস্খা থাকে। কিন্তু এই সংবিধান কি খুব খারাপ সংবিধান? তাতে আস্খা নেই কেন? আসলে এসব নির্ভর করছে সরকার ও বিরোধী দলের আচরণের ওপর।
নয়া দিগন্ত : নির্বাচন কমিশন নিয়েও আস্খার সঙ্কট আছে।
রফিক-উল হক : নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে বলব, আমি তাদের চিনি। ভারতের নির্বাচন কমিশনার সাকসেনার মতো যদি আচরণ তাদের হতো, তাহলে সবাই আস্খা রাখতে পারত। কিন্তু এই নির্বাচন কমিশনাররা কী করছেন? ভোলার উপনির্বাচনে বললেন সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে না। তাহলে চট্টগ্রামে মোতায়েন করলেন কেন? একমুখে দুই কথা কেন? নির্বাচন কমিশনারের চাকরি তো চলে যাবে না। তাহলে এই আচরণে কি আস্খা আসবে? মুখে যা বলব কাজে
তা-ই করতে হবে। যে যার জায়গায় আছেন সেখানে সঠিক দায়িত্ব পালন করলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে।
নয়া দিগন্ত : বিচার বিভাগের অবস্খা তো আপনার বেশি জানার কথা।
রফিক-উল হক : বিচার বিভাগ নিয়ে মন্তব্য করলে আবার আদালত অবমাননা হবে। অনেক কোর্ট আছে খুব ভালো। কিন্তু কিছু কোর্ট আছে যারা হাওয়া বুঝে রায় দিয়ে থাকেন। রায় হবে আইনের চোখে।
নয়া দিগন্ত : নির্বাহী বিভাগ বিশেষ করে প্রশাসনে এক ধরনের স্খবিরতা বিরাজ করছে, বিষয়টিকে কিভাবে দেখেন?
রফিক-উল হক : দেশ চালানোর ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা নেয়া উচিত। যাকে-তাকে যখন-তখন ওএসডি করে রাখা হয়েছে। শত শত কর্মকর্তাকে ওএসডি করলে প্রশাসন চলবে কিভাবে? এইচ টি ইমাম যাকে ভেবেছেন তাকে ওএসডি করেছেন, এটা কি প্রধানমন্ত্রী দেখেন না? কর্মকর্তারা আগের সরকারের সাথে কাজ করেছেন বলে তাদের ওএসডি করতে হবে। তাহলে সরকার আমলাদের সমর্থন পাবে কিভাবে? এখন যারা আছে তারা ভাবছে পরের সরকারের আমলে তাদের অবস্খাও এমন হবে। সে জন্য আমি বলি পার্টি কী বলে তা নয়, আইন মেনে চলুন। আইন কী বলে তা দেখুন। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন। কয়েক দিন আগে এক মন্ত্রী যুবলীগকে বললেন, তোরা যুবদলকে মারতে পারিস না? কী করিস তোরা? আমার সম্পর্কেও অকথ্য ভাষায় কথা বলেছে। আমি অবশ্য মামলা করব। এভাবে তো চলতে পারে না।
নয়া দিগন্ত : আমরা দেখছি সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়ছে বিরোধী দল সংসদে যাচ্ছে না এ অবস্খায় সাংবিধানিক ব্যবস্খা সম্পর্কে প্রশ্ন সৃষ্টি হচ্ছে কি না।
রফিক-উল হক : সংসদ একতরফাভাবে চলছে। বিরোধী দল যাচ্ছে না। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, নেত্রী যা বলছেন তা-ই হচ্ছে। নেত্রী কিছু বলার সাথে সাথে এক হাত নয়, দু’হাত তুলছেন। কিন্তু এবার একটি বিষয় লক্ষ করছি, নেত্রী থাকা সত্ত্বেও সংসদ খালি। আগে প্রধানমন্ত্রী থাকলে ভয়ে সবাই উপস্খিত থাকতেন, এখন তা-ও হচ্ছে না। নেত্রী সংসদে সময় দিচ্ছেন, কিন্তু পেছনে সব ফাঁকা। মাঝে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বসে আছেন। আর পেছনে কিছু মহিলা এমপি সেজেগুজে বসে আছেন। এই কি সংসদ?
নয়া দিগন্ত : সংবিধানে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু, ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে বিষয়গুলোকে কিভাবে দেখেন?
রফিক-উল হক : দেখুন এ ব্যাপারে আদালতের সিদ্ধান্ত আছে। সেখানে বলা হয়েছে, রিমান্ডে নিয়ে কাচের ঘরে রাখতে হবে। আইনজীবী দেখতে পারবেন তাকে টর্চার করা হচ্ছে কি না। হামিদুল হক চৌধুরী কবে এ রায় দিয়ে গেছেন কিন্তু সরকার তো তা মানছে না। আমরা সংসদে বড় গলায় আইনের শাসনের কথা বলছি। বিরোধী দলকে গাল দিচ্ছি, কিন্তু আমরা কী করছি তা দেখছি না। তাই বিরোধী দল সরকারি দল সবাইকে তার নিজের জায়গায় নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে। না হলে কোনো কিছুই হবে না। আগে দেশের স্বার্থ পরে দলের স্বার্থ; এরপর হতে পারে নিজের স্বার্থ। সব কিছু রাজনৈতিক বিবেচনায় নিলে হবে না।
নয়া দিগন্ত : আমরা দেখছি আদালত প্রাঙ্গণে গ্রেফতারের ঘটনা ঘটছে। বিষয়টিকে কিভাবে দেখেন?
রফিক-উল হক : কয়েক দিন আগে আদালত প্রাঙ্গণে যে গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে তা অচিন্তনীয়। আমি ৫১ বছর ধরে আদালতে প্র্যাকটিস করছি, এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। এরশাদের মতো ডিক্টেটরের সময়ও এমন ঘটেনি।
নয়া দিগন্ত : আপনি বলেছিলেন ওয়ান-ইলেভেন থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে নির্বাচিত সরকার এসেছে। সে আশা কতখানি বাস্তবায়ন হয়েছে?
রফিক-উল হক : সে আশা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। যখন সরকার গঠন করা হয়, তখন আমি প্রধানমন্ত্রীকে তার বোনের সামনে বলেছি, আপনার নৌকায় আল্লাহর মর্জি বহু লোক উঠেছে। এই লোক নিয়ে আস্তে আস্তে নদী পার হতে হবে। যদি একটু ধাক্কা লাগে তাহলে সব যাবে। এখন তো তা-ই হচ্ছে। আমি তা চাই না। আমি চাই আওয়ামী লীগ আবার আসুক। তারা সব সময় কেন বলে, আমাদের এই সময়ের মধ্যে সব কিছু করতে হবে। পরের বার কেন তারা আসতে পারবে না । পাঁচ বছর পর চলে যেতে হবে এ ধারণা কেন? তবে আমি যা আশা করেছিলাম তাতে আশাহত হয়েছি। আমি আশাহত হয়েছি তাতে কিছু আসে-যায় না। তবে দেশের মঙ্গলের জন্য দু’দলকে উপলব্ধি করা উচিত। তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত।
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ২৬/০৭/১০] |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/BaristerRafiqulHaque |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| বিশিষ্ট আইনজীবি, সুপ্রিম কোর্ট |
|