|
নিষিদ্ধ দৈনিক আমার দেশ: কিসের আলামত?
ড. আব্দুর রহমান সিদ্দিকী |
|
এক ধরনের জঘন্য নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন সরকার জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক আমার দেশ-এর ডিক্লারেশন বাতিল করেছে, তাৎক্ষণিকভাবে পত্রিকাটির প্রকাশনাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নানান কারসাজি করে পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাহসী কলামিষ্ট মাহমুদুর রহমানকে নিক্ষেপ করা হয়েছে কারাগারে। শুধু তাই নয় তাকে রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন, নিপীড়ন করা হচ্ছে। দেশের অনেক বিবেকবান মানুষ বিস্ময়ভরে সরকারের এসব কাণ্ডকারখানা দেখছে, দেশের গণতন্ত্র প্রিয় বিদ্বান বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ এতে হতভম্ব, উদ্বিগ্ন। আমার দেশ বন্ধ করে দেয়া বা মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা এখন শুধু একটি পত্রিকা বা একজন ব্যক্তি সম্পাদকের বিষয় নয়। এর প্রভাব প্রতিক্রিয়া ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত বলয়কে ছাপিয়ে সার্বজনীন অধিকার লঙ্ঘনের রূপ পরিগ্রহ করেছে। আর শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উঠেছে দেশ-বিদেশে নিন্দার ঝড়।
এ কথা প্রায় সকলেই জানেন যে, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ হচ্ছে স্বাধীন সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমসমূহ। স্বাধীন গণমাধ্যম একদিকে ক্ষমতাসীন সরকারকে রাষ্ট্রপরিচালনায় ভুলভ্রান্তি এড়িয়ে চলতে দিক নির্দেশনা দান করে অন্যদিকে জনগণের প্রত্যাশা ও অধিকারের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করে থাকে। গত দেড় বছর ধরে এসব দায়িত্বই পালন করে চলছিল আমার দেশ। যারা রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করছে তাদের নানান অন্যায়-অসংগতি ত্রুটি-বিচ্যুতি ভুল-ভ্রান্তি চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমার দেশ-জনস্বার্থ বিরোধী কার্যকলাপের প্রতিবাদ করেছে নিরন্তর। যেখানে যেভাবেই জাতীয় স্বার্থ লঙ্ঘিত হয়েছে আমার দেশ তা জনগণের সামনে নির্ভয়ে তুলে ধরেছে। একটি দেশপ্রেমিক সংস্থা হিসেবে আমার দেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলেছে অবিরাম। গণমানুষের কল্যাণ ও স্বার্থের অনুকূলে দাঁড়িয়েছে সাহসের সাথে। মাহমুদুর রহমান একজন প্রবীণ প্রকৌশলী। তাঁর পেশা যন্ত্রপাতি কলকব্জা নাড়াচাড়া করা। কিন্তু জাতির অপরিহার্য প্রয়োজনে তিনি হাতে তুলে নিয়েছেন কলম। অবিরাম লিখেছেন মানুষের অধিকারের পক্ষে। রাষ্ট্রের অস্তিত্বের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন সাহসের সাথে। দেশ বিক্রির চক্রান্ত আর আধিপত্যবাদী আগ্রাসীদের বিছানো নানা ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্নভিন্ন করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন বিগত দুই বছর ধরে। গণতন্ত্রের আড়ালে শাসক গোষ্ঠী বেপরোয়া লুণ্ঠন চাঁদাবাজী টেণ্ডারবাজী ধর্ষণ দখলদারিত্বে লিপ্ত। মাহমুদুর রহমান মুখোশ ছিঁড়ে তাদের কুৎসিত চেহারা জাতির সামনে তিনিই খুলে দিয়েছেন। তিনি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অন্য একরকম প্রহরীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, জনগণকে জাগিয়ে রেখেছেন সর্বদা। এসব হচ্ছে তাঁর অপরাধ। নিখাঁদ দেশপ্রেম বুকে ধারণ করা যেন মহা অন্যায়। আর এ জন্যই কদর্য নাটক সাজিয়ে তাঁকে নিক্ষেপ করা হয়েছে কারান্তরালে, নেয়া হয়েছে রিমান্ডে। অতীতে বিভিন্ন সরকার সাংবাদিক-সম্পাদকদের কারাগারে পাঠিয়েছে। (ইত্তেফাকের মরহুম মানিক মিয়া তাঁদের একজন)। কিন্তু কাউকে রিমান্ডে নেয়ার নজির নাই। মাহমুদুর রহমানকে রিমান্ডে নেয়ার ঘটনায় বোঝা যায় সরকারের অন্ধ আক্রোশের শিকার তিনি। প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই এই নজির বিহীন ঘটনা জন্ম দিয়েছে সরকার। হয়তো তাকে খতম করে দেয়ারই ষড়যন্ত্র চলছে রিমান্ডের নামে। পুলিশ কাষ্টোডিতে শ্রমিক নেতা বাকেরসহ বহু অবাঞ্চিত মৃত্যুর কথা জাতি জানে। তাই মাহমুদুর রহমানের রিমান্ডের খবর শুনে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত মানুষ উদ্বিগ্ন, তারা ফুঁসছে।
বিগত আঠারো মাসে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী এই দেশকে এক ভয়ানক রক্তাক্ত জনপদে পর্যবসিত করেছে। এরা নির্বাচনের আগে জাতিকে অনেক ভালো ভালো কথা শুনিয়েছে। বলেছিল দ্রব্যমূল্য কমানোর কথা, জীবন যাত্রাকে সহজ ও সাশ্রয়ী করার কথা। প্রলোভন দেখিয়েছিল ঘরে ঘরে চাকুরির, তরুণদের স্বপ্ন দেখিয়েছিল ডিজিটাল দেশ গড়ার। শুনিয়েছিল দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসনের মিঠে হাওয়া বইয়ে দেয়ার ললিত বাণী। কিন্তু জনগণ অবিলম্বে দেখতে পেল নেতা-নেত্রীদের সব প্রতিজ্ঞা প্রতিশ্রুতি কর্পুরের মত উবে গেছে, তারা প্রতারিত হয়েছে। বস্তুতঃ ক্ষমতার মসনদে আরোহণের পর এরা এক ভিন্নতর চেহারায় আবির্ভুত হয়েছে। তারা চারদিকে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার দাবানল ছড়িয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেন শৃগাল শকুনের মত ঝাঁপিয়ে পড়েছে দেশটির উপর। যে যেভাবে পারে লুটপাট, চাঁদাবাজী করে, খুন জখম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে, হল-হোস্টেল ছাত্রীদের যৌন অনাচারে বাধ্য করে গোটা দেশকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এরা দেশের আইন-আদালতকে পঙ্গু ও পকেটস্থ করে ফেলেছে। ন্যায় বিচার আজ সুদূর পরাহত। আইনের শাসন ক্রমশঃ হচ্ছে বিপর্যস্ত। সুশাসন আজ নির্বাসিত। একই ধরনের অপরাধে বিচারের ঘর থেকে সরকারি দলের কেউ কেউ বেকুসুর খালাস পেয়ে যাচ্ছে। আবার প্রতিপক্ষের লোকদের আইনের শক্ত রজ্জুতে বাঁধা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী গণ্ডাগণ্ডা মামলা-মোকদ্দমা অপরাধ-অভিযোগ থেকে খালাস পেয়ে যাচ্ছেন, হয়ে উঠছেন ফুলের মত পবিত্র, নিষ্কুলুষ। আর বিরোধী দলীয় নেত্রীকে তোলা হচ্ছে বিচারের কাঠগড়ায়। তাঁদের ভাবমূর্তিতে লেপে দেয়া হচ্ছে নানান অপবাদ অপরাধের কলুষ কালিমা। সরকারের আমলা-ফয়লা আমত্যরা গোপন চুক্তি করছেন, উৎকোচের অর্থ নাকি লেনদেন করছেন, এসব কথা প্রায়ই শোনা যাচ্ছে। তবু তারাই ধোয়া তুলসীপাতা। আর বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের কল্পিত অতিরঞ্জিত অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেয়া হচ্ছে মামলায়, অবলীলায় হনন করা হচ্ছে তাদের চরিত্র। এ সরকার কোনো কোনো দেশের সাথে প্রকাশ্য গোপন নানা জনস্বার্থ বিরোধী চুক্তি-সমঝোতায় আবদ্ধ হচ্ছে। প্রতীয়মান হচ্ছে এরা বিজাতীয়দের তাবেদার, বিদেশীদের পায়ে নিজেদের নৈবেদ্য দিয়ে ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে থাকতে চায়।
দৈনিক আমার দেশ শাসকগোষ্ঠীর এসব অপকীর্তির কথা ফাঁস করে দিয়েছে। একজন খাঁটি দেশ প্রেমিকের মত মাহমুদুর রহমান ওদের দেশবন্ধকের চক্রান্ত আর জালিয়াতি জোচ্চুরির কাহিনী জাতিকে অবহিত করার কাজে নিয়োজিত থেকেছেন। আর সে জন্যই তাঁর উপর সরকার ক্ষিপ্ত ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। আহত শ্বাপদের মত বিষ দাঁত বসানোর মওকা খুঁজেছে এতোদিন। বিগত ১লা জুন মধ্য রাতে সেই কামড় বসিয়েছে আমার দেশকে, আর সময়ের নির্ভিক সন্তান মাহমুদুর রহমানকে। ওরা বোধকরি ভেবেছে মাহমুদুর রহমান যদি আর কিছুদিন কলম চালাতে থাকেন তাহলে ওদের ক্ষমতার দুর্গে আগুন জ্বলে উঠবে। হয়তো আঁচ করতে পেরেছে আমার দেশ আর কিছুকাল চালু থাকলে নিপীড়িত বিক্ষুব্ধ জনতার রুদ্ররোষে ধ্বসে পড়বে ওদের দুঃশাসনের প্রাসাদ।
ক্ষমতাসীন সরকারের আচার-আচরণ কর্মকৌশলের সাথে বহুলালোচিত ১/১১ সরকারের একটা অন্তর্গত মিল পরিলক্ষিত হচ্ছে। সে সময় মধ্যরাতে ঘেরাও করে, সীন ক্রিয়েট করে মহাহুলুস্থুল বাঁধিয়ে বিনা পরোয়ানায় উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের, নেয়া হতো রিমান্ডে চালানো হতো অমানুষিক অত্যাচার নির্যাতন। রাষ্ট্রযন্ত্রকে তখন দেখা গেছে আক্রমণাত্মক ভূমিকায়। সরকার তখন অবলম্বন করেছে নিবর্তনমূলক পন্থা। এরাও ঠিক একই কায়দা এস্তেমাল করছে, মধ্যরাতে লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে, ধরেবেঁধে নিয়ে যায় দেশের একজন বিশিষ্ট নাগরিককে, খ্যাতিমান সংবাদকর্মীকে। তালাবদ্ধ করে দিয়েছে তাঁর বহুল পঠিত সংবাদপত্রের কার্যালয়। মনে হচ্ছে এরা যেন অব্যবহিত পূর্ববর্তী সরকারেরই হুবহু প্রতিচ্ছবি, তাদেরই চেতনাগত উত্তরসূরী। অথচ সাবেক সরকারটি ছিল সেনাসমর্থিত অগণতান্ত্রিক সরকার। আর এ সরকারের গায়ে রয়েছে গণতন্ত্রের আলখেল্লা। তবুও কি অদ্ভুত মিল এ দু’য়ের মধ্যে। দেশের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি ভাবছেন দেশের বর্তমান সরকার যে কর্মকৌশল অবলম্বন করছে, যে লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়েছে, তা থেকে এরা এখনই সরে আসবে না। এ ক্ষমতালিপ্সু চক্রটি সহজে নিবৃত্ত হওয়ার নয়। সত্যিকার দেশপ্রেমিকরা এদের টার্গেট, এরা কাউকে সত্যি কথা উচ্চারণ করতে দিতে নারাজ। এরা গণতন্ত্রকে পায়ে ঠেলে হয়ে উঠছে স্বৈরাচারী। এরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। এরা নাগরিকদের মত প্রকাশের অধিকারকে স্বীকার করে না। এজন্যই ইতোমধ্যে বন্ধ করে দিয়েছিল চ্যানেল ওয়ান, যমুনা টিভি, আটকে দিয়েছে ‘ফেসবুক’। ইতোমধ্যেই নিহত হয়েছে অনেক সুপরিচিত সাংবাদিক। আওয়ামী ঠ্যাঙ্গারেদের হাতে সারাদেশে আহত-পঙ্গু হয়েছে বহু সংবাদকর্মী। ওরা স্তব্ধ করে দিয়েছে বহু প্রতিবাদী কণ্ঠ। এই হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার আসল নমুনা।
প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ বরাবরই একটি ফ্যাসিবাদী দল। যতসব বনেদি ষণ্ডা-পাণ্ডা, গুণ্ডা-মাস্তান, খুনে-লুটেরাদের পরম আশ্রয়স্থল এ দলটি। এ পার্টির পুরোধা মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানও দলে লালন করেছেন যত লুটেরা আর ‘চাটার দল’কে। দলের গভীরে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন ‘চোরের খনি’। অবশেষে শেখ মুজিব নিজেই গণতন্ত্রের পিরহান ছুঁড়ে ফেলে পরিণত হয়েছিলেন চূড়ান্ত স্বৈরাশাসকে-একনায়কে। তিনি অস্বীকার করেন দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে। অস্বীকার করেন মানুষের সংগঠিত হওয়ার অধিকার, ফুৎকার দিয়ে নিভিয়ে দিয়েছিলেন মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারকে। বন্ধ করে দিয়েছিলেন দেশের তাবৎ ভিন্ন মতাবলম্বী সংবাদপত্র। বাতিল করেছিলেন সব রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে। ইতালীর ফ্যাসিষ্ট মুসোলীনির স্টাইলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাকশাল, একদলীয় শাসন। গঠন করেছিলেন পেটুয়া রক্ষী বাহিনী। চালু রেখেছিলেন শুধু ‘মামা-ভাগ্নের’ কুক্ষিগত গুটিকয়েক দৈনিক পত্রিকা, আর বিটিভি পরিণত হয়েছিল বাকশাল টেলিভিশনে। সেদিন হাজার হাজার সংবাদকর্মীকে বেকারত্বের বিভীষিকার মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছিল, তারা পথে পথে ঘুরেছেন, ক্ষুধা বঞ্চনা ও অপমানে সেদিন চোখের পানি ফেলেছেন। জাতির ঠোঁটে তালা মেরে দিয়েছিলেন মুজিব। এভাবে শেখ সাহেব হয়ে উঠেছিলেন একচ্ছত্র কর্তৃত্বপরায়ন এক ভয়ংকর স্বৈরশাসক। জাতির সব স্বপ্ন ভেঁঙ্গে দুমড়ে মুচড়ে ফেলেছিলেন তিনি। স্বাধীনতা হয়ে উঠেছিল হাস্যকর, সার্বভৌমত্বকে সপেঁ দেয়া হয়েছিল আধিপত্যবাদী প্রতিবেশীর পদপ্রান্তে। জাতিকে শায়েস্তা করতে তিনি লেলিয়ে দিয়েছিলেন রক্ষীবাহিনী নামক হায়েনার দলকে। তখন মুজিববাদীদের দাপটে গণমানুষের প্রাণ ছিল ওষ্ঠাগত। কথিত বঙ্গবন্ধু দেশকে উপহার দিয়েছিলেন ’৭৪-এর কালান্তক দুর্ভিক্ষ। হত্যা করেছিল প্রতিবাদী বিপ্লবী সিরাজ শিকদারকে। সেই গণতন্ত্র হত্যাকারী শেখ মুজিবের উত্তরসূরীরা এখন ক্ষমতায়। পতিত মুজিববাদের ধ্বজাধারীরা আবার ক্ষমতার দণ্ডহাতে দণ্ডায়মান। মুজিবের আদর্শ বাস্তবায়নের কথা সহস্র কণ্ঠে তারা নিত্যদিন উচ্চারণ করে। যথার্থ! মানুষের সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে আজ ছিনিমিনি খেলছে বাকশালের উত্তরাধিকারী এ সরকার। এদের হাতে গণতন্ত্র নিরাপদ নয়। গণমাধ্যম স্বাধীন নয়। গণমাধ্যম কর্মীরা বিপদাপন্ন, তারা অনেকেই ভাসছেন চোখের পানিতে- আর সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পদে পদে বিপর্যস্ত। এর নিদারুণ উদাহরণ অবরুদ্ধ আমার দেশ, আর অবরুদ্ধ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। দেশবাসী ঠিকই বুঝে গেছেন যে, সরকার ষড়যন্ত্র করে বন্ধ করে দিয়েছে দৈনিক আমার দেশ, কারাবন্দি করা হয়েছে সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে। কিন্তু দেশের লাখো মানুষ দৈনিক আমার দেশ পড়তে চায়। মাহমুদুর রহমানকে মুক্ত দেখতে চায়। সরকারী মহলের জানা উচিত পত্রিকা বন্ধ করে অপকর্ম অন্যায় দুর্নীতিকে লুকানো যাবে না শেষাবধি। এসব করে শেখ মুজিবও শেষ রক্ষা করতে পারেন নাই।
আজকে চারদিকে চারদিকে শোনা যাচ্ছে বাকশালের পদধ্বনি। জাতিকে ধাবিত করা হচ্ছে একদলীয় স্বৈরশাসনের দিকে। আজকে ১৯৭৪-’৭৫-এর মুজিববাদী দুঃশাসনের কথা মনে পড়ছে আবার। সেই জঘন্য ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আলামত চোখে পড়ছে সর্বত্র। নানা বুলি বচনের আড়ালে এরা গণতন্ত্র হত্যায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। মানুষের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিতে উদ্যত। এরা গণতন্ত্রকে পিছনে ঠেলে দিয়ে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র কায়েমের দিকে ধাবমান। তার এক ঘৃণ্য নমুনা হচ্ছে দেশের বহুপ্রতিষ্ঠান/সংস্থার নাম পরিবর্তনের প্রয়াস। দেশের শত শত স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসার নামকরণেও দেখা যাচ্ছে সেই উদগ্র বাসনার প্রতিফলন। শেখ মুজিব ও তাঁর বিবি-বাচ্চা জ্ঞাতিগোষ্ঠী আত্মীয়-স্বজনের নামে প্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি। এমনকি দেশের বনজঙ্গল-সাফারী পার্ক, রিজার্ভ ফরেষ্ট পর্যন্ত শেখ মুজিবের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এখন মানুষ ভাবছেন কবে যে সুন্দরবনের নাম হবে মুজিববন, আর সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার বদলে নাম দেয়া হবে মুজিব বাজার। আর রাজধানী ঢাকার নাম পরিবর্তন করার জন্য এক বিকারগ্রস্থ মুজিবনগরী আমলা দাবি উত্থাপন করেছেন। তিনি রাজধানী ঢাকার নাম ‘মুজিবনগর’ করার প্রস্তাব করেছেন। এবং তার এ দাবি বাস্তবায়িত হওয়া অসম্ভব নয়। শুধু শেখ মুজিবের নাম ঊর্ধ্ব আকাশে তুলে ধরতেই এ হতদরিদ্র দেশের দুর্লভ হাজার হাজার একর চমৎকার চাষাবাদের জমি দখল করে আরেকটি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট নির্মাণের প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে সরকার। কাজেই জনগণ নয়, দেশ জাতি নয়, গণতন্ত্রও নয়- ব্যক্তিপূজাই প্রাধান্য পাচ্ছে এসময়। গণতন্ত্র এখানে একটি কৃষ্ণপক্ষের ক্ষীয়মান চাঁদের তুলনা। আর কিছুদিন পার হলে হয়তো পুরো অমাবশ্যার আঁধার নেমে আসবে জাতির ভাগ্যাকাশে। সেজন্যই দৈনিক আমার দেশ-এর মত উজ্জ্বল নক্ষত্রটিকে ভূপাতিত করা হয়েছে, আর আঁধার তাড়ানিয়া মাহমুদুর রহমানের সাহসী কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে আঁটা অপকৌশল মোটেই অভাবনীয় নয়। সিরাজ শিকদারের হত্যাকারীদের উত্তরসুরীরা যেন উন্মত্ত হয়ে উঠেছে নৃশংস জিঘাংসায়।
এবার ক্ষমতার চাঁদোয়ার নিচে বসেই লীগাররা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তা আঁচ করা যায় এদের বৈদেশিক মিতালীর ভাবভঙ্গি থেকেই। এরা ঝুঁকে পড়েছে এক অশুভ আন্তর্জাতিক চক্রের দিকে। ইন্দো-মার্কিন-জায়নবাদী অক্ষশক্তির ক্রীড়ানক হয়ে উঠেছে এরা, তাদের মনোমিতা এই সরকার। সরকার ইতোমধ্যেই ঘনিষ্ট হয়ে উঠেছে এই ত্রিদেশীয় অক্ষশক্তির সাথে-ভায়া হিন্দুস্তান। এদেশ সকলের অগ্নিদৃষ্টি বাংলাদেশের ওপর। দৈনিক আমার দেশ বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্রসত্তার কথা বলে, স্বাধীনতার কথা বলে জনগণের কল্যাণের পক্ষে দাঁড়ায়। সেই সংবাদপত্রটিকে নিষিদ্ধ করা হলো কার স্বার্থে, কাদের ইঙ্গিতে? বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ। এর রয়েছে সমুজ্জ্বল ইসলামী ঐতিহ্য আর জনগণ লালন করে সুদৃঢ় ইসলামী মূল্যবোধ। তাই হিন্দু-খ্রিষ্ট-ইহুদীবাদীরা এর সমাজ কাঠামো ভাঙ্গতে বদ্ধপরিকর, এর সাংস্কুতিক সত্ত্বাকে মুছে ফেলার পাঁয়তারা করছে। এ দেশকে তাদের মুঠোয় চাই-আদর্শিক ও রণকৌশলগত কারণে। ইতোমধ্যে এ সরকার সানন্দে হাত মিলিয়েছে ভারতে সাথে, আর তার মাধ্যমে বাকি দুই দুষ্ট শক্তির কণ্ঠলগ্ন হয়েছে। এই ত্রয়ীশক্তি কার্যতঃ বিশ্বমানচিত্রকে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিতে চায়। কব্জায় নিতে চায় বিশেষতঃ মুসলিম জাহানকে-বাংলাদেশ যার অন্যতম। এমন পরিকল্পনা নিয়েই তারা হয়তো অগ্রসর হচ্ছে। আর এ সরকার তাদেরই সহযোগী, এ ভূ-খণ্ডটিও তাদের টার্গেট বটে। মোটকথা, এ সরকার দেশটিকে নানাভাবে গণতন্ত্রহীনতার দিকে, নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে নিয়ে চলেছে। একে পরিণত করতে চায় অকার্যকর রাষ্ট্রে। অবশেষে অবাধ পদচারণার ক্ষেত্রে পর্যবসিত করতে চায় বিদেশী সামরিক-বেসামরিক দণ্ডধরদের। দেশপ্রেমিক মাহমুদুর রহমান এ চক্রান্ত রুখে দিতে চালিয়েছেন তার তীক্ষ্নকলম। এদেশের সার্বভৌমত্ব ইসলামী চরিত্রের কথা লিখেছেন বার বার। তাই হামলা-মামলা জেল-জুলুম-গ্রেফতার-রিমান্ড আর ডিক্লারেশন বাতিলের বেড়াজাল দিয়ে তাঁকে প্রতিহত করার চেষ্টা। আমার দেশ বিদেশী চক্রান্তকারী ও তাদের দেশীয় দোসরদের মুখোশ খুলে দিতে অকুতোভয়। আর সে জন্যই যত আক্রোশ এদের উপরে।
স্পষ্টতঃ সব নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রিমান্ডে নেয়া হয়েছে, নানা কাহিনীকাণ্ড করা হচ্ছে তাকে নিয়ে। মাহমুদুর রহমান কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন যে, সত্যপ্রকাশের দায়ে তিনি শাসক মহলের বিরাগভাজন হয়ে পড়েছেন। ইতোপূর্বে তার উপর দৈহিক হামলা হয়েছে একাধিকবার। মামলা হয়েছে ডজন ডজন। প্রাণনাশের হুমকি মাথায় নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছেন দেশের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। বলেছেন গণতন্ত্রের কথা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা। তিনি লিখেছেন শাসক মহলের দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের কথা। গত মাসে রাজশাহীতে এসেছিলেন গঙ্গার পানির নায্য হিস্যার দাবীর কথা বলতে। নগরীর বিশিষ্টজনদের সাথে মত বিনিময় সভায় তিনি ব্যক্ত করেছিলেন তার উপরে সরকারী মহলের শ্যেন দৃষ্টির কথা, কঠিন আক্রোশের কথা। তিনি আরো বলেছিলেন দেশ ও জাতির পক্ষে তিনি কলম অব্যাহত ভাবে চালিয়ে যাবেন। এ জন্য কারাগারে যেতেও ভয় পান না। তার আশঙ্কা সত্য হলো। তিনি এসব উচ্চারণ করেছেন নির্ভিকভাবে, নিজের কল্যাণ অকল্যাণের ভাবনা থেকে নয়। মাহমুদুর রহমান গত দু’বছরে রাজশাহীতে অনেকবার এসেছেন। প্রথম এসেছিলেন আমারই নিমন্ত্রণে, দৈনিক আমার দেশ-এর দায়িত্বভার গ্রহণ করার মাত্র ২৯ দিনের মাথায়। শেষবার আসেন গত মাসের ফারাক্কা দিবসের আয়োজনে। কথা ছিল দুপুরে ডাল-ভাত খাবেন আমার বাসায়। সে মতো আয়োজনও করা হয়েছিল। কবি আব্দুল হাই শিকদার, মানিক ভাইসহ তাঁর কয়েকজন সফরসঙ্গী দুপুরে আমার বাসায় আসবেন বলেছিলেন। যখন টেবিলে খাবার সাজানো হচ্ছে- তখন মাহমুদুর রহমান আমাকে ফোন করে তার অপাগতার কথা জানালেন। ক্ষমা প্রার্থনা করলেন আমার স্ত্রীর কাছে। জানালেন নিরাপত্তাজনিত কারণে আমার বাসায় তাঁর আসা সম্ভব নয়। আমি সেদিন পীড়াপীড়ি করিনি, অবাকও হইনি। তবে মন খারাপ করেছিল আমার স্ত্রী, ছেলেমেয়েরা। মাহমুদুর রহমান সাহেবরা এলেন না, খেলেন না এজন্য তারা কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু আমি মন খারাপ করেনি। কারণ আমি জানি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এখন মুজিববাদী মাস্তানদের পদভারে কম্পিত। তাদের দাপট দুষ্কর্মে, দুঃশীল দুর্বিনীত আচরণে এই মহান বিদ্যাপিঠ এখন এক অস্বস্তিকর স্থান। কেউ জোর করে বলতে পারে না কখন কোথায় কি অঘটন ঘটবে। কাজেই ক্যাম্পাসে এলে মাহমুদুর রহমানের লাঞ্ছিত নিগৃহীত হওয়া মোটেই অসম্ভব নয়। এমনকি তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু যে ঘটবে না, তাও জোর করে বলার উপায় নাই। আমার বাসায় দাওয়াত না খেয়েই তিনি ফিরে গেলেন ঢাকায়। কিন্তু সেই মুজিববাদীদের রোমশ থাবায় তাকে পড়তে হলো মাত্র ১৩ দিনের মাথায়। বাকশালীরা বন্দুকের নলের মুখে তাঁকে তুলে নিয়ে গেল মধ্যরাতে। এই কি হাতাকাটা কোটওয়ালাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রশাসনের আসল চেহারা? এসবই কী তাদের ডিজিটাল সমাজ নির্মাণের পন্থা? এই কি তাদের সুশাসনের নমুনা? এরা আসলে সত্য ও ন্যায়ের হন্তারক। এরা উদার গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা রোধ করতে মরিয়া। এরা দেশপ্রেমিকদের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে নির্মম, এরা বিদেশী প্রভূদের তোষণে ব্যাকুল।
প্রকৃতপক্ষে আজকে ব্যক্তি মাহমুদুর রহমান কারাগারে নন-কারাগারে জাতির নির্ভিক বিবেক, রিমান্ডে জনগণের গণতন্ত্রের আকাঙ্খা, অবরুদ্ধ জাতির স্বাধীনতা অটুট রাখার প্রবল প্রতিজ্ঞা। দৈনিক আমার দেশে নয়, তালা মারা হয়েছে দেশের কোটি কোটি মানুষের ঠোঁটে। জনসাধারণের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারকে করা হয়েছে সিলগালা। ক্ষমতাসীন মহল সম্ভবতঃ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নাই। তারা জানে না যে, অবদমিত নির্যাতিত মানুষেরা হুঙ্কার দিয়ে পথে বেরিয়ে এলে তাদের তখ্তে-তাউস খড়কুটার মত ভেসে যাবে বঙ্গোপসাগরে। আর আওয়ামী উৎপীড়ন ও অনাচারের আবর্জনা ভেদ করে জনগণ অবশ্যই শীঘ্র জেগে উঠবে। অবতীর্ণ হবে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন কায়েমের সংগ্রামে। তারা মাহমুদুর রহমানের মত দেশপ্রেমিকদের হাতে তুলে দিবে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পতাকা।
লেখকঃ প্রফেসর, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrAbdurRahmanSiddique |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| প্রফেসর, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় |
|