ইদানীং বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, তার ছাত্র, অধ্যাপক, প্রশাসন, পাঠক্রম, শিক্ষা, শিক্ষার পরিবেশ, ক্যাম্পাসে রাজনীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দলাদলি, দলীয়করণ, ইত্যাদি নিয়ে বেশ লেখালেখি ও বিতর্ক হচ্ছে। এ আলোচনা-সমালোচনার পেছনে দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ চত্বরে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক দাঙ্গাহাঙ্গামারও যে একটা ভূমিকা আছে তা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার জন্য কেউ বলছেন ছাত্র রাজনীতিসহ বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে সব ধরণের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হউক। কেউ বলছেন, ‘জয়তু ছাত্র রাজনীতি’। কেবল ‘ছাত্র রাজনীতিই’ পারে জাতিকে এই আপদ বালাই থেকে মুক্তি দিতে। সমস্যার পরিসরকে আরেকটু সম্প্রসারিত করে কেউ আবার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি বাণিজ্য এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট বাণিজ্যের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং তাদের পরিপ্রেক্ষিত ও তাত্পর্য নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করছেন। আবার এমনও কলাম লেখক আছেন যারা বাংলাদেশে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়কে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। কেউ তার সমালোচনাও করছেন। কেউ কেউ আবার দেশের কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়ে বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে ব্যবসা ও প্রতিযেগিতার সুযোগ করে দিতে পরামর্শ দিচ্ছেন। অন্যান্যরা বলছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চাই, শিক্ষা চাই, কিন্তু বাণিজ্য চাই না, ইত্যাদি, ইত্যাদি।
আমার ধারণা, আমরা যাই বলি বা লিখি না কেন, দেশের নীতি নির্ধারকদের এখনো পর্যন্ত যে মনোভাব তাতে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় কোনো গুণগত পরিবর্তনের কোনো আশা নেই। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায়তন গত ৩০/৪০ বছর ধরে যেভাবে চলছে সেভাবেই গতানুগতিক ধারায় চলবে আগামী দিনগুলেতেও। দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, তাদের শিক্ষা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে আমি নিজেও আগে দু’একটি কলাম লিখেছি। আপাতত এ বিষয়ে আমার আর কোনো নতুন চিন্তা ও ধারণা নেই এবং লেখারও ইচ্ছে নেই।
আজ আমি উচ্চশিক্ষা বিষয়ে একটি সাধারণ প্রশ্ন তুলতে চাই। এ প্রশ্ন দেশ-কাল, জাতি ভেদে সবার বেলা সমানভাবে প্রযোজ্য। এটা প্রতিষ্ঠান কিংবা তার পরিবেশের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয়। প্রশ্নটি আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অধ্যাপকদের নিয়ে। তাও তাদের যোগ্যতা, বেতন ভাতা, বা সুযোগ সুবিধা নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আরো মৌলিক, আরো অন্তর্নিহিত। তাই আমি এটা উত্থাপন করতে চাই সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন আঙ্গিকে, নতুন ভঙ্গিতে। প্রশ্নটি আমি তুলছি যতটা না পাঠকদের আলোকিত করতে তার চেয়ে বেশি নিজে জানার জন্য, আপন কনফিউশন দূর করার তাগিদে। যে প্রসঙ্গটি আমি টেনে আনতে চাই এতে মৃদু বিতর্কও হতে পারে, তবে হলেও সেটা হবে নতুন ঢঙে, নতুন মাত্রায়। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় শ’ খানেক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এতে অধ্যাপক আছেন কয়েক হাজার। আমার এই লেখা পড়ার সময় ও সুযোগ সব অধ্যাপকের হয়ত হবে না, তাবে যারা কষ্ট করে ধৈর্য ধরে লেখাটি পড়বেন, তাদের কাছে সবিনয়ে আমি আমার লেখার ফিডব্যাক কিছু না কিছু হলেও আশা করছি।
আর সময় নষ্ট না করে কোন পরিপ্রেক্ষিতে ও পঠভূমিকায় আজকের প্রশ্নটি আমার মনের দরজায় টোকা দিল শুরুতে সেটা পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই। বলাই বাহুল্য ঘটনাচক্রে আমিও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, তবে দেশি নয় একটি বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করে সংসার চালাই। পেশাগত জীবনের প্রারম্ভে ঊনিশ'শ’ সত্তর দশকের শেষে অবশ্য এক বছর বাংলাদেশের অন্যতম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়ানোর সুযোগ হয়েছিল। সেটা আজও আমি অত্যন্ত গৌরবের সাথে স্মরণ করি। বর্তমানে আমার কর্মস্থল কোথায় সেটা নিবন্ধের নিচে লেখক পরিচিতিতে আছে। আমার সাথে যোগাযোগের ঠিকানাটিও সেখানে আছে।
এবার আসি আসল কথায়। মাস খানেক আগে টেনেসী স্টেইট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপকদের নিয়ে একটি জরুরি বিভাগীয় বৈঠক বসে। মিটিংএর নির্দিষ্ট এজেন্ডা আলোচনার পর আমাদের ‘অ্যাসিউরেন্স অফ লার্নিং’ এবং ‘টিচিং ইফেক্টিভনেস’ নিয়ে কথা উঠে। আলোচনার এক পর্যায়ে, আমার অভিজ্ঞতা থেকে কথা প্রসঙ্গে অমি মিটিংএ একটি প্রশ্ন তুললাম। প্রশ্নের আগে এখানে বলে রাখি আমি আন্ডারগ্রাজুয়েট ক্লাসে পরিসংখ্যানের প্রথম ও দ্বিতীয় কোর্স পড়াই। বললাম, আমরা যা পড়াচ্ছি ছেলেমেয়েরা তো কিছুই শিখছে বলে মনে হচ্ছে না। আগের দিন ক্লাসে যা পড়াই পরের দিন গিয়ে প্রশ্ন করলে ছাত্র-ছাত্রীরা অসহায়ের মত ফ্যাল ফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এর কারণ এবং বিহীত কী’? আমার প্রশ্নটি শেষ হওয়ার আগেই বলতে গেলে মুখ থেকে কথাটি কেড়ে নিয়ে ডিপার্টমেন্টের হেড যা বললেন তার মানে করলে এই দাঁড়ায়, ‘আমরা টিচার নই তাই আমরা টিচ করি না, আর এজন্যই ছাত্র-ছাত্রীরা কিছু লার্নও করে না’। তখন আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম, ‘তা হলে আমরা কী, এবং ক্লাসে গিয়ে কী করি?’ তিনি সগৌরবে উত্তর দিলেন, ‘উই আর প্রফেসারস, নট টিচারস। উই প্রফেস, অ্যান্ড ডু নট টিচ’। কথা এখানেই শেষ হয়ে গেল। দিনের শেষবেলা মিটিং অ্যাডজোর্ণ হল, সবাই যার যার বাড়ি চলে গেলেন।
কিন্তু কথোপকথনের রেশ আমার মাঝে রয়ে গেল এবং এখনো আছে। বিভাগীয় প্রধানের কাছ থেকে উত্তর যা পেলাম তার চেয়েও একটি প্রশ্ন আরো বড় হয়ে গেঁথে রইল আমার মনে। ‘উই আর প্রফেসারস, নট টিচারস। উই প্রফেস’। আমার প্রশ্ন, ‘হোয়াট ডু উই প্রফেস, হাও ডাজ ইট বেনিফিট আওয়ার স্টুডেন্টস অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনস?’ যদি কোনো সহৃদয় অধ্যাপক বা অন্য কারো কাছে আমার প্রশ্নটির উত্তর জানা থাকে তা হলে ইমেইল মারফত জানালে বাধিত থাকব।
লেখক: অধ্যাপক - টেনেসী স্টেইট ইউনিভার্সিটি; এডিটর - জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ।
awahid2569@gmail.com |
আসলেই তো এই মানব সভ্যতার বিনির্মানে "সমকালীন শিক্ষা ব্যবস্থা" কতটা প্রয়োজনীয় বা আসলেই কি কার্য্যকারী?